Menu

হুজুরের (আইঃ) হল্যান্ড ও জার্মানী সফর অক্টোবর ২০১৫ ব্যক্তিগত ডায়েরী পার্ট-১ (শেষ পর্ব)

[হুযুর (আইঃ) এর হল্যান্ড এবং জার্মানী সফরঃ আবিদ খান সাহেবের ব্যক্তিগত ডায়েরী। ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন নুরে কাওসার রিফাত সাহেব। শেষ পর্ব প্রকাশ করা হল]

লন্ডনের বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎ

হুজুরের সফরের কয়েকদিনের মধ্যেই জোনাথন বাটারওর্থ সাহেব ও তার স্প্যানিশ বউ মারিয়া সাহিবা তাদের মেয়েকে নিয়ে ছুটি কাটাতে নানপেস্ট আসেন। তারা দুজনেই সাম্প্রতিককালে আহমদীয়াত গ্রহণ করেছে। কিন্তু আমি যখন তাদের সাথে কথা বললাম আমার মনে হল তারা জন্মগতভাবেই আহমদী। তাই তাদের সাথে কথা বলার পর আমি নিজের আধ্যাত্মিক অবস্থা চিন্তা করে লজ্জিত হই। সেদিন বিকেলে হুজুর ডাচ সংসদে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তারা দুজনেই হুজুরকে গাড়িতে উঠার পূর্বে এক নজর দেখার জন্য তার বাসস্হানের পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।

আমি এই সুযোগে তাদের কাছে যাই ও তাদের সাথে কথা বলি। মারিয়া সাহিবাকে জিজ্ঞেস করি নানপেস্ট সফর কেমন হচ্ছে? তিনি বলেন “আমার মনে হচ্ছে আমি একটি ভিন্ন জগতে আছি। হল্যান্ডে এসে হুজুরের এত কাছে থাকার অনুভুতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ”
জোনাথন বলেন “যদিও আমরা লন্ডনে মসজিদ ফযলের কাছেই থাকি, কিন্তু অন্য একটি দেশে এসে হুজুরকে কাছে পাওয়ার অনুভুতি সত্যিই অসাধারণ।”

জোনাথন হুজুরের হল্যান্ড কর্ম পরিকল্পনা সম্বন্ধে জানতে চান। আমি তাকে বলি যে হুজুর ইতোমধ্যেই তিনটি সাক্ষাৎকার দিয়ে দিয়েছেন। জোনাথন বলেন “আমি লক্ষ্য করেছি হুজুর তার মতামত দেবার সময় দুই পক্ষ থেকেই তথ্য নেন এবং তাদের একত্র করে একটি সর্বোত্তম উত্তর দেন। যেমন বর্তমান শরণার্থী সমস্যা সম্বন্ধে হুজুর বলেন যে বিশ্বকে অবশ্যই শরণার্থীদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া উচিৎ। কিন্তু একই সাথে তিনি এটিও বলেন যে শরণার্থী বেশে সন্ত্রাসীরাও প্রবেশ করতে পারে। এজন্য তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।”

আমি জোনাথন সাহেবের এই বক্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ একমত। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটি বারবার লক্ষ্য করেছি যে হুজুর সবসময়ই সত্য ও ন্যায়সঙ্গত কথা বলেন। তিনি কখনো তার শ্রোতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কোন কথা বলেন না। সেদিন বিকেলে ডাচ সংসদে আমরা এই বক্তব্যের আরো একতি প্রমাণ দেখতে পাই।

মোবারক মসজিদ সফর

হুজুর, তার স্ত্রী ও কাফেলা সদস্যগণ সকাল ১১.৪৫ মিনিটে মসজিদে মোবারক, হেগ এর উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আমি ২০০৬ সালে হেগে এক মাসের একটি ইন্টার্ণশিপ করেছিলাম। এজন্য আমি মসজিদে মোবারকে আবার আসতে পেরে আনন্দিত। সেখানে আমরা জোহর আসরের নামায আদায় করি। এরপর দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয় ভেড়ার মাংস, ডাল ও ডাচ রুটি। আমি সাধারণত দুপুরে খুব বেশি খাই না। কিন্তু আমরা ঠান্ডায় বাইরে বসে ছিলাম। আর খাবার ও গরম গরম ছিল। তাই আমি মজা করেই খাবার খাই।

হুজুরের বক্তব্য সবাইকে অনুপ্রাণিত করল

দুপরের খাবারের পর আমি আয়ারল্যান্ডের একজন আহমদী বন্ধুর সাথে কথা বলি। সে আমাকে বলে “হুজুরের খুৎবা আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছে। গত সপ্তাহের খুৎবা যেখানে হুজুর বায়তুল ফুতুহ মসজিদে আগুন লাগা সম্বন্ধে বলেন সেটি কেবল স্হানীয় নয় বরং বিশ্বের সকল আহমদীদেরই অনুপ্রাণিত করেছে। আমার বউ এর গর্ভপাত করতে হয়েছে এবং আমাদের সন্তান ধারণে সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু হুজুরের কথা আমাদের স্বান্তনা দিয়েছে ও ঈমান দৃঢ় করেছে। আহমদী হিসেবে আমরা অনেক ভাগ্যবান কারণ আমাদের উপর খলীফার আশীর্বাদ রয়েছে। আমাদের জীবনের সকল পদক্ষেপেই তিনি আমাদের সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবেন।”

বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে সাক্ষাৎ

ডাচ সংসদে হুজুরের বক্তব্য শোনার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে সম্মানিত অতিথি ও রাজনীতিবিদ এসেছেন। যেমন আলবেনিয়া, ক্রোয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড, স্পেন ও সুইডেন। দুপুরের খাবার এর পর কয়েকজন মসজিদে মোবারকে হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এদের মধ্যে কয়েকজন অন্যান্য অনুষ্ঠানে হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। অন্যান্যদের জন্য হুজুরের সাথে এটিই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ। হুজুর সকলকেই তাদের দেশ থেকে কষ্ট করে আসার জন্য ধন্যবাদ জানান। কয়েকজন অতিথি এই সুযোগে হুজুরকে প্রশ্ন করেন।

সেখানে এক নাইজেরিয়ান পুরোহিত ছিলেন যিনি সুইডেনে থাকেন। তিনি ২০১২ সালে ইউরোপিয়ান সংসদে হুজুরের বক্তব্য শুনেছিলেন। তিনি বলেন যে তার ইচ্ছা হুজুর যেন সুইজারল্যান্ড সফর করেন। হুজুর বলেন “আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ। আমি আশা করি আল্লাহর রহমতে আমি ভবিষ্যতে সেখানে যেতে পারব।” মন্টিনিগ্রো থেকে একজন এমপি বলেন “পুরো বিশ্ব এখন একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই আপনি শান্তির যে বার্তা প্রচার করে চলেছেন সেটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। আমার দেশ অনেক ছোট, তাই আমি আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাতে পারছি না। কিন্তু আমি আশা করি ভবিষ্যতে আপনি আমাদের দেশে সফর করবেন।”

হয়ত তিনি ভেবেছিলেন বিশ্বের অন্যান্য নেতাদের মতো হুজুরের অনেক রাজকীয় আতিথেয়তা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের হুজুর খুবই সাদামাটাভাবে চলাফেরা করে এবং আমাদের জামাত কখনো কোন সরকার বা সংস্হার কাছে থেকে কোন আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করে না।এমপির বক্তব্য শুনে হুজুর অত্যন্ত সুন্দর উত্তর দেন। তিনি বলেন “আমি একজন সাধারণ ব্যাক্তি। তাই এটিও হতে পারে যে আমি কোন আমন্ত্রণ ছাড়াই চলে আসলাম। আপনার দেশ ছোট নাকি বড় সেটি কোন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল উদার মানসিকতা ও একে অন্যের প্রতি ভালবাসা থাকা। আহমদীয়া মুসলিম জামাতও সংখ্যায় অনেক ছোট। কিন্তু আমরা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছি।”

স্প্যানিশ একজন রাজনিতীবিদ মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসবাদের উথান সম্বন্ধে প্রশ্ন করেন। হুজুর বলেন “সন্ত্রাসী দলগুলোকে অবশ্যই কেউ রসদ ও আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে তাদের। এটি বন্ধ করতে হবে।” এটি শুনে একজন আইরিশ রাজনিতীবিদ ইএমন ও কুইভ বলেন “আমার মনে হয় একমাত্র যারা অস্ত্র তৈরী করতে পারে কেবল তারাই যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে।” হুজুর তাকে জিজ্ঞেস করেন “বড় বড় দেশ যেমন রাশিয়া, ইরান তাদের উপর সফলভাবে অবরোধ আরোপ করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু একটি ছোট ও অসংগঠিত সন্ত্রাসী দলের অর্থায়ন বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর কারন কি?” আইরিশ রাজনিতীবিদ বলেন “এটি একটি অত্যন্ত চমৎকার ও যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন।”

এই আলোচনার সময় হুজুরকে জানানো হয় যে সুইডিশ সরকার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্হায়ী সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা বাতিলের দাবিতে প্রচারণা শুরু করেছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে হুজুর এই ভেটো সম্বন্ধে বলে এসেছেন যে এটি একটি অন্যায় নিয়ম যা নিরাপত্তা পরিষদের স্হায়ী সদস্যদের সাধারণ সদস্যদের থেকে বেশি প্রভাব ও শক্তি দিয়ে থাকে। হুজুর বলেন “এরকম ব্যাপারে সুইডেনকে সবসময় প্রথম ভূমিকা নিতে দেখা যায়। যেমন ফিলিস্তিনকে প্রথম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার একটি অন্যতম দেশ হল সুইডেন। ”

একজন স্প্যানিশ রাজনিতীবিদ বলেন “প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) বিশ্বের বর্তমান পরিস্হিতি সম্বন্ধে কোন ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন কি।” হুজুর বলেন “প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) বলেছিলেন যে এক বিশৃঙ্খল ও অরাজকতার সময় আসবে যখন এক দেশ অন্য দেশের বিরোধিতা করবে, জনগণ সরকারের বিরোধিতা করবে, সরকার জনগণের বিরোধিতা করবে। এ সকল অরাজকতার কেন্দ্রবিন্দু হবে সিরিয়া।” “তাই বর্তমান বিশ্বের অরাজক পরিস্থিতি দেখে আমার ধর্মের প্রতি আমার ঈমান আরো দৃঢ় হয়েছে। আমরা তাই অরাজক অবস্হা সৃষ্টি করিনি কিন্তু আমরা দেখছি যে আশেপাশে কি ঘটছে।”

হুজুরের নম্রতা ও ধৈর্য্য

সাক্ষাতের পর হুজুর সকল রাজনিতিবিদ রুম থেকে বের হবার পর নিজে বের হলেন। কারণ হুজুর জানতেন যে তারা এখন ডাচ সংসদে যাবেন। হুজুর আগে বের হলে তাদের কয়েক মুহুর্ত বিলম্ব হতে পারত। তাই হুজুর সবার পরে বের হবার সিদ্ধান্ত নেন। এটি হুজুরের বিনয় এর আর একটি উদাহরণ। তার কখনো কোন বিশেষ প্রোটোকল প্রয়োজন নেই। সকল অতিথিরাও বের হবার সময় হুজুরের সাথে দেখা করে বের হন।

একটি ব্যক্তিগত মতামত

হুজুর এরপর কিছু সময়ের জন্য তার রুমে গেলেন। আমরা সবাই বাইরে হুজুরের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমরা সবাই হুজুরের ডাচ সংসদের অধিবেশন সফল হবার জন্য দোয়া করছিলাম। আমি কিছুটা নার্ভাসবোধ করছিলাম। আমি জানি হল্যান্ড সংসদে হুজুরের বক্তৃতা আমাদের জামাত ও হল্যান্ডের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ। কিন্তু আমি কিছুটা ভীত ছিলাম যে আল্লাহ না করুক খারাপ কিছু যদি ঘটে যায়।

এই ডাচ সংসদেই এমপি গ্রিট ওয়াইল্ডার কয়েক বছর ধরে ইসলাম ও মহানবী মোহাম্মদ (সাঃ) এর নামে কুরুচিমূলক বক্তব্য দিয়েছিল। সেই সময় হুজুর গ্রিট ওয়াইল্ডার এর বক্তব্যের প্রতিবাদে ১৪ অক্টোবর ২০১১ সালে খুৎবায় বলেছিলেন“মনোযোগ দিয়ে শুন, তুমি, তোমার দল এবং তোমার মতো যত মানুষ রয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু ইসলাম ধর্ম এবং মহানবী মোহাম্মদ (সাঃ) এর শান্তির বাণী চিরদিন বেঁচে থাকবে। বিশ্বে কোন শক্তি, সেটি যত শক্তিশালী ই হোক না কেন, ইসলামকে তারা যতই ঘৃণা করুক না কেন, তারা কখনোই ইসলাম ধর্মকে ধ্বংস করতে পারবে না। আমাদের কোন জাগতিক ক্ষমতা নেই এবং আমরা কখনো সেটা প্রয়োগও করব না। কিন্তু সেই পবিত্র হৃদয় যাদেরকে ইসলাম বিরোধীরা কষ্ট দিয়েছে, তাদের দোয়ার এমন শক্তি রয়েছে যা আকাশকেও কাপিয়ে দিতে পারে। ইসলামকে যারা ধ্বংস করতে চায় তারা এসকল পবিত্র আত্মার দোয়ার মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যাবে।”

পরবর্তীতে গ্রিট ওয়াইল্ডার হুজুরের এই বক্তব্য শোনার পর ডাচ মন্ত্রীকে লিখিতভাবে হুজুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানায়। তিনি বলেন যে হুজুর নাকি সংঘাতের ডাক দিয়েছেন। তাই এজন্য মন্ত্রী সাহেব আহমদী জামাতের বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ডাচ মন্ত্রী বলেন “হযরত মির্যা মাশরুর আহমেদ বলেছে যে এরকম মানুষ ও দল কোন হামলার মাধ্যমে নয় বরং দোয়ার মাধ্যমে ধ্বংস হবে। এই বক্তব্যে আমি এমন কিছু দেখি না যা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করতে পারে। তাই আহমদী মুসলিম জামাতের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেবার প্রয়োজন নেই।”

আমি যখন এই ঘটনা চিন্তা করছিলাম তখন আমি ভাবলাম যে আল্লাহ তাআলা কিভাবে জামাত ও খলীফার সম্মান রক্ষা করেছিলেন। তাই আমি বুঝলাম যে যাই হোক না কেন এবারও মহান আল্লাহ তাআলা আহমদীয়া জামাত ও আমাদের খলীফার সম্মান রক্ষা করবেন। আলহামদুলিল্লাহ।

সামান্য বিলম্ব

হেগ শহরে আমাদের মসজিদ শহরের কেন্দ্রেই অবস্হিত। তাই সংসদ ভবন নিকটেই রয়েছে। শহরটি খুবই আকর্ষণীয়। এটি সবুজ গাছপালা, ফুল ও পানির ফোয়ারা দিয়ে সাজানো। প্রধান সড়কের পাশে সাইকেলের রাস্তা রয়েছে। আমরা যখন সংসদ ভবনে পৌছলাম তখন গেটে কিছুটা দেরী হচ্ছিল। কারণ নিরাপত্তা কর্মী তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে থেকে কাফেলার গাড়ীর ছাড়পত্র চেক করছিল। এসময় নাসির আমিনী সাহেব ও হুমায়ুন সাহেব বিতর্ক শুরু করলেন। তাদের তর্কের বিষয় হল নিরাপত্তা কর্মীর উচ্চতা নিয়ে। আমি ও মুনীর জাভেদ সাহেবও এই আলোচনায় অংশ নিলাম। আমরা কেউই তার উচ্চতা সম্বন্ধে একমত হতে পারছিলাম না। কিন্তু আমরা একটা বিষয়ে একমত ছিলাম যে তার উচ্চতা ৬ ফুট ২ইঞ্চি থেকে ৭ ফুট এর মধ্যে হবে। সেই গুরুত্বপূর্ণ সময় এই আমরা কিভাবে একটি তুচ্ছ জিনিস নিয়ে বিতর্ক করার সময় পেলাম সেটি ভেবে আমি এখন অবাক হই।

ডাচ সংসদে হুজুরের সফর

হুজুর সংসদে প্রবেশের পর ভ্যান বোমেল হুজুরকে অভ্যর্থনা জানান। ভ্যান বোমেল একজন ডাচ সংসদ সদস্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্হায়ী কমিটির সদস্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কমিটির একটি দল হুজুরকে সেদিন ডাচ সংসদে বক্তব্য দেবার জন্য আমন্ত্রন জানিয়েছিল। হুজুরকে তারা একটি বড় হল রুমে নিয়ে যায়। হুজুর একটি বড় টেবিলের মাঝে বসলেন। তার ডান পাশে ছিলেন ডাচ কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং বাম পাশে ছিলেন হল্যান্ড জামাতের আমীর সাহেব ও নায়েব আমীর সাহেব। হ্যারি ভ্যান বোমেল উদ্ভোধনী বক্তৃতা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। তিনি হুজুরকে ডাচ সংসদে স্বাগত জানান এবং বলেন যে বিশ্বের বিভিন্ন স্হান থেকে রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছেন।

হুজুরের বক্তব্য

হ্যারি ভ্যান বোমেল এরপর হুজুরকে তার বক্তব্য প্রদানের জন্য অনুরোধ করেন। হজুর সাধারণত দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেন। কিন্তু সেদিন তিনি নিজ স্হানে বসে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। কারণ ডাচ কমিটীর রীতি হল তারা সকল বক্তব্য বসে দেয়াই পছন্দ করে। হুজুর সবসময়ই অন্যান্যদের রীতি নীতিকে সম্মান প্রদর্শন করার চেষ্টা করেন এবং এটি তারই একটি সামান্য উদাহরণ। অনুষ্ঠান চলাকালে হুজুরের নিরাপত্তা কর্মীগণও বসেই ছিলেন। এটি আমাদের সেদিন অবাক করছিল। কারণ আমরা সবসময় তাদের দাড়িয়ে থাকা দেখতেই অভ্যস্ত।

বক্তব্যে হুজুর ইসলামের শান্তিপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরেন এবং যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে কোরআন কখনোই সন্ত্রাসবাদের অনুমতি দেয় না। হুজুর বলেন “বর্তমানে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন সমস্যাকে বিশ্বের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছে। যেমন আবহাওয়া পরিবর্তন, বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্হা ইত্যাদি। কিন্তু আমরা যদি বস্তুনিষ্ঠভাবে চিন্তা করি তাহলে নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে যে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হল বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা। দিন দিন আমাদের পৃথিবী আরও বেশি অস্হির ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।”

হুজুর এরপর বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তায় বিভিন্ন দেশসমূহের সম্পর্ক কিভাবে উন্নতি করা যায় সে সম্বন্ধে বলেন। হুজুর বলেন কিভাবে কিছু নামধারী ইসলামী দল নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কোরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখা দিয়ে সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি করছে। এ সম্বন্ধে হুজুর বলেন “আমরা আহমদী মুসলমান, এসকল দলের মধ্যে নই যারা পুরো বিশ্বে অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করে চলেছে। বরং আমরা সবসময় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা পুরো মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হল সকল শত্রুতা ও ঘৃণাকে বন্ধুত্ব ও ভালবাসায় রূপান্তরিত করা।”

“একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে আমি বলতে চাই একে অন্যকে দোষারোপ না করে আমাদের উচিৎ হবে স্হায়ী বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করা। কোরআন আমাদের শিক্ষা দেয় যে পরিস্হিতি যাই হোক না কেন আমাদের সবসময় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা উচিৎ। তাই যেকোন সংঘাতের পূর্বে বা পরে সকল পক্ষকেই সততা ও ন্যায়বিচারের সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে আমরা এরকম সততা ও ন্যায়বিচার দেখতে পাই না। বরং দেখা যায় একটি যুদ্ধের পর পরাজিত দেশের উপর অন্যায় অবরোধ আরোপ করা হয়। এতে পরাজিত দেশের উন্নতির আর কোন পথ খোলা থাকে না। ফলে তাদেরকে সত্যিকারের স্বাধীনতা থেকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়।” “বিশ্ব শান্তির জন্য পরাশক্তিদের একে অন্যকে সম্মান করতে হবে এবং একসাথে কাজ করতে হবে। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য দুর্বল দেশকে শোষণ না করে উন্নত দেশের উচিৎ অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশকে প্রকৃতভাবে সাহায্য করা।”

“যদি এরকম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নীতিমালা তৈরী করা হয় তাহলে এটি বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু যদি বর্তমান অবিচার ও শোষন চলতে দেয়া হয় তাহলে এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ একটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ লেগে যেতে পারে যার দুর্ভোগ আমাদের পরবর্তী কয়েক প্রজন্মকেবহন করতে হবে।”

আলহামদুলিল্লা্হ হুজুরের বক্তব্য সত্যিকারের ইসলামকে সবার সামনে তুলে ধরেছে।

প্রশ্নোত্তর পর্ব

বক্তব্যের পর কমিটির সদস্যগণ হুজুরকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। আমি যতদূর জানি এসকল প্রশ্ন হুজুরের বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু দুই জন রাজনীতিবিদ হুজুরকে বাক্ স্বাধীনতার ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। বিভিন্ন আহমদী আমাকে পরে জানান যে দুজন রাজনীতিবিদদের প্রশ্ন করার ধরণ তাদের কাছে ঠিক মনে হয়নি। আমাকেও স্বীকার করতে হবে যে তাদের কথা বলার ধরণে আমিও হতাশ হয়েছি। অনেক অ-আহমদী অতিথিও তাদের এই আচরণকে সমর্থন করেননি।

সমস্যা তাদের প্রশ্ন নিয়ে নয়। বাক্ স্বাধীনতার ব্যাপারটি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্ক চলছে। সমস্যা হল হুজুর যখন এর উত্তরে ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী পরিস্কার ও ব্যাখামূলক উত্তর দিচ্ছিলেন তখন তারা আবার একই প্রশ্ন করছিল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল যে তারা মনে করেছিল বারবার হুজুরকে এভাবে চাপ প্রয়োগের ফলে হুজুর এমন কিছু বলবেন যেটা তাদের মতে সাথে মিলে যায় এবং ইসলামের বিপক্ষে যায়।

যদি তারা তাদের এই পদ্ধতি অন্য কোন নেতার উপর প্রয়োগ করত তাহলে হয়ত তাদের এই পন্থা কাজ করত। কিন্তু এই পন্থা তারা প্রয়োগ করেছে খলীফাতুল মসীহ (আইঃ) এর উপর। যাকে আল্লাহ তাআলা পথ প্রদর্শন করেন। তাই তাদের বারবার চেষ্টা সত্ত্বেও হুজুর একই কথা বলেন “যদিও বাক স্বাধীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক অধিকার কিন্তু এটিরও একটি সীমা থাকা প্রয়োজন।”

“সমাজের বৃহত্তর কল্যণের জন্য, শান্তি ও একতা বজায় রাখার জন্য মাঝে মধ্যে কিছু ত্যাগ স্বীকার করা ও সীমার মথ্যে থাকা প্রয়োজন।”
হুজুর বারবার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক মূল্যবোধে মেনে চলার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
“বাক-স্বাধীনতার নামে কারো নামে এমন কিছু বলা উচিৎ নয় যা শুনলে কেউ কষ্ট পেতে পারে। এটি হল সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলাকে অভ্যর্থনা জানানো। ” “সংসদ বিভিন্ন আইনকে সংশোধন করে এবং নতুন নতুন আইনও সৃষ্টি করে। এটি প্রমাণ করে যে মানব সৃষ্ট আইন কখনো নিখুঁত হতে পারে না। ”

কিন্তু এত কিছুর পরও সেই রাজনীতিবিদ তাদের মতাদর্শন হুজুরের মধ্যে চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করতে থাকে। পরিশেষে হুজুর বলেন “পশ্চিমা বিশ্ব যে দাবি করে যে তারা পূর্ণ বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। এটি আসলে তাদের একটি কপটতা মাত্র। পশ্চিমা বিশ্বে ইহুদীদের মনে কষ্ট দিতে পারে এমন কোন বক্তব্য দেয়ার নিয়ম নেই। যেমন হলোকাস্ট কে অস্বীকার করার জন্য কাউকে শাস্তি দেয়া হতে পারে। তাই এটি দাবি করা ভুল যে বাক স্বাধীনতা সর্বক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হচ্ছে।” এটি শোনার পর তারা চুপ হয়ে যায়।

অধিবেশন শেষ হবার পর আমি এখানে উপস্হিত থাকতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করলাম। আহমদীগণ অনেক ভাগ্যবান কারণ তাদের খিলাফত রয়েছে। খলীফা ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই এভাবে ইসলামকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।আলহামদুলিল্লাহ্।
হুজুর সবসময়ই শান্ত ছিলেন। তার কথা মানুষের হৃদয়ের গভীরে বিশ্বাস স্হাপন করত। তার বক্তব্য ইসলামের সত্যতা ও সম্মান প্রতিষ্ঠিত করে।

আর একটি মজার ব্যাপার হল যখনই ক্যামেরা বন্ধ করা হল তখনই যেসব রাজনীতিবিদ হুজুরের সাথে কিছুটা শত্রুতাপূর্ণ আচরণ করছিল, তারা হঠাতই হুজুরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠল । তারা হুজুরকে বক্তব্য দেবার জন্য ও তাদের প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য ধন্যবাদ জানালো।

হুজুর পরবর্তীতে আমাকে বলেন যে তাদের মধ্যে একজন রাজনীতিবিদ হুজুরের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন যদি তার কোন প্রশ্ন হুজুরের কাছে উপযুক্ত বলে মনে না হয়। আমাদের খলীফা বিনয়ের সাথে বলেন যে এতে তিনি কিছুই মনে করেন নি।

হুজুরের বক্তব্যের প্রভাব

অধিবেশনের পরে আমি কিছু অতিথির সাথে কথা বলার সুযোগ পাই। হুজুর যেভাবে ইসলামকে তুলে ধরেছে এতে তারা হুজুরের অত্যন্ত প্রশংসা করেন। ধর্মীয় শিক্ষক প্রফেসর এরিক ডি জং বলেন “তোমাদের খলীফা হলেন ইসলামের প্রতীক। এই ডাচ সংসদে তাকেই প্রয়োজন ছিল। আমি এখানে আসতে পেরে অনেক আনন্দিত।”

একজন অতিথি ছিলেন ক্রোয়েশিয়ান এমপি। তিনি একটি ব্যাপার অনেক পছন্দ করেন। সেটি হল হুজুর তার বক্তব্যে কোরআন থেকে অনেক আয়াত তুলে ধরেছেন। এটি তার কাছে সঠিক ইসলাম তুলে ধরার জন্য সর্বোত্তম পন্থা বলে মনে হয়েছে।

সুইজারল্যান্ডের একজন ধর্মযাজক বলেন “যখন আমি খলীফা মাশরুরকে দেখি ও তার কথা শুনি তখন আমার নিজেকে এই পৃথিবীর জন্য আশাবাদী মনে হয়।” তিনি সেই দুজন রাজনীতিবিদদের একই প্রশ্ন করার ব্যাপরটি পছন্দ করেন নি। তিনি বলেন “আমার মনে হয় তারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গী খলীফার উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছিল। তারা চাচ্ছিল তিনি ইসলামের বিপক্ষে কিছু বলুক। কিন্তু তিনি তাদের ফাঁদে পা দেন নি এবং ইসলামের শিক্ষার উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।” একজন বিখ্যাত মুসলিম শিক্ষক প্রফেসর ইয়াসির লতীফ বলেন “প্রশ্নোত্তর পর্বে খলীফা যেভাবে উত্তর দিয়েছেন আমি তাতে আভিভূত হয়েছি। তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে উত্তর দিয়েছেন। তিনি সবসময় শান্ত ছিলেন ও কোনরকম বিরক্তভাব প্রকাশ করেন নি। ”

একজন ভারতীয় সাংবাদিক সুলতান শাহীন বলেন যে তিনি পুরো বক্তৃতা প্রকাশ করতে চান। তিনি বলেন “প্রশ্নোত্তর পর্বে আমি লক্ষ্য করি যে তিনি লজ্জিত নন। বরং তিনি ইসলামের অনুসারী হয়ে গর্বিত। একজন মুসলমান হিসেবে আমি এটির প্রশংসা করি। তিনি বাক-স্বাধীনতার ব্যাপারে পশ্চিমা বিশ্বের ইহুদী ও হলোকাস্টের কথা উল্লেখ করে তাদের দ্বিমুখী নীতির ব্যাপারটি তুলে ধরেছেন। এটি অত্যন্ত সাহসী বক্তব্য ছিল।”

আমি একজন ডাচ স্হপতি মাইকেল এর সাথে কথা বলি। প্রশ্নোত্তর পর্বে ডাচ রাজনীতিবিদদের আচরণ তাকে অনেকটাই হতাশ করেছে। তিনি বলেন “তোমাদের খলীফা অনেক সম্মানিত ও জ্ঞাণী ব্যক্তি। কিন্তু আমি আমার দেশের রাজনীতিবিদদের আচরণে অনেক লজ্জিত। খলীফার কাছে থেকে জ্ঞানের কথা শোনাই তাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ ছিল। তাদের উচিৎ ছিল খলীফাকে আরো সম্মান প্রদর্শন করা। তারা জানত যে এই আলোচনা পুরো বিশ্ব দেখছে। তাই আমার মনে হয় তারা এটাকে নিজেদের প্রচারের জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিল।” আমি একজন ডাচ অতিথি জনাব লুইপার্ট এর সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “আমার কাছে খলীফার বক্তব্য অসাধারাণ মনে হয়েছে। সেটি প্রজ্ঞা দ্বারা পূর্ণ ছিল। যেটি আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছে তা হল আপনাদের খলীফা কেবল আজকের কথাই নয় বরং ভবিষ্যতের কথাও চিন্তা করছেন। ”

একজন ডাচ মহিলা বলেন “মিডিয়ার অপপ্রচারের কারণে আমার ইসলাম সম্বন্ধে অনেক ভুল ধারণা ছিল। কিন্তু আজকে আমার ধ্যান ধারণা পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। আমি আজকে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলাম ইসলাম আসলে শান্তির ধর্ম কারণ খলীফা কোরআন থেকে আয়াত উদ্ধৃত করে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় তিনি প্রকৃত ইসলাম প্রচার করছেন, নিজের ব্যক্তিগত ধ্যান ধারণা নয়। ”

অতিথিদের সাথে হুজুরের মোলাকাত

অধিবেশনের পরে হুজুর, তার স্ত্রী ও কাফেলা সদস্যগণ গাড়ীতে করে একটি বিশাল বিল্ডিং এ যান। সেটির নাম হল নিউস্প্রুট। এখানে ডাচ রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও বিভিন্ন দল সংবাদ সম্মেলন ও সভা করে থাকে। সেদিনের সূচি অনুযায়ী হুজুর সেখানে বিভিন্ন সম্মানিত অতিথিদের সাথে সাক্ষাত করবেন এবং পরে রাতের খাবার পরিবেশন করা হবে। পরবর্তী ৪৫ মিনিটে হুজুর বিভিন্ন সম্মানিত অতিথিদের সাথে সাক্ষাত করেন। যাদের মধ্যে ছিলেন হল্যান্ডের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, স্প্যানিশ রাষ্ট্রদূত, লন্ডনের একজন পুলিশ চীফ প্রমুখ।

আরনর্ড ভ্যান ডর্ণ এর সাথে সাক্ষাত

হুজুরের সাথে আরনর্ড ভ্যান ডর্ণ নামে একজন ডাচ রাজনীতিবিদ সাক্ষাত করতে আসেন। তিনি পিভিভি দলের একজন সাবেক সদস্য এবং একটি ইসলাম বিরোধী দলের নেতা গ্রিট উইল্ডারের সাবেক উপদেষ্টা। কিন্তু তিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হল্যান্ডে মুসলমানদের প্রথম রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তাই হুজুরের সাথে সক্ষাতের সময় তিনি রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য দিক নির্দেশনা চান।
হুজুর বলেন “আপনি যেহেতু ইসলামিক দল গঠন করেছেন। তাই যেকোন বিষয়ের জন্য কোরআন থেকে দিক নির্দেশনা গ্রহণ করুন। যদিও কোরআন একটি ধর্মীয় গ্রন্থ, কিন্তু এতে সকল বিষয়ের কাজের জন্য দিক নির্দেশনা রয়েছে। আপনাকে হযরত মোহাম্মদ(সাঃ) এর সত্য চরিত্র সম্বন্ধেও জানতে হবে। যখন কোন মুসলমানের সাথে পরিচয় হবে তখন তাকে মোল্লাদের অন্ধ অনুসরণ না করে, কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী চলার জন্য উৎসাহিত করবে। আহমদীয়া মুসলিম জামাত কোরআনের যে অনুবাদ করেছে সেটিও আপনার পড়া উচিৎ।”

তিনি হুজুরকে তার উপদেশের জন্য ধন্যবাদ জানান। রাতের খাবারের সময় আমি তার পাশেই বসেছিলাম এবং তার সাথে ইসলাম নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেন “আমি যখন পিভিভি দলে ছিলাম তখন অন্ধের মতো ইসলাম বিরোধী প্রচারণা চালাতাম। আমি তখন ভাবতাম ইসলাম একটি বর্বর ও নারীবিদ্বেষী ধর্ম। আমি কোরআন ও অন্যান্য ইসলামী বই পড়ার সিদ্ধান্ত নেই, যেন ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারের জন্য আমি আরো অনেক কিছু জানতে পারি। কিন্তু আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। কারণ ইসলাম সম্বন্ধে আমাকে যা বলা হয়েছিল আর কোরআনে যা লেখা আছে তাতে কোন মিলই নেই। তাই আমি গোপনে ইসলাম ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাই এবং ১৮ মাস পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেই। কিছু নন আহমদী মুসলমান আমাকে হুজুরের সাথে দেখা করতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু আমি তাদের কথা শুনিনি এবং এজন্য আমি কৃতজ্ঞ।”

নানপেস্টে ফিরে যাওয়া

অতিথিদের সাথে সাক্ষাতের পর রাতের খাবার পরিবেশন করা হয়। এরপর হুজুর মোবারক মসজিদে যান। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করা হয়। এরপর আমরা নানপেষ্টের উদ্দেশ্য রওনা দেই। এটি জামাতের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও বরকতমময় দিন ছিল।

সিঁড়ির কাছে কিছু মুহুর্ত

হল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে ফযরের নামাযের পর আমরা দরস শুনতাম। কিন্তু পরদিন সকালে নামাযের পরে হুজুর যখন বের হয়ে গেলেন আমিও তার পেছনে রওনা দিলাম। এটি আমার জন্য ভাগ্যবান বলে প্রমাণিত হল। কারণ হুজুর তার বাসায় যাবার পথে আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং বললেন সিড়ির নিচে আমি যেখানে থাকি সেখানে হুজুরের সাথে দেখা করতে।

আমি আমার কক্ষে ফিরে যাই এবং কিছু সময় পর হুজুর সেখানে আসেন। সিড়ির নিচে একটি ছোট দরজা রয়েছে। হুজুর একপাশে দাড়ালেন ও আমি অন্য পাশে। কয়েক মিনিট ধরে আমরা সংসদের অধিবেশনের কথা আলোচনা করলাম। হুজুর হ্যারি ভ্যান বোমেল যিনি এই অধিবেশন আয়োজন করেছেন তার সম্বন্ধে বলেন যে তিনি আহমদীয়া জামাতকে অনেক সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন। আমরা এই সফরে হুজুরের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকার নিয়েও কথা বলি।

আল্লাহর রহমতে এই সফরে আমি অনেকবার হুজুরের সান্নিধ্যে থাকতে পেরেছি। এই কয়েকটি মুহুর্তও আমি অনেক আনন্দের সাথে মনে রাখব। এটি আমার খলীফার সাথে কাটানো একটি অনন্য সময়।

ডি স্টেনটর এর সাথে সাক্ষাৎকার

৭ অক্টোবর বুধবার সকালে হুজুর ডাচ সংবাদপত্র ডি স্টেনটর কে সাক্ষাৎকার দেন। সাংবাদিক বলেন “মিডিয়াতে সবসময় ইসলামকে দুর্নাম করে এমন সংবাদকে ফলাও করে প্রচার করা হয়। কিন্তু আহমদীয়া মুসলিম জামাতের যে শান্তির বাণী প্রচার করছে সেটি সেভাবে প্রচারিত হয় না। এতে আপনি হতাশ হয়ে যান কি না।” হুজুর বলেন “আমি এতে হতাশ হয়ে যাইনা। কিন্তু এর ফলে আমি আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়ার প্রতি আরো মনোনিবেশ করি। তাই হতাশার পরিবর্তে আমরা আমাদের প্রভুর আরো নিকটে চলে যাই এবং মানুষকে সাহায্য করার ইচ্ছা বৃদ্ধি পায়। অবশ্যই আল্লাহ তাআলা তার সৃষ্টিকে ভালবাসেন।”

সাংবাদিক বলেন যে সন্ত্রাসী দলগুলো তো বলছে তারা কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। হুজুর বলেন “এটি পরিষ্কার ব্যাপার যে তারা হঠাৎ করে কোরআনের আয়াতের একটি অংশ নিয়ে আসে এবং অপব্যাখ্যা করে সাধারণ জনগণদের ভুল পথে পরিচালিত করছে। বাইবেলেও এমন অনেক আয়াত আছে যদি সেগুলো অপ্রাসঙ্গিকভাবে নেয়া হয় তাহলে তা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করবে। তাই সকল ধর্মগ্রন্থকেই ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে। যদি আমরা মোহাম্মদ(সাঃ) এর জীবনের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে আমরা কোরআনের শিক্ষার সঠিক চিত্র পেতে পারি। তিনি সারা জীবন অমানুষিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন কিন্তু কখনো প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেননি। পরিশেষে যখন তাকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হল সেটা কেবলমাত্র নিজেদের রক্ষার জন্য দেয়া হয়েছিল। কেবল ইসলাম নয় বরং সকল ধর্ম ও সকল ধর্মীয় স্হান কে রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য ছিল। ” সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেন “আপনি কি মনে করে ইসলাম বিরোধী ও নন আহমদী মুসলামানেরা আপনাকে আক্রমনে করতে পারে। এতে কি আপনি কখনো ভীত হয়ে পড়েন।” হুজুর বলেন “আমি যদি ভীত হয়ে পড়ি তাহলে কিভাবে আমার দ্বায়িত্ব সম্পন্ন করব। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য স্হানে আহমদীদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে। কিন্তু এতে আমাদের উদ্দেশ্য বিফল হবে না, সেটা হল বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ইসলামের প্রকৃত বাণী পৌছিয়ে দেয়া। আহমদী মুসলমান হল সেসকল যোদ্ধা যারা শান্তির জন্য যুদ্ধ করছে। কিন্তু কোন তলোয়ার বা সন্ত্রাসবাদ আমাদের অস্ত্র নয়। আমাদের একমাত্র অস্ত্র হল দোয়া।”

কিছু স্হানীয় আহমদীদের সাথে সাক্ষাৎ

সাংবাদিকের সাথে সাক্ষাতের পর হুজুর স্হানীয় আহমদীদের সাথে মোলাকাত করেন। এই সুযোগে আমিও তাদের কারো কারো সাথে কথা বলি।
একজন আহমদী মহিলা মিসেস শামীম মাযহার তার স্বামী ও সন্তানের সাথে এসেছিলেন। তিনি বলেন“আমার একটি সন্তানের কিছুটা সমস্যা রয়েছে। তাই তাকে দেখে হুজুর অত্যন্ত ভালবাসার সাথে তার স্বাস্হ্যের খোজ খবর নেন ও বিশেষভাবে তার জন্য দোয়া করেন। আমার মনে হচ্ছে আমি মেঘের উপরে ভাসছি। আমি আমার আনন্দকে প্রকাশ করতে পারছি না। আজকে আমি আমার পরিবারের সকলকে বলব যে আমি যুগের খলীফার সাথে দেখা করেছি, এবং এর সাথে কোন কিছুরই তুলনা হয় না। ”

আমি এজন আহমদী খাদেম আতাউল মুনিম(৩২ বছর) ও তার স্ত্রী মালিহা হান্নান এর সাথে কথা বলি। আতাউল মুনিম বলেন “আজকে হুজুরের সাথে দেখা করব, এটা চিন্তা করে আমি গতরাতে ঘুমাতেই পারিনি। তার সাথে সাক্ষাৎ করে আমি যে প্রশান্তি ও আনন্দ লাভ করেছি সেটি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মোলাকাতের সময় হুজুর আমার জন্য দোয়া করেন যে “আল্লাহ আপনার উপর আশির্বাদ করুন।” এই শব্দগুলো সারা জীবন আমার সাথে থাকবে এবং আমাকে ও আমার সন্তানকে রক্ষা করবে ইনশাল্লাহ।”
তার স্ত্রী বলেন “রাবওয়াতে থাকার সময় আমি চিন্তা করতাম যে আমার মতো একজনের কি হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য হবে। আমি সারাজীবন এই মুহুর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ”

একটি আবেগময় সভা

আমি মীর নাঈম উর রশীদ (৪৪ বছর) সাহেবের সাথে দেখা করি। তিনি তার সন্তানদের নিয়ে এসেছিলেন। তাদের দেখেই আমার মন খারাপ হয়ে যায় কারণ তাদের মধ্যে দুজন অসুস্হ ছিল। তিনি আমাকে বলেন “আমরা কিছুদিন হল হল্যান্ডে এসেছি। এর পূর্বে কয়েক বছর থাইল্যান্ডে অসহায়ভাবে জীবন যাপন করেছি। সেখান থেকে আমরা হল্যান্ডে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছিলাম। ”

তার নয় বছরের মেয়ে জাইনা শারীরিক ভাবে অসুস্হ। সে তার বয়সের তুলনায় অনেক ছোট। কিন্তু মানসিকভাবে সে অনেক চালাক এবং অনেক মিষ্টি করে কথা বলে। হুজুরের সাথে দেখা হবার পর সে বলে “আমি অনেক ভাগ্যবান কারণ আমি হুজুরের সাথে দেখা করেছি। হুজুর অনেক দয়ালু কারণ তিনি আমাকে চকোলেট ও কলম দিয়েছেন। আমি অনেক আনন্দিত।”
তার এক ছোট ভাই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্হ।মীর নাঈম সাহেব বলেন “থাইল্যান্ডে থাকার সময় এই ছেলেটি সুইমিং পুল এ পড়ে যায় এবং প্রায় ডুবে গিয়েছিল। অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা বলেন যে সে আর বাচবে না। কিন্তু আমি লন্ডনে ফোন করে হুজুরকে দোয়ার অনুরোধ জানাই। তারপর আমার ছেলে অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠে। এতে চিকিৎসকগণ বিস্মিত হয়ে উঠেন। হুজুর এরপর তার সন্তানের অবস্হা নিয়মিত হুজুরকে জানানোর নির্দেশ দেন। হুজুর অনেক ব্যস্ত থাকেন কারণ তার কাধে পুরো জামাতের দ্বায়িত্ব। কিন্ত তারপরও তিনি প্রত্যেক আহমদীকে অত্যন্ত ভালবাসেন। এজন্য তিনি আমার সন্তানের খবর নেবার জন্য থাইল্যান্ডের প্রত্যন্ত গ্রামে যোগাযোগ করেছিলেন। আমি কসম খেয়ে বলছি একমাত্র খলীফাতুল মসীহ এর পক্ষেই এতটা দয়ালু ও স্নেহশীল হওয়া সম্ভব। ”

বায়তুল আফিয়াত মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্হাপন

মোলাকাত শেষে হুজুর জোহর ও আসরের নামায আদায় করেন। এরপরে আমরা আলমীর শহরে বায়তুল আফিয়াত মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্হাপন অনুষ্ঠানের জন্য যাই। বিকেল ৪.৩০ মিনিটে আমরা পৌছাই। সেখানে সহকারী মেয়র জনাব ফ্রিটস হুইস এবং স্হানীয় জামাতের লোকজন উপস্হিত ছিল। কোরআন তেলাওয়াতের পর আমীর হেবাতুন নূর সাহেব উদ্ভোধনী ব্ক্তৃতা দেন।

সহকারী মেয়র সাহেবের প্রজ্ঞাময় বাণী

আমীর সাহেবের পর সহকারী মেয়র সাহেব সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তার কথা শুনে বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি অনেক জ্ঞাণী ব্যক্তি। হুজুরের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তিনি ডাচ এর পরিবর্তে ইংরেজী ভাষায় কথা বলেন। তিনি বলেন “আমার বক্তব্য অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হবে কারণ খলীফার বক্তব্য শোনাই আমাদের জন্য উত্তম। আমি ও আপনাদের খলীফা একই বছর জন্মগ্রহণ করি কিন্তু তিনি আমার চেয়ে অনেক বেশী বিজ্ঞ ব্যক্তি। তাই আমি মনে করি না আমার আর কিছু বলরা প্রয়োজন আছে।”

সাধারণত রাজনীতিবিদগণ ভাষণ দেবার সুযোগ পেলে তা হারাতে চান না। আমার মনে হল খলীফাতুল মসীহ এর মর্যাদা কি তা তিনি কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছেন।

হুজুরের বক্তৃতা

এরপর হুজুর তার বক্তব্যে মসজিদের আসল উদ্দেশ্য ও ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা সম্বন্ধে স্হানীয়দের অবহিত করেন। তিনি বলেন “বিশ্বের যেকোন স্হানে নির্মিত সকল আহমদী মসজিদই সকল মানবজাতির জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও সৌহার্দ্যের প্রতীক। একজন প্রকৃত মুসলমানের দ্বায়িত্ব হল সকলের প্রতি ভালবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করা এবং সমাজের শান্তির জন্য কাজ করা। তাই একটি ব্যাপারে আমি সকলকে আশ্বস্ত করতে চাই, আজকের এই মসজিদ সকলের জন্যই শান্তি ও নিরাপত্তার আশ্রয়স্হল হিসেবে প্রমাণিত হবে।”

“আমাদের মসজিদ তৈরীর কোন গোপন উদ্দেশ্য নেই। আমাদের সকল মসজিদের দরজাই সকলের জন্য সবসময় খোলা রয়েছে। যে কেউ আমাদের মসজিদে দর্শন করতে চাইলে তাকে অবশ্যই স্বাগত জানানো হবে।”

হুজুর স্হানীর কতৃপক্ষ ও বাসিন্দাদের মসজিদ তৈরীতে সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান। হুজুর বলেন “অনেক আহমদীই এখানে এসেছেন কারণ নিজদেশে ধর্মের কারণে তাদের উপর অত্যাচার করা হতো। আপনাদের সকলের দয়া ও উদার মানসিকতার জন্যই তারা এখানে এখন শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবে, ইনশাল্লাহ।”

হুজুরের বক্তব্যের প্রভাব

হুজুরের বক্তব্য বেশী বড় ছিল না। কিন্তু এটি অতিথিদের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। আমি একজন স্হানীয় রাজনীতিবিদ আসজেন ভ্যান ডিউক বলেন “আপনাদের খলীফা শান্তি ওমানবতার কথা বলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে আহমদী মসজিদ শান্তির প্রতীক। বর্তমানে ইসলাম নিয়ে মানুষের মনে অনেক ভীতি রয়েছে, যেটি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই আপনাদের খলীফার বাণী দূর দূরান্তে ছড়িয়ে দেয়া উচিৎ। মানুষের ইসলাম নিয়ে যে ভুল ধরাণা রয়েছে খলীফার বাণী ও উদাহরণই তা দূর করতে পারে।”
সহকারী মেয়র সাহেব বলেন “খলীফার সাথে সাক্ষাৎ করা ও তার সাথে কথা বলা আমার জন্য সম্মানের বিষয়। তার দয়া ও জ্ঞান সত্যই অসাধারণ। তিনিই পুরো বিশ্বে শান্তির সেতুবন্ধন তৈরী করতে পারেন।” একজন স্হানীয় পুলিশ অফিসার বলেন “তিনটি শব্দেই আপনার খলীফাকে বর্ণনা করা যায়- শান্তি, সম্মান ও মানবতা। আমার আর কিছু বলার নেই।” একজন ডাচ মহিলা সোনজা বলেন “খলীফা শান্তি ও ভালবাসার বাণী ছড়াচ্ছিলেন। তিনি সকলকে নতুন মসজিদের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। এককথায় আজকের অনুষ্ঠানটি ছিল নিখুঁত।” আমি একজন ডাচ ড: উইলেন কোএলসার এর সাথে কথা বলি । তিনি বলেন “খলীফা সকলকে ইসলাম ধর্মের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। মহাত্মা গান্ধী ও মার্টিএ লুথার কিং হল আমার ব্যক্তিগত আদর্শ। আমি খলীফাকে তাদের মতোই একজন মনে করি।” আহমদীদের কাছে অবশ্যই হুজুরের মর্যাদা অনেক উপরে। কিন্তু অতিথিগণও হুজুরকে অনেক সম্মান প্রদর্শন করেন।

একটি স্মরণীয় বিবাহ

ভিত্তি প্রস্তর অনুষ্ঠানের পর কাফেলা নানপেস্টে ফেরত চলে আসে। সেখানে মাগরিবের নামাযের পর হল্যান্ডের মিশনারী ইনচার্জ সাহেব সাবেক সদর খোদ্দামুল আহমদীয়া হল্যান্ড টমি খালন সাহেবের বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। হুজুর বিবাহের সময় উপস্হিত ছিলেন।
বিবাহের সময় টমি সাহেব ও তার বাবার নাম উচ্চারণে মোবাল্লেগ সাহেবের অসুবিধা হচ্ছিল। তাই টমি সাহেব নিজেই তাদের নামের সঠিক উচ্চারণ বলে দেন। বিবাহ সম্পন্নের পর হুজুর তাদের জন্য দোয়া করেন। এরপর টমি সাহেবকে বিবাহের মোবারকবাদ জানান। হুজুর বলেন “টমি সাহেব, মনে হয় আপনার বিবাহ আপনি পড়ালেই ভাল হতো।”আমরা হুজুরের কথা শুনে হাসলাম। এমনকি মোবাল্লেগ সাহেব যিনি টমি সাহেবের নামের সঠিক উচ্চারণ করতে পারছিলেন না তিনিও হুজুরের জোকস শুনে হেসে ফেলেন।

হুজুরের সাথে স্মরণীয় মুহুর্ত

সেদিন রাতের খাবারের পর আমি আমার রুমে ল্যাপটপে কাজ করছিলাম। তখন আমি হুজুরের রুমের দরজা খোলার শব্দ পাই। আমি সাথে সাথেই আসসালামু আলাইকুম বলি। হুজুর আমার ড্রয়িং রুমে এসে এমটিএ দেন। হুজুর আমাকে বলেন আব্দুল্লাহ সাপরাহ সাহেবকে ডাকতে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমি তাকে নিয়ে আসলাম এবং পরবর্তী ৩৫ মিনিটে আমরা হুজুরের সান্নিধ্যে সময় কাটানোর সৌভাগ্য হল।
আলহামদুলিল্লাহ, হুজুরকে সকলের ভিত্তি প্রস্তর অনুষ্ঠান নিয়ে সন্তুষ্ট মনে হল। ডেপুটি মেয়র সাহেব সম্বন্ধে হুজুর বলেন “তাকে আমার ভালই লেগেছে। তিনি অনেক রসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। তাকে আমার কিছুটা লন্ডনের মেয়র বরিস জনসনের মতো মনে হয়েছে। তিনি বলছিলেন যে এটি একটি অবাক ব্যাপার আমরা একই বছর জন্মগ্রহণ করেছি এবং ৬৫ বছর পর একসাথে দেখা করছি। আমি তাকে বলি এর চেয়েও অবাক করা ব্যাপার হল আমরা দুজনেই হাজার মাইল দূরে বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে বেড়ে উঠেছি কিন্তু আজ একটি ইসলামিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে একত্র হয়েছি। ”

হুজুর আমার সম্বন্ধে জানতে চান যে আমার অনুষ্ঠানটি কেমন লেগেছে এবং আমি কার কার সাথে কথা বলেছি। মালা ও মাহিদ কেমন আছে সে ব্যাপারেও হুজুর খোজ নেন। হুজুরের সাথে কাটানো মুহুর্তগুলো চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আমার রুমমেট এর সাথে কথোপকথন

সাধারণত আহমদ ভাই নিরাপত্তার ব্যাপারটি দেখেন তাই একটু দেরী করে রাতে ঘুমাতে আসেন। তিনি আসার পর আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা ও লন্ডনের জীবন যাপন নিয়ে কথা বলি। তখন আহমদ ভাই কাপড় স্ত্রী করতে করতে আমার সাথে গল্প গুজব করেন। আমি এ সময়টি ভালই উপভোগ করি।

ঘুম ও দেরীতে নাস্তা

হল্যান্ডে এসে আমি কখনো ফযরের নামায পড়ে ঘুমাই নি। কিন্তু বৃহস্পতিবার আমি একটু ঘুমিয়ে নেই। ঘুমানোর পরে আমার অনেক সতেজ লাগছিল। এটি একটি ভাল সিদ্ধান্ত ছিল কারণ এরপর সারাদিন অনেক ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে।
ঘুমানোর ফলে আমি সকালের নাস্তা খেতে পারিনি। তাই আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম এবং ভাবছিলাম যে খাবারের জন্য দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তখন আহমদ ভাই আমাকে বললেন যে নাসির আমিনী সাহেব আমার জন্য একটি চকোলেট মাফিন পাঠিয়েছেন যেটি তিনি স্হানীয় বেকারী থেকে নিয়েছেন। আমি অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। গরম কফির সাথে মাফিন বড়ই সুস্বাদু ছিল।

নামাযের সময় অসুবিধা

সেদিন দুপুরের নামাযের সময় সামনের কাতারে দাড়ানো কারো ফোন বেজে উঠে। একবার নয় বরং দুইবার এই ঘটনা ঘটে এবং প্রত্যেকবারই তাকে ফোন সাইলেন্ট করতে অনেক সময় নিতে হয়। নামায শেষে হুজুর পেছনে না তাকিয়েই বলেন “এটি যার ফোনই হোক না কেন তার উচিৎ হবে সেটি বন্ধ করে দেয়া।”

হুজুর পিছনে তাকিয়ে জানতে চাননি যে সেটি কার ফোন ছিল। এতে সেই ব্যাক্তি আরো বেশী বিব্রত হওয়া থেকে বেচে গেল। আমি সবসময় আমার ফোন সাইলেন্ট করে রাখতাম কিন্তু এরপর পুরো সফরে আমি ফোন বন্ধ করে রাখি।

নানপেস্ট টাউন সেন্টারে ভ্রমণ

বিকেলে আমি প্রথমবারের মতো নানপেস্ট টাউন সেন্টারে ভ্রমণ করতে যাই। স্হানীয় জামাত সফরের সময় কয়েকটি সাইকেল সরবরাহ করে আমি তার মধ্যে একটি নিয়ে নাসির আমিনী সাহেবের সাথে বের হয়ে পড়ি।
টাউন সেন্টারটি ছোটই ছিল। ৩০-৪০ মিনিটে মোটামোটি সবকিছুই দেখা হয়ে যায়। স্বভাবতই আমি বিভিন্ন চকোলেট সেলস এর দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। আমরা একটি পনিরের দোকানে যাই। সেখানে পনিরের তীব্র গন্ধ ছিল। দোকানের মালিক আমাকে কিছু পনির দেন যেটি খুব সুস্বাদু ছিল। আমি ভাবলাম যে নল্ডনের জন্য কিছু নিয়ে যাব। কিন্তু পরে চিন্তা করলাম যে লন্ডন যেতে যেতে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিছু কাফেলা সদস্য পনির লন্ডনে নিয়ে গিয়েছিল। আমি যতদূর জানি তা নষ্ট হয়নি।

আমি দেখলাম নাসির সাহেব ১৫ ইউরো তে এক ব্যাগ শুকনো ফল কিনেছেন। তিনি আমাকে বললেন যে বড়ই সস্তায় পেয়েছেন। কিন্তু পরে এক দোকানে যেয়ে দেখেন একই জিনিস তিন ভাগের এক ভাগ দামে বিক্রি হচ্ছে।

আত্মীয়দের সাথে সাক্ষাৎ

হল্যান্ডে থাকার সময় আমি মির্যা ফখর আহমেদ সাহেব, তার স্ত্রী আয়েশা ও তাদের সন্তানদের সাথে কয়েকবার সাক্ষাৎ করি। তারা পূর্বে লন্ডনেই থাকতেন। কয়েক বছর হল হল্যান্ডে থাকছেন। তাদের বড় মেয়ে আইমান হুজুরের সফরের আমার লেখা ডায়েরী পড়েছে। দেখা হবার পর সে জানতে চায় হল্যান্ড আমার কেমন লাগছে। তাকে কিছুটা চিন্তিত মনে হল আমি হল্যান্ড সম্বন্ধে খারাপ কোন মন্তব্য লিখে ফেলি কিনা। আমি তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি যে হল্যান্ডে আমি অনেক উপভোগ করছি।

জার্মান খোদ্দাম নামাযের জন্য হল্যান্ড আসা

৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় দুইজন খোদ্দাম ইনতিসার মালিক(২৬) ও শেহেরার আসলাম (২৬) জার্মানী থেকে ড্রাইভ করে হল্যান্ডে আসেন। ইনতিসার বলেন “আমাদের এখানে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হল হুজুরকে দেখা ও তার পিছনে নামায আদায় করা। হুজুরকে এক নজর দেখলেও মনে হয় আমাদের সারা জীবন আশির্বাদময় হয়ে যাবে। ”
আসলাম বলেন “বিশ্বে অনেক আহমদী রয়েছে যারা হুজুরকে এক নজর দেখার জন্য, তার পিছনে নামায আদায় করার জন্য মরিয়া। অনেক মানুষ হুজুরকে আক নজর দেখার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। তাই এটি আমাদের জন্য লজ্জ্বাজনক হবে যদি আমরা হুজুরকে দেখার এই সুযোগ না নেই। ”

স্হানীয় আহমদীদের উপর প্রভাব

বিকেলে আমি কিছু স্হানীয় আহমদীর সাথে কথা বলি যারা হুজুরের সাথে মোলাকাত করেছেন। তাদের একজন হলেন ইমরান চৌধুরী(৫৩)। তিনি ৪৭ বছর ধরে হল্যান্ডে বসবাস করছেন। তিনি বলেন “আমি কেন্দ্রীয় আমেলার সদস্য ছিলাম। তখন হুজুরের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য হত। আমি লক্ষ্য করেছি হুজুরে দ্রুত ক্যালকুলেশন করতে পারেন। একবার বিভিন্ন সংখ্যাকে বিভিন্ন দেশের মুদ্রায় পরিণত করার প্রয়োজন ছিল। আমেলা সদস্যগণ দ্রুত ক্যালকুলেটর দিয়ে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তারা ফলাফল বের করার পূর্বেই হুজুর তার মাথায় তা বের করে ফেলেন। ”
আমি কিছু আরব আহমদীদের সাথেও কথা বলি। মরোক্কো থেকে খালিদ আল কারবাশি ও তার স্ত্রী শাহেদা আসেন। তারা প্রায় পাচঁ বছর পূর্বে আহমদীয়াত গ্রহণ করেছেন। খালিদ সাহেব বলেন “হুজুর হলেন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। তিনি এমন নক্ষত্র যিনি আমাদের দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। আমার কর্তব্য হল খলীফাতুল মসীহ কে আদেশ পালন করা কারণ তিনি হলেন হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতিনিধি। তাকে অনুসরণ করা মানেই হল মোহাম্মদ (সাঃ) কে অনুসরণ করা। ”

তার স্ত্রী শাহেদা সাহিবা বলেন “হুজুরের সাথে সাক্ষাতের পর আমার অনুভুতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বর্তমান বিশ্বে সকল মানুষের মধ্যে তিনিই আল্লাহর সবচেয়ে কাছের ব্যাক্তি। তাই তার সাথে দেখা করা অনেক সৌভাগ্যের বিষয়। তার দোয়া এমন এক সম্পদ যা আমাকে ও আমার সন্তানদের আগত প্রজন্মকেও রক্ষা করবে। ”

আমি আরো এক মরোক্কের আহমদীর সাথে কথা বলি। তিনি হলেন মোস্তফা শাফাকী সাহেব। আমি হলাম যখন তিনি বললেন যে তার বয়স ৪৬। কারণ তাকে দেখে আরো তরুণ মনে হচ্ছিল। তিনি ২৫ বছর বয়সে আহমদীয়াত গ্রহণ করেন। কথা বলার সময় তার চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল কিন্তু মুখে হাসি ছিল। তিনি বলেন “আমি কসম খেয়ে বলছি খলীফাতুল মসীহর প্রতি ভালবাসা আমার প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন সময় আমরা সমস্যায় পড়ে থাকি। যেমন আমি কোন চাকরী পাচ্ছিলাম না এবং আমার কোন সন্তানও হচ্ছিল না। আমরা হুজুরকে দোয়ার জন্য অনুরোধ করি। আল্লাহর রহমতে এখন আমি চাকরী পেয়েছে এবং সম্প্রতি জানতে পেরেছে যে আমার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। আলহামদুলিল্লাহ। হুজুয একজন পিতার মতই আমাদের সকলের সমস্যা শোনেন ও দোয়া করেন। ”

আমি ইউসুফ এখলাক(৩৪) সাহেবের সাথে কথা বলি। আমি এর পূর্বে তাকে দেখিনি। কিন্তু তার কন্ঠস্বর শুনে আমি বুঝি যে তিনি ইব্রাহীম এখলাক সাহেবের ভাই, যিনি লন্ডন জামাতে সবার পরিচিত এবং ওয়াকফে জীন্দেগিতে নিয়োজিত আছেন। তিনি আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই তার ভাই এর সাথে কথা বলা আমি উপভোগ করি। ইউসুফ সাহেব ১৬ বছর বয়সে আহমদীয়াত গ্রহণ করেন। তিনি বলেন “আমি আসলেই বাকরুদ্ধ। কারণ আমি এমন একজনের সাথে সাক্ষাত করলাম যিনি বর্তমান বিশ্বে আল্লাহর সবচেয়ে নৈকট্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি। বর্তমান বিশ্বে চারিদিকে অশান্তি, নৈরাজ্য। মুসলমানগণ একজন আর একজনকে কাফের ঘোষনায় ব্যস্ত। কিন্তু আমাদের জামাত খলীফার হাতে একতাবদ্ধ। এটিই আমাদের অন্যান্যদের থেকে আলাদা করেছে। খিলাফতের অনুগত্যের মাধ্যমেই আমাদের সম্মান নিহিত।”

নানপেস্টে শুক্রবারের খুৎবা

৯ অক্টোবর ২০১৫ হুজুর বায়তুন নূর মসজিদ, নানপেস্ট থেকে খুৎবা প্রদান করেন। খুৎবাতে হুজুর বলেন “হল্যান্ডে বসবাসরত বেশীরভাগ আহমদীদেরই এই কারণে হল্যান্ডে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে যে তারা পাকিস্তানে ধর্মীয় স্বাধীনতা পেত না। তাই তাদের কর্তব্য হল ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী জীবন যাপন করা। প্রত্যেক আহমদীর উচিৎ বয়াতের শর্তসমূহের প্রতি লক্ষ্য করা। তারা কতটুকু শর্ত পালন করছে সেটির ব্যাপারে তাদের চিন্তা করা উচিৎ।”

ডি করাসপোনডেন্ট এর সাথে সাক্ষাৎকার

বিকেলে হুজুর ডাচ সংবাদমাধ্যম ডি করাসপোনডেন্টকে সাক্ষাৎকার দেন। হুজুরকে জিহাদের ধারণা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। হুজুর বলেন “বিভিন্ন সন্ত্রাসী দল যেমন দায়েশ কোরআনের ভুল ব্যাখা প্রদান করছে। জিহাদের প্রকৃত অর্থ হল ভাল কোন কিছুর জন্য চেষ্টা করা। কিন্তু সন্ত্রাসীগণ তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা করছে।”
সিরিয়ার অবস্থা সম্বন্ধে হুজুরকে জিজ্ঞেস করা হয় বিশ্ব শক্তি সমূহের কি প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সাথে একসাথে কাজ করা উচিৎ। হুজুর বলেন “সিরিয়ায় শান্তির জন্য প্রধান হুমকি হল সন্ত্রাসী দল দায়েশ। তাই তাদের দমন করার ব্যাপারটিকেই অগ্রাধিকার দেয়া উচিৎ। এজন্য কিছুটা হলেও সিরিয়ার সরকারের সাথে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। ”

হুজুরের কাছে জানতে চাওয়া হয় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির ব্যাপারে তিনি কোন আশা দেখছেন কিনা। হুজুর বলেন “যে সকল লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তা খুব আশানুরূপ নয়। অবস্হা আরো খারাপ হবার সম্ভাবনা আছে। তাই আমি অতি দ্রুত কোন কিছু আশা করছি না। কিন্তু আমি আশা করি শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে ও আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে।”

জামাতের প্রচারের ব্যাপারে হুজুরকে জিজ্ঞেস করা হয়। হুজুর বলেন “আমরা কখনো হতাশ হবো না এবং হাল ছেড়ে দেব না। আমরা আমাদের প্রচার চালিয়ে যাব। আমরা বিশ্বাস করি একদিন পরিবর্তন আসবেই। এই প্রজন্ম না হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইসলামের সত্যতা বুঝতে পারবে।”

হল্যান্ডে সংবাদ সম্প্রচার

সাক্ষাতকার শেষে আমি চিন্তা করলাম আমি বিভিন্ন দেশে হুজুরকে বিভিন্ন সাক্ষাতকার দিতে দেখেছি। কিন্তু পাচঁ দিনে পাচঁটি সাক্ষাতকার দিতে কখনো দেখিনি। আলহামদুলিল্লাহ সকল সাক্ষাতকারই আল্লাহর আশির্বাদ স্বরূপ ছিল। সাংবাদিকদের ধন্যবাদ দিতে হয় কারন দুই একদিনের মধ্যেই সাক্ষাতকারের সংবাদ প্রচার করা হয়। তাই আল্লাহর অশেষ রহমতে হুজুরের সাক্ষাতকারের মাধ্যমে আহমদীয়াতের সংবাদ লাখ লাখ ডাচদের কাছে পৌছে যায়।

ওয়াকফে নও ক্লাস

সন্ধ্যায় হুজুর ওয়াকফে নও দের উদ্দেশ্যে ক্লাস নেন। সেখানে হেগের মোবারক মসজিদ সম্বন্ধে একটি প্রেজেন্টেশন ছিল। সেখানে বলা হয় হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে(রহঃ) সময়ে সেখানে একটি বড় অগ্নিকান্ড ঘটে। তখন হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে(রহঃ) হল্যান্ড জামাতের সবাইকে আশ্বস্ত করেন যে ইনশাল্লাহ আল্লাহর সাহায্যে এই মসজিদ অনেক বড় ও সুন্দর হবে।
এটি আমাকে সম্প্রতি বায়তুল ফুতুহ মসজিদে ঘটে যাওয়া অগ্নিকান্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। হুজুর আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে শীঘ্রইপুড়ে যাওয়া হলকে আরো সুন্দর ও বরকতপূর্ণ করে তৈরী করা হবে, ইনশাল্লাহ।

হোম স্ক্রীন আপডেট

হুজুর সন্ধ্যায় আমাকে তার অফিসে ডাকেন। তিনি আমার মোবাইল নেন কারণ ডিকশনারীতে তিনি কিছু চেক করতে চান। পরবর্তী কয়েক মিনিট তিনি আমার ফোন ব্যবহার করেন। হুজুর খুব ভালভাবে আইফোন ব্যবহার করতে পারেন। তিনি সাফারী ব্রাউজার ওপেন করে অক্সোফোর্ড ডিকশনারীর ওয়েবসাইটে চলে যান এবং তার যে শব্দ দরকার সেটি দেখে নেন। হুজুর আমাকে উপদেশ দেন যে যদি অ্যাপলিকেশনটি ইন্সটল করা থাকত তাহলে আরো সুবিধা হতো। যখন আমি ফোন নিলাম তখন দেখলাম হুজুর অক্সফোর্ড ডিকশনারির ওয়েবপেজ আমার হোমস্ক্রীনে সেভ করে দিয়েছেন। তাই ফোন হাতে নিলে আমার সেই স্মরণীয় মুহুর্তটি মনে পড়ে যায়।

হুজুরের বিরতিহীন সময়সূচী

হুজুর কয়েকদিন আগে ডাচ সংসদে হয়ে যাওয়া অনুষ্ঠানটির কথা বলেন। তিনি বলেন যে ইংরেজী তার মাতৃভাষা নয়। আমি হুজুরকে বলি যে মাশাল্লাহ হুজুরের ইংরেজী অনেক ভাল এবং অনেক ইংরেজদের থেকে হুজুর ভাল বলেন।
হুজুর একবার বলেছিলেন যে একবার এক কানাডিয়ান রাজনীতিবিদ তাকে বলেন “ বেশীরভাগ পাকিস্তানী রাজনীতিবিদ যাদের সাথে আমি দেখা করেছি তাদের ইংরেজী আমি বুঝতে পারিনি। কিন্তু আপনার ইংরেজী আমি ভালোভাবেই বুঝতে পারছি।”

আমি দোয়া করি যেন হুজুর ভবিষ্যতে কিছু সময় পান যেন আরাম করতে পারেন। কিন্তু আমি দেখেছি যখনই তিনি অল্প কিছু সময় পান জামাতের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অথবা আহমদীদের সাথে মোলাকাত করেন।

জামাতের আত্মত্যাগের প্রশংসা

হুজুর যখন তার মেইল চেক করছিলেন তিনি বলেন “যদিও আমি কোন তাহরীক করিনি। কিন্তু তারপরও বিশ্বের বিভিন্ন স্হান থেকে আহমদীগণ অগ্নিকান্ডের পর বায়তুল ফুতুহ মসজিদের জন্য অর্থ প্রেরণ করছে।” মসজিদের প্রতি আহমদীদের ভালবাসা ও আত্মত্যাদের জন্য হুজুরকে আনন্দিত মনে হচ্ছিল।

মিডিয়া সম্বন্ধে হুজুরের উপদেশ

হুজুর বিগত কয়েকদিনের মিডিয়া সক্ষাতকার নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন “আমি একটি জিনিস তাদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করছি যে আমাদের শান্তির বাণী কোন নতুন বিষয় নয়। বরং এটি মহানবী (সাঃ) এর শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত। অমুসলিমগণ যাতে এই বিষয়টি বুঝতে পারে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ”

বাচ্চাদের প্রতি হুজুরের দয়া ও ভালবাসা

আমি হুজুরকে বলি যে কিছুদিন পূর্বে আমি এক পরিবারের সাথে কথা বলেছিলাম যাদের দুইটি সন্তানই শারীরিকভাবে অসুস্হ। হুজুর সাথে সাথেই তাদের কথা মনে করতে পারলেন এবং গভীর ভালবাসার সাথে তাদের বিষয়ে কথা বলেন। হুজুর বলেন ৯ বছরের মেয়েটি মানসিক ভাবে অনেক চালাক কিন্তু দুঃখের বিষয় হল তার ভাই মানসিকভাবে অসুস্হ। হুজুর তার সাথে মোলাকাতের পর কিভাবে সবকিছু এত নিখুঁতভাবে মনে রাখতে পারেন তা ভেবে আমি অবাক হই।

একটি বিশেষ সফরের ব্যবস্হা

হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি হেগ শহরের বিখ্যাত প্যানোরমা পেইন্টিং দেখেছি কিনা। হুজুর বলেন যে খিলাফতের পূর্বে ও পরে তিনি এটি কয়েকবার দেখেছেন। আমি বলি যে আমি ছবিটি দেখিনি। তাই হুজুর তৎক্ষনাৎ ব্যক্তিগত সচিব সাহেবকে ডাকেন ও বলেন যে পরদিন সকালে নাসির আমিনী সাহেবের সাথে আমি যেন ছবিটি দেখতে যাই। আমি হুজুরের প্রতি কৃতজ্ঞ। হুজুর নিজে যা পছন্দ করেছেন ও আমাকেও দেখার জন্য বলছেন আমি সে ছবি দেখার জন্য অধীর আগ্রহী।

একটি বরকতময় সপ্তাহ

আমি যখন হুজুরের অফিস থেকে বের হচ্ছিলাম তখন হুজুর হাসলেন ও বললেন “যদি কালকে আমি সময় পাই তাহলে আমরা হয়ত সাইক্লিং করতে বের হব।” আমি এটি শুনে অত্যান্ত আনন্দিত হলাম। আমি শুনেছি যে পূর্ববর্তী হল্যান্ড সফরে হুজুর নানপেস্টের গ্রাম্য রাস্তায় সাইক্লিং করেছিলেন। হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে(রহঃ) হল্যান্ডে সাইক্লিং করে অনেক আনন্দ পেতেন। আমি সাইক্লিং এর জন্য অনেক উৎসাহী ছিলাম।
আমরা এক সপ্তাহের কম সময় হল হল্যান্ডে এসেছি। কিন্তু এর মধ্যেই অনেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। খিলাফতের বরকত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সকলেই লক্ষ্য করেছে। সফরের পরবর্তী অংশের জন্য আমি অপেক্ষা করছি।

শেষ

আগের লেখা গুলো

প্রথম পর্ব

হুজুরের (আইঃ) হল্যান্ড ও জার্মানী সফর অক্টোবর ২০১৫ ব্যক্তিগত ডায়েরী পার্ট-১ (পর্ব-১)

দ্বিতীয় পর্ব

হুজুরের (আইঃ) হল্যান্ড ও জার্মানী সফর অক্টোবর ২০১৫ ব্যক্তিগত ডায়েরী পার্ট-২ (পর্ব-২)