২৯ জানুয়ারি ২০২১ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.) প্রদত্ত জুমুআর খুতবা

بسم اللہ الرحمن الرحیم

যুক্তরাজ্যের (টিলফোর্ড, সারেস্থ) ইসলামাবাদের মুবারক মসজিদে প্রদত্ত সৈয়্যদনা আমীরুল মু’মিনীন হযরত মির্যা মসরূর আহমদ খলীফাতুল মসীহ্ আল্ খামেস (আই.)-এর ২৯ জানুয়ারি ২০২১ মোতাবেক ২৯ সুলাহ্, ১৪০০ হিজরী শামসী’র জুমুআর খুতবা
তাশাহ্হুদ, তা’ঊয এবং সূরা ফাতিহা পাঠের পর হুযূর আনোয়ার (আই.) বলেন:
হযরত উসমান (রা.)-এর বিভিন্ন যুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে উল্লেখ করছি। যেমনটি বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত উসমান (রা.) বদরের যুদ্ধে যোগ দিতে পারেন নি কেননা, তার সহধর্মিণী রসূল তনয়া হযরত রুকাইয়া (রা.) গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, তাই মহানবী (সা.) তার সেবা-শুশ্রƒষা করার জন্য তাকে (রা.) মদীনায় অবস্থান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু তাকে (রা.) বদরের (যুদ্ধে) যোগদানকারীর মর্যাদা দিয়েছেন। এ কারণেই মহানবী (সা.) তার জন্য বদরের (যুদ্ধে) অংশগ্রহণকারীদের মতই যুদ্ধলব্ধ সম্পদে ও পুরস্কারে অংশ নির্ধারণ করেছেন।
তৃতীয় হিজরীর মহররম বা সফর (মাসে) গাতফানের যুদ্ধ হয়। গাতফানের যুদ্ধের জন্য নজদ অভিমুখে যাত্রার প্রাক্কালে মহানবী (সা.) হযরত উসমান (রা.)-কে মদীনার আমীর নিযুক্ত করেন আর এ কারণে তিনি এতেও যোগদান করেন নি। হযরত মির্যা বশীর আহমদ সাহেব (রা.) এই যুদ্ধের বিশদ বিবরণ এভাবে দিয়েছেন,
বনু গাতফানের কোন কোন গোত্র অর্থাৎ বনু সা’লাবাহ্ এবং বনু মোহারেব এর সদস্যরা তাদের একজন নামকরা যোদ্ধা দ’সুর বিন হারেস এর আহ্বানে মদীনার ওপর অতর্কিতে হামলা করার দুর্ভিসন্ধি নিয়ে নজদ এর একটি স্থান ‘যী আমর’ এ সমবেত হতে আরম্ভ করে। মহানবী (সা.) যেহেতু তাঁর শত্রুদের গতিবিধি সম্পর্কে নিয়মিত খবরাখবর রাখতেন (তাই) তিনি (সা.) সময়মত তাদের এই হিং¯্র অভিপ্রায় সম্পর্কে অবহিত হন আর তিনি একজন বিচক্ষণ সেনানায়কের মতো আগাম ব্যবস্থা হিসেবে সাড়ে চারশ’ সাহাবীর একটি দলকে নিজের সাথে নিয়ে ৩য় হিজরীর শেষ দিকে অথবা সফর (মাসের) প্রারম্ভে মদীনা হতে যাত্রা করেন এবং দ্রুত গতিতে সফর করে ‘যী আমর’ এর কাছাকাছি পৌঁছে যান। শত্রুরা তাঁর আগমন সংবাদ পেতেই ত্বড়িৎ পাশ্ববর্তী টিলায় উঠে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেয় আর মুসলমানরা ‘যী আমর’এ পৌঁছার পর দেখে ময়দান ফাঁকা। তবে, বনু সা’লাবাহ্’র জব্বার নামের একজন বেদুঈন সাহাবীদের হাতে ধরা পড়ে, (তারা) তাকে বন্দি করে নিয়ে মহানবী (সা.)-এর সমীপে উপস্থিত হন। মহানবী (সা.) তার কাছে খবরাখবর জিজ্ঞেস করলে জানা যায় বনু সা’লাবাহ্ এবং বনু মোহারেব এর সকল সদস্য পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছে এবং তারা উন্মুক্ত প্রান্তরে মুসলমানদের সামনে আসবে না। অগত্যা মহানবী (সা.)-কে (নিজ বাহিনীকে) ফিরে আসার নির্দেশ দিতে হয়। কিন্তু এই যুদ্ধের এতটুকু লাভ অবশ্যই হয়েছে, অর্থাৎ সে সময় গাতফান গোত্রের পক্ষ থেকে যে আশংকা দেখা দিয়েছিল- তা সাময়িকভাবে টলে যায়।
উহুদের যুদ্ধ হয়েছিল তৃতীয় হিজরীর শওয়াল মাসে। হযরত উসমান (রা.) উহুদের যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। প্রথম দু’টি যুদ্ধে তিনি যোগদান করেন নি কিন্তু এতে অর্থাৎ উহুদের যুদ্ধে তিনি যোগদান করেছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে সাহাবীদের একটি দল এমন ছিল যারা অতর্কিত হামলা এবং মহানবী (সা.)-এর শাহাদতের সংবাদ শুনে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন আর এমনও একটি সময় আসে যখন মহানবী (সা.)-এর সাথে মাত্র ১২জন সাহাবীর ছোট্ট একটি দল রয়ে গিয়েছিল। হযরত উসমান প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মুসলমানরা যখন কুরাইশদের বাহিনীর ওপর বিজয় লাভ করে আর তারা গনিমতের মাল একত্রিত করার কাজে রত হয় তখন মহানবী (সা.) যেই পঞ্চাশজন তিরন্দাজকে নিজ স্থান পরিত্যাগ করতে বারণ করেছিলেন তারা বিজয় দেখে নিজেদের স্থান পরিত্যাগ করে, অথচ মহানবী (সা.) তাদেরকে নিজেদের স্থান পরিত্যাগ করতে কঠোরভাবে বারণ করেছিলেন। খালেদ বিন ওয়ালীদ, যিনি তখনও মুসলমান হন নি, তিনি এই দৃশ্য দেখে তাৎক্ষণিকভাবে সেদিক দিয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ করেন। এই আক্রমণ এত অতর্কিত ও অপ্রত্যাশিত এবং এমন প্রচ- ছিল যে, মুসলমানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ছত্রভঙ্গ সাহাবীদের মাঝে হযরত উসমানের নামও উল্লেখ করা হয়। পবিত্র কুরআনে তাদের সম্পর্কে উল্লেখ হয়েছে যে, তখনকার বিশেষ পরিস্থিতি এবং তাদের আন্তরিক ঈমান ও নিষ্ঠাকে সামনে রেখে আল্লাহ্ তা’লা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। অতএব আল্লাহ্ তা’লা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ تَوَلَّوْا مِنكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ إِنَّمَا اسْتَزَلَّهُمُ الشَّيْطَانُ بِبَعْضِ مَا كَسَبُوا ۖ وَلَقَدْ عَفَا اللَّهُ عَنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ حَلِيمٌ (সূরা আলে ইমরান: ১৫৬)
অর্থাৎ, “নিশ্চয় তোমাদের মধ্য থেকে যারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিল, যেদিন দুদল পরস্পর মুখোমুখী হয়েছিল, নিশ্চয় তাদের কোন কোন কৃতকর্মের দরুন শয়তান তাদেরকে পদস্খলিত করতে চেষ্টা করেছিল। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মার্জনা করেছেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম সহিষ্ণু।”
এই যুদ্ধকালে মুসলমানদের উক্ত অবস্থার উল্লেখ করতে গিয়ে হযরত মির্যা বশীর আহমদ সাহেব সীরাত খাতামান্নাবীঈন পুস্তকে লিখেন, কুরাইশ বাহিনী প্রায় চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছিল আর নিজেদের মুহুর্মুহু আক্রমণে প্রতি মুহূর্তে চাপ বৃদ্ধি করছিল। তাতেও মুসলমানরা হয়ত কিছু সময় পর সামলে উঠতে পারত, কিন্তু সর্বনাশ এটি হয়েছে যে, কুরাইশদের এক সাহসী সৈনিক আব্দুল্লাহ্ বিন কামেয়া মুসলমানদের পতাকাবাহক মুসআব বিন উমায়ের (রা.)-এর ওপর আক্রমণ করে এবং নিজ তরবারির আঘাতে তাঁর ডান হাত কেটে ফেলে। মুসআব (রা.) তাৎক্ষণিকভাবে পতাকা অপর হাতে নিয়ে নেন আর ইবনে কামেয়াকে মোকাবিলার জন্য এগিয়ে যান। কিন্তু সে দ্বিতীয় আঘাতে তার অপর হাতও ছিন্ন করে দেয়। এতে মুসআব নিজের উভয় কর্তিত হাত একত্রিত করে পতনোন্মুখ ইসলামী পতাকাকে সামলানোর চেষ্টা করেন এবং সেটিকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরেন। যখন ইবনে কামেয়া তাঁর ওপর তৃতীয় আঘাত হানে আর এবার মুসআব শহীদ হয়ে পড়ে যান। যদিও অন্য একজন মুসলমান তাৎক্ষণিকভাবে অগ্রসর হয়ে পতাকা হাতে নিয়ে নেন, কিন্তু যেহেতু মুসআবের গঠন-গড়ন মহানবী (সা.)-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল, তাই ইবনে কামেয়া ধরে নিয়েছে যে, আমি মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যা করেছি। অথবা হতে পারে এটি তার পক্ষ থেকে দুষ্কৃতি ও প্রতারণামূলকভাবে হয়ে থাকবে। যাহোক মুসআবের শহীদ হয়ে পড়ে যাওয়ায় সে চিৎকার করে বলতে থাকে যে, আমি মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যা করেছি। এই সংবাদে মুসলমানদের বাদবাকি সম্বিতটুকুও হারিয়ে যেতে থাকে এবং তাদের ঐক্য পুরোপুরি হারিয়ে যায়। আর বহু সাহাবী হতভম্ব হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রস্থান করে। তখন মুসলমানরা তিনটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এক দল ছিল তাদের, যারা মহানবী (সা.)-এর শাহাদাতের সংবাদ পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করেছিল আর এই দলের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে কম। অথবা বলা যায় যে, তারা হতাশায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল। তাদের মাঝে হযরত উসমান বিন আফফানও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু যেমনটি পবিত্র কুরআনে উল্লেখ হয়েছে যে, তখনকার বিশেষ পরিস্থিতি এবং তাদের আন্তরিক ঈমান ও নিষ্ঠাকে দৃষ্টিপটে রেখে আল্লাহ্ তা’লা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদের মাঝ থেকে কেউ কেউ মদীনায় পৌঁছে যায়। আর এভাবে মদীনায়ও মহানবী (সা.)-এর কাল্পনিক শাহাদাত এবং ইসলামী সেনাবাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পৌঁছে যায়, যার ফলে পুরো শহরে মাতম আরম্ভ হয়ে যায় আর মুসলমান আবালবৃদ্ধবণিতা (সবাই) অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত অবস্থায় শহর থেকে বেরিয়ে পড়ে এবং উহুদের দিকে যাত্রা করে। আর কেউ কেউ হতবুদ্ধিতার মাঝে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে যায় এবং আল্লাহ্র নাম নিয়ে শত্রু-সারিতে ঢুকে পড়ে।
দ্বিতীয় দলে তারা ছিল , যারা পলায়ন না করলেও, মহানবী (সা.)-এর শাহাদাতের সংবাদ শুনে হয় হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল অথবা এখন যুদ্ধ করাকে নিরর্থক মনে করেছিল। তাই তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে একপাশে মাথা নিচু করে বসে পড়েন।
তৃতীয় দল ছিল তাদের, যারা যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছিল। তাদের মাঝে কতিপয় এমনও ছিল- যারা মহানবী (সা.)-এর চতুর্দিকে সমবেত ছিল এবং অতুলনীয় আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছিল; আর অধিকাংশ ছিল এমন যারা যুদ্ধক্ষেত্রে বিক্ষিপ্তভাবে লড়াই করছিল। এরা এবং একইসাথে দ্বিতীয় দলের লোকেরাও যতই মহানবী (সা.)-এর জীবিত থাকার সংবাদ পাচ্ছিল ততই উন্মাদের ন্যায় লড়তে লড়তে তাঁর (সা.) চতুর্দিকে একত্রিত হচ্ছিল। সে সময়ে যুদ্ধের অবস্থা এমন ছিল যে, কুরাইশদের সেনাবাহিনী সমুদ্রের ভয়াল ঢেউয়ের ন্যায় চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসছিল এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সকল দিক থেকে তির এবং পাথর বর্ষিত হচ্ছিল। এরূপ বিপদসংকুল অবস্থা দেখে উক্ত নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীরা মহানবী (সা.) এর চারদিক ঘেরাও করে তাঁর পবিত্র দেহের চারপাশে মানবঢাল তৈরি করে। তথাপি যখনই আক্রমণের ঢেউ আসত তখন এই গুটিকতক লোককে ধাক্কা দিয়ে এদিক সেদিক সরিয়ে দেয়া হতো আর এরূপ অবস্থায় কয়েকবার এমন হয়েছে যে, মহানবী (সা.) প্রায় একাই রয়ে যেতেন।
যাহোক বলা হয় যে, তখন হযরত উসমান হতাশ হয়ে অথবা অন্য কোন কারণে মহানবী (সা.) এর শাহাদাতের সংবাদ শুনে সেখান থেকে চলে গিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে হতাশ হয়ে বসে পড়া লোকদের মাঝে হযরত উমরেরও (রা.) উল্লেখ পাওয়া যায়; যাহোক সেটা যথাসময়ে বর্ণনা করা হবে।
এখন আমি হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় যে কূটনৈতিক কার্যকলাপ এবং বয়আতে রিযওয়ান হয়েছিল, তাতে হযরত উসমান (রা.)-এর ভূমিকা বা তাঁর সম্পর্কে কী কী তথ্য পাওয়া যায়, তা উল্লেখ করছি। মহানবী (সা.) স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি এবং তাঁর সাহাবীগণ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের মাথা ন্যাড়া করে এবং চুল ছেঁটে বায়তুল্লাহ্তে প্রবেশ করছেন। এই স্বপ্নের ভিত্তিতে মহানবী (সা.) ষষ্ঠ হিজরী সনের যিলক্বদ মাসে স্বীয় চৌদ্দশ সাহাবীকে সাথে নিয়ে ওমরাহ্ করার জন্য মদীনা থেকে যাত্রা করেন। হুদায়বিয়া নামক স্থানে তিনি যাত্রাবিরতি দেন। কুরাইশরা মহানবী (সা.) কে ওমরাহ্ করতে বাধা প্রদান করে। দুই পক্ষের মাঝে যখন কূটনৈতিক আলোচনার সূচনা হয় এবং মহানবী (সা.) মক্কাবাসীদের উত্তেজনা সম্পর্কে অবগত হন, তখন তিনি (সা.) বলেন এমন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে মক্কায় প্রেরণ করা হোক যিনি মক্কার অধিবাসী হবেন এবং কুরাইশদের কোন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য হবেন। কাজেই তখন হযরত উসমান (রা.)-কে এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়। হযরত মির্যা বশির আহমদ সাহেব এর যে বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন তার কিছুটা এখানে বর্ণনা করছি। তিনি (রা.) লিখেন-
মহানবী (সা.) একটি স্বপ্ন দেখেন যে, তিনি নিজের সাহাবীদের সাথে নিয়ে বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করছেন। তখন যিলক্বদ মাস খুব নিকটে ছিল, যাকে অজ্ঞতার যুগেও সেই চারটি পবিত্র মাসের অন্তর্ভুক্ত জ্ঞান করা হতো যেগুলোতে সর্বপ্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল নিষিদ্ধ । অর্থাৎ একদিকে তিনি এই স্বপ্ন দেখেন আর অপর দিকে সময়ও এমন ছিল যে, আরবের চতুর্সীমায় যুদ্ধ-বিগ্রহ থেমে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসত। যদিও তখন হজ্জের মৌসুম ছিল না এবং তখনও পর্যন্ত ইসলামে হজ্জব্রত পালন যথারীতি নির্ধারিত হয় নি, কিন্তু বায়তুল্লাহ শরিফের তোয়াফ সবসময়ই করা যেত, তাই তিনি (সা.) এই স্বপ্ন দেখার পর নিজ সাহাবীদেরকে উমরার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের আহবান জানান। সেই মুহূর্তে তিনি সাহাবীদের উদ্দেশ্যে এই ঘোষণাও প্রদান করেন যে, যেহেতু এই সফরে কোন ধরনের যুদ্ধ করার অভিপ্রায় নেই বরং কেবল এক শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় ইবাদাত পালন করা অভিপ্রায়, তাই মুসলমানদের এই সফরে কোন ধরনের অস্ত্র সাথে নেয়া উচিত হবে না, তবে হ্যাঁ, আরবদের রীতি অনুযায়ী কেবল নিজেদের তরবারি খাপে আবদ্ধ করে মুসাফেরদের মত নিজেদের সাথে রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি তিনি (সা.) মদীনার চতুর্দিকে বসবাসরত বেদুঈন লোকদেরও সাথে গিয়ে উমরাহ করার আহবান জানান- যারা বাহ্যত মুসলমানদের সাথে ছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অতি অল্পসংখ্যক বা নামে মাত্র কিছু লোক ব্যতিত ঐ সকল দূর্বল ইমানের অধিকারী তথাকথিত মুসলমান বেদুঈনগণ, যারা মদীনার আশপাশে বসবাস করতো, মহানবী (সা.)-এর সাথে বের হতে অস্বীকৃতি জানালো কেননা তাদের ধারণা ছিল, যদিও মুসলমানরা উমরার নিয়্যত বৈ অন্য কোন উদ্দেশ্যে বের হচ্ছে না, কিন্তু কুরায়শরা অবশ্যই মুসলমানাদেরকে বাধা প্রদান করবে আর এভাবে যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। তারা এ-ও ভাবছিল যে, যেহেতু এই মোকাবিলা মক্কার অদূরে এবং মদীনা থেকে দূরে হবে, তাই কোন মুসলমান জীবিত ফিরতে পারবে নাÑ এই ভয়ে তারা উক্ত কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হয় নি। যাইহোক, মহানবী (সা.) প্রায় চৌদ্দশত সাহাবীর একটি দল নিয়ে যুল কা’দার ছয় হিজরীর প্রারম্ভে সোমবার প্রভাতে মদীনা থেকে যাত্রা করেন। এই সফরে তাঁর সহধর্মিণী মোহতারমা হযরত উম্মে সালেমা (রা.) তাঁর সহযাত্রী ছিলেন আর মদীনার আমীর হিসেবে নুমায়লা বিন আব্দুল্লাহ্ (রা.)কে এবং ইমামুস সালাত হিসেবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আব্দুল্লাহ্ বিন মাকতুম (রা.)কে নিযুক্ত করে যান।
যখন তিনি (সা.) মদীনা থেকে প্রায় ছয় মাইল দূরত্বে মক্কার পথে অবস্থিত যুল হুলায়ফা’য় গিয়ে পৌঁছান হন, তখন যাত্রাবিরতির আদেশ দেন এবং যোহর নামায আদায় শেষে কুরবানীর উটগুলোকে চিহ্নিত করার নির্দেশ প্রদান করেন, যা সংখ্যায় ছিল ৭০টি এবং সাহাবীদেরকে হাজীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ পোষাক পরিধানের নির্দেশ দেন যাকে পারিভাষাগতভাবে এহরাম বাধা বলা হয় এবং তিনি স্বয়ং এহরাম পরিধান করেন। অতঃপর কুরায়েশের অবস্থা নীরিক্ষণের উদ্দেশ্যে যে, তাদের কোন দূরভিসন্ধি নেই তো? খুযাআ গোত্রের এক সদস্য বুসর বিন সুফিয়ানকে যিনি মক্কার নিকটবর্তী এলাকায় বসবাস করতেন বার্তাবাহকরূপে অগ্রে প্রেরণ করে ধীরে ধীরে মক্কা অভিমূখে যাত্রা করেন এবং অতিরিক্ত সাবধানতাহিসেবে মুসলমানদের বড় দলের অগ্রভাগে থাকার জন্য আব্বাদ বিন বিশরের নেতৃত্বে বিশজন অশ^ারোহীর একটি ক্ষুদ্রদলও নিযুক্ত করেন। যখন মহানবী (সা.) কয়েকদিনের যাত্রা শেষে আসফানের কাছে উপনীত হন, যেটি মক্কা থেকে প্রায় দুই মঞ্জিল বা ১৮ মাইল দূরত্বে পৌঁছেন তখন বার্তাবাহক ফেরত এসে মহানবী (সা.)কে অবগত করেন যে, মক্কার কুরায়েশরা খুব উত্তেজিত এবং আপনাকে বাধা দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এমনকি তাদের মাঝে অনেকে নিজেদের উত্তেজনা এবং হিং¯্রতার বহিঃপ্রকাশার্থে চিতার চামড়া পরিধান করে রেখেছে এবং যুদ্ধের দৃঢ় সংকল্প করে মুসলমানদেরকে সর্বমূল্যে বাধা প্রদান করার প্রতিজ্ঞা করেছে। এটিও জানা গেছে, কুরায়শরা নিজেদের কতিপয় আত্মত্যাগী অশ^ারোহীর এক ক্ষুদ্রদল খালেদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে সম্মুখে প্রেরণ করেছে যিনি তখনও মুসলমান হন নি ;আর সম্ভবত সেই ক্ষুদ্রদল মুসলমানদের কাছাকাছি পৌঁছেও গেছে, এছাড়া সেই দলে একরামা বিন আবু জেহেলও অন্তভুক্ত আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। মহানবী (সা.) এই খবর শুনে সংঘাত এড়াতে সাহাবীদেরকে এই আদেশ দিলেন যে, তারা যেন মক্কার পরিচিত পথ না নিয়ে ডান দিকে গিয়ে যেন সম্মুখে অগ্রসর হয়। অতএব মুসলমানরা একটি কঠিন ও দূর্গম পথে সমুদ্রকূল ঘেঁষে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে। মহানবী (সা.) যখন সেই নতুন পথ পাড়ি দিয়ে হুদায়বিয়ার নিকটে উপনীত হন, যা মক্কা থেকে এক মঞ্জিল অর্থাৎ কেবল নয় মাইল দুরত্বে অবস্থিত এবং হুদায়বিয়ার ঘাঁটি থেকে মক্কার উপত্যকার সূচনা হয়ে যায়; তখন হঠাৎ করে তাঁর ’কুসওয়া’ নামে পরিচিত ঊঁটনী পা ছড়িয়ে হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে বসে পড়ে- যা তিনি (সা.) বহু যুদ্ধে ব্যবহার করেছেন। শত চেষ্টা করেও তাকে দাঁড় করানো যাচ্ছিল না। সাহাবীগণ নিবেদন করলেন, সম্ভবত সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু মহানবী (সা.) বললেন, না না, এটি ক্লান্ত হয়নি। আর এভাবে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়া এর অভ্যাসও না। বরং আসল বিষয় হলো, এর পূর্বে যেই মহান সত্তা আসহাবে ফীল-এর হাতিকে মক্কা অভিমুখে অগ্রসর হতে বাধা দিয়েছিলেন, তিনিই এখন এই উটনীকেও থামিয়েছেন। অতএব আল্লাহর কসম! মক্কার কুরাইশরা বায়তুল হারামের সম্মানার্থে যে দাবীই আমার কাছে উত্থাপন করবে, আমি তা মেনে নিব। এরপর তিনি তাঁর উটনীকে পুনরায় দাঁড়ানোর আদেশ দিলেন। আর আল্লাহর কি মহিমা! এবার সে ততক্ষনাৎ উঠে চলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলো। তারপর তিনি তাকে হুদায়বিয়া উপত্যকার অপরপ্রান্তে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি ঝরনার নিকটে থেমে উটনী থেকে নিচে নামলেন এবং সেখানেই তাঁর নির্দেশে সাহাবীগন শিবির স্থাপন করেন।
কুরাইশদের সাথে সন্ধির আলোচনার সূচনা কীভাবে হয়, তা পরবর্তীতে বর্ণনা করা হবে। মহানবী (সা.) হুদায়বিয়া উপত্যকায় পৌঁছে উপত্যকার ঝাণার পাশে শিবির স্থাপন করেন। যখন সাহাবীগণ সেখানে শিবির স্থাপন করেন তখন খোযা’আ গোত্রের বোদাইল বিন ওয়ারাকা নামের একজন প্রসিদ্ধ নেতা যে কাছের এলাকাতেই বাস করতো, তার কিছু সঙ্গীসহ মহানবী (সা.)-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য আসে। সে তাঁর (সা.) কাছে নিবেদন করে, মক্কার নেতারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তারা আপনাকে কখনোই মক্কায় প্রবেশ করতে দিবে না। তিনি (সা.) বলেন, আমরা তো যুদ্ধের উদ্দেশ্যে আসি নি বরং কেবল উমরার নিয়্যত নিয়ে এসেছি। পরিতাপ! যুদ্ধের আগুন মক্কার কুরাইশদেরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলেছে, তবুও এরা নিবৃত্ত হয় না; আমি তো তাদের সাথে এই সন্ধির জন্য প্রস্তুত যেÑ তারা যেন আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করে আর আমাকে অন্যদের বিষয়ে বাধা না দেয়। মক্কবাসীদের সাথে আমার কোন বিরোধ নেই। তাদের সাথে আমি কোন সম্পর্ক রাখব না আর অন্যদের মাঝে ইসলামের বার্তা পৌঁছাব। কিন্তু যদি তারা আমার এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে এবং যুদ্ধের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত রাখে তবে আমিও সেই সত্তার কসম খেয়ে বলছি, যার হাতে আমার প্রাণ! আমিও ততক্ষণ পর্যন্ত রণে ভঙ্গ দিব না যতক্ষণ না এপথে আমার জীবন উৎসর্গিত হয় অথবা খোদা আমাকে বিজয় দান করেন। আমি যদি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাই তাহলে তো ঝামেলা শেষ। কিন্তু যদি খোদা তা’লা আমাকে জয়যুক্ত করেন এবং আমার প্রতিষ্ঠিত ধর্ম বিজয় লাভ করে তাহলে মক্কাবাসীদেরও ঈমান আনার ক্ষেত্রে কোন ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ থাকা উচিত হবে না। বুদায়েল বিন ওয়ারাকার ওপর মহানবী (সা.)-এর এই আন্তরিক এবং বেদনাদায়ক বক্তব্যের গভীর প্রভাব পড়ে এবং সে তাঁর (সা.)-এর কাছে নিবেদন করে, আপনি আমাকে সামান্য অবকাশ দিন আমি যেন মক্কা গিয়ে আপনার এই বার্তা পৌঁছে দিতে পারি এবং সন্ধি স্থাপনের চেষ্টা করতে পারি। তিনি (সা.) অনুমতি দিলেন। বুদায়েল তার গোত্রের কতক ব্যক্তিকে সাথে করে নিয়ে মক্কাভিমুখে রওনা হয়। বুদায়েল বিন ওয়ারাকা মক্কায় পৌঁছে কুরাইশদের সমবেত করে তাদের উদ্দেশ্যে বলে, আমি সেই ব্যক্তি অর্থাৎ মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর কাছ থেকে আসলাম। তিনি আমার কাছে একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। আপনাদের অনুমতি পেলে আমি তা উল্লেখ করি। জবাবে কুরাইশদের উত্তেজিত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তিরা বলতে থাকলো, আমরা এই ব্যক্তির কোন কথা কানে তুলতে চাই না। কিন্তু বুদ্ধিমান এবং দায়িত্বশীল নেতারা বললো, ‘ঠিক আছে তার প্রস্তাব আমাদের শুনাও। অতএব, বুদায়েল হুযূর (সা.) এর প্রস্তাব পুনঃরায় তাদের সামনে পড়ে শুনাল। উরওয়া বিন মাসুদ নামে সাকিফ গোত্রের এক প্রভাবশালী নেতা তখন মক্কায় ছিলেন, তিনি দাঁড়িয়ে আরবদের প্রাচীন রীতিতে বলেন, হে লোকেরা আমি কি তোমাদের পিতার মত নই? তারা বললো, হ্যাঁ। এরপর তিনি বলেন, তোমরা কি আমার সন্তানতুল্য নও? তারা বললো, হ্যাঁ। পুনরায় উরওয়া বলেন, তোমারা কি আমাকে কোনভাবে অবিশ^াস করতে পার? কুরাইশরা বললো, কখনোই না। তখন সে বলে, তাহলে আমি মনে করি এই ব্যক্তি অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.) তোমাদের সামনে একটি উত্তম প্রস্তাব রেখেছেন। তার প্রস্তাব তোমাদের গ্রহণ করা উচিত। আর আমাকে অনুমতি দাও যেন আমি তোমাদের পক্ষ থেকে তার কাছে গিয়ে আলোচনা করতে পারি। কুরাইশরা বললো, ঠিক আছে আপনি আমাদের পক্ষ থেকে গিয়ে তার সাথে আলোচনা করুন।
সে যখন মহানবী (সা.)-এর বৈঠকে গিয়ে উপস্থিত হয় তখন সেখানে এক প্রাণোদ্দীপক দৃশ্য দেখে। উরওয়া মহানবী (সা.)-এর সামনে উপস্থিত হয় এবং তাঁর (সা.) আলোচনা শুরু করে। সে মহানবী (সা.)-এর সামনে সেই বক্তব্যই পুণরাবৃত্তি করেÑ যা এর আগে বুদায়েল বিন ওয়ারকার সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। উরওয়া মূলত মহানবী (সা.)-এর অভিমতের সাথে একমত ছিল। কিন্তু কুরাইশের পক্ষে দূতের দায়িত্ব পালন এবং তাদের স্বার্থ রক্ষায় যত বেশি সম্ভব শর্ত মানানোর চেষ্টায় ছিল। উরওয়া মহানবী (সা.)-এর সাথে আলোচনা শেষ করে কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়েই বলে, হে লোকেরা! আমি জীবনে অনেক সফর করেছি। রাজ দরবারে উপস্থিত ছিলাম। কায়সার, কিসরা, নাজ্জাসীর দরবারে প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলেছি। কিন্তু খোদার কসম, যেভাবে আমি মুহাম্মদ (সা.) এর অনুসারীদের তাঁকে সম্মান করতে দেখেছি এরকম আর কোথাও দেখিনি। এরপর সে তার পুরো অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে- যা মহানবী (সা.) এর সভায় দেখেছে। পরিশেষে বলে, আমি তোমাদের পরামর্শ দিচ্ছি, মহানবী (সা.)-এর প্রস্তাব একটি ন্যায়নিষ্ঠ প্রস্তাব তাই এটি গ্রহণ করে নেয়া উচিত। উরওয়া’র এই কথাগুলো শুনে বনূ কিনানার হুলাইস বিন আলকামা নামের এক নেতৃস্থানীয় কুরাইশ তাদের উদ্দেশ্যে বলে, আপনারা অনুমতি দিলে আমি মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে সাক্ষাত করতে চাই। তারা বলল, নিঃসন্দেহে যেতে পারো। অতঃপর সেই ব্যক্তি হুদায়বিয়াতে আসে আর মহানবী (সা.) তাকে দূর থেকে দেখেই সাহাবীদেরকে বলেন, যে ব্যক্তি আমাদের দিকে আসছে সে এমন গোত্রের সাথে সম্পর্ক রাখে যারা কুরবানীর দৃশ্য পছন্দ করে। সুতরাং তোমরা অতিসত্তর নিজেদের কুরবানীর পশুগুলোকে একত্র করে তার সামনে নিয়ে আস যাতে সে বুঝতে পারে এবং অনুধাবন করে, আমরা কী উদ্দেশ্যে এখানে সমবেত হয়েছি। অতএব সাহাবীরা যখন নিজেদের কুরবানীর পশুগুলোকে হাঁকিয়ে এবং আল্লাহু আকবর ধ্বনি উচ্চকিত করে তার সামনে একত্রিত হয় তখন সে এই দৃশ্য দেখে বলে, সুবহানাল্লাহ্ সুবহানাল্লাহ্! এরা তো হাজী। বায়তুল্লাহ্র তাওয়াফ করা থেকে এদেরকে কোনভাবে বিরত রাখা যেতে পারে না। অতঃপর সে দ্রুত কুরাইশদের মাঝে ফিরে যায় এবং বলতে থাকে, আমি দেখেছি, মুসলমানেরা নিজেদের পশুগুলোর গলায় কুরবানীর মালা বেঁধে রেখেছে এবং সেগুলোর গায়ে কুরবানীর চিহ্ন লাগিয়ে রেখেছে। সুতরাং তাদেরকে কা’বা শরীফের তাওয়াফ থেকে বিরত রাখা কোনভাবে সমীচীন হবে না।
কুরাইশদের মাঝে তখন চরম বিভক্তি দেখা দিচ্ছিল এবং লোকেরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেল। একদল মুসলমানদেরকে সর্বমূল্যে ফেরত পাঠাতে ও যুদ্ধ করার বিষয়ে ছিল বদ্ধপরিকর। কিন্তু অন্যদল এটিকে নিজেদের প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী পেয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল এবং একটি সম্মানজনক সমঝোতার আকাক্সক্ষী ছিল। এ কারণে সিদ্ধান্ত ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। তখন মিকরিয বিন হাফ্স নামী এক আরব নেতা কুরায়েশকে বলে যে, আমাকে যেতে দাও আমি মীমাংসার কোন পথ বের করবো। কুরায়েশরা বলল, ঠিক আছে তুমিও চেষ্টা করে দেখ। অতঃপর সে মহানবী (সা.)-এর কাছে আসে। মহানবী (সা.) দূর থেকে তাকে দেখে বলেন, আল্লাহ ভালো করুন, এই ব্যক্তি তো ভালো নয়। যাহোক, মিকরিয তার কাছে এসে আলোচনা আরম্ভ করে কিন্তু তার আলোচনা চলাকালেই মক্কার এক বিশিষ্ট নেতা সুহায়েল বিন আমর মহানবী (সা.)-এর সকাশে উপস্থিত হয়- যাকে সম্ভবত কুরায়েশরা ভীতবিহ্বল হয়ে মিকরিযের অপেক্ষা না করেই পঠিয়ে দিয়েছিল। মহানবী (সা.) সুহায়েলকে আসতে দেখে বলেন, সুহায়েল আসছে। এখন আল্লাহ চাইলে বিষয় সহজ হয়ে যাবে।
যাহোক, এই সংলাপ অব্যহত থাকে। তখন এই ঘটনাও ঘটে যে, কুরায়েশদের পক্ষ থেকে যখন একের পর এক দূত আসতে থাকে তখন মহানবী (সা.) অনুভব করেন, তাঁর পক্ষ থেকেও কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তির কুরায়েশদের কাছে যাওয়া উচিত, যে তাদেরকে সহমর্মিতা এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝাতে পারবে। মহানবী (সা.) খারাশ বিন উমাইয়া নামী এক ব্যক্তিকে এ কাজের জন্য নির্বাচন করেন যে খুযাআ গোত্রের সাথে সম্পর্ক রাখতো। অর্থাৎ সেই গোত্র যার সাথে কুরায়েশের পক্ষ থেকে আগত সর্বপ্রথম দূত বুদায়েল বিন ওয়ারকারের সম্পর্ক ছিল। এ উপলক্ষ্যে মহানবী (সা.) খারাশকে বাহন হিসাবে নিজের একটি উট প্রদান করেন। খারাশ কুরায়েশের কাছে যায় কিন্তু যেহেতু তখনও আলোচনার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল আর কুরায়েশের যুবকেরা খুবই উত্তেজিত ছিল, এক উত্তেজিত যুবক ইকরামা বিন আবু জাহল খারাশের উটের ওপর হামলা করে সেটিকে আহত করে দেয়। আরবদের রীতি অনুসারে এর অর্থ ছিল, আমরা তোমাদের গতিবিধিকে বাহুবলে বাধা দিচ্ছি। শুধু তাই নয়, কুরায়েশের এই ক্ষেপাটে দল খারাশের ওপরও আক্রমণ করতে উদ্যত ছিল কিন্তু জ্যেষ্ঠ ও বয়স্করা মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে তার প্রাণ রক্ষা করে আর তিনি ইসলামী শিবিরে ফিরে আসেন অর্থাৎ কাফেরদের কাছ থেকে তিনি ফিরে আসেন। মক্কার কুরায়েশরা এতেই ক্ষান্ত হয় নি বরং নিজেদের উত্তেজনায় অন্ধ হয়ে এ বিষয়েরও সংকল্প করে যে, এখন মহানবী (সা.) এবং তার সাহাবীরা মক্কার এতটা নিকটে এবং মদিনার এত দূরে এসে অবস্থান করছেন তাই তাদের ওপর আক্রমণ করে যথাসম্ভব ক্ষতি সাধন করা যায়। অতএব তারা এ উদ্দেশ্যে চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের একটি দল হুদায়বিয়া অভিমুখে প্রেরণ করে আর তখন উভয় পক্ষের মাঝে যে আলোচনা চলছিল এর ছদ্মাবরণে তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করে যে, ইসলামী শিবিরের আশপাশে প্রদক্ষিণ কর, উৎ পেতে থাক আর সুযোগ বুঝে মুসলমানদের ক্ষতি সাধন করতে থাক। বরং কতিপয় রেওয়ায়েত থেকে এটিও জানা যায় যে, তাদের সংখ্যা আশি ছিল আর সুযোগে কুরায়েশ মহানবী (সা.)-কে হত্যা করারও ষড়যন্ত্র করেছিল কিন্তু যাহোক মুসলমানরা আল্লাহর ফজলে নিজ জায়গায় সজাগ ও সচেতন ছিল। আর কুরায়েশের এই ষড়যন্ত্রের গোমর ফাঁস হয়ে যায় আর এদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। মক্কাবাসীর এমন আচরণে, যা পবিত্র মাসগুলোতে বলতে গেলে হারাম শরীফের ভেতর করা হয়েছিল, মুসলমনরা খুবই ক্রুব্ধ বা উত্তেজিত ছিল কিন্তু মহানবী (সা.) তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং শান্তি আলোচনায় কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে দেন নি। মক্কাবাসীর এহেন আচরণের কথা পবিত্র কুরআনেও উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তা’লা বলেন,
وَهُوَ الَّذِي كَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ عَنْهُم بِبَطْنِ مَكَّةَ مِن بَعْدِ أَنْ أَظْفَرَكُمْ عَلَيْهِمْ ۚ وَكَانَ اللَّـهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا
অর্থাৎ মক্কার উপত্যকায় আল্লাহ নিজ কৃপায় কাফেরদের হাতকে তোমাদের থেকে নিবৃত রেখেছেন আর তোমাদের সুরক্ষা করেছেন আর তোমরা যখন তাদের ওপর বিজয় লাভ করেছ আর তাদেরকে নিজেদের করতলগত করেছ তখন তিনি তাদের থেকে তোমাদের হাতকে বিরত রেখেছেন। (সূরা ফাতাহ্: ২৫)
যাহোক, যখন আমরা এই সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সেই পটভূমিতে মহানবী (সা.)-এর ক্রমাগত ধৈর্য, স্থৈর্য ও শান্তি স্থাপনের চেষ্টা দেখি, তখন আমরা দেখতে পাই যে, তা এমন এক ধৈর্য ও শান্তি স্থাপনের পরম প্রচেষ্টা, যার কোন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি (সা.) ক্রমাগত এই চেষ্টায় ব্যাপৃত ছিলেন যেন শান্তির কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। মহানবী (সা.) যখন কুরায়শদের দুষ্কৃতি দেখলেন এবং একইসাথে খিরাশ বিন উমাইয়ার সাথে মক্কাবাসীদের উত্তেজিত আচরণের কথা শুনলেন, তখন কুরায়শদের উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য এবং তাদেরকে সঠিক পথে আনার উদ্দেশ্যে এমন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে মক্কায় প্রেরণ করতে চাইলেন, যিনি মক্কারই বাসিন্দা এবং কুরায়শদের কোন সম্ভ্রান্ত গোত্রের সাথে সম্পর্ক রাখবেন। অর্থাৎ এতকিছুর পরও তিনি (সা.) চেষ্টা পরিত্যাগ করেন নি, বরং এত কিছুর পরও অন্য কাউকে পাঠানোর এই ঝুঁকি নেন। সুতরাং তিনি (সা.) হযরত উমর বিন খাত্তাবকে বলেন, ভাল হয় যদি আপনি মক্কায় যান এবং মুসলমানদের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকের দায়িত্ব পালন করেন। হযরত উমর নিবেদন করেন, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনি জানেন যে মক্কার লোকেরা আমার প্রতি তীব্র শত্রুতা রাখে এবং বর্তমানে মক্কায় আমার গোত্রের এমন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি নেই, মক্কাবাসীদের উপর যার চাপ থাকতে পারে। এজন্য আমার পরামর্শ হল, সাফল্যের পথ সুগম করার লক্ষ্যে এই সেবার জন্য উসমান বিন আফফানকে বেছে নেয়া হোক, যার গোত্র বনু উমাইয়া বর্তমানে অত্যন্ত প্রভাবশালী; আর মক্কাবাসীরা উসমানের বিরুদ্ধে কোন দুষ্কৃতির দুঃসাহস দেখাতে পারবে না এবং হযরত উসমানকে পাঠালে সাফল্যের অধিক আশা করা যায়। এই পরামর্শ মহানবী (সা.) পছন্দ করেন এবং তিনি হযরত উসমানকে তিনি মক্কায় যাওয়ার নির্দেশ দেন যেন এবং কুরায়শদেরকে মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ অভিপ্রায় ও উমরা পালনের ইচ্ছা সম্পর্কে অবগত করেন। আর তিনি (সা.) হযরত উসমানকে নিজের পক্ষ থেকে কুরায়শ-নেতাদের নামে একটি চিঠিও লিখে দেন। এই চিঠিতে মহানবী (সা.) নিজের আগমনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন এবং কুরায়শদের নিশ্চয়তা দেন যে, আমাদের উদ্দেশ্য কেবল একটি ইবাদত পালন করা আর আমরা শান্তিপূর্ণভাবে উমরা পালন করে ফিরে যাব।
তিনি (স.) হযরত ওসমানকে এটিও বলেন, মক্কায় যেসব দুর্বল মুসলমান রয়েছে তাদের সাথে সাক্ষাতেরও চেষ্টা করো এবং তাদের সাহস ও মনোবল দৃঢ় করো এবং তাদেরকে বলো, তোমরা আরেকটু ধৈর্য ধারণ কর, অচিরেই খোদা তা’লা সাফল্যের দ্বার খুলবেন। এ বার্তা নিয়ে হযরত ওসমান মক্কায় যান এবং আবু সুফিয়ানের সাথে সাক্ষাত করেন যিনি সে যুগের বড় নেতা ছিলেন এবং হযরত ওসমানের নিকটাতœীয়ও ছিলেন। হযরত উসমান (রা.) মক্কাবাসীদের এক জনসভায় উপস্থিত হন। সেই সভায় হযরত ওসমান মহানবী (স.)-এর লিখিত পত্র উপস্থাপন করেন যা একে একে কুরাইশদের বিভিন্ন নেতা দেখে, তা সত্ত্বেও তাদের সবাই এ হঠকারিতায় অনড় ছিল যে, মুসলমানগণ এবছর মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না। হযরত ওসমানের জোর দেয়ার পর কুরায়েশ বলে, তোমাদের যদি বেশী আগ্রহ থাকে তবে আমরা তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে বাইতুল্লাহ্র তওয়াফ করার সুযোগ দিচ্ছি, কিন্তু এর অধিক নয়। হযরত ওসমান বলেন, এটি কিভাবে হতে পারে যে, রসূলুল্লাহ্ (স.)-কে মক্কার বাইরে বাধাগ্রস্ত দেয়া হবে আর আমি তওয়াফ করব? কিন্তু কুরায়শরা কিছুতেই মানল না। অবশেষে হযরত ওসমান হতাশ হয়ে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তখন মক্কার দুষ্কৃতকারীদের মাথায় যে দুষ্কৃতি ভর করে তা হলো, তারা হযরত ওসমান এবং তার সাথীদের মক্কায় বাধাগ্রস্ত করে সম্ভবত এ ভেবে যে, এভাবে সমঝোতায় অধিক লাভজন শর্তাবলী মানাতে পারব। তখন মুসলমানদের মাঝে এ গুজব রটে যায় যে, মক্কাবাসীরা হযরত ওসমানকে হত্যা করেছে। এ সংবাদ পৌঁছার পর মহানবী (স.)ও গভীরভাবে শোকাহত ও ত্রুব্ধ হন। তখন তিনি সেখানে বয়াতে রিযওয়ান নেন। এ সম্পর্কে লেখা আছে, এ সংবাদ হুদায়বিয়ায় পৌঁছার পর মুসলমানদের মাঝে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, কেননা উসমান মহানবী (স.)-এর জামাতা এবং সবচেয়ে সম্মানিত সাহাবিদের অন্যতম ছিলেন। মক্কায় তিনি ইসলামী দূত হিসাবে গিয়েছিলেন। আর সেই দিনগুলোও ‘আশহারে হুরুম’ অর্থাৎ সম্মাজনক মাস-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং মক্কা স¦য়ং হারাম (সম্মানিত) বা পবিত্র এলাকা ছিল। মহানবী (সা.) তৎক্ষণাৎ সমস্ত মুসলমানদের মাঝে ঘোষণা দিয়ে তাদেরকে একটি বাবলা গাছের নিচে সমবেত করেন। অতঃপর সাহাবাগণ যখন একত্রিত হন তখন এই সংবাদের কথা উল্লেখ করে তিনি (সা.) বলেন, যদি এই সংবাদ সঠিক হয়ে থাকে তবে খোদার কসম! আমরা এই জায়গা হতে ততক্ষণ পর্যন্ত নড়বো না যতক্ষণ উসমানের (হত্যার) প্রতিশোধ না নেই। অতঃপর তিনি (সা.) সাহাবীদেরকে বলেন, আস এবং আমার হাতে হাত রেখে (অর্থাৎ ইসলামের বয়’আত গ্রহণের যে রীতি প্রচলিত আছে তদনুযায়ী) এই অঙ্গীকার কর যে, তোমাদের কেউ পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করবে না এবং নিজ জীবন বাজি রেখে লড়াই করবে। কিন্তু কোন অবস্থাতেই নিজ স্থান ত্যাগ করবে না। এই ঘোষণার পর সাহাবাগণ বয়’আতের জন্য এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন যে একে-অপরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলেন। এই ১৪০০-১৫০০ মুসলমানের প্রত্যেকেই নিজ প্রিয় মনিবের হাতে পুণরায় বয়’আত করে বিক্রি হয়ে যায়; সে সময় ইসলামের সামগ্রিক পুঁজি এটিই ছিল; অর্থাৎ এটিই মুসলমানদের মোট সংখ্যা ছিল। যখন বয়’আত নেয়া হচ্ছিল, তখন তিনি (সা.) তাঁর বাম হাত তাঁর ডান হাতের ওপরে রেখে বলেন, এটি উসমানের হাত। কেননা যদি সে এখানে উপস্থিত থাকতো তবে এই পবিত্র বাণিজ্যে অন্যের চেয়ে পিছিয়ে থাকতো না। কিন্তু এখন সে খোদা ও তাঁর রাসূলের কাজে নিয়োজিত। এভাবেই বিদ্যুততুল্য এ দৃশ্যের যবনিকাপাত ঘটে।
ইসলামের ইতিহাসে এই বয়’আত ‘বয়’আতে রিযওয়ান’ নামে সু-প্রসিদ্ধ। অর্থাৎ সেই বয়’আত যেখানে মুসলমানগণ খোদা তা’লার পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জনের পুরস্কার লাভ করেছেন। কুরআন শরীফও বিশেষভাবে এই বয়’আতের কথা উল্লেখ করেছে। যেমন আল্লাহ তা’লা বলেন,
لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
অর্থাৎ হে রসূল! নিশ্চয় আল্লাহ তা’লা মুসলমানদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা একটি বৃক্ষতলে তোমার বয়আত করছিল। কেননা এই বয়আতের মাধ্যমে তাদের অন্তরের সুপ্ত নিষ্ঠা আল্লাহ তা’লার প্রকাশ্য জ্ঞানের অংশ হয়ে গেছে। সুতরাং খোদাও তাদের অন্তরে শান্তি বর্ষণ করেন আর তাদের তিনি এক নিকটবর্তী বিজয়ে ধন্য করেন।
সাহাবা (রা.)ও এই বয়আতের কথা সর্বদা অত্যন্ত গর্ব ও ভালোবাসার সাথে বর্ণনা করতেন এবং তাদের অধিকাংশরাই পরবর্তীতে যুগের লোকদের বলতেন, তোমরা তো মক্কা বিজয়কে বিজয় মনে কর, কিন্তু আমরা বয়আতে রিজওয়ানকেই প্রকৃত বিজয় মনে করতাম। এতে কোন সন্দেহ নেই যে এই বয়াতের সমূহ অনুসঙ্গ ও শর্তের বর্তমানে এক অতি মহান বিজয় ছিল। শুধু এজন্য নয় যে, এটি ভবিষ্যতের অন্যান্য বিজয়ের দ্বার উন্মোচন করেছে, বরং এজন্যেও যে, এর মাধ্যমে ইসলামের সেই প্রাণ বিকিয়ে দেয়ার চেতনার অতি মহান রূপে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে যাকিনা মুহাম্মদ (সা.)-এর ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু আর ইসলামের নিবেদিতপ্রাণ মান্যকারীরা তাদের কর্ম দ্বারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তারা তাদের রসূল এবং এই রসূল (সা.)-এর আনিত সত্যের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে আর সেই (রণ)ক্ষেত্রের প্রত্যেক ধাপে জীবন ও মৃত্যুকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত। এজন্যই সাহাবায়ে কেরাম (রা.) বয়আতে রিজওয়ানের কথা উল্লেখ করে বলতেন, এই বয়আত ছিল মৃত্যুকে বরণ করার (স্বীকৃতিস্বরূপ) বয়আত। অর্থাৎ এই অঙ্গীকারের ওপর বয়আত করা হয়েছিল যে, প্রত্যেক মুসলমান ইসলামের জন্য এবং ইসলামের সম্মান রক্ষার্থে নিজেদের জীবন বাজি রাখবে তথাপি তারা পিছু হটবে না। এই বয়আতের বিশেষ দিকটি হলো, এই অঙ্গীকার ও শপথ কেবল মৌখিক কোন সাময়িক স্বীকৃতি ছিল না, যা কোন সাময়িক উত্তেজনার বশে করা হয়ে থাকবে, বরং অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উদ্ভূত ধ্বনি ছিল যার পেছনে মুসলমানদের সম্মিলিতশক্তি এক বিন্দুতে পুঞ্জীভুত ছিল। কুরাইশরা যখন এই বয়আত সম্বন্ধে জানতে পারে, তখন তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে তারা শুধু হযরত উসমান (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীদেরই মুক্ত করে দেয় নি, বরং তাদের দূতদেরও এ নির্দেশনা প্রদান করে যে, এখন যেকরেই হোক, মুসলমানদের সাথে চুক্তি করে নেয়া উচিত, কিন্তু এ শর্ত অবশ্যই নির্ধারন করতে হবে যে, মুসলমানরা যেন এ বছরের পরিবর্তে আগামী বছর এসে উমরা করে আর এখন যেন ফিরে যায়। অপরদিকে মহানবী (সা.)ও শুরু থেকেই এই অঙ্গীকার করে রেখেছিলেন যে, এ অবস্থায় আমি এমন কোন কথা বলবো না, যা মর্হরম মাসের পবিত্রতা এবং কাবা গৃহের সম্মান পরিপন্থি হবে আর আল্লাহ্ তা’লা তাঁকে যেহেতু এ সুসংবাদ দিয়ে রেখেছিলেন যে, এ অবস্থায় কুরাইশদের সাথে শান্তিচুক্তি ভবিষ্যত সফলতার পথ সুগম করবে, তাই এই উভয় পক্ষের জন্য যেন এ পরিবেশ সন্ধি ও মীমাংসার এক অতি উত্তম পরিবেশ ছিল আর এ পরিবেশেই সোহেল বিন আমর মহানবী (সা.)-এর সমীপে উপস্থিত হয়। আর মহানবী (সা.) তাকে দেখেই বলেন, এখন মনে হচ্ছে বিষয়টি সহজ হবে। সন্ধির আলোচনা শুরু হলে সোহেল বিন আমর যখন মহানবী (সা.)-এর নিকট আসে তখন তিনি (সা.) তাকে দেখেই বলেন, (যেভাবে পূর্বেই বলা হয়েছে যে,) সোহেল আসছে, আল্লাহ্ চাইলে এখন বিষয়টি সহজ হয়ে যাবে। যাহোক সোহেল এসেই মহানবী (সা.)কে বলে, চলুন! এখন দীর্ঘ বিতর্ক বাদ দিন, আমরা চুক্তি করতে প্রস্তুত আছি। প্রত্যুত্তরে মহানবী (সা.) বলেন, আমরাও প্রস্তুত আছি। একথা বলেই তিনি (সা.) তাঁর সেক্রেটারী হযরত আলী (রা.)কে ডেকে পাঠান। এই চুক্তির শর্তগুলো ছিল নি¤œরূপ :-
মহানবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবীরা এ বছর ফিরে যাবেন। আগামী বছর তারা মক্কায় এসে উমরার আচারঅনুষ্ঠান পালন করতে পারবে, কিন্তু শর্ত হলো সাথে খাপবন্ধি তরবারি ছাড়া আর কোন অস্ত্র বহন করা যাবে না এবং মক্কায় তিন দিনের অধিক সময় অবস্থান করবে না।
মক্কার লোকদের মধ্যে থেকে কেউ যদি মদীনায় যায় তাহলে সে মুসলমান হলেও মহানবী (সা.) তাকে মদীনায় আশ্রয় দিবেন না এবং তাকে ফেরৎ পাঠাবেন। কিন্তু কোন মুসলমান যদি মদীনা ছেড়ে মক্কায় চলে আসে তাহলে তাকে ফেরৎ পাঠানো হবে না। আরেকটি রেওয়ায়েতে রয়েছে যে, মক্কার কেউ যদি তার অভিভাবকের অনুমতি ব্যতীত মদীনায় আসে তাহলে তাকে ফেরৎ পাঠাতে হবে। আরব গোত্রগুলোর মধ্যে থেকে কোন গোত্র চাইলে মুসলমানদের সাথেও মৈত্রী গড়তে পারে কিংবা মক্কাবাসীর মিত্রও হতে পারবে। বর্তমানে এই চুক্তি দশ বছরের জন্য হবে আর এই সময়কালে কুরাইশ এবং মুসলমানদের মাঝে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে।
এই চুক্তির দুটি অনুলিপি করা হয় আর দুই পক্ষের বিভিন্ন সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ এতে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন। মুসলমানদের মাঝে যারা স্বাক্ষর করেন তারা হলেন, হযরত আবু বকর, হযরত উমর, হযরত উসমান, (ততক্ষণে তিনি মক্কা থেকে ফিরে এসেছিলেন। অর্থাৎ কাফেররা যে তাকে আটকে রেখেছিল সেখান থেকে ততক্ষণে তাকে ছেড়ে দিয়েছিল। তিনিও এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।) আব্দুর রহমান বিন অওফ, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস এবং আবু উবায়দা (রা.)। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর সোহেল বিন আমর চুক্তিপত্রের একটি প্রতিলিপি নিয়ে মক্কায় ফিরে যায় এবং দ্বিতীয় প্রতিলিপিটি থাকে মহানবী (সা.)-এর কাছে।
হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) এ ঘটনাটি নিজের ভাষায় এভাবে বর্ণনা করেছেন, আশেপাশের কিছু লোক মক্কাবাসীদের কাছে জোর দিয়ে বলে যে, এই মানুষগুলো শুধু তোয়াফ করার জন্য এসেছেন, আপনারা তাদেরকে কেন বাধা দিচ্ছেন? কিন্তু মক্কাবাসীরা তাদের হঠকারিতায় অনড় থাকে। এতে বাহিরের গোত্রগুলোর লোকেরা মক্কাবাসীকে বলে, আপনাদের এ পন্থা বলে দিচ্ছে যে, আপনাদের উদ্দেশ্য সন্ধি নয় বরং দুষ্টামী। এজন্য আমরা আপনাদের পক্ষ নিতে প্রস্তুত নই। হযরত মুসলেহ্ মওউদ (রা.) যে কথাটি বলেছেন তা একটি নতুন কথা। অর্থাৎ আশপাশের গোত্রগুলোর পক্ষ থেকেও চাপ ছিল যার ফলে মক্কাবাসীরা ভয় পেয়ে যায় আর তারা এবিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করে যে, মুসলমানদের সাথে আমরা সন্ধি করার চেষ্টা করব। এ বিষয়ের সংবাদ পেতেই মহানবী (সা.) হযরত উসমান (রা.) কে, মক্কাবাসীর সাথে আলোচনার জন্য প্রেরণ করেন যিনি পরবর্তিতে তাঁর তৃতীয় খলীফা নির্বাচিত হয়েছেন । হযরত উসমান (রা.) যখন মক্কায় পৌঁছান তখন মক্কায় যেহেতু তার অনেক অত্মীয়স্বজন ছিল, তারা আত্মীয়রা তার চতুপাশের্^ সমবেত হয় এবং তাকে বলে, আপনি তাওয়াফ করতে পারেন তবে মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ্ (সা.) আগামী বছর এসে তাওয়াফ করবেন। কিন্তু হযরত উসমান (রা.) বলেন, আমি আমার সম্মানিত নেতাকে ছাড়া তাওয়াফ করতে পারব না। যেহেতু মক্কার সর্দারদের সাথে তার আলোচনা দীর্ঘ হয়ে গিয়েছিল, তাই কিছু সংখ্যক দুষ্ট প্রকৃতির লোক মাক্কায় এই গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, হযরত উসমান (রা.) কে হত্যা করা হয়েছে। ছড়াতে ছড়াতে এই সংবাদ মহানবী (সা.)-এর কাছে পৌঁছলে রসূলুল্লাহ্ (সা.) সাহাবীদের একত্র করেন এবং বলেন, প্রত্যেক জাতির নিকটই দূতের জীবন নিরাপদ থাকে। তোমরা শুনে থাকবে যে, মক্কাবাসী হযরত উসমান (রা.) কে হত্যা করেছে। এই সংবাদ যদি সঠিক হয় তাহলে আমরা জোরপূর্বক মক্কাতে প্রবেশ করব। অর্থাৎ আমাদের প্রাথমিক ইচ্ছা ছিল, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মক্কাতে প্রবেশ করব, কিন্তু যে পরিস্থিতিতে সেই ইচ্ছা পোষণ করা হয়েছিল সেই পরিস্থিতি যেহেতু বদলে যাবে তাই আমরা এই পরিকল্পনার অনুসরণে বাধ্য থাকব না। যারা এই অঙ্গীকার করতে প্রস্তুত যে, যদি আমাদেরকে অগ্রসর হতে হয় তাহলে হয় (মক্কা) জয় করে ফিরব নয়তো একেক করে সবাই যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করব, তারা এই শপথ করে আমার হাতে বয়আত করুক। মহানবী (সা.) এ ঘোষণা দিতেই তাঁর সাথে আগত সেই পনেরশ দর্শনার্থীর সবাই এক মুহূর্তেই পনেরশ সৈনিকে পরিণত হয়ে যান এবং উন্মাদপ্রায় একে অপরকে টপকে গিয়ে তারা একজন আরেকজনের পূর্বেই রসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর হাতে বয়আত করতে সচেষ্ট হন। পুরো ইসলামী ইতিহাসেই এ বয়আত অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে আর একে বৃক্ষের চুক্তি বলা হয়। কেননা এই বয়আত যখন নেয়া হয় তখন রসূল করীম (সা.) একটি গাছের নিচে বসেছিলেন। এই বয়আতে অংশ নেয়া শেষ ব্যক্তিটিও যতদিন পর্যন্ত ধরাপৃষ্ঠে জীবিত ছিলেন ততদিন তিনি গর্বের সাথে একথাটি স্মরণ করতেন। কেননা পনের শত মানুষের একজনও এই অঙ্গীকার করতে দ্বিধা করে নি। শত্রুরা যদি ইসলামের দূতকে হত্যা করে থাকে তাহলে আজ আমরা দুটি অবস্থার একটি অবস্থা অবশ্যই সৃষ্টি করব। অর্থাৎ হয় তারা সন্ধ্যার পূর্বেই মক্কা বিজয় করবে নয়তো তারা সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বেই রণক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিবে। কিন্তু মুসলমানরা তখন সবেমাত্র বয়আত করে শেষ করেছিল, এমন সময় হযরত উসমান (রা.) ফিরে এসে বলেন, মক্কাবাসীরা তো এ বছর উমরা করার অনুমতি দিবে না, কিন্তু আগামী বছরের জন্য অনুমতি দিতে প্রস্তুত। কাজেই এ বিষয়ে চুক্তি করার জন্য তারা তাদের প্রতিনিধি নিযুক্ত করেছে। হযরত উসমান (রা.)-এর আগমনের কিছুক্ষণ পরই সন্ধির উদ্দেশ্যে সোহেল নামের মক্কার এক নেতা মহানবী (সা.)-এর সমীপে উপস্থিত হয় এবং এই চুক্তিপত্র লিখা হয়। হযরত উসমান (রা.) সম্পর্কে আলোচনা চলমান থাকবে, ভবিষ্যতেও এটি অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ্।
আজও আমি দোয়ার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। পাকিস্তানের পরিবেশ পরিস্থিতির জন্য বিশেষভাবে দোয়া করুন। এখন তারা তো ঘরের চার দেয়ালেও নিরাপদ নয়, নিজ গ-িতেও নিরাপদ নয়। মৌলভীরা যেখানেই বলে, পুলিশের লোক সেখানেই পৌঁছে যায়। এমন কিছু ভদ্র পুলিশও আছে যারা বলে, আমাদের সহানুভূতি আপনাদের সাথে রয়েছে, কিন্তু আমরা কী আর করতে পারি! কেননা আমাদের ওপর এতটা চাপ প্রয়োগ করা হয় যে, আমাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যা বলে তা-ই আমাদের করতে হয়। অতএব আল্লাহ্ তা’লা এসব দুষ্ট প্রকৃতির কর্মকর্তার হাত থেকে আমাদের রক্ষা করুন, দেশকে নিষ্কৃতি দিন আর প্রত্যেক আহমদীকে স্বাধীনভাবে এবং নিরাপত্তার সাথে নিজ মাতৃভূমিতে বসবাসের তৌফিক দিন। বিশেষভাবে দোয়া করতে থাকুন। এ দোয়া যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ইনশাআল্লাহু তা’লা খুব শীঘ্রই আমরা দেখব যে, বিরুদ্ধবাদীদের পরিণাম অত্যন্ত ভয়ানক হবে। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে দোয়া করার তৌফিকও দিন এবং তা কবুলও করুন।