Menu

হুজুরের (আইঃ) হল্যান্ড ও জার্মানী সফর অক্টোবর ২০১৫ ব্যক্তিগত ডায়েরী পার্ট-১ (পর্ব-১)

[হুযুর (আইঃ) এর হল্যান্ড এবং জার্মানী সফরঃ আবিদ খান সাহেবের ব্যক্তিগত ডায়েরী। ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন নুরে কাওসার রিফাত সাহেব]

ভূমিকা

৪ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে হযরত খলীফাতুল মসীহ আল খামেস (আইঃ) ও তাঁর কাফেলা হল্যান্ড ও জার্মানীতে ১৫ দিনের সফরের জন্য যাত্রা শুরু করেন। এসময় হুজুর ডাচ সংসদে বক্তব্য দিবেন, বিভিন্ন মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন, বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিবেন ও জামেআ আহমদীয়া জার্মানীর প্রথম সমাবর্তন পরিচালনা করবেন।

হুজুর ও তাঁর সম্মানিত স্ত্রী সহ মোট ১৪ জন কাফেলা নিয়ে সেদিন যাত্রা শুরু হয়। যার মধ্যে ছয় জন নিরাপত্তা সদস্য হলেন মাহমুদ আহমদ সাহেব, নাসির সাঈদ সাহেব, শওকত সাহেব, মাহমুদ খান সাহেব, সরদার হুমায়ুন সাহেব এবং খাজা কুদ্দুস সাহেব। অফিস কর্মীদের মধ্যে ছিলেন আহমদ জাভেদ সাহেব(ব্যক্তিগত সচিব), আব্দুল মাজীদ তাহের সাহেব (অতিরিক্ত ওয়াকিল উল তবশীর), মোবারক আহমেদ জাফর সাহেব (অতিরিক্ত ওয়াকিল উল মাল), বশির আহমেদ সাহেব(পি.এস. অফিস)এবং আমি (আবিদ খান প্রেস ও মিডিয়ার পক্ষ থেকে)।

ব্র্যাডফোর্ড থেকে নাসির আমিনী সাহেব ও নাদিম আমিনী সাহেব এবং লন্ডন থেকে মুহাম্মদ আহমেদ সাহেবও কাফেলার সদস্য ছিলেন। তাঁরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তাঁদের ব্যক্তিগত গাড়ী ও নিজেদের চালক হিসেবে পেশ করেন। হুজুর সদয়ভাবে তাঁদের অনুরোধ গ্রহণ করেন।

হুজুরের ভালবাসা ও উদ্বেগ

সফর শুরুর ২ সপ্তাহ পূর্বে হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি এই সফরে গেলে আমার স্ত্রী মালার কোন অসুবিধা আছে নাকি। কারন আমার স্ত্রী তখন সন্তান সম্ভবা ছিল। আমি সাথে সাথেই উত্তর দিলাম যে আমাদের এই দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে যুগ খলীফার সান্নিধ্যে থাকা আমাদের জন্য অশেষ বরকতের কারণ হবে। তাই এই সফরের ব্যাপারে আমাদের কোন দুশ্চিন্তা নেই। এটি ছিল আমাদের ও আমাদের পরিবারের জন্য হুজুরের ভালবাসা ও উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। বাসায় আমি মালাকে এই কথা জানালে সে অনেক আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে।

আলহামদুলিল্লাহ, কিছুদিন পরেই হুজুরের ব্যক্তিগত সচিব আামাকে সফরের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন। যখনই আমি এ সংবাদ শুনলাম তখনই আমি মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় গভীরভাবে আভিভূত। আমি সবসসময় ভীত থাকতাম যাতে আমি যেন এমনকিছু না করি যা কাফেলার জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে।

পরিবারকে বিদায়

৪ অক্টোবর সকাল ৯টায় আমি ফযল মসজিদে এসে নিরাপত্তা টিম কে আমার লাগেজ দিয়ে দেই। আমি পূর্বে সবসময় ১টি ব্যাগ নিয়েই সফর করেছিলাম। কিন্তু এবার আমি একটি ছোট ব্যাগও নিয়েছি। তাই আমি কিছুটা চিন্তিত ছিলাম যে গাড়ীতে সব লাগেজের স্থান হবে কিনা। আল্লাহর রহমতে গাড়ীতে পর্যাপ্ত স্থান ছিল।

এরপর আমি আমার ছেলে মাহিদ ও স্ত্রী মালার কাছ থেকে বিদায় নিতে যাই। গাড়ীতে করে আসার সময় মাহিদ চুপচাপই ছিল। কিন্তু যখনই আমি লাগেজ বের করা শুরু করলাম সে কান্না শুরু করল। মালা আমাকে বলেছিল বাসায় যাবার সময় পুরোটা পথই সে কান্নাকাটি করেছে। বাসায় যেয়ে তাকে কিছু চিপস দেয়া হলে তার কান্না থামে।

নাদিম এর গাড়ী মেরামত

মসজিদে নাদিম আমিনীকে দেখে মনে হলো কোন বিষয় নিয়ে সে বড়ই চিন্তিত। সাধারণত সে সবসময় শান্ত ও হাস্যজ্জ্বল থাকে। তাই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম যে সবকিছু ঠিক আছে তো। সে আমাকে তার গাড়ীর কাছে নিয়ে গেল এবং বলল যে গতকাল রাতে সে একটি হোটেলে ছিল। সে সময় তার গাড়ীর পিছনের গ্লাস সম্পূর্ণ ভেঙ্গে গিয়েছে এবং তা মেরামত করার কোন সময় সে পায়নি।

আল্লাহর রহমতে হুজুরের নিরাপত্তা দল এ ব্যাপারে দারুণ উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে গাড়ীর পিছনের গ্লাসের স্থানটি একটি অস্থায়ী আবরণ দিয়ে ঢেকে দিল। প্রথমে তারা সেখানে লাগেজ রাখল যাতে বাতাস ঢুকতে না পারে। তারপর গ্লাসের স্থানটি তারা মোটা হার্ডবোর্ড দিয়ে ঢেকে দিল।শেষে প্লাস্টিকের শিট দিয়ে হার্ডবোর্ডটি ঢেকে দিয়ে টেপ দিয়ে সিল করে দেয়া হল।

আমরা যখন হল্যান্ডে পৌছাই তখন আমি মুবারক জাফর সাহেবকে জিজ্ঞেস করি যে গাড়ীতে কোন অসুবিধা হয়েছিল কিনা। তিনি বলেন পুরো সফরে গাড়ীতে কোন বাতাস প্রবেশ করেনি এবং কোন শব্দও ছিল না।

ফযল মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু

ফযল মসজিদে অনেক আহমদী হুজুরকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন। সকাল ১০ টার সময় হুজুর ও তার স্ত্রী বাসা থেকে বের হয়ে আসেন। দোয়ার পরে কাফেলা যাত্রা শুরু করে। সফরের বেশীরভাগ সময়ই আমাদের গাড়ী হুজুরের গাড়ীর ঠিক পিছনেই ছিল। কিন্তু নাদিমের গাড়ীর গ্লাস ভেঙ্গে যাবার কারণে প্রথম কিছুদিন আমাদের গাড়ী হুজুরের গাড়ীর সামনে ছিল। পূর্ববর্তী ইউরোপ সফরের সময় আমরা শনিবার সফর শুরু করেছিলাম। কিন্তু এবার আমরা রবিবার যাত্রা শুরু করি। এটি আমাদের জন্য আশিসপূর্ন সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়। শরণার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাবার কারণে শনিবার চ্যানেল টানেল কার্যক্রম কয়েক ঘন্টার জন্য বন্ধ ছিল। কিন্তু রবিবার আল্লাহর রহমতে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং আমাদের বিন্দুমাত্র দেরী হয়নি।

একটি মজার মুহুর্ত

আমরা দুপুর প্রায় ১২ টার দিকে ফোকস্টোন এ পৌছলাম। সেখানে হুজুর গাড়ী থেকে নেমে সার্ভিস এরিয়ার দিকে গেলেন। হুজুর ধূসর বর্ণের আচকান কোট ও আফগানী টুপি পরিহিত ছিলেন। আমি লক্ষ্য করলাম হুজুর তার আইফোনে কিছু পড়ছেন এবং হাসছেন। কয়েকমিনিট পরে হুজুর আমাকে তার কাছে ডাকলেন।

হুজুর একটি কৌতুক পড়ছিলেন। তিনি সেটি আমাকে পড়ে শোনান। পাকিস্তানে এক গাড়ী চালককে সিটবেল্ট বাধার জন্য ১০০০ রুপি পুরস্কার দেয়া হল। পুরস্কার পেয়ে সে বলল “ভাল হয়েছে এখন আমি আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে নিব।” পাশে তার মা ছিল। তিনি বলে উঠলেন “ওর কথা একদম বিশ্বাস করবেন না। মাতাল অবস্থায় ও উল্টাপাল্টা কথা বলে থাকে।” পিছনের সিটে তার বাবা ঘুমাচ্ছিল। তিনি হঠাৎ উঠে পড়েন এবং বলেন “আমি আগেই বলেছিলাম চোরাই গাড়ীর জন্য আমরা ধরা পড়ে যাব।” এরমধ্যে তার ভাই যে গাড়ীর পিছনে লুকিয়ে ছিল চিৎকার করে বলল “ভাই, আমরা কি অবৈধভাবে সীমানা পার হতে পেরেছি।”

কৌতুক বলে হুজুর হাসলেন এবং বলেন এই লোক সিটবেল্ট বাধার জন্য পুরস্কার পেলেও প্রায় অন্য সকল আইনই ভঙ্গ করেছে।

ক্যালসিসে দুপুরের খাবার

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা দুপুর ১২.২০ এ ইউরোটানেল শাটেল এ উঠলাম এবং দুপুর ১.১৫ মিনিটে ক্যালসিসে পৌছালাম। সেখানে হল্যান্ডের আমীর সাহেব কিছু স্থানীয় আহমদীদের নিয়ে কাছের একটি পেট্রোল স্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হল্যান্ড জামাত সেখান থেকে হুজুরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে কাছের একটি রেস্তোরায় নিয়ে যায়। রেস্তোরাটির নাম ছিল “বাফেলো গ্রীল”।

হুজুর ও তার স্ত্রী রেস্তোরার একপাশে একটি টেবিলে বসেছিলেন। কাফেলার অন্যান্য সদস্যগণ কাছেই একটি লম্বা টেবিলে ছিলেন। আহমদ ভাই আমাকে অনুরোধ করলেন আমি যেন হুজুর ও তার স্ত্রীকে খাবার পরিবেশনে সহায়তা করি। হুজুর ও তার পরিবার কে খাবার পরিবেশন করা আমার জন্য বড়ই সৌভাগ্যের ব্যাপার ছিল। কিন্তু একই সাথে আমি কিছুটা চিন্তিত ছিলাম যে আমি যদি কোন ভুল করে ফেলি তাহলে কি হবে। তবে আশার কথা হল সেখানে হুজুর কে পরিবেশনার দ্বায়িত্বে রেস্তোরার একজন ওয়েটারও ছিল। তাই আমাকে খুব বেশি কিছু করতে হয়নি।

হুজুরের টেবিলে মাছ ও মাংসের স্টেক দুটিই দেয়া ছিল। হুজুর ও তার স্ত্রী শুধু মাছ খেলেন ও মাংসের স্টেকটি ফিরিয়ে দিলেন। কয়েক মিনিট পর আহমদ ভাই আমাকে বললেন আমি যেন হুজুরকে জিজ্ঞেস করি তাদের কিছু প্রয়োজন আছে কিনা। আমি তাকে বলি আমার জন্য ব্যাপারটি সহজ হবে যদি আমি কোন কিছু হুজুরের কাছে নিয়ে যাই এবং জিজ্ঞেস করি যে এটি হুজুরের লাগবে কিনা। আহমদ ভাই আমাকে বুদ্ধি দিলেন যে আমি কিছু টমেটো কেচআপ নিয়ে যেতে পারি।

আমি টমেটো কেচআপ নিয়ে হুজুরের টেবিলের কাছে যাই। সেখানে যেয়ে আমি বড়ই হতাশ হই কারণ টেবিলে পূর্ব থেকেই একটি বড় কেচআপের বোতল রাখা ছিল। আমি তা সত্ত্বেও হুজুরকে জিজ্ঞেস করি যে তাদের কেচআপ লাগবে কিনা। হুজুর কিছু না বলে টেবিলে রাখা কেচআপের বোতলের দিকে নির্দেশ করেন। আমি সেখানে থেকে চুপচাপ চলে আসি আর ভাবতে থাকি কেচআপ না নিয়ে আমি যদি আচার নিয়ে যেতাম তাহলেই ভাল হত।

আমার মনে হয় হুজুর আমার হতাশার কথা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি আমাকে কিছুক্ষণ পর তার টেবিলে ডাকেন এবং কিছু অতিরিক্ত পানীয় যা তার টেবিলে দেয়া হয়েছিল তা ফেরত নিয়ে যেতে বলেন।

এই ঘটনার পর আমার হতাশা কিছুটা দূর হয়। তাই শেষ দিকে আমি আবার হুজুরের কাছে যাই এবং জিজ্ঞেস করি তাদের কিছু লাগবে নাকি। হুজুর আমকে জিজ্ঞেস করেন আর কি আছে। আমি বললাম “হুজুর এখানে কফি পাওয়া যায়।” হুজুর বললেন যে কফির প্রয়োজন নেই। হুজুর আমাকে এটি জিজ্ঞেস করেছিলেন আমাকে শেখানোর জন্য যে খাবার পরিবেশনের পূর্বে কি কি খাবার রয়েছে তা জানা থাকা প্রয়োজন।

এরমধ্যে আহমদ ভাই হুজুরকে জিজ্ঞেস করেন যে হুজুর কোন মিষ্টান্ন খাবেন কিনা। হুজুর বলেন যে তিনি এক পিস চীজকেক নিতে চান। আমিও চীজকেক খেয়ে দেখি, সেটি খুবই সুস্বাদু ছিল। হুজুরের পছন্দ আসলেই অসাধারণ।

আমি আহমদ ভাই ও খাজা কুদ্দুস সাহেবের সাথে আমার খাবার খাই। খাবার সময় আহমদ ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমার কোন প্রকারের খাবার পছন্দ। আমি বললাম পূর্বে আমি স্টেক, বার্গার ইত্যাদি পছন্দ করতাম। কিন্তু যতই আমার বয়স বৃদ্ধি পাচ্ছে এশিয়ান দেশী খাবার আমার কাছে বেশী ভাল মনে হচ্ছে।

আহমদ ভাই আমার খাবারের পছন্দের ব্যাপারটা হুজুর ও তার স্ত্রীর সাথে আলাপ করে। হুজুরের স্ত্রী আমাকে কাছে ডাকেন এবং বলেন তার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি পুরোই উল্টো। যতই তার বয়স বাড়ছে ভীনদেশী খাবার তার কাছে ততই ভাল লাগছে।

রেস্তোরায় জোহর ও আসর নামায আদায়

দুপুরের খাবারের পর ম্যানেজারের কাছে থেকে অনুমতি নিয়ে রেস্তোরার দোতালায় একটি রুমে জোহর ও আসর নামায আদায় করা হয়। আমার মনে হয় এই রুম রেস্তোরার ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় খোদ্দামগণ দ্রুত চেয়ার টেবিল একপাশে সরিয়ে দেন ও জায়নামায বিছিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর হুজুর আসেন ও জোহর আসর নামায আদায় করেন।

একটি স্বস্তির বিরতি

নামাযের পরেই হল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হল। যদিও আমি রেস্তোরাতে বাথরুম করেছিলাম কিন্তু যাত্রা শুরু হবার পরপরই আমার আবার বাথরুম চাপল। তাই পরবর্তী দুই ঘন্টা আমার বড়ই অস্বস্তিতে কেটেছিল।

আল্লাহর রহমতে দুই ঘন্টা পর আমাদের কাফেলা বেলজিয়ামের একটি পেট্রোল স্টেশনে থামল। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাড়াতাড়ি কাছের বাথরুমের দিকে দৌড় দিলাম। বের হয়ে দেখি হুজুর একটি দোকানে বিভিন্ন জিনিস দেখছিলেন। হুজুর আমাকে ডাকেন এবং আমার অবস্থা জিজ্ঞেস করেন। আমি বললাম গত দুই ঘন্টা ধরে আমি একটি বাথরুম বিরতির জন্য দোয়া করছিলাম। হুজুর আমার অবস্থা দেখে হাসেন।

[চলবে…]