Menu

জলসা সালানা ইউকে ২০১৭ – ২য় পর্ব

জলসা সালানা ইউকে ২০১৭

ব্যক্তিগত ডায়েরী – ২য় পর্ব

আবিদ খান (বাংলা অনুবাদ)

 

মসীহ মাউদ (আঃ) এর ওভারকোট

৩০ জুলাই ২০১৭ তারিখ ইউকে জলসা সালানার শেষ দিন। সকাল থেকেই আন্তর্জাতিক বয়াতের জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ১২.৩০ মিনিটে আমি হুজুরের বাসায় যাই ও অন্যান্য সদস্যদের সাথে বাইরে দাড়িয়ে অপেক্ষা করি। ঠিক ১ টার সময় মসীহ মাউদ (আঃ) এর ওভারকোট পরিধান করে হুজুর বের হন। ১৯৯৩ সাল থেকে এটিই ঐতিহ্য হয়ে এসেছে যে আন্তর্জাতিক বয়াতের সময় হুজুর মসীহ মাউদ (আঃ) এর ওভারকোট পরিধান করবেন। অনেক বছর ধরেই হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রহঃ) ও হযরত খলীফাতুল মসীহ আল খামেস (আইঃ) ইমাম মাহদী(আঃ) এর একটি সবুজ কোট পরে আসছিলেন। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবৎ হুজুর খয়েরী রং এর একটি কোট পরছেন।

কয়েক জন মানুষ আমাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেছে। এ বিষয়ে আমি এক সময় হুজুরের কাছে প্রশ্ন করেছিলাম। হুজুর বলেছিলেন “সময়ের সাথে সাথে প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর সবুজ কোটটি অনেক পুরনো ও ময়লা হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি ভাবলাম প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর অন্য কোট পরাই উত্তম হবে। ”

“যদিও আন্তর্জাতিক বয়াতে প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর কোট পরা একটি ঐতিহ্য কিন্তু এটি আবশ্যকীয় কোন বিষয় নয়। যদি কোটটি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে কোট ছাড়াই আন্তর্জাতিক বয়াত হবে। ”

 

একটি অবিস্মরণীয় মুহুর্ত

আন্তর্জাতিক বয়াত আরো হাজারো মানুষের মতো আমার জন্যও একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এই বছর বয়াতের সময় আমার ও হুজুরের মাঝে দুইজন মানুষ ছিল। বয়াতের সময় হুজুরকে এত কাছে থেকে দেখা এবং বয়াতের শর্তসমূহ হুজুরের মুখ থেকে শোনা আমার সারা জীবন মনে থাকবে। বয়াতের ফলে মনের মধ্যে যে আবেগ সৃষ্টি হয় সেটি কেবল খিলাফতে আহমদীয়াই সৃষ্টি করতে পারে। বয়াতের পর সবাই আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সিজদা দেয়। প্রতি বছর এই সিজদার সময় গত বছরের সকল ভুল ত্রুটি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। তাই আমি এসময় আমার সকল পাপের জন্য ইসতেগফার পড়ি, আমার দুর্বলতার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আমি দোয়া করি আল্লাহপাক যেন আমার সকল দুর্বলতা ঢেকে রাখেন। শেষ কয়েক মুহুর্ত আমি হুজুর যাদের জন্য দোয়া করতে বলেছেন তাদের জন্য এবং আমার পরিবারের জন্য দোয়া করি।

 

একজন সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা

একজন মহিলা সাংবাদিক রিনা ওলফসন আগের দিন বলেছিলেন যে জলসাতে সংগীতের অভাব রয়েছে। তিনি মনে করেন আবেগকে উদ্বেলিত করতে ও আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানে সংগীতের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বয়াত দেখে তার দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন “আমি জানি না আমার কি হয়েছিল। আমি কখনো এতটা আবেগপ্রবণ হইনি। আমি বয়াতের শর্তগুলো পুনরাবৃত্তি করতে থাকি। আমি এখন জানি যে আবেগকে উদ্বেলিত করতে সংগীতের প্রয়োজন নেই। ”

পরবর্তীতে তিনি জুইশ ক্রনিকেল পত্রিকায় আমাদের জলসার খবর পাবলিশ করেন। সেখানে তিনি লিখেন “আমার প্রতি যে আতিথেয়তা প্রদর্শন করা হয়েছে সেটি অতুলনীয়। ভারী বর্ষণের ফলে পুরো স্হান কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মিনিটের মধ্যেই আমার পায়ের সাইজের বুট এসে পড়ে। আমার কোন কিছু প্রয়োজন হলে আমি চাইবার আগেই তা আমার কাছে চলে আসত। ”

জলসার রিভিও অফ রিলিজিওন প্রদর্শনীতে টুরিন শ্রাউড সম্বন্ধে তিনি বলেন “আমি প্রায় ২০০ মুসলমান মহিলাদের সাথে বসেছিলাম যখন টুরিন শ্রাউড বিশেষজ্ঞ ব্যারি তার বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এটি একটি অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা যেখানে হিজাব পরিহিত মহিলা একজন ইহুদী মানুষের বক্তব্য শুনছেন।”

আন্তর্জাতিক বয়াত সম্বন্ধে তিনি বলেন “আমি জলসার শেষ দিন একটি অসাধারণ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি। হাজার হাজার মানুষ তাদের খলীফার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। খলীফা এসে বসলেন এবং সামনে হাত রাখলেন। তার আশেপাশের মানুষ তার হাতের নিচে হাত রাখলেন এবং যারা তার পিছনে ছিল তারা কাধে হাত রাখলেন। প্রত্যেক মানুষ তার সামনের মানুষের কাধে হাত দিয়েছিলেন। বয়াতের পর সকলেই আল্লাহর শোকর গোজারের জন্য সিজদায় পড়ে যান। কেউ কেউ কাঁদতে শুরু করে। বয়স্ক মানুষের কান্নার শব্দ প্রতিফলিত হতে থাকে। এটি ছিল অসাধারন অভিজ্ঞতা।”

একজন আরব ইউরোপিয়ান

আন্তর্জাতিক বয়াতের সময় কয়েকজন আহমদী হুজুরের হাতে সরাসরি হাত রাখার সৌভাগ্য অর্জন করে। তাদেরকে এমনভাবে নির্বাচন করা হয় যেন প্রত্যেকে বিশ্বের এক একটি স্হানকে প্রতিনিধিত্ব করে। এবার আমি এরকম একজন ব্যক্তি মোহাম্মদ ইব্রাহীম ইখলাফ সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি মূলত মরোক্কোর অধিবাসী এবং বর্তমানে পরিবার সহ লন্ডনে বসবাস করছেন। তিনি ওয়াকফে জিন্দেগী হিসেবে ইউকে জামাতের ন্যাশনাল তবলীগ সেক্রেটারী হিসেবে কর্মরত আছেন।

তিনি বয়াত সম্বন্ধে বলেন “২৪ জুলাই ২০১৭ তারিখে আমি জামাতের কাছ থেকে একটি চিঠি পাই যেখানে লেখা ছিল যে আমি পৃথিবীর সৌভাগ্যবান কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে একজন যারা হুজুরের বরকতময় হাতে হাত রেখে বয়াত গ্রহণ করবে। সংবাদটি পেয়ে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। আমি ইসতেগফারে রত হই, কারণ আমি জানি যে আমি এর যোগ্য নই।  ”

“চিঠি পেয়ে আমি আমার গাড়ীতে চলে যাই। আমার চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছিল। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করে আমার সকল দোয়া পূরণ করার জন্য ধন্যবাদ জানাই। আমার এখন কেবল একটি ইচ্ছাই অপূর্ণ রয়েছে তা হল আহমদীয়াতের জন্য শাহাদাত বরণ করা। আমি যদি খিলাফতের জন্য মৃত্যুবরণ করতে পারি তাহলে সেটি আমার জন্য বড়ই সৌভাগ্যের বিষয় হবে। যদি বিরুদ্ধবাদীরা আমাকে শত টুকরো করে ফেলে তাহলেও আমার কোন আপত্তি নেই। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি ‘হে আল্লাহ; আমি আমার স্ত্রী-সন্তানদের জন্য চিন্তিত নই; কারণ আমি জানি তুমি তাদের প্রতি লক্ষ্য রাখবে।’ ”

“হুজুর আমাকে বলেছেন যে আমি ইউরোপ ও আরবের প্রতিনিধি হিসেবে থাকব। আমি হুজুরের কথায় অত্যন্ত অবাক হয়েছি কারণ আমি নিজেকে সবসময় ইউরোপিয়ান বলেই মনে করতাম কারণ আমি এখানেই বেড়ে উঠেছি। আবার আমি নিজেকে আরব বলেও মনে করি কারণ সেখানেই আমার জন্ম। সুবানাল্লাহ হুজুর আমাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানেন।”

“আমি দেখলাম হযরত খলীফাতুল মসীহ(আইঃ) জলসা গাহে প্রবেশ করে স্টেজের দিকে আসতে লাগলেন। আমর মনে হল হয়ত এভাবেই মহানবী(সাঃ) হাটতেন। হুজুর প্রতিশ্রুত মসীহ (আঃ) এর ওভারকোট পরিধান করে ছিলেন। আমি সেই ওভারকোট প্রথমবারের মতো দেখছিলাম; তাই আমার মনে হল আমি কেবল খলীফাতুল মসীহ(আইঃ) এর হাতে নয় বরং প্রতিশ্রুত মসীহ (আঃ) এবং মহানবী(সাঃ) এর হাতেও বয়াত করছি। ”

“কয়েক মুহুর্ত পর হুজুর হাত বাড়িয়ে প্রতিনিধিদের হাতের উপর রাখেন। আমার মনে হল হুজুরের বরকতময় হাত আমার নগন্য হাতের উপর ছিল। আমার অনামিকার উপর হুজুরের অনামিকা ছিল। সে সময় আমার অনুভূতি প্রকাশ করার ভাষা আমার নেই। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকি আল্লাহপাক যেন আমাকে সম্পূর্ণভাবে খিলাফতের সেবা করার সুযোগ দেন এবং আমি যেন আল্লাহর ভালবাসায় ডুবে যেতে পারি। ”

“এটি একটি অশেষ বরকত, যেটির ফল আমি ও আমার পরিবার সারাজীবন পেতে থাকব। আমি একটি নতুন জগতে ছিলাম। আমি জানি না আমার কি হয়েছিল। আমি সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে পারব না। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র মানুষের বরকতময় হাত স্পর্শ করার সুযোগ পেয়েছি। যাকে আল্লাহপাক খলীফা নির্বাচিত করেছেন। বয়াতের পর আমরা নামাযে চলে যাই। আমার মনে হল আমি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসলাম। এটি একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। ”

ইব্রাহীম সাহেব যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন জামাতের সকল সদস্যই সেটি লাভ করার স্বপ্ন দেখে। তার সাথে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক কিন্তু তিনি সবসময়ই তার বয়স লুকিয়ে গেছেন। আমি তাকে বলি যে তার অভিজ্ঞতা আমি ডায়েরীতে লিখব এবং তার বয়স কত সেটিও জানা দরকার। তিনি কেবল বলেন “আমার প্রিয় ভাই আবিদ, তোমার কেবল এই কথাই জানা যথেষ্ট যে আমি হৃদয় থেকে একজন তরুণ খাদেম। ”

জলসা সালানার শেষ অধিবেশন

জলসা সালানার শেষ অধিবেশনে বিকেল ৫.১৫ মিনিটে হুজুর তার সমাপনী বক্তব্য দেন। বক্তব্যে হুজুর ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা এবং যারা দাবী করে ইসলাম একটি সন্ত্রাসী ধর্ম তাদের বিরুদ্ধে একজন আহমদীকে কিভাবে কাজ করতে হবে সে ব্যাপারে ব্যাখ্যা করেন। হুজুর পবিত্র কোরআন ও হাদীস থেকে উদ্ধৃতি উল্লেখ করে প্রমাণ করেন যে ইসলাম সম্পূর্ণ শান্তির ধর্ম।

হুজুর বলেন “ইসলাম ধর্ম, বর্ণ, জাতি হিসেবে ভেদাভেদ পছন্দ করে না। ইসলাম বিশ্বাস করে সকল মানুষই সমান। মহানবী(সাঃ) বলেছেন যে একজন নন-আরবের উপর একজন আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই সেরকমই কোন বর্ণের মানুষ কোন বর্ণের মানুষের থেকে শ্রেষ্ঠ নয়।  ”

“ইসলাম ধর্ম বলে আল্লাহপাক সকল জাতির জন্যই নবী প্রেরণ করেছেন। মুসলমানগণ সকল নবীর উপরই বিশ্বাস স্হাপন করে। এই একটি বিষয় দিয়ে বোঝা যায় যে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মই ধর্মীয় স্বাধীনতার এরকম দৃষ্টান্ত স্হাপন করতে পারে না। যেখানে অন্যান্য ধর্মের অনুসারী মহানবী(সাঃ) এর উপর ঘৃণ্য ভাষা ব্যবহার করে সেখানে মুসলমানগণ সকল ধর্মের নবীগণকেই শান্তির সালাম দেয়। এটিই হল প্রকৃত ইসলাম।   ”

হুজুর তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসার নিন্দা জানান এবং বলেন যে পশ্চিমা শক্তি মুসলিম দেশে অস্ত্র সরবারহ করে সেখানে যুদ্ধকে উৎসাহ দিচ্ছে। এসব অস্ত্র অনেক সময় সন্ত্রাসীদের হাতে পড়ে এবং তারা এর ফলে আরো সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করে।

হুজুর বলেন “শান্তি স্হাপনের জন্য পার্থিব সকল চেষ্টা প্রচেষ্টা করা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। বরং আমরা দেখছি যে বিশৃঙ্খলা, ঘৃণা, যুদ্ধ-বিগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকৃত সত্য হল যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজের সকল স্তরে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা অনুযায়ী ভালবাসা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি অর্জন করা সম্ভব হবে না। শান্তির একমাত্র উপায় হল সৃষ্টিকর্তাকে চেনা ও মানবজাতির উপকার করা।”

 

জলসার সমাপ্তি

হুজুর দোয়ার মাধ্যমে জলসার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। হুজুর বলেন জলসাতে ১০৭ টি দেশ থেকে মোট ৩৭ হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল। এরপর বিভিন্ন দল নযম গায়। এ বছর একটি নযম ছিল নাম ‘White Birds’ এবং এটি গেয়েছিলেন পশ্চিমা দেশের বয়াতকারী আহমদীগণ। পশ্চিমা পরিবেশে বেড়ে উঠে তারা এই ঘোষণা দিচ্ছে যে তারা আহমদীয়াতের বাগানে প্রবেশ করেছে এটি সত্যই অভাবনীয়।

হুজুর তার বাসস্হানে যান; সেখানে ইউকের আমীর সাহেব এবং জলসাগাহ অফিসার জলসার সফল সমাপ্তির জন্য হুজুরকে মোবারকবাদ জানান। আল্লাহর রহমতে সফলভাবে জলসা সমাপ্তির জন্য হুজুরকেও সন্তুষ্ট মনে হচ্ছিল। এ বছর গত বছরের তুলনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এক হাজার কম ছিল। জলসার পর অনেকেই তাদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় এবং অনেকেই কাজ করার জন্য থেকে যায়।

 

প্রতিনিধিদের সাথে ছবি

হুজুর হাদীকাতুল মাহদীতে তার অফিসে যাবার পর বিভিন্ন দলের অনুরোধে তাদের সাথে ছবি তুলেন। এসব দলের মধ্যে ছিল Alislam, IAAAE এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত খোদ্দামুল আহমদীয়ার প্রতিনিধি। একটি ছবির সময় একজন বয়স্ক আহমদী হুজুরের সামনে মেঝেতে বসে পড়েন। একজন বয়স্ক মানুষ মেঝেতে বসেছে এটি সঠিক না হলেও তিনি জোর করেন যে তিনি তার প্রিয় খলীফার সামনে মেঝেতেই বসবেন। হুজুর এরপর ভালবেসে তার কাধে হাত রাখেন।

টুরিন শ্রাউড বিশেষজ্ঞ

হুজুর বিভিন্ন দেশ থেকে আগত প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন যাদের মধ্যে ছিলেন নন আহমদী অতিথি, সাংবাদিক এবং নতুন বয়াতকারী আহমদী। সুইডেনের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করে হুজুর টুরিন শ্রাউড বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলেন যারা রিভিও অফ রিলিজিওন প্রদর্শনীতে টুরিন শ্রাউড সম্বন্ধে বক্তব্য দিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একজন ছিলেন ব্যারী সোয়ার্টজ যিনি এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো আমেরিকা থেকে ইউকে জলসায় এসেছেন।

মিঃ সোয়ার্টজ বলেন “জলসায় আমি আমার পরিবারের চেয়ে বেশি ভালবাসা পাই। এখন আমি নিজেকে আহমদী পরিবারের একজন মনে করি। আমার মনে হয় আমি আহমদীয়াতের একজন ইহুদী সদস্য। যখন আমি প্রথম জলসায় আসি তখন কিছুটা চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু আমি দ্রুতই বুঝতে পারি যে এখানে চিন্তার কিছু নেই। আপনারা সত্যই শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমি এখনই পরের বছরের জলসার জন্য আমার উপস্হিতি নিশ্চিত করেছি। ”

হুজুর হাসেন ও রিভিও অফ রিলিজিওনের প্রধান সম্পাদক আমীর সাফীর সাহেবের দিকে লক্ষ্য করে বলেন “আমীর রিভিও অফ রিলিজিওন প্রদর্শনী নিয়ে চিন্তিত ছিল। কারণ এ নিয়ে তৃতীয় বারের মতো এই প্রদর্শনী হলো। আমি খুব আনন্দিত যে এবার কয়েকজন নতুন বিশেষজ্ঞ এসেছে যারা এ বিষয়ে নতুন আঙ্গিকে বক্তব্য দিকে পারবে। ”

 

মিঃ সোয়ার্টজ বলেন “আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে আহমদী মহিলাগণ অত্যন্ত বুদ্ধিমান। তারা কেবল আমাদের বক্তব্য শুনতেই আসেনি বরং তারা আমাদেরকে অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন করেছে। এটি দেখে আমি আশ্চর্য হয়েছি। ”

হুজুর বলেন “ধর্মীয় পড়াশোনায় আমাদের আহমদী মেয়েদের আগ্রহ ছেলেদের চেয়ে বেশি। যেমন আমাদের একটি দল রয়েছে যাদের কাজ হল বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করে পার্থক্য নির্ধারন করা এবং সেই দলের ৯০% হল মহিলা।”

মিঃ সোয়ার্টজ বলেন “আমি আপনার সাথে দেখা করতে পেরে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। আমি আপনাকে আমার বাহুতে জলসা ডিউটির ব্যাজ দেখাতে চাই কারণ আপনি গত জলসায় বলেছিলেন আমি যেন এই ব্যাজ নেই। ”

হুজুর বলেন “এটি খুবই ভাল হয়েছে। এখন আপনি নিজেকে জলসা কার্যক্রম কমিটির একজন সদস্য বলে মনে করতে পারেন।  ”

হুজুর এরপর আমীর সাফির দিকে তাকিয়ে কৌতুক করে বলেন “পরের বছর আপনি তার নীল ব্যাজ পরতে পারবেন।”

সকলেই হুজুরের কথা শুনে হেসে ফেলে।

একজন মহিলা শিক্ষার্থী বলেন “আমি লক্ষ্য করেছি যে আহমদীগণ ঈসা(আঃ) প্রতি অনেক ভালবাসা রাখে। একজন খৃষ্টান হিসেবে আমার এটি খুবই পছন্দ হয়েছে।”

হুজুর বলেন “হ্যা। আমরা বিশ্বাস করি ঈসা(আঃ) আল্লাহর সত্য নবী ছিলেন। তাই আমি আমার বক্তব্যে বলেছিলাম যে আমরা আল্লাহর কোন নবীর বিরুদ্ধেই খারাপ কথা বলতে পারি না।”

মিটিং এর শেষ দিকে মিঃ সোয়ার্টজ বলেন “আমি যখন ২০১৫ সালে প্রথমবার জলসায় এসেছিলাম তখন বলেছিলাম যে আহমদীরা ভাল কাজ করছে কিন্তু আমেরিকাতে কেউ আহমদীয়াতের নামই শুনেনি। কিন্তু বর্তমানে আমি আমেরিকাতে আহমদীয়া মুসলিম জামাতের নাম শুনতে পাচ্ছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুগে আহমদীয়াতের শান্তি ও সৌহার্দ্যের বাণী অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ”

লস এঞ্জেলেসের বৌদ্ধ প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ

হুজুর আমেরিকা থেকে আগত প্রায় ২৪ জন অতিথির সাথে সাক্ষাৎ করেন যারা ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বৌদ্ধ সংগঠনের সদস্যবৃন্দ। হুজুরের অফিসে আসার পর তারা একে একে হুজুরের সামনে এসে মাথা সামান্য ঝুকিয়ে হুজুরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। হুজুরও তাদের সাদরে আমন্ত্রণ জানান। সেটি অত্যন্ত সুন্দর দৃশ্য ছিল।

বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হুজুরকে বলেন “আমরা লস এঞ্জেলেস থেকে এসেছি কিন্তু আমরা মূলত ভিয়েতনামের অধিবাসী। আমরা বিশ্বাস করি পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিই শান্তিপূর্ণভাবে একসাথে বসবাস করার মূলমন্ত্র। তাই আমরা আপনাদের সাধে একাত্মতা ঘোষণা করতে পেরে আনন্দিত। কারণ আমরা দেখেছি যে আহমদীগণ সহানুভূতিশীল মানুষ। এই জলসায় আমরা যে ভালবাসা ও আতিথেয়তা পেয়েছি তা সত্যই অভাবনীয়। আপনারা অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ ও সুসংগঠিত জামাত। আমরা আপনাদের কথা আমেরিকার জনগণের কাছে বলব।”

হুজুর বলেন “আমাদের সবসময় মানবীয় মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমরা সবাই একই মানবজাতির অংশ। তাই আমাদের একটি স্লোগান হল ‘হিউম্যানিটি ফার্স্ট’। ”

এরপর তারা হুজুরকে একটি উপহার প্রদান করে। উপহারটি ছিল ১৫০০ বছর পুরনো গাছের কাঠ দিয়ে তৈরী বাক্সের মধ্যে কিছু তজবী। তারা হুজুরকে বলে যে ভিয়েতনামের মানুষ এসব তজবীকে জাতীয় সম্পদ বলে মনে করে।

বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আরো বলেন “আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে আপনি অনেক দয়ালু, সরল এবং সৎ মানুষ। তাই আমরা চাই আপনি আমেরিকায় এসে আমাদের পথ প্রদর্শন করুন।  ”

হুজুর তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন “ইসলামী শিক্ষার মূলভিত্তি হল পরস্পরের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আমরা মনে করি গৌতুম বুদ্ধ(আঃ) আল্লাহর সত্য নবী এবং সৎ মানুষ ছিলেন।”

হুজুর বৌদ্ধদের বিভিন্ন দলের মধ্যে বিভাজনের কারণ জানতে চান। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বলেন “কিছু বৌদ্ধ দালাই লামাকে তাদের আধ্যাত্মিক নেতা বলে মনে করে কিন্তু অন্যরা তা করে না। আমি বর্তমান দালাই লামার সাথে সাক্ষাৎ করেছি। কিন্তু তাকে আপনার মতো এতটা বন্ধুভাবাপন্ন বলে মনে হয়নি। ”

হুজুর হেসে বলেন “টিভি তে দেখে তো দালাই লামাকে অনেক বন্ধুভাবাপন্ন বলেই মনে হয়।”

প্রতিনিধিদের আর একজন হুজুরকে বলেন “আমি প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর ‘ইসলামী নীতিদর্শন’ বইটি পড়েছি এবং বইটি আমার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমি বইটি ভিয়েতনামীজ ভাষায় অনুবাদ করতে চাই। ”

হুজুর বলেন “হতে পারে আমাদের জামাতে এর মধ্যেই বইটি ভিয়েতনামীজ ভাষায় অনুবাদ করেছে। যদি করে থাকে তাহলে এক কপি আপনাকে দিয়ে দিতে বলছি।”

বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বলেন “যদি ভিয়েতনামের মানুষ আহমদীয়াত গ্রহণ করে তাহলে আমি কষ্ট পাব না। কারণ এর ফলে আমাদের দেশেরই উন্নতি হবে। ”

সাক্ষাতের পর হুজুর তাদের সাথে ছবি তুলেন। ছবি তোলার পূর্ব মুহুর্তে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আমার দিকে তাকিয়ে বলেন “আপনাদের নেতা একজন পবিত্র ও পরম বিজ্ঞ মানুষ। তার প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। ”

কানাডিয়ান সংসদ সদস্যের সাথে সাক্ষাৎ

হুজুর এরপর কানাডার একজন সংসদ সদস্যের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সারা বিশ্বে মানবাধিকার রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাই তিনি শুরুতেই হুজুরকে বলেন “আমি আলজেরিয়া সফর করতে যেতে চাচ্ছিলাম যেখানে গত দুই বছর যাবৎ আহমদীয়া জামাতের উপর অনেক অত্যাচার করা হচ্ছে। কিন্তু আমাকে ভিসা দেয়া হয়নি এবং আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে যে আমি কি আহমদীদের সাহায্য করতে যাচ্ছি কিনা।”

তিনি বলেন যে তিনি বিভিন্ন অর্থনেতিক ব্যবস্হা সম্বন্ধে পড়াশোনা করছেন। তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন যে ইসলামিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্হা কিভাবে কাজ করে।

হুজুর তাকে বলেন “আপনি হযরত মুসলেহ মাউদ (রাঃ) এর ‘ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্হা’ বইটি পড়তে পারেন। বর্তমান সমাজে সুদ পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্হাকে এমনভাবে গ্রাস করে রেখেছে যে সুদকে অল্প সময়ে পুরোপুরিভাবে সরিয়ে দেয়াও সম্ভব নয়। কিন্তু ইসলামিক নীতর উপর ভিত্তি করে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে যার ফলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে এবং লেনদেন প্রক্রিয়াও নিরপেক্ষ হবে। ”

 

 

ব্র্যাম্পটনের মেয়রের সাথে সাক্ষাৎ

সংসদ সদস্যের সাথে সাক্ষাতের পর হুজুর কানাডার ব্র্যাম্পটনের মেয়র ও স্হানীয় কাউন্সিল সদস্যের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারা কানাডা থেকে ইউকে জলসা দেখতে এসেছে। কারণ কানাডা জামাত ব্র্যাম্পটনে বিশাল এলাকা ক্রয় করেছে যেখানে তারা ভবিষ্যতে জলসার আয়োজন করবে।

হুজুর তাদের বলেন “হাদীকাতুল মাহদীতে জলসার পর গোছগাছের কার্যক্রম শুরু হয়ে গিয়েছে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো স্হান পরিস্কার হয়ে যাবে। কিন্তু আমি জানি না কানাডার আহমদীগণ এতটা দক্ষ হবে কিনা! ”

 

ব্র্যাম্পটনের মেয়রের বলেন যে জলসা অনেক সুসংগঠিত ছিল এবং তিনি মহিলাদের কার্যক্রম তারা নিজেরাই পরিচালনা করেছে দেখে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছেন। হুজুর তাকে বলেন “আমাদের মহিলারা স্বাধীন। আমরা চাই না তাদের পুরষদের ছায়ার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে। বরং আমরা চাই তারা উন্নতি করুক।”

একটি দুঃখের কারণ

হুজুর এরপর জ্যামাইকার একটি প্রতিনিধি দলের সাথে কথা বলেন। সেখানে ছিলেন রাসটাফারিয়ান দলের নেতা ও একজন সাংবাদিক। আমার মনে হয়েছে দুইজন অতিথির আচরণই হতাশাজনক ছিল। বিভিন্ন মিটিং এ হুজুরকে অনেক কঠিন প্রশ্ন করা হয় এবং এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এই মিটিং এ আমার মনে হল দুই জন অতিথি হুজুরের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করেছেন, তাদের গলার স্বর অনেক সময় ব্যঙ্গাত্মক ও ঝগড়াটে বলে মনে হয়েছে।

তারা বারবার জলসাতে পুরুষ ও মহিলার পৃথক স্হানের ব্যাপারে প্রশ্ন করে। হুজুর অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে তাদের ব্যাখ্যা করে বোঝান যে আহমদী পুরুষ ও মহিলারা স্বাধীনভাবে তাদের কাজ পরিচালনা করে। অবশ্যই আমরা এটি আশা করি না যে সকল অতিথিই আমাদের ইসলামী শিক্ষার সকল নিয়ম মেনে চলবে। কিন্তু আমরা সবার কাছ থেকেই সাধারন ভদ্র আচরণ আশা করি। কিন্তু একসময় আমার মনে হল তারা ঝগড়া শুরু করে দেবে।

জ্যামাইকার জামাত কানাডার জামাতের অধীনস্হ এবং মিটিং এ কানাডার আমীর সাহেবও উপস্হিত ছিলেন। আমি আমীর সাহেবকে ইশারা করে মিটিং শেষ করতে বলি। কিন্তু মিটিং আরো কয়েক মিনিট চলতে থাকে। পুরো সময় হুজুর শান্তভাবে সকল প্রশ্নের জবাব দিতে থাকেন। এরপর হুজুর উঠে দাড়িয়ে বলেন কোন অতিথি যদি তার সাথে ছবি উঠাতে চায় তাহলে উঠাতে পারে। আমি হুজুরের যেসব সাক্ষাৎকার দেখেছি তার মধ্যে এই প্রথম হুজুর বোঝালেন যে সাংবাদিকের আচরণ তার পছন্দ হয়নি। কিন্তু তারপরও সাক্ষাৎকারের সময় তিনি সবসময় শান্ত ছিলেন।

আমি পরের দিন কানাডার আমীর সাহেবের সাথে কথা বলি। আমি বলি যে যেসব সাংবাদিক আমাদের বিরোধিতা করে তাদেরকে সাক্ষাৎকারের জন্য আনতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু জামাতের অন্তত এই ব্যাপারটি নিশ্চিত করা উচিৎ যে তারা যেন মৌলিক সৌজন্যতাবোধ রক্ষা করে।

বেলিজ, আইসল্যান্ড ও বেলজিয়ামের প্রতিনিধিদের সাথে মিটিং

বেলিজ থেকে আগত একজন অতিথি জলসা সম্বন্ধে বলেন “জলসার সবচেয়ে ভাল বিষয় হল আপনাদের খলীফার বক্তব্য। তিনি তার বক্তব্যে প্রকৃত শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। প্রতিটি বক্তব্যেই তিনি সকলের প্রতি নিজের ভাই-বোনের মতো সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতে বলেছেন।”

আমি চিন্তা করলাম কিভাবে আল্লাহপাক তার খলীফার সম্মানের দিকে লক্ষ্য রাখেন। একটু আগেই জ্যামাইকার সাংবাদিক হুজুরের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছিল। আর এখানে আর একজন অতিথি প্রকাশ্যেই ঘোষণা করছে যে হুজুরের বক্তব্য তার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।

মিটিং এর মাঝে একজন ইউরোপীয়ান মহিলা হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করে। তিনি হুজুরকে বলেন যে তাকে একজন আহমদী বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি কি এজন্য আহমদীয়াত গ্রহণ করবেন কিনা? হুজুর তাকে বলেন “কেবল বিবাহের কারণে আহমদীয়াত গ্রহণ করার কোন প্রয়োজন নেই। বরং আপনি তখনই কেবল আহমদীয়াত গ্রহণ করবেন যখন প্রকৃতভাবেই প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর দাবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করবেন। ”

আরব প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ

পরদিন সকালেই হুজুর আরো কিছু অতিথির সাথে সাক্ষাৎ করেন। যারা সংখ্যায় বেশি ছিল তারা মাহমুদ হলে ও যারা সংখ্যায় অল্প তারা হুজুরের অফিসেই তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। প্রথমেই আরব থেকে আগত এক দল হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করে।

সেখানে একজন আরব মহিলা বলেন “এ বছরের জলসা আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমার মনে হচ্ছে আমি একটি নতুন জীবন লাভ করেছি। আমরা অনেক ভাগ্যবান কারণ হুজুর আমাদের উপদেশ ও দিক নির্দেশনা প্রদান করে থাকেন। বিশেষত হুজুর যখন ঘরের মধ্যে শান্তি স্হাপনের কথা বলেন সেটি আমার অত্যন্ত ভাল লেগেছে। ”

এরপর ৬-৭ বছরের ছোট মেয়ে আয়েশা নযমের কয়েকটি লাইন শোনায় এবং হুজুরের কাছে যেয়ে হুজুরকে জড়িয়ে ধরে। হুজুরও তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন। সেটি অত্যন্ত সুন্দর দৃশ্য ছিল।

একজন আরব মহিলা প্রশ্ন করেন যে এ বছর জলসার সময় এত বৃষ্টি হবার পেছনে কোন আধ্যাত্মিক কারণ রয়েছে কিনা? হুজুর বলেন “আবহাওয়া আল্লাহপাকই নিয়ন্ত্রন করেন এবং বৃষ্টিও আল্লাহর বরকতের একটি পন্থা।”

একজন প্রশ্ন করেন “পশ্চিমা দেশগুলো কেন অস্ত্র ব্যবসা করে যুদ্ধকে আরো বৃদ্ধি করছে?”

হুজুর বলেন “অস্ত্র ব্যবসা খুবই বিপজ্জনক এবং এটি করা হচ্ছে মুসলমান দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ইসলামকে দুর্বল করার জন্য। কিন্তু আরবদেরও উচিৎ ইসলামবিরোধী শক্তিদের ফাঁদে পা না দেয়া। ”

কাবাবিরের সদর খোদ্দাম হুজুরের কাছে তার পরিবারের জন্য দোয়ার আবেদন করেন। হুজুর বলেন “কাবাবির সম্বন্ধে আমি একটি দুঃখজনক রিপোর্টে পেয়েছি; যে সেখানকার তরুণ আহমদীগণ বয়স্কদের মতো জামাতের সাথে জড়িত নয়। সদর খোদ্দাম হিসেবে আপনার দ্বায়িত্ব তাদেরকে অনুপ্রাণিত করা। এজন্য আপনাকে দুইটি কাজ করতে হবে। প্রথমত তাদেরকে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায়ে সচেষ্ট হতে হবে এবং দ্বিতীয়ত আপনার উচিৎ তাদের খিলাফতের আরো কাছে নিয়ে আসা। ”

এরপর হুজুর চেয়ারে বসে থাকা একজন আরব বালক কে দেখে বলেন “আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। কারণ তুমিই সেই বালক যে সবসময় আমার দিকে হাত নেড়ে থাক। আমি দোয়া করি তুমি যেন ভাল আহমদী বালক এবং বড় হয়ে ভাল আহমদী মোবাল্লেগ হতে পার।”

হুজুরের কথা শুনে সেই বালক অত্যন্ত আনন্দিত হয়।

চার্টাড প্লেন

একজন সিরিয়ান আহমদী হুজুরকে জানায় যে সে কানাডা থেকে এসেছে। কানাডা থেকে ৩৭৫ জন খোদ্দাম একটি চার্টাড প্লেনে একসাথে জলসাতে এসেছে। সে তাদের মধ্যে একজন। তারা সকলেই ওয়াকফে আরজীর জন্য আবেদন করেছে এবং তাদেরকে হাদীকাতুল মাহদীতে জলসা পরবর্তী গোছগাছের কাজে সাহায্য করতে বলা হয়েছে। প্রত্যেক খোদ্দাম ১২০০ ডলার করে দিয়েছে। হুজুর তার কাছে জানতে চান তার সাথে দেখা করার আগে সদর খোদ্দামের অনুমতি নিয়ে এসেছেন কিনা। তিনি বলেন যে তিনি অনুমতি নিয়েই এসেছেন।

হুজুর তাকে বলেন “ঠিক আছে; কিন্তু তারপরও এই মিটিং এর পর আপনি আরো দুই ঘন্টা অতিরিক্ত কাজ করবেন।”

হুজুরের কথায় বোঝা যায় যুগ খলীফা আশা করেন প্রত্যেক আহমদী নিজেদের দ্বায়িত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়ে সকল কাজ সম্পন্ন করবে।

গাম্বিয়ার মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ

আরব প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাতের পর হুজুর তার অফিসে গাম্বিয়ার কৃষি মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। গাম্বিয়াতে বিগত সরকারের সময়ে আমাদের জামাত অনেক অত্যাচারের সম্মুক্ষীণ হয়েছে। আল্লাহর রহমতে নতুন সরকার অনেকটাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে।

গাম্বিয়ার কৃষি মন্ত্রী বলেন “আমি দেশে যেয়ে আমাদের প্রেসিডেন্টকে বলব আপনাকে যেন আনুষ্ঠানিকভাবে গাম্বিয়াতে আমন্ত্রন জানানো হয়। আপনার পূর্বের খলীফাও গাম্বিয়া সফর করেছিলেন তাই আমরা চাই আপনিও সেখানে আসেন। তাহলে পুরো বিশ্বে দেখবে যে আমাদের সরকার অন্যান্য দলের মতো আপনাদেরকেও সমান অধিকার প্রদান করছে। ”

হুজুর বলেন “হ্যা, আমাদের মনে রাখতে হবে যে ধর্ম হচ্ছে মানুষের মনের ব্যাপার। প্রত্যেকেরই ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। আমি আশা করব আপনাদের দেশে একনায়কতন্ত্রের অবসান হয়েছে এবং এখন জনগণ প্রকৃত স্বাধীনতা পাবে। আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাই এবং আমাকে কোন আমন্ত্রন জানানো হোক বা না হোক আমি গাম্বিয়াতে আসার চেষ্টা করব, ইনশাল্লাহ্।  ”

হুজুর গাম্বিয়ার কৃষি ব্যবস্হা সম্বন্ধে জানতে চান। কৃষিমন্ত্রী বলেন যে গাম্বিয়াতে উৎপাদিত বাদাম ও ধান বিদেশে রপ্তানী করা হয় কিন্তু ফসলী জমির মাত্র ১৫% জমিতে ফসল ফলানো হচ্ছে।

হুজুর বলেন “গাম্বিয়াতে অনেক জমি রয়েছে তাই আপনাদের সেগুলো কাজে লাগানো উচিৎ। তাহলে আপনারা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবেন। কৃষকদের ভর্তুকী দিয়ে সাহায্য করুন যেন তারা এই কাজে উৎসাহিত হয়। আপনারা যদি আমাদের জামাতকে ১০০০ একর জমি আধুনিক চাষাবাদের জন্য দেন তাহলে আমরা সেখানে ফসল উৎপাদন করে দেশের উন্নয়নে সাহায্য করব। ”

মন্ত্রী বলেন যে আফ্রিকার একটি বড় সমস্যা হল দুর্নীতি এবং এর ফলেই মহাদেশের উন্নতি ব্যহত হচ্ছে।হুজুর বলেন “আমি যখন ঘানাতে ছিলাম সেখানেও দুর্নীতি ছিল। স্হানীয় মানুষ দুর্নীতিকে বলত ‘Chopping Money’। এর ফলে দেশের সম্পদ জনগণের উন্নয়নের জন্য সঠিকভাবে ব্যয় হতো না।”

কৃষিমন্ত্রী বলেন যে গাম্বিয়ার স্বাস্হ্যসেবার অবস্হাও অত্যন্ত অপ্রতুল এবং অনেক উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। হুজুর বলেন “গাম্বিয়াতে আমাদের জামাত একটি হাসপাতাল স্হাপন করেছে। আমরা ছোট ছোট ক্লিনিক করতে পারি যেখানে এলোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক ঔষুধ ও সামান্য স্বাস্হ্যসেবা দেয়া হবে। আমরা এমন স্হানে স্বাস্হ্যসেবা নিয়ে যেতে চাই যেখানে এরকম কোন ব্যবস্হা নেই। ”

জলসায় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে কৃষি মন্ত্রী বলেন “জলসায় আমি স্বেচ্ছাসেবকদের কাজ করার যে স্পৃহা দেখেছি তা সত্যিই অসাধারণ। আমি দায়িত্বরত সকল মানুষের মুখেই হাসি দেখেছি। আহমদীদের দেখে আমি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি।   ”

একটি আবেগঘন মুহুর্ত

কৃষিমন্ত্রী চলে যাবার পর হুজুরের কথা শুনে আমি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। হুজুর আমাকে বলেন “গতকাল জলসার শেষ অধিবেশনের সময় আমার পিঠ ব্যথা শুরু হয় এবং আমার অনেক কষ্ট হচ্ছিল। আমার বক্তব্যের পূর্বেই ৯০ জন শিক্ষার্থীকে পুরস্কার প্রদান করার পর থেকেই ব্যথা শুরু হয়।  ”

 

হুজুরের প্রাইভেট সেক্রেটারী সাহেব মুনীর জাভেদ সাহেবও রুমে ছিলেন। তিনি বলেন “গত তিন দিন হুজুর তিন মাসের সমপরিমাণ কাজ করেছেন।”

হাইতি প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ

হুজুর হাইতি থেকে আগত প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন হাইতির রাজধানী পোর্ট-এ-প্রিন্স এর সাবেক মেয়র ।

হুজুর তাকে বলেন “আপনি যখন জলসা গাহে আপনার শুভেচ্ছা বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন আমি সেখানে ছিলাম না। কিন্তু ঘটনাক্রমে আমি টিভি ছাড়ি এবং তখন আপনিই বক্তব্য দিচ্ছিলেন এবং আমি সরাসরি আপনার বক্তব্য শুনি। ”

মেয়র সাহেব বলেন “ধন্যবাদ। এটি আমার জন্য অনেক সম্মানের বিষয় যে খলীফা আমার বক্তব্য শুনেছেন। এই জলসা আমার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং ইসলাম সম্বন্ধে আমার ধারণা পরিবর্তন হয়েছে। ইসলাম সম্বন্ধে আমার মনে যে সন্দেহ ছিল তা দূর হয়েছে এবং আমি বুঝতে পেরেছি মিডিয়াতে যেভাবে ইসলামকে প্রচার করা হয় সেটি সম্পূর্ণ ভুল।  ”

হাইতির জামাত সম্বন্ধে হুজুর বলেন “হাইতিতে আমাদের জামাত এখনো অনেক ছোট। জামাত ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার পর সরকারের অনুমতি নিয়ে আমরা হাইতিতে স্কুল ও হাসপাতাল তৈরী করার পরিকল্পনা করছি। এর ফলে স্হানীয় মানুষের উপকার হবে। অতীতে আমরা অস্হায়ী ভিত্তিতে এরকম কিছু কাজ করেছিলাম। কিন্তু আমার ইচ্ছা স্হানীয় মানুষকে সাহায্য করার জন্য স্হায়ী কিছু করা। হাইতি তে আমাদের সংখ্যা কম হতে পারে কিন্তু আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। ”

ফিলিপাইন প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ

হুজুর এরপর ফিলিপাইন প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সংসদ সদস্য, সাংবাদিক এবং আহমদী মুসলমান।

সাংবাদিক হুজুরকে ফিলিপাইনের কিছু দ্বীপে মুসলিম সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধির ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। হুজুর তাকে বলেন “সরকারকে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। যদি সেনাবাহিনী সন্ত্রাসীদের দমনে পদক্ষেপ নেয় তাহলে এটি সঠিক সিদ্ধান্ত। দেশের শান্তিকে সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর এজন্য যদি দৃঢ় কোন পদক্ষেপ নিতে হয়ে তাহলে সেটি সমর্থনযোগ্য। এরকম করা না হলে সন্ত্রাসবাদ আরো ছড়িয়ে পড়বে।   ”

 

ক্রোয়েশিয়া ও মেসিডোনিয়া প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ

একজন ক্রোয়েশিয়ান ছাত্র হুজুরকে প্রশ্ন করে “লাজনাদের দেয়া আপনার বক্তব্যে আপনি একটি গল্প বলেছিলেন যেখানে একজন খুনী মৃত্যুদন্ডের পূর্বে তার মায়ের জিহ্বাতে কামড় দেয়। সে বলে যে এটা করার কারণ হল তার মা তাকে ছোটবেলায় কখনো কোন খারাপ কাজ করতে বাধা দেয়নি। এজন্য সে আজ বড় অপরাধী হয়ে উঠেছে। আমার প্রশ্ন হল সন্তানদের ভুলের জন্য কি কেবল মায়েরাই দায়ী? ”

হুজুর তাকে বলেন “সন্তানের বাবা ও সমাজেরও বাচ্চাদের প্রতি প্রভাব থাকে। কিন্তু সন্তানের উপর তার মায়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তাই মা যদি সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দেয় তাহলে এটি সন্তানকে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে। একজন মা যদি সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তোলে তাহলে কেবল পরিবারই নয় বরং পুরো জাতিই উপকৃত হবে। তাই আমাদের দ্বিতীয় খলীফা(রাঃ) বলেছিলেন যদি ৫০% মা ধার্মিক ও সৎ হয় তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্মের ৯০% মানুষ ন্যায়পরায়ণ হবে। ”

আর একজন অতিথি ব্রেক্সিট সম্বন্ধে হুজুরের মতামত জানতে চান। হুজুর বলেন “আমি কোন রাজনীতিবিদ নই। আমার ব্যক্তিগত মতামত হল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন যদি একসাথে থাকতে পারত তাহলে সেটি তাদের জন্য ভাল হতো। তাই আমি ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ভোট দিয়েছি। ”

একজন মহিলা বলেন যে তিনি গত জলসার পর হুজুরের সাথে দেখা করার পর আহমদীয়াত গ্রহণ করেছেন। তার পরিবারের তিন জন সদস্য আহমদীয়াত গ্রহণ করেছে কিন্তু তার ছেলে এখনো আহমদী হয়নি।

হুজুর তাকে বলেন “মা হিসেবে, ইনশাল্লাহ আপনি তাকেও ইসলামের দিকে নিয়ে আসতে পারবেন, ইনশাল্লাহ।”

 

সাইপ্রাস, ইন্দোনেশিয়া ও নেপালের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ

সাইপ্রাস থেকে আগত একজন মহিলা বলেন “জলসা অনেক সুন্দর হয়েছে এবং সকলেই অনেক আন্তরিক ছিল। আমার অনেক আহমদীর সাথে পরিচয় হয়েছে এবং আমি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আহমদীদের কাছ থেকে তাদের বাসায় যাবার আমন্ত্রন পাচ্ছি। আমি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই থাকার একটি স্হান পাব। ”

প্রতিনিধিদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে আগত ইসলামিক ইতিহাসের একজন প্রফেসর ছিলেন। তার সাথে কথোপকথনের সময় হুজুর তাকে বলেন “আপনার সবসময় ওরিয়েন্টালিস্টগণ ইসলামের ইতিহাস সম্বন্ধে যা লিখেছেন তার উপর পুরোপুরি নির্ভর করা উচিৎ নয়। কারণ তারা ইসলামের প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করেছে। সবসময় মনে রাখবেন যে পবিত্র কোরআন বলেছে ‘ধর্মে কোন জোর-জবরদস্তি নেই’। তাই দায়েশ ও আল কায়েদার মত সন্ত্রাসী দলসমূহ যা করছে তা ইসলামী শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। এসব সন্ত্রাসী দল ইসলামের নাম নিয়ে মুসলমান দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আমি আশা করব এই হুমকি মোকাবেলা করার শক্তি ইন্দোনেশিয়ার আছে।  ”

“মহানবী (সাঃ) বলেছেন যে ব্যক্তি কলেমা পাঠ করে সেই মুসলমান। তাই ওলামারা কাউকে ইসলাম থেকে বের করে দিতে পারে না অথবা বলতে পারে না যে এরা মুসলমান আর এরা মুসলমান নয়। ইসলাম সকল মানবজাতিকে একত্র করতে এসেছে। ইসলাম বলে একটি মানুষকে হত্যা করা মানে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করা। তাই মুসলমান হিসেবে আমাদের উচিৎ কারো জীবন না নিয়ে মানুষকে নতুন জীবন দান করা। ”

নেপাল থেকে আগত একজন বৌদ্ধ শিক্ষককে হুজুর বলেন “আমার মনে হয় আমাদের জলসা দেখে আপনি বুঝতে পেরেছেন যে বৌদ্ধদেরকে শান্তিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আহমদীরাও তাদের চেয়ে কম শান্তিপ্রিয় নয়। ”

উত্তরে শিক্ষক বলেন “হ্যা। আপনার কথা পুরোপুরি সত্য। আমি শান্তির এমন অপূর্ব প্রদর্শনী পূর্বে কখনো দেখিনি।”

নেপালের একজন নতুন আহমদী হুজুরকে নেপালের ঐতিহ্যবাহী টুপি উপহার দেন। হুজুর তাকে বলেন “জাযাকাল্লাহ, আমি বাসায় নামায পড়ার সময় এটি পড়তে পারব।”

নেপালের একজন অতিথি বলেন “আমরা জামেআ আহমদীয়া ইউকে সফর করেছি এবং দেখেছি যে জামাতের অনেক তরুণ জামাতের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে। এটি অত্যন্ত অনুপ্রেরণমূলক কারণ বৌদ্ধদের মধ্যেও এরকম বিষয় আছে যেটি কেবল বয়স্কদের মধ্যে দেখা যায়। ”

হুজুর তাকে বলেন “আমরা বিশ্বাস করি তরুণদের উন্নতি ব্যতীত দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই আমরা তরুণদের তরবিয়তের জন্য সবসময় গুরুত্ব দিয়ে থাকি।  ”

আমেরিকার প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ

আমেরিকান প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন নতুন আহমদী এবং আফ্রিকান আমেরিকান আহমদী।

একজন আফ্রিকান আমেরিকান মহিলা বলেন “এই জলসা আমার জন্য অত্যন্ত উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে। আমার মনে হয়েছে আমি এখন আমার ধর্মের আরো কাছে এসেছি। জলসার মাধ্যমে আমি আমেরিকার অনেক মহিলার সাথে প্রথমবারের মতো সাক্ষাৎ করেছি। ”

হুজুর সদর লাজনা ইউএসএ কে উদ্দেশ্য করে বলেন “লন্ডনে আসার পর তিনি তার দেশের লাজনা সদস্যদের সাথে পরিচিত হয়েছেন। এতে বোঝা যায় আমেরিকাতে পর্যাপ্ত জামাতী অনুষ্ঠান হয় না যার মাধ্যমে সদস্যগণ একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারে। ”

একজন তরুণ মহিলা সিস্টার আমান্ডা বলেন “হুজুর, আমরা এই সফর অনেক উপভোগ করেছি। কিন্তু আমাদের আসার সময় আমাদের চারটি ইমিগ্রেশন অফিসে চেকিং করে আসতে হয়েছে। ”

হুজুর হেসে বলেন “আপনি অনেক ভাগ্যবান কারণ আপনাকে ৬-৭ বার চেক না করে মাত্র ৪ বার চেক করেছে।”

একজন নন-মুসলমান অতিথি সিস্টার অ্যালেক্সিয়া বলেন “এটি একটি অসাধারণ এবং আধ্যাত্মিক জলসা। সবচেয়ে ভাল খবর হল পৃথিবীতে আপনাদের মতো বিশাল একটি শান্তিপূর্ণ জামাত রয়েছে। ”

হুজুর বলেন “এটিই হল প্রকৃত ইসলাম। আমি আশা করব খারাপ আবহাওয়ার জন্য আপনাদের খুব বেশি কষ্ট হয়নি।”

সিস্টার অ্যালেক্সিয়া বলেন “এটি কোন সমস্যা নয়। আমার জুতো ময়লা হয়ে গিয়েছিল কিন্তু আমি সেটি পরিস্কার করে নিয়েছি। এখানে যে বরকত রয়েছে খারাপ আবহাওয়া তার তুলনায় কিছুই নয়।”

একজন আফ্রিকান আমেরিকান মহিলা হালীমা দীন সাহিবা হুজুরের কাছে আলিয়া লতিফ সাহিবার জন্য বিশেষ দোয়ার অনুরোধ করেন। তিনিও একজন আফ্রিকান আমেরিকান মহিলা যিনি কয়েক বছর ধরে জলসার জন্য আগত আমেরিকার মহিলাদের দেখাশোনা করে আসছেন এবং অন্যান্য জামাতীয় কাজ করছেন।

হালীমা দীন সাহিবা বলেন “হুজুর, আলিয়া অনেক চমৎকার মানুষ।”

হুজুর উত্তরে বলেন “হ্যা। আমি জানি আলিয়া অনেক চমৎকার মানুষ।”

হুজুরের কথা শুনে আমি আলিয়া সাহিবার দিকে তাকাই। আমি দেখি যে তিনি নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রন করতে পারছেন না এবং তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। তিনি আমাকে পরবর্তীতে বলেন যে হুজুরের কথা শুনে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

জেমস নামে নিউইয়র্কের একজন অতিথি কে হুজুর বলেন “আপনাকে দেখে আহমদী বলে মনে হচ্ছে।”

উত্তরে জেমস বলেন “আমি আহমদীয়াত গ্রহণের অনেক কাছে চলে এসেছি। এই জলসা আমার জন্য একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এর ফলে আমি ইসলাম গ্রহণের পথে অনেক দূর এগিয়েছি। এখানে আমি যেসব মানুষের সাথে পরিচিত হয়েছি আমার মনে হয়েছে সকলের জীবনেরই একটি উচ্চতর উদ্দেশ্য আছে। ”

 

নতুন বয়াতকারী আহমদীর বক্তব্য

একজন আফ্রিকান আমেরিকান মহিলা নিকোল উইলিয়ামস হুজুরকে বলেন যে তিনি ২০‌‌‌১৭ সালের এপ্রিল মাসে আহমদীয়াত গ্রহণ করেছেন।

তিনি সাক্ষাতের পর আমাকে বলেন “আমি জীবনে প্রথম জলসায় অংশগ্রহণ করলাম এবং এটি খুবই আনন্দময় অভিজ্ঞতা ছিল। আধ্যাত্মিক পরিবেশ, হুজুরের খুৎবা, আন্তর্জাতিক বয়াত, সকলের আতিথেয়তা দেখে আমি বুঝতে পেরেছি যে আহমদীয়া জামাতের অংশ হওয়া বিরাট বরকতের ব্যাপার। বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক বয়াত এত সুন্দর ছিল যে আমি তখন আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। মহিলাদের অংশে একজন মহিলার চোখও শুকনো ছিল না।  ”

“এই সফরে আমি প্রকৃত ইসলামের সৌন্দর্য্য অবলোকন করেছি। আমি দেখেছি ‘ভালবাসা সবার তরে ঘৃণা নয়কো কারো পরে’ বাস্তব উদাহরণ। আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের লাজনাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে। আমি দেখেছি বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আহমদীয়াত ছড়িয়ে পড়ছে। জলসার অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলতে পারব না।  ”

হুজুরের সাথে প্রথম সাক্ষাতের ব্যাপারে তিনি বলেন “হুজুরের সাথে দেখা করার অনুভূতি প্রকাশ করার মত ভাষা আমার জানা নেই। গত বছর আমি হুজুরের খুৎবার ইংরেজী অনুবাদ শুনেছি। অবশেষে আমেরিকার প্রতিনিধিদের সাথে হুজুরের সাথে দেখা করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। হুজুর যখন দরজা দিয়ে হলে প্রবেশ করলেন এবং নিজের চেয়ারে বসলেন আমার মনে হল যে আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমার মনে হল একটি উজ্জ্বল আলো রুমের মধ্যে প্রবেশ করল।  ”

“আমি দেখেছি হুজুর অত্যন্ত আন্তরিক, দয়ালু ও বন্ধুভাবাপন্ন মানুষ। তিনি সারাদিন ধরেই আমাদের মতো অনেক দলের সাথে সাক্ষাত করছেন যেটি একটি অসাধারণ ব্যাপার। আমি অনেক ভাগ্যবান কারণ আমি হুজুরের সাথে কথা বলতে পেরেছি। আমি হুজুরকে বলেছি যে আমি একজন নতুন আহমদী। হুজুর আমার কথা শুনে হাসেন। আমি কখনো সেই মুহুর্ত ভুলতে পারব না। আমি বুঝতে পেরেছি যে আমাকে খিলাফতের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে।  ”

 

 

 

একজন অতিথির অভিজ্ঞতা

আমি একজন নন আহমদী অতিথি মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি আমাকে বলেন “আমি জলসায় অংশগ্রহণের জন্য ৮ দিন যাবৎ লন্ডনে আছি। এসময় আমি আহমদীয়া জামাতের আরো কাছে এসেছি। আহমদীদের সাথে থেকে আমি প্রকৃত ইসলাম সম্বন্ধে জানতে পেরেছি। জলসার অভিজ্ঞতা আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমি এখন আরো ভাল স্বামী, পিতা, বন্ধু ও মুসলমান হবার জন্য অনুপ্রাণিতবোধ করছি।  ”

“হুজুরের সাথে দেখা করা একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তিনি তার ব্যস্ত সময় থেকে আমাদের জন্য দেখা করার সময় রেখেছেন এটি সত্যিই অভাবনীয় এবং এতে তার চরিত্রের একটি অসাধারণ দিক প্রকাশ পায়।  ”

তার কথা শুনে আমি চিন্তা করলাম যে হুজুরের সাথে দেখা করে কেবল আহমদীরাই নন বরং নন আহমদীরাও উপকৃত হয়। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি যে তিনি এক আহমদীকে বলেছেন তার স্ত্রী তার মাঝে এক বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন; তিনি এখন সেরকম স্বামী হতে পেরেছেন যেরকম তার স্ত্রী সবসময় চেয়ে এসেছিলেন।

হাঙ্গেরী ও দক্ষিন কোরিয়ার প্রতিনিধি

একজন তরুণ অতিথি হুজুরকে বলেন “আমি শিক্ষকতা করি। এই জলসা আমার জন্য একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিল। আমি কখনো এরকম ভ্রাতৃত্ববোধ অনুভব করিনি। ”

হুজুর তাকে বলেন “আমাদের জলসাতে সমাজের সকল স্তর থেকেই মানুষ আসে এবং প্রত্যেকেই অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের ভাই-বোন বলেই মনে করে। আপনি নিজেই বলেছেন যে আপনি কোন ধর্মেই বিশ্বাস করেন না; কিন্তু এখানে আপনার মনে হয়েছে সবাই আপনাকে নিজের ভাই বলেই মনে করছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটিই হল প্রকৃত ভ্রাতৃত্ববোধ। এখন আপনার উচিৎ কোন ধর্মকে গ্রহণ করার চিন্তা-ভাবনা করা। কারণ ধর্মই আমাদের মানবীয় মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সহমর্মিতা শিক্ষা দিয়েছে। ”

অতিথি বলেন “কোরিয়াতে অনেক চার্চ রয়েছে কিন্তু মসজিদের সংখ্যা অত্যন্ত অল্প।”

হুজুর বলেন “ইনশাল্লাহ্, আমি আশা করি একদিন কোরিয়াতেও আমরা মসজিদ স্হাপন করব।”

 

বিবাহ অনুষ্ঠান

মসজিদ ফযলে জোহর ও আসরের নামাযের পর হুজুর সেখানে কয়েকটি বিবাহ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন।

হুজুর বলেন “প্রথম বিবাহ আমার বড় ভাইয়ের ছেলের এবং সে একজন ওয়াকফে নও। আমি দোয়া করি আল্লাহপাক যেন ওয়াকফে নও হিসেবে তার সকল দ্বায়িত্ব পালন করার এবং প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর প্রত্যাশা পূরণ করার তৌফিক দান করেন।”

“যারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন তাদের মনে রাখা উচিৎ তারা যেন কেবল পার্থিব জিনিসের পেছনে না ছুটে। বরং তাদের উচিৎ ধর্মকে সবসময় পার্থিব বিষয়ের উপর প্রাধান্য দেয়া এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের নৈতিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেয়া। ”

একটি ঐতিহাসিক সফর

পাকিস্তানের নাযির তালিম মির্যা ফযল আহমদ(৫০ সাহেব) এবারের জলসায় অংশগ্রহনের জন্য ইউকে আসেন। তিনি সম্পর্কে হুজুরের ভাতিজা।

তিনি আমাকে বলেন “খিলাফতের পূর্বে আমি হুজুরের মধ্য একটি জিনিস লক্ষ্য করেছি। সেটি হল তিনি জামাতের প্রত্যেকটি বিষয় খুব সূক্ষভাবে পর্যালোচনা করতেন। সাধারণত পাকিস্তানীদের মধ্যে এই জিনিসটি দেখা যায় না। যদি কোন সিদ্ধান্ত হয়ে যেত তাহলে হুজুর নিশ্চিত করতেন যে কাজটি যেন সম্পন্ন হয়। ”

ফযল সাহেব ২০০৩ সালে খলীফাতুল মসীহ(রাবেঃ) ইন্তেকালের পর ইন্তেখাব-এ-খিলাফতের সদস্য হিসেবে হুজুরের সাথেই লন্ডন আসেন। তার মুখ থেকে আমি সেই ঐতিহাসিক সময়ের বর্ণনা শুনি।

তার কথা শুনে আমার নিজের স্মৃতিও মনে পড়ে যায়। আমি তখন হার্টেলপুলের বাসায় একা ছিলাম যখন আমার এক কাজিন আমাকে জানায় যে হযরত খলীফাতুল মসীহ(রাবেঃ) ইন্তেকাল করেছেন। যদিও হুজুর কয়েক বছর ধরে অসুস্হ ছিলেন কিন্তু তারপরও এটি আমাদের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল কারণ একদিন আগেই হুজুর জুমআর খুৎবা দিয়েছিলেন। এরপরের কয়েকদিন আমাদের মনের ভিতর এক প্রকার শূন্যতা বিরাজ করে যেটি আমি পূর্বে কখনো অনুভব করিনি। পুরো জামাতেরই একই অবস্হা ছিল। কিন্তু জামাতের প্রবীণ কর্মকর্তারা তাদের দুঃখকে একপাশে সরিয়ে রেখে ইন্তেখাব-এ-খিলাফতের ব্যবস্হা করছিলেন।

ফযল সাহেব বলেন “আমি তখন ওয়াকিল-উল-মাল হিসেবে রাবওয়াতে কর্মরত ছিলাম। ১৯ এপ্রিল ২০০৩ তারিখে বিকেলে আমার বাবার কাছ থেকে একটি ফোনকল পাই এবং তিনি আমাকে দ্রুত আসতে বলেন। আসার পর আমি মনে করি যে হয়ত খলীফাতুল মসীহ(রাবেঃ) শরীর আরো খারাপ হয়েছে। কয়েক মিনিট পর একজন আমাকে মৃত্যু সংবাদটি দেয়।  ”

“হুজুর তখন পাকিস্তানের নাযির-এ-আলা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি এবং আরো কয়েকজন সদস্য একটি বিবৃতি তৈরী করছিলেন যেটি এমটিএ তে প্রচার করা হবে এবং সেখানে খলীফাতুল মসীহ(রাবেঃ) ইন্তেকালের খবর বলা হবে। তারা ইন্তেখাব-এ-খিলাফতের মিটিং এর জন্যও পরিকল্পনা করছিলেন।   ”

“সেসময় আমার হুজুরকে অত্যন্ত শান্ত মনে হয়েছে। তার হয়ত নিজের দুঃখ নিয়ে ভাববার অবকাশও ছিল না। তখন তার একমাত্র চিন্তা ছিল কিভাবে জামাতকে সেই বিপর্ষয়ের সময় রক্ষা করা যায়। ”

আমি সবসময়ই লক্ষ্য করেছি যে হুজুর যেকোন পরিস্হিতিতে জামাতের কর্তব্য পালনকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। হুজুর সবসময় লক্ষ্য রাখেন প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর জামাত যেন থেমে না থাকে। খলীফাতুল মসীহ(রাবেঃ) ইন্তেকালের সময় হুজুর স্বভাবতই দুঃখ পেয়ে থাকবেন এবং তিনি অন্যান্য আহমদীদের চেয়ে বেশিই দুঃখ পাবেন কারণ তিনি খিলাফতের সবচেয়ে বিনয়ী ও অনুগত সেবক ছিলেন।

ফযল সাহেব বলেন “সেদিন আমরা লন্ডনে যাবার জন্য প্যাকিং করছিলাম। কোন এক কারণে আমার হুজুরের বাসায় যাবার প্রয়োজন হয়েছিল। আমি যখন হুজুরের বাসায় পৌছলাম তখন তিনি নামায পড়ছিলেন। আমি দেখলাম হুজুর সিজদায় রত হয়ে আল্লাহর কাছে মাথানত করে অঝোরে কাঁদছেন। আমি কখনো হুজুরকে এভাবে কাঁদতে দেখিনি।”

স্পর্শকাতর মুহুর্ত

প্রথম যে দল রাবওয়া থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্য রওনা হয়ে সেখানে ১৪ জন প্রবীণ কর্মকর্তা ছিলেন। তাদের মধ্যে কারো কারো ডায়াবেটিস ছিল এবং অনেকের শরীর খারাপ ছিল। সন্ধ্যার সময় আমরা রাবওয়া থেকে রওনা হবার কিছু সময় পর একটি সার্ভিস স্টেশনে বিরতি নিতে হয়।

ফযল সাহেব বলেন “আমি তখন মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়ার সদস্য। আমি জানি অনেকেই সারাদিন কিছু খাননি তাই আমি সার্ভিস স্টেশনে চা-বিস্কুটের ব্যবস্হা করেছিলাম। চা দেয়া হলে একজন প্রবীণ কর্মকর্তা অনেক রেগে যান এবং বলেন

‘এটি কি কোন চা খাবার সময় হল?’

আবেগের দিক দিয়ে তিনি সঠিক ছিলেন। সেসময় কারোরই খাবার মানসিকতা ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা হল সেখানে কয়েকজন প্রবীণ সদস্য ছিলেন যারা কিছু না খেতে পেলে অজ্ঞান হয়ে যাবেন। হুজুরও তখন সেখানে ছিলেন এবং আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে হয়ত তিনিও আমার উপর রাগ করবেন। কিন্তু তিনি একটি কথাও না বলে এক কাপ চা নিয়ে সেটি পান করা শুরু করেন। ”

“হুজুর অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে স্পর্শকাতর মুহুর্তটি সামাল দেন। হুজুর এভাবে আমাদের অনুমতি দেন যে দুঃখের সময়ও খাবার খাওয়া জরুরী। পরবর্তীতে কয়েকজন প্রবীণ সদস্য আমাকে ধন্যবাদ দেয় যে তখন যদি তারা খাবার না পেত তাহলে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারত। ”

“লন্ডনে যাবার পরপরই হুজুর ও অন্যান্য কর্মকর্তাগণ ইউকের আমীর সাহেব ও প্রবীণ কর্মকর্তাদের সাথে মিটিং করেন। আমি যখন ভোটের জন্য ফযল মসজিদে প্রবেশ করি তখন আমার কোন ধারণাই ছিল না যে আমি কাকে ভোট দিব। কিন্তু ভোট শুরু হবার সাথে সাথেই সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেল। মুহুর্তের মধ্যেই আমার সব মনোযোগ হুজুরের প্রতি নিবদ্ধ হল এবং আমি জানতাম যে আমি তাকেই খলীফাতুল মসীহ হিসেবে ভোট দিব। আমার তখন মনে হয়েছিল যে আল্লাহপাক আমার হৃদয়কে হুজুরের দিকে নিবদ্ধ করে দিয়েছেন এবং পুরো সময় আল্লাহপাকই আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।  ”

 নতুন সম্পর্ক

ফযল ভাইয়ের সাথে সেদিন আমি মির্যা আদিল আহমদ (৪৪ বছর) সাহেবের সাথেও কথা বলি। তিনি হুজুরের কাজিন এবং বর্তমানে রাবওয়াতে জামাতের কাজে কর্মরত আছেন। আমি তাদের দুজনকেই হুজুরের নিকটাত্মীয় হিসেবে হুজুরের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন তা জানতে চাই।

ফযল সাহেব বলেন “পরিবারের সদস্য ও হুজুরের ভাতিজা হিসেবে আমি সবসময় ভয়ে থাকি যে আমার কোন আচরণ দ্বারা হুজুরের অসম্মান হয়ে যায় কিনা। আমার মনে হয় যারা হুজুরের পরিবারের সদস্য নয় তাদের চেয়ে আমার এই ভয় আরো বেশি। আমি সবসময় আত্মীয়দের সাথে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছি। হুজুরের খিলাফতের পূর্বে তাকে সম্মান করতাম এবং কোনরকন ভয় ছাড়াই স্বচ্ছন্দভাবেই হুজুরের সাথে কথা বলতাম। কিন্তু হুজুর খলীফা হবার পরই সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যায়। যদি বলা হয় রাত-দিনের পার্থক্য তাহলেও কম বলা হবে।”

“সবসময় আমি চিন্তা করি যে হুজুর হলেন আল্লাহর প্রতিনিধি। তার হাসিতেই আমার আনন্দ এবং তার দুঃখেই আমার দুঃখ। এখন আর চাচা-ভাতিজা সম্পর্কের কোন অর্থ নেই। এখন আমাদের মধ্যে কেবল একটিই সম্পর্ক- তিনি আমার খলীফা এবং আমি তার চাকর।  ”

এরপর আদিল ভাই হাসেন ও বলেন “আমিও ফযল ভাই এর সাথে একমত। আমারও মনে হয়েছে হুজুরের সাথে আমার পারিবারিক সম্পর্ক ২২ এপ্রিল ২০০৩ তারিখে শেষ হয়ে গিয়েছে। ”

ফযল ভাই বলেন “কিছু মানুষ মনে করে যেহেতু আমি হুজুরের আত্মীয় তাই আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে হুজুরের সাথে কথা বলতে পারি। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার সেরকম নয়। আমি বোঝাতে পারব না যে হুজুরকে দেখার পর আমার মনের ভিতর কি হয়। ”

আদিল ভাই বলেন “আবিদ, তুমি হয়ত আমাকে হুজুরের বাসায় মাঝেমাঝে দেখে থাকবে যে আমি চুপচাপ দাড়িয়ে আছি এবং কোন কথা বলতে পারছি না। আমি ভীত থাকি যে আমার কোন কথা হুজুরের প্রতি অসম্মান হয়ে যায় কিনা।  ”

 

ঘানার আহমদীদের আবেগ

আমি ঘানা থেকে আগত উমর ফারুক আলী(৫৩ বছর) ও তার স্ত্রী সালমা ফারুকের সাথে কথা বলি। তার স্ত্রী ১৯৯০ সালে বয়াত গ্রহণ করেন।

হুজুরের সাথে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে উমর সাহেব বলেন “হুজুরের সাথে দেখা করা একটি সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। হুজুরের সাথে দেখা করার সময় আমার মুখের হাসি অন্যান্য সময়ের চেয়ে আরো বিস্তৃত ছিল। হুজুরের অফিস থেকে বের হয়েও আমি হাসছিলাম কারণ হুজুরের সাথে দেখা করে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। হুজুর ঘানা সম্বন্ধে আমাদের চেয়েও বেশি জানেন এবং তিনি আমাদের অত্যন্ত ভালবাসেন।”

তার স্ত্রী বলেন “আমি হুজুরকে বলি যে হুজুরের চেহারা দেখাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। কারণ তার চেহারা থেকে যে নূর বের হয় তা আমাদের হৃদয়কে ছুঁয়ে যায় এবং আমরা বুঝতে পারি যে আল্লাহপাকই তাকে খলীফা নিযুক্ত করেছেন।”

“আমি প্রায় ২০ বছর পূর্বে অনেক গবেষণা করে আহমদীয়াত গ্রহণ করেছি। আমি নন-আহমদী ছিলাম এবং অনেক বই পড়ার পর আমার কাছে আহমদীয়াতের সত্যতা প্রমাণিত হয়। আমি এখন জানি যে আমাদের কর্তব্য হল মহানবী(সাঃ) এর সালাম প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এ্র কাছে পৌছে দেয়া। আহমদীয়া জামাতের সদস্য হতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করি।  ”

“আহমদীয়াত গ্রহণের জন্য আমার মনে কোন আফসোস নেই। এখন আমি ঘানার লাজনা তাহরীক-এ-জাদীদ ও ওয়াকফে জাদীদ সেক্রেটারী হিসেবে কাজ করছি। এটি আমার জন্য অনেক বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার।”

 

বাংলাদেশ জামাতের সাথে অফিসিয়াল সাক্ষাত

১ আগস্ট ২০১৭ তারিখে হুজুর বাংলাদেশ জামাতের কর্মকর্তাদের সাথে অফিসিয়াল সাক্ষাত করেন। মিটিং এ বাংলাদেশের আমীর সাহেব হুজুরকে আহমদনগরে একটি নতুন মসজিদের ডিজাইন প্রদর্শন করেন।

ডিজাইন দেখার পর হুজুর বলেন “অবশ্যই আপনারা এটি তৈরী করতে পারেন কিন্তু আপনাদের উচিৎ নিজেদের খরচেই এটি তৈরী করা। অন্যান্য অনেক জামাতই এখন নিজেদের পায়ে দাড়িয়ে পড়েছে। তাই এখন বাংলাদেশ জামাতেরও কেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের পায়ে দাড়ানো উচিৎ।  ”

“আপনি আমাকে বলে থাকেন যে সাধারণ আহমদীগণ জামাতের সাথে এতটা জড়িত নয় এবং তারা প্রয়োজনীয় আর্থিক কুরবানী করতে তৈরী নয়। কিন্তু প্রকৃত সমস্যা হল জামাতের কর্মকর্তাদের আরো কর্মঠ হতে হবে। তাহলেই সাধারণ আহমদীগণও জামাতের সাথে আরো সম্পৃক্ত হবে।”

“বিশ্বে বাংলাদেশ জামাতের চাইতেও ছোট ও গরীব অনেক জামাত রয়েছে। আপনাদের জামাত ১০০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; তাই আপনাদের কোন অজুহাত দেবার সুযোগ নেই। আপনাদের উচিৎ তরুণদের অনুপ্রাণিত করা এবং তাদের দ্বায়িত্ব দেয়া। ”

“প্রতি বছর আমি জার্মানী জামাতকে মসজিদ তৈরীর জন্য মিলিয়ন ইউরো সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা দেই। আল্লাহর রহমতে তারা সেটা পূর্ণ করে। আপনাদেরও তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়া উচিৎ এবং লোন না নেবার চেষ্টা করা উচিৎ। এরকম করা না হলে ধার করা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। ভালবাসা, সৌহার্দ্য ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আপনারা এটা অর্জন করতে পারবেন। তাই সকল আহমদীর সাথেই ভালবাসাপূর্ণ আচরণ করুন এবং নিজেকে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলুন যেন তারা আপনাকে অনুসরণ করতে পারে। ”

আহমদীদের অনুপ্রাণিত করার উপায় সম্বন্ধে হুজুর বলেন “কেবল চাঁদা নেবার জন্য মানুষের কাছে যাবেন না। বরং তারা কেমন আছে, তাদের কোন সমস্যা আছে কিনা এসব খবর নিতেও তাদের কাছে যাবেন। ইনশাল্লাহ, তারা যতই জামাতের কাছে আসবে তারা বুঝতে পারবে যে এই চাঁদা কোন ট্যাক্স নয় বরং এটি তরবিয়তের একটি উপায়। অবশ্যই আমার দোয়া আপনাদের সাথে আছে। কিন্তু পাশাপাশি আপনাদেরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে। ”

“আমি বলেছি যে ভালবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণই হল সফলতার চাবিকাঠি। কারণ মহান আল্লাহপাক এভাবেই মসুলমানদের সাথে মহানবী (সাঃ) কে আচরণ করতে বলেছিলেন । যদি আপনি মানুষের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করেন তাহলে তারা আরো দূরে সরে যাবে।”

বাংলাদেশের আমীর সাহেব বলেন যে, বাংলাদেশ জামাত দেশের গরীব-দুঃস্হদের নিয়মিতভাবে সাহায্য করে আসছে। হুজুর বলেন “আমি এটি শুনে অত্যন্ত আনন্দিত। আপনাদের উচিৎ গরীব-দুঃস্হদের সাহায্য করার ব্যাপারে আরো গুরুত্ব দেয়া। পরিস্হিতি যাই হোক না আমাদের দ্বায়িত্ব হল তাদের সাহায্য করা।  ”

 

ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধি

হুজুর ইন্দোনেশিয়া থেকে আগত প্রায় ১০০ জন আহমদী ও অতিথির সাথে দেখা করেন। এসময় একজন আহমদী মহিলা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি হুজুরের কাছে দোয়া চান কারণ তার সন্তান হচ্ছিল না। অনেকেই তাদের জলসার আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা কথা স্মরণ করে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। কিছু আহমদী হুজুরকে দোয়ার জন্য আবেদন জানান যেন তাদের পরিবার সবসময় জামাতের সাথে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ থাকে এবং জামাতের খেদমত করতে পারে।

একজন আহমদী বলেন “আমি চাকুরী থেকে পদত্যাগ করে জলসায় এসেছি কারণ আমার বস আমাকে ছুটি দিচ্ছিলেন না। কিন্তু আমি মনে করি এটি কোন সমস্যা নয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে জলসায় অংশগ্রহণ করার ফলে আল্লাহপাক আমাকে অশেষ বরকত দিবেন।”

হুজুর তাকে বলেন “আল্লাহপাক আপনাকে পূর্বের চাইতেও ভাল চাকুরী দিন। ”

 

মাওরী আহমদীদের সাথে সাক্ষাৎ

২০১৬ সালে নিউজিল্যান্ডের প্রথম মাওরী আহমদী জলসায় অংশগ্রহণের জন্য ইউকেতে আসেন। তখন হুজুর তাকে বলেছিলেন যে ২০১৭ সালে তিনি যেন আবার আন্তর্জাতিক বয়াতে হুজুরের হাতে বয়াত করার জন্য ইউকেতে আসেন। বয়াতের দুই দিন পর তিনি ও তার স্ত্রী হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। মাওরী আহমদী হুজুরকে মাওরীদের ঐতিহ্যবাহী পাত্র উপহার দেন যেটি তিনি নিউজিল্যান্ড থেকে এনেছিলেন। তিনি হুজুরের কাছে দোয়ার আবেদন করেন যেন অন্যান্য মাওরীগণ আহমদীয়াত গ্রহণ করে।

হুজুর বলেন “হ্যা, আমি দোয়া করব যেন আরো বেশি সংখ্যক মাওরী আহমদীয়াত গ্রহণ করে। আপনি এখন নিজেকে মাওরীদের মধ্যে আহমদী মোবাল্লেগ হিসেবে মনে করবেন।”

মাওরী আহমদী বলেন “হুজুর, আমি ইতোমধ্যেই আপনার দোয়ার বরকত দেখতে পেয়েছি। গত বছর আমার সাত বছরের ছেলের মাথায় টিউমার হয়েছিল এবং আমি যখন লন্ডন এসেছিলাম তখন আপনার কাছে দোয়ার জন্য আবেদন করেছিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে তার মাথায় সফলভাবে অপারেশন হয়েছে এবং এখন সে সম্পূর্ণ সুস্হ।”

বুরকিনা ফাসো প্রতিনিধি

হুজুর একটি আফ্রিকান দেশ বুরকিনা ফাসো থেকে আগত অতিথিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে হিউম্যান রাইটস কমিশনের চেয়ারম্যানও ছিলেন। তিনি হুজুরকে বলেন যে তার মনে হয় বুরকিনা ফাসোতে বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও শান্তি রয়েছে।

হুজুর বলেন “যদি আপনি এটি অর্জন করতে সক্ষম হন তাহলে আপনার দেশ উন্নতি করবে।”

অতিথি বলেন “জলসায় আপনার বক্তব্য পুরো বিশ্বের স্বাধীনতার জন্য একটি সনদ। বিশ্বের এই সংকটময় মুহুর্তে এটির খুব প্রয়োজন ছিল। আমার কোন সন্দেহ নেই যে বর্তমান বিশ্বে যেসব সমস্যা রয়েছে আপনার বক্তব্যে তার সমাধান রয়েছে।  ”

প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন ছিলেন বুরকিনা ফাসোর ন্যাশনাল উমর-এ-খারিজা সেক্রেটারী। তিনি বলেন “হুজুর ২০০৮ সালে আপনি যখন ঘানা সফর করেছিলেন তখন সাইকেল চালিয়ে কিছু খোদ্দাম বুরকিনা ফাসো থেকে ঘানা গিয়েছিল। আমি তাদের মধ্যে একজন ছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলতে পারব না। ”

হুজুর হাসেন ও বলেন “আমার মনে আছে তোমরা সকলেই অনেক পুরনো ও ভাঙা সাইকেল চালিয়ে এসেছিলে; কিন্তু এসব প্রতিবন্ধকতা তোমাদের বাধা দিতে পারেনি।  ”

আমেরিকার প্রতিনিধি

 

আমি আমেরিকার নিউজার্সি থেকে আগত আব্দুর রহিম লতীফ(৪৬ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি তিন বছর পর ইউকে জলসায় অংশগ্রহন করলেন। আন্তর্জাতিক বয়াতের সময় তাকে আমেরিকার প্রতিনিধি হবার সম্মান দেয়া হয়েছিল। তাই তিনি কয়েকজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের মধ্যে একজন যারা হুজুরের হাতে সরাসরি হাত রাখতে পেরেছিল। গভীর আবেগের সাথে তিনি তার অভিজ্ঞতা আমাকে বলেন।

তিনি বলেন “এই সফর আমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রতিদিন আমার মনে হচ্ছে আমার সকল সমস্যা ও বোঝা একে একে আমার উপর থেকে সরে যাচ্ছে। সারা বছর যেসব সমস্যা ছিল জলসার কল্যাণে এবং আমার আধ্যাত্মিক মালিকের কাছে থাকার কারণে সব সমস্যা সমাধান হয়ে গিয়েছে।  ”

হুজুরের হাতে হাত রেখে বয়াত করার অনুভুতি সম্বন্ধে তিনি বলেন “সেদিন জলসা সালানার দ্বিতীয় দিন ছিল। আমি রাতের খাবার খাচ্ছিলাম। অন্য একজনের আমেরিকার প্রতিনিধি হবার কথা ছিল। কিন্তু তিনি অসুস্হ হয়ে পড়ায় আমাকে জানানো হয় যে এবার আমাকে নির্বাচন করা হয়। এই সংবাদ শুনে আমি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। আমি এক নগন্য মানুষ কিন্তু তারপরও আল্লাহপাক আমাকে এই সৌভাগ্য দিয়েছেন। আমি তখন কান্না আটকাতে পারিনি।  ”

“আমাকে কাঁদতে দেখে জামেআর একজন শিক্ষক আমার কাছে এসে বলেন যে আমি অসুস্হ কিনা। আমি তাকে বিষয়টি বলি। তিনি আমাকে বলেন যে ‘আমি বুঝতে পেরেছি আপনি কাদঁতে থাকুন।’ ”

“বয়াতের সময় আমি অনেক আবেগাপ্লুত ও ভীত ছিলাম। আমি চিন্তা করছিলাম যে আমাকে আরো ভাল হতে হবে এবং আমি নিজের দুর্বলতা নিয়ে ভাবছিলাম। এভাবে একটি জামাতকে প্রতিনিধিত্ব করে সরাসরি হুজুরের হাতে হাত রেখে বয়াত করা একটি বিশাল দায়িত্ব। বয়াতের শর্তসমূহ বলার সময় আমি নিজের সাথে ওয়াদা করছিলাম যে আমি বয়াতের সবগুলো শর্ত পূরণ করার সাধ্যমত চেষ্টা করব। ”

 

“এই লন্ডন সফর আমার জীবনকে পুরো পরিবর্তন করে দিয়েছে। যেমন বলা যায়, মসজিদ থেকে আমার বাসা বেশি দূরে নয়। কিন্তু মাঝে মাঝে আমি আলসেমী করে জামাতে নামায পড়তে যাই না। কিন্তু এখন আমার আর এরকম দুর্বলতা করার সুযোগ নেই। আমার মাঝে যেসকল দুর্বলতা রয়েছে সেগুলো দূর করার সকল চেষ্টা আমাকে করতে হবে।”

“এই সফরে আমি হুজুরের সাথে দেখা করার সৌভাগ্য লাভ করেছি। এটি একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এমটিএ তে হুজুরকে অনেক গম্ভীর বলে মনে হয়। কিন্তু হুজুরের সাথে সরাসরি কথা বলে আমি বুঝতে পারি যে হুজুর অনেক আন্তরিক, তিনি আমাদের প্রতি অনেক ভালবাসা রাখেন। এটি একটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার যে আমরা সেই মানুষের সাথে দেখা করতে পারি যিনি এই মুহুর্তে পৃথিবীতে আল্লাহর সবচেয়ে কাছের মানুষ। এমনকি তিনি নিজেই আমাদের তার কাছে আসতে বলেন। আমরা তাকে আমাদের সকল সমস্যার কথা বলতে পারি এবং তিনি সেসকল সমস্যা দূর করে দেন।  ”

“হুজুরের এক আমেরিকা সফরের সময় আমি মসজিদে নিরাপত্তা দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি দেখলাম যে হুজুর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আহমদীদের সাথে সাক্ষাতেই ব্যস্ত ছিলেন। আমরা যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলাম তারা একটু পর পর বিরতি নিতে পারতাম। কিন্তু হুজুর এক আহমদী পরিবারের পর আর এক আহমদী পরিবারের সাথে বিরতিহীনভাবে সাক্ষাত করতে থাকেন। যেসব আহমদী হুজুরের সাথে দেখা করে বের হয়ে আসছিল তাদের মুখেও বিস্তৃত হাসি ছিল। আমি কেবল একদিনের ঘটনা বললাম। হুজুরের পুরো সফরেই হুজুর এরকমই ব্যস্ত ছিলেন।  ”

গুয়াতেমালা ও কোস্টারিকা প্রতিনিধি

গুয়াতেমালা ও কোস্টারিকা প্রতিনিধিদের মধ্যে গুয়াতেমালার একজন মহিলা সংসদ সদস্য এবং কোস্টারিকার একজন সংসদ সদস্য ও একজন সাংবাদিক ছিলেন।

গুয়াতেমালার সংসদ সদস্য বলেন “গত কয়েকদিনে আমি আহমদীয়া মুসলিম জামাত সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। এখন আমি প্রকৃত ইসলাম কি তা বুঝতে পেরেছি। ইসলাম নিয়ে পূর্বে আমার মনে যে সন্দেহ ও ভীতি ছিল তা এখন আর নেই। আমি এখন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত। ”

কোস্টারিকার সংসদ সদস্য বলেন “আমি গুয়াতেমালার সংসদ সদস্যের সাথে পুরোপুরি একমত। ইসলাম সম্বন্ধে যেসব মিথ্যা বিশ্বাস আমাদের ছিল তা সম্পূর্ণভাবে দূর হয়েছে। ইসলাম সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে।”

হুজুর হাসেন ও বলেন “আমাদের জলসায় আপনি দেখে থাকবেন যে এখানে কোন বিশৃঙ্খলা নেই বা কোন মারামারি নেই। আমি মনে করি না বিশ্বের আর কোথাও এত মানুষের সমাবেশ এতটা শান্তিপূর্ণ হবে।  ”

কোস্টারিকার সংসদ সদস্য বলেন “হ্যা, আমি আপনার সাথে একমত। জলসাতে বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ আসে কিন্তু তারা সবাই একই ভাষায় কথা বলে, সেটি হল ভালবাসার ভাষা। আমি শুনেছিলাম ইসলামে নারীর কোন মর্যাদা দেয়া হয় না; কিন্তু এখানে এসে আমার ধারণা সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। আমি জলসায় মহিলাদের পাশে অনেক নিরাপদ বোধ করেছি এবং মহিলাদের সাথে কাটানো সময় উপভোগ করেছি। আমি ছেলেদের পাশেও ছিলাম কিন্তু মহিলাদের পাশে থাকতেই আমার বেশি ভাল লেগেছে।   ”

হুজুর বলেন “হ্যা. আমাদের মহিলারা ছেলেদের তাদের সামনে থেকে সরে যেতে বলে যেন তারা কোনরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই উন্নতি করতে পারে। ”

কোস্টারিকা থেকে আগত একজন মহিলা জলসার অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বলেন “আমি জলসায় আপনার বক্তব্য শুনে অনেক আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছি। আপনার এই কথা যে ‘শত্রুর জন্যও দোয়া করবে, তাদের ক্ষমা করবে ও ভালবাসবে’ আমার খুবই ভাল লেগেছে। আমি খৃষ্টান এলাকায় বাস করি এবং সেখানে কেউ আপনার মতো শান্তিপূর্ণ বক্তব্য দেয় না। এক কথায় বলতে হলে আপনি আমাদের শিখিয়েছেন যে আমরা যদি মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করি তাহলে আল্লাহপাকও আমাদের সাথে ভাল ব্যবহার করবেন।  ”

হুজুর বলেন “বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আমাদের জলসায় এসে থাকে এবং আমরা সকলকেই ভালবাসি ও সম্মান করি। কারণ এটিই হল ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।”

কোস্টারিকা থেকে আগত সাংবাদিক হুজুরকে বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ কিভাবে একসাথে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্হান করতে পারে সে সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন। হুজুর তাকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে বোঝান যে ইসলামী শিক্ষা সকল প্রকার সন্ত্রাসবাদের বিপক্ষে।

এরপর হুজুর প্রকৃত জিহাদ সম্বন্ধে বলেন “পবিত্র কোরআন বলে ‘লা ইকরাহা ফিদ্দীন’ যার অর্থ হল ধর্মে কোন প্রকার জোর জবরদস্তি নেই।  ”

“এই আয়াত দ্বারা কি বোঝা যায়? এতে বোঝা যায় ধর্ম হল যার যার মনের ব্যাপার। খৃষ্টান, ইহুদী, মুসলমান এবং অন্য যে কোন ধর্মের মানুষেরই শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ধর্ম প্রচারের অধিকার রয়েছে। একইসাথে প্রত্যেক মানুষের যে কোন ধর্মকে গ্রহন বা প্রত্যাখ্যান করার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে।  ”

“আমরা ইসলামের শিক্ষা প্রচার করছি এবং যাদের এই ধর্ম ভাল লাগছে তারা আমাদের জামাতে যোগ দিচ্ছে। কিন্তু যারা আমাদের জামাতে যোগ দিচ্ছে না আমরা তাদের প্রতি কোনরকম শত্রুতা পোষণ করছি না। কারণ আমরা সকলেই হযরত আদম(আঃ) এর বংশধর। তাই এটি আমাদের দায়িত্ব সকলকে ভালবাসা ও সম্মান করা।”

গুয়েতামালা তে হিউম্যানিটি ফার্স্ট নাসির হাসপাতাল নির্মাণ করছে। হুজুরকে স্হানীয় সংসদ সদস্য অনুরোধ করেন তিনি যেন হাসপাতাল নির্মাণ হবার পর সেটি উদ্বোধন করতে যান। হুজুর বলেন “আমি আপনার নিমন্ত্রনের জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। ইনশাল্লাহ আমি আশা করব আমি যেন হাসপাতাল উদ্বোধন করতে যেতে পারি।”

রাশিয়ান প্রতিনিধি

রাশিয়ান প্রতিনিধিদের মধ্যে একন রাশিয়ান সাংবাদিক ও নতুন বয়াতকারী আহমদী ছিলেন।

সাংবাদিক হুজুরকে বলেন “আমি জলসা অনেক উপভোগ করেছি। আমি অবাক হয়েছি কারণ এখানে ৩০ হাজারের মতো মুসলমান সকলেই নিয়ম মেনে চলছে এবং তারা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। কেবল বৃষ্টি সামান্য সমস্যা সৃষ্টি করেছিল।  ”

হুজুর হাসেন ও বলেন “আমি আপনাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি পৃথিবীর কোথাও এরকম সমাবেশ খুজেঁ বের করুন; যেখানে যেকোন ধর্মের ৩০ হাজার মানুষ সবসময় এরকম সুশৃঙ্খলভাবে থাকবে। আপনি এরকম শৃঙ্খলাবোধ কেবল আহমদী মসুলিম জামাতের মধ্যেই দেখতে পাবেন। আমি লক্ষ্য করবেন যখন আবহাওয়া খারাপ হয়েছিল তখনও আহমদীগণ ধৈর্য্য ধরে ছিলেন। এটি তখনই সম্ভব হবে যখন আপনার ধর্মের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থাকবে। ”

সাংবাদিক হুজুরকে বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ বৃদ্ধি সম্বন্ধে প্রশ্ন করেন। হুজুর বলেন “আমি গত দশ বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য যে কোন মানুষের চেয়ে বেশি বক্তব্য দিয়েছি, কারণ আমি প্রকৃত ইসলামের অনুসরণ করি। এখন অন্যান্য মানুষ ও দল এসব সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছে এবং বলছে যে এর ফলে বিশ্বের শান্তি ব্যহত হতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন আহমদীয়া মুসলিম জামাতই সর্বপ্রথম বিশ্বকে এই বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছিল ”

“একজন সাংবাদিক হিসেবে আপনার প্রশ্ন করা উচিৎ যে এসকল সন্ত্রাসীগণ কিভাবে অস্ত্র পাচ্ছে। মুসলমান দেশে খুব সামান্যই অস্ত্র তৈরী হয়। বেশিরভাগ অস্ত্রই পশ্চিমা বিশ্বে তৈরী হয়ে থাকে। সন্ত্রাসবাদকে থামাতে হলে মুসলিম ও নন-মুসলিম সকলকেই প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উদাহরণসরূপ বলা যায় গত বছর বিশ্ব শক্তিসমূহ দায়েশকে দমন করতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছিল। এর ফলে তারা দায়েশের অগ্রগতিকে থামাতে পেরেছে এবং বর্তমানে সেটি একটি পরাজিত দলে পরিণত হয়েছে।   ”

“বর্তমান সমস্যার কিছু পার্থিব সমাধান রয়েছে। কিন্তু আমাদের জামাত আধ্যাত্মিক সমাধানের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই আমরা প্রতিনিয়ত বিশ্ব শান্তির জন্য আল্লাহর দরবারে মাথা নত করে দোয়া করি। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী আমরা শৈশব থেকেই আমাদের জামাতের বাচ্চাদের নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা দিয়ে থাকি। এর ফলে আল্লাহর রহমতে আহমদী মসুলমানগণ বিশ্বে শান্তি স্হাপন করে চলেছে।   ”

সাংবাদিক হুজুরকে জিজ্ঞেস করেন হুজুর কি মহিলা ইমামকে সমর্থন করেন কিনা? হুজুর বলেন “আমি মহানবী (সাঃ) এর সুন্নাহ করে অনুসরণ করি। তিনি যদি কোন কাজকে ভুল বলেন তাহলে সেটি ভুল, বাকি বিশ্ব কি বলল বা কি চিন্তা করল সেটি কোন ব্যাপার নয়। তিনি আমাদের মালিক এবং পথ প্রদর্শক।”

এরপর হুজুর জলসাতে লাজনাদের বক্তব্যে মহিলারা কেন ইমাম হতে পারবে না এ ব্যাপারে যেসব পয়েন্ট বলেছিলেন সেগুলো আবার বলেন।

আশীর্বাদের উৎস

মিটিং শেষ হবার পর প্রাইভেট সেক্রেটারী মুনীর জাভেদ সাহেব হুজুরকে বলেন যে পরবর্তী মিটিং সিয়েরা লিওনের প্রতিনিধিদের সাথে মাহমুদ হলে হবে। হুজুর বলেন যে তিনি এক মিনিটের মধ্যেই আসছেন। এরপর হুজুর তার টেবিলের পিছনে ট্রলীর কাছে যান, একটি গ্লাস নিয়ে পানি ঢালেন এবং কয়েক চুমুক পান করেন। এটি একটি দুর্লভ মুহুর্ত যেখানে হুজুর মাহমুদ হলে যাবার পূর্বে নিজের জন্য এক মিনিট সময় পেলেন।

গত কয়েক দিনে আমি দেখেছি যে খিলাফত প্রকৃত বরকতের উৎস এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার একটি প্রতিফলন। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মানুষজন বলে গেছেন যে কিভাবে হুজুরের বক্তব্য তাদের উপর প্রভাব ফেলেছে এবং ইসলাম সম্বন্ধে তাদের ধারণা পরিবর্তন করে দিয়েছে, তাদের সকল ইসলামভীতি এখন দূর হয়েছে। তারা বলেছে যে জলসা সালানার মতো শান্তিপূর্ণ সমাবেশ তারা পূর্বে কখনো দেখেনি।