Menu

হুজুরের স্ক্যান্ডেনেভিয়া সফর (দ্বিতীয় পর্ব)

 

[হুযুর (আইঃ) এর স্ক্যান্ডেনেভিয়া সফরঃ আবিদ খান সাহেবের ব্যক্তিগত ডায়েরীইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদকৃত]

 

মালমোতে মাহমুদ মসজিদে আগমন

৬ দিনের অত্যন্ত বরকতময় ডেনমার্ক সফরের পর হুজুর ১০ মে, ২০১৬ তারিখে সুইডেনে আসেন। হুজুর নতুন নির্মিত মসজিদ ‘মসজিদে মাহমুদে’ যান। আমি ‘মসজিদে মাহমুদে’র সৌন্দর্য ও বিশালতা দেখে অবাক হয়ে যাই এবং চিন্তা করি যে সুইডেনের মত একটি ছোট জামাত কিভাবে এত সুন্দর ও বড় মসজিদ তৈরী করতে পারল। আগমনের পর শত শত আহমদী নারী, পুরুষ ও শিশু হুজুরকে অভ্যর্থনা জানায়। তাদের দেখে আমার ডেনমার্কের আহমদীদের কথা মনে পড়ল। হুজুর ডেনমার্ক সফর শেষে চলে আসার সময় তাদের চেহারা অত্যন্ত দুঃখিত ছিল।

হুজুর মসজিদ প্রাঙ্গনেই তার ছোট রুমে যান। আমরা এ সুযোগে মসজিদের ভিতরটি দেখতে থাকি। আমরা সকলেই মসজিদের সৌন্দর্য্য ও আকার দেখে অবাক হয়ে যাই। মসজিদের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট হল সেটির মেহরাব। আমি এত বড় মেহরাব কখনো দেখিনি।

 

স্হানীয় জামাত শেষ মুহুর্তের কাজ

আমাদের পরিকল্পনা ছিল সকল কাফেলা সদস্যই মসজিদ প্রাঙ্গনে থাকবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অতিথিশালার কাজ সম্পন্ন হয়নি। তাই হুজুর ও তার নিরাপত্তা কর্মীগণ মসজিদ প্রাঙ্গনে থাকেন এবং আমাদের থাকার ব্যবস্হা কাছের হোটেলে করা হয়। এছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না। কিন্তু আমি হুজুরের কাছাকাছি থাকতে না পেরে কিছুটা দুঃখিত ছিলাম।

 

মসজিদের কাজ সঠিক সময়ে সম্পন্ন হওয়া একটি বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল। সুইডেনের আমীর সাহেব আমাকে বলেন যে দুই দিন পূর্বে মসজিদের নর্দমা ব্যাবস্হা পুরো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই তখন মসজিদে কোন পানি সরবরাহ ব্যবস্হা ছিল না।

 

স্হানীয় একটি কোম্পানীকে এটি ঠিক করার কাজ দেয়া হয়। তাদের সাথে স্হানীয় আহমদীগণ বিরতিহীন কাজ করে। মসজিদের বেশিরভাগ মাটিই তুলে ফেলে ড্রেনের কাজ করতে হয়েছিল। একজন স্হানীয় আহমদী আমাকে বলেন যে আমরা আসার কয়েক ঘন্টা পূর্বেও মসজিদ প্রাঙ্গনকে ধ্বংসযজ্ঞ বলে মনে হচ্ছিল। তারা মনে করেছিল যে কোনভাবেই সময়ের মধ্যে তারা কাজ শেষ করতে পারবে না।

আমীর সাহেব বলেন আহমদীগণ সারা রাত কাজ করেছে। তারা দোয়া করেছে এবং সদকা দিয়েছে যেন আল্লাহপাক যথাসময়ে কাজ শেষ করে দেন। তাই সেদিন সকাল ১১টায় ড্রেনেজ ব্যবস্হা ঠিক করে পানি সরবরাহ পুনরায় চালু করা হয়েছে। তারপর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই কেটে রাখা মাটি দিয়ে সকল গর্ত ভরাট করা হয় এবং রোলার দিয়া মাটি সমান করা হয়। আমীর সাহেব ও স্হানীয় সকলেই মনে করেন যে এটি অলৌকিক ঘটনা এবং আল্লাহতা’লার সাহায্যের একটি নিদর্শন।

 

সেদিন সন্ধ্যায় হুজুর পুরো মসজিদ প্রাঙ্গন পরিদর্শন করেন।

 

সাক্ষাৎকার

পরদিন সকলে স্হানীয় জামাত চারটি মিডিয়ার সাথে হুজুরের সাক্ষাৎকারের ব্যবস্হা করে। তাই সেদিন ২ ঘন্টা ধরে বিরতিহীনভাবে হুজুর সুইডিশ ন্যাশনাল টিভি, স্ক্যানস্কা ডাগব্লাডেট সংবাদপত্র, সিডসিভেনস্ক্যান সংবাদপত্র ও সুইডিশ ন্যাশনাল রেডিওকে সাক্ষাৎকার দেন।

সকল সংবাদমাধ্যমই হুজুরের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। এভাবে হুজুরের শান্তির বার্তা পুরো সুইডেনে পৌছে যায়, আলহামদুলিল্লাহ।

একটি সাক্ষাৎকারে হুজুরকে প্রশ্ন করা হয় যে ইমিগ্র্যান্টরা একটি নতুন দেশে যেয়ে কিভাবে সেখানে মানিয়ে নিবে। হুজুর বলেন “সকলের উচিৎ নিজের দেশকে ভালবাসা ও দেশের প্রতি অনুগত থাকা । দেশের উন্নতির জন্য কাজ করা, আইন মেনে চলা এবং সরকারকে সম্মান করা। এটা উচিৎ নয় যেসকল ইমিগ্র্যান্ট তাদের দেশে এসেছে এবং তাদের আইন মেনে চলছে তাদেরকে বলা যে; তোমরা তোমাদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ভুলে যাও। যদিও সেসকল বিশ্বাস তাদের দেশের শান্তিকে কোনভাবেই বাধা প্রদান করে না।”

সাক্ষাৎকারের সময় মাঝেমাঝে তারা কি প্রশ্ন করবে সেটি অনুমান করা যায়। কিন্তু এপর সাংবাদিক যে প্রশ্নটি করে সেটি আমি কখনো অনুমান করতে পারতাম না। তার এই প্রশ্নে আমি হতাশ হলাম কারণ হুজুরের কিছু মূল্যবান সময় নষ্ট হল। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন “ইউরোভিশন গানের প্রতিযোগিতা শীঘ্রই স্টকহোমে শুরু হতে যাচ্ছে। আপনি নিশ্চয়ই তা দেখবেন?”

হুজুরও তার এই প্রশ্নে অবাক হলেন এবং তাকে পুনরায় প্রশ্নটি বলতে বললেন। এরপর হুজুর বলেন “আমার এসব জিনিসে কোন আগ্রহ নেই।”

 

আমি এতে অনেক হতাশ হয়েছি। একটি প্রসিদ্ধ মিডিয়ার একজন সম্মানিত সাংবাদিক কেন এটি বুঝতে পারলেন না যে একজন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতার এসব সামান্য বিষয়ের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই কোন আগ্রহ থাকবে না।

 

আর একটি সাক্ষাৎকারে হুজুরকে জিজ্ঞেস করা হয় প্রথমবার মাহমুদ মসজিদকে দেখে হুজুরের অনুভূতি কেমন ছিল। হুজুর সুন্দরভাবে উত্তরে বলেন “যখনই আমি একটি নতুন মসজিদ দেখি তখনই আমি আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। আমি চিন্তা করি যে মহান আল্লাহপাক আমাদের একত্র হয়ে তাঁর সামনে মাথা নত করার আর একটি স্হান দান করেছেন।”

 

ডেনমার্কের মতো এখানেও হুজুরকে করমর্দন নিয়ে সুইডেনে যে বিতর্ক চলছে সে নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। হুজুর বলেন “কেউ যদি কেবল করমর্দন করে তাহলেই এটি বলা যাবে না যে সে এই দেশের প্রতি অনুগত। কিছু খৃষ্টান মদ পান করে না। আপনারা কি বলবেন যে সে আপনাদের সমাজের অংশ নেয় কারণ সে মদ পান করে না? একইভাবে কিছু ইহুদী মহিলাও রয়েছেন যারা ছেলেদের সাথে করমর্দন করে না। আপনারা তো তাদের সমালোচনা করছেন না কারণ তাহলে আপনাদের ইহুদিবিদ্বেষী বলা হবে। ”

 

একটি সাক্ষাৎকারে হুজুরকে সমকামিতার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়। হুজুর ব্যাখ্যা করেন “কেবল কোরআনই বলেনি যে এটি একটি অন্যায় কাজ বরং বাইবেলেও একই কথা লেখা রয়েছে। একজন মুসলিম কখনো সমকামি মানুষদের আক্রমন করবে না। কারণ সেটি হবে ভুল ও ইসলামবিরোধী কাজ।”

 

হুজুর বলেন যে একজন মানুষকে তার ধর্মীয় ব্যাপার শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে দেয়া উচিৎ। সমকামিতার ব্যাপারে হুজুর অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কথা বলেছেন। কিন্তু সুইডেনের সকল মানুষ হুজুরের এই বক্তব্যকে স্বাগত জানাননি।

 

তিনটি সাক্ষাৎকারের পর হুজুর ভাবলেন যে সেদিনের মতো সকল সাক্ষাৎকার শেষ। কারণ তাকে কেবল তিনটি সাক্ষাৎকারের কথা জানানো হয়েছিল। এরপর স্হানীয় জামাত সুইডেন ন্যাশনাল রেডিও সাংবাদিকের সাথে হুজুরের পরিচয় করিয়ে দেন। হুজুর তাকে আরো ২০ মিনিটের মতো সাক্ষাৎকার দেন। সাংবাদিক প্রথম প্রশ্ন করেন “আপনি কে?” উত্তরে হুজুর বলেন “আমি আল্লাহর একজন সামান্য বান্দা যাকে আহমদীয়া মুসলিম জামাতের পঞ্চম খলীফা হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হল ইসলামের প্রকৃত ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষা প্রচার করা।”

 

হুজুরের ধৈর্য্য

সাক্ষাৎকারের এই ম্যারাথন অধিবেশন ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট পর শেষ হল। অফিস রুমে অনেক গরম ছিল। কিছুক্ষণ পরই আমি ঘামা শুরু করলাম এবং আমার মাথা ঘুরতে লাগল। আমি ভাবলাম আমারই যদি এই অবস্হা হয় তাহলে হুজুরের কেমন লাগছে। তৃতীয় সাক্ষাৎকারের পর আমি হুজুরকে এক গ্লাস পানি দিলাম। হুজুর অল্প পানি খেলেন। প্রচন্ড গরম ও চারটি সাক্ষাৎকার আয়োজন করার সত্ত্বেও হুজুর কোনরকম বিরক্তি বা ক্লান্তি প্রকাশ করেন নি। কিন্তু আমাদের সকলেরই শেষের দিকে ঝিমুনি চলে এসেছিল।

মাজিদ সাহেব আমাকে বলেন যে এক ঘন্টা পর তিনি ক্লান্ত হয়ে তার মনঃসংযোগ হারিয়ে ফেলেন। সকল সাক্ষাৎকার শেষ হবার পর হুজুর আমীর সাহেবকে বলেন “এতক্ষণ ধরে কথা বলার পর আমার এখন মাথা ব্যথা করছে।”

 

এরপর আমি ও মাজিদ সাহেব স্হানীয় জামাতকে বললাম যে ৪ টি সাক্ষাৎকার একসাথে না করে; ২টি সকালে ও ২টি বিকেলে করলে ভাল হতো। আমি আগে থেকে জামাতের কর্মসূচী জানলে তাদেরকে এভাবেই করার জন্য পরামর্শ দিতাম। হুজুরও পরবর্তীতে আমার এই অভিমতকে সমর্থন করেছেন।

 

একজন নিবেদিত কর্মী

এই সফর ও হুজুরের অন্যান্য সফরে আমি হুজুরের নিরাপত্তা কর্মীদের সাধারণ জীবনযাপন লক্ষ্য করেছি। বিশেষভাবে বয়স্ক নিরাপত্তা কর্মীদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি উল্লেখযোগ্য। হয়ত এটিই স্বাভাবিক; কারণ তারা অনেক বছর ধরে খলীফার সাথে কাজ করছে এবং খলীফা তাদের ব্যক্তিগতভাবে তরবীয়ত করেছেন।

এই সফরেও আমি তাদের সরলতার কিছু দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। মালমোতে নিরাপত্তা কর্মীগণ যে বিল্ডিং এ ছিল সেখানে ২৪ ঘন্টা গরম পানির ব্যবস্হা ছিল না। কিন্তু তারা এ নিয়ে কোন অভিযোগ করেনি। তাদের কয়েকজন আমাকে বলেছিল

“আমরা এখানে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে এসেছি; তাই গরম পানি আছে কি নেই সেটা কোন ব্যাপার নয়।”

 

মালমোতে প্রথম রাতে আমি হুজুরের একজন বয়োজেষ্ঠ্য নিরাপত্তা কর্মী নাসির সাইদ সাহেবকে দেখি। তিন খলীফাতুল মসীহ সালেস(রঃ) আমল থেকে কাজ করছেন। তাকে দেখে আমার অনেক অসুস্হ মনে হল। তিন অনেক ঘামছিলেন এবং তার জ্বরও ছিল। আমি তার সুস্হতা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম।

কিন্তু ১৫ মিনিট পর আমি যখন নামাযের জন্য মসজিদে যাই তখন দেখি তিনি তার নিয়মমাফিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। তাকে তখনো অসুস্হ দেখাচ্ছিল। কিন্তু তিনি তার সুস্হতার চেয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

 

অপরদিকে হুজুর যদি কখনো জানতে পারেন যে তার কর্মীদের কেউ অসুস্হ তখন তিনি তাদের জন্য ঔযুধ দেন ও বিশ্রাম নিতে বলেন।

 

মালমোতে আমি একবার দেখি যে মসজিদে কে জানি শুয়ে আছে। আমি কাছে যেয়ে দেখি যে তিনি হলেন শওকত সাহেব। তিনি ছোট একটি ঘুম দিয়ে নিচ্ছিলেন। তিনি যখনই একটু সময় পেয়েছেন ঘুমিয়ে নিয়েছেন যেন আবার দ্রুত তার দায়িত্বে ফিরতে পারেন। এভাবেই হুজুরের কর্মীগণ অত্যন্ত সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তাদের দৃষ্টান্ত দেখে আমি দোয়া করি যেন আমিও তাদের মতো বিনয়ী ও সরলভাবে জীবন যাপন করতে পারি।

 

কয়েকটি মূল্যবান মুহুর্ত

সেদিন হুজুর আমাকে তার অফিসে ডাকেন এবং আমি ও আমার ২ বাচ্চার খবর নেন। এরকম একটি ব্যস্ত সফরের মধ্যেও হুজুর আমার ও আমার পরিবারের খবর নিচ্ছেন এটি একটি অবাক করা বিষয়। হুজুর সফরের ব্যস্ততার মধ্যেও তার পরিবারেরও খবর নেন। হুজুর আমাকে তার পরিবারের কথা জানান এবং বলেন যে লন্ডনে বৃষ্টি হচ্ছে।

হুজুর বলেন যে ডেনমার্ক সফরে তিনি মসজিদ ও হোটেল ছাড়া কোথাও যাননি। আমি বললাম যে ডেনমার্ক তো অনেক ছোট দেশ, সেখানে বেশি কিছু দেখার নেই। হুজুর আমাকে বলেন যে আমার ধারণা ঠিক নয়। কারণ সেখানে অনেক ঐতিহাসিক স্হান রয়েছে। হুজুর বলেন কিন্তু সেটি কোন ব্যাপার নয় কারণ আমার উদ্দেশ্য ছিল স্হানীয় আহমদীদের সাথে দেখা করা। আমি হুজুরকে ডেনমার্কে একজন আহমদীর কথা বলি। তিনি আমাকে বলেছিলেন হুজুরের সাথে দেখা করার পর তার জীবন পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। এখন তিনি এই সম্পর্ক ধরে রাখার জন্য হুজুরকে নিয়মিত চিঠি দিবেন। হুজুর বলেন “তাকে আমার মেইল ঠিকানা ও ফ্যাক্স নাম্বার পাঠিয়ে দেও; যেন সে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারে।”

হুজুর এরপর কোপেনহেগেন এ আয়োজিত গতদিনের অনুষ্ঠান নিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলেন। হুজুর বলেন ইংরেজী ডেনিশদের মাতৃভাষা নয়। তাই আমি অনুষ্ঠানে কিছুটা ধীরে কথা বলেছি। সাধারণত হুজুরের বক্তব্য ২৬-২৭ মিনিটেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু গতদিন বক্তব্য শেষ হতে ৩২ মিনিট সময় লেগেছিল। কিভাবে মানুষের উদ্দেশ্য বক্তব্য দিতে হবে সে ব্যাপারে হুজুর বলেন “সবসময় ভালবাসার সাথে মানুষের সাথে কথা বলবে। যদি কখনো কাউকে নির্দেশনা বা উপদেশ দিতে হয় তখনও তাদের সাথে ভালবাসার সাথে কথা বলবে। এটিই হল কোরআনের শিক্ষা।”

 

হুজুর বলেন এ কারণেই অনেকেই তাকে বলেছে যে হুজুরের বক্তব্য অনেক শক্তিশালী কিন্তু সে কথা তিনি অত্যন্ত বিনীত ও ভালবাসার সাথে ব্যক্ত করেছেন। আমি বললাম যে আমি হুজুরের কথার সাথে পুরোপুরি একমত। হুজুর কারো অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে তার বক্তব্য দিতে পেরেছেন। আমি হুজুরকে বললাম যে সাক্ষাৎকারে সকল সাংবাদিক; হাত মেলানোর বিষয়টিকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। তারা এ বিষয়কে লিঙ্গ বৈষম্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু অপরদিকে তারা প্রকৃত লিঙ্গ বৈষম্যের অনেক ব্যাপারকেই উপেক্ষা করছিলেন। যেমন সুইডেন ও অন্যান্য অনেক দেশেই মহিলাদের বেতন একই কাজ করা পুরুষের চেয়ে কম।

হুজুর বলেন “এটি একদম সত্য কথা। তাই আমি তাদেরকে বলেছি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে লক্ষ্য দিতে। আমি যখন একজন সাংবাদিককে বলি যে এসব সামান্য বিষয় নিয়ে মাতামাতি না করে বিশ্বে ক্ষুধা ও দারিদ্রের যে সমস্যা রয়েছে তার দিকে লক্ষ্য দিতে; তখন তার চেহারা মলিন হয়ে পড়ে।”

হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে আমি কোথায় থাকছি। আমি বলি যে আমরা কাছের একটি হোটেলেই আছি। হুজুর জানতে চান সেখান থেকে মসজিদে আসতে কেমন সময় লাগে এবং আমরা সেদিন ফজরের নামায পড়েছি কিনা। আমি জানাই যে মসজিদে আসতে ১০-১৫ মিনিট সময় লাগে এবং সৌভাগ্যবশত আমরা সেদিন ফযরের নামায পড়েছিলাম কারণ আমরা ৩.৫০ মিনিটেই মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা দেই।

আমি হুজুরকে বলি যে সুইডেনের আমীর সাহেব এবং কাশিফ ভিরক সাহেব(একজন তরুণ মোবাল্লেগ) আমাকে বলেছেন যে একজন সাংবাদিক শুক্রবারে হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করতে চান। হুজুর বলেন যে জুমআর নামাযের পরে তার সাথে সাক্ষাৎকারের সময় ঠিক করতে। এরপর হুজুর বলেন যে নামাযের সময় হয়ে গিয়েছে। হুজুর উঠে দাড়ান এবং অফিস থেকে মসজিদের দিকে রওনা দেন। আমিও তাকে অনুসরণ করি।

 

আহমদীদের আবেগ

পরদিন সকালে হুজুর আহমদীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আমি তাদের কারো কারো সাথে কথা বলি। আমি নাসি মোস্তফা ওমর সাহিবা নামে একজন ইরাকী কুর্দ এর সাথে কথা বলি। তিনি ও তার স্বামী কয়েক বছর পূর্বে বয়াত করে আহমদীয়াত গ্রহণ করেছেন। এটি তাদের দুজনেরই হুজুরের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ।

নাসি সাহিবা বলেন “আমি যখন হুজুরের রুমে প্রবেশ করি তখন আমি শান্ত ছিলাম। কিন্তু হুজুরকে দেখে আমার অবস্হা পরিবর্তন হয়ে যায়। সাথেসাথেই আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। আমি একপ্রকার ভালবাসা ও শান্তি অনুভব করি যেটি আগে কখনো অনুভব করিনি।”

 

“আমার স্বামী ঘরে সবসময় এমটিএ ছেড়ে রাখেন। আমি তাকে মাঝে মাঝে বলতাম যে অন্য চ্যানেলও দাও। কিন্তু হুজুরের সাথে সাক্ষাতের পর আমি বুঝতে পারলাম কেন তিনি এমন করতেন। আমিও সবসময় হুজুরের কাছাকাছি থাকতে চাই। এজন্যই আমার স্বামী সারাদিন এমটিএ দিয়ে রাখতেন।”

আমি তার স্বামী ফরহাদ আলীর সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “আমি ১৯ বছর পূর্বে বয়াত করেছি। বয়াত করার পূর্বে ও পরে আমি বিভিন্ন স্বপ্ন দেখেছি। একটি স্বপ্নে আমি দেখি আমি একটি বিশাল স্টেডিয়ামের মধ্যে দাড়িয়ে আছি। সেখানে কিছূ আক্রমনাত্মক ও উগ্রবাদী লোক আমার দিকে পাথর ছুড়ে মারে। হঠাৎ করে আমি হুজুরকে দেখি; তিনি আমার হাত ধরে আমাকে নিরাপদ স্হানে নিয়ে যান।”

“আজকের এই দিন আমার অনেক দিনের দোয়ার ফল। আমি অনেক বছর ধরে আল্লাহর কাছে কেদেঁ দোয়া করেছি; যেন আমি আমার প্রিয় হুজুরের সাথে দেখা করার সৌভাগ্য লাভ করতে পারি। আহমদীয়াতকে খুঁজে পেয়ে আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি। কারণ আহমদীয়াতের মাধ্যমেই আমি তাকওয়া, সততা ও ভালবাসা পেয়েছি যা আজ আমি খলীফাতুল মসীহর মধ্যে নিজ চোখে দেখতে পেয়েছি।”

“আহমদী হবার পর থেকে আমি অনেক অত্যাচারের সম্মুক্ষীণ হয়েছি। কিন্তু এতে আমার ঈমান দুর্বল না হয়ে আরো শক্তিশালী হয়েছে। মানুষের কঠোর ব্যবহারের বিপরীতে আমি সবসময় তাদের সাথে ভালবাসা পূর্ণ আচরণ করার চেষ্টা করেছি। মাঝমাঝে আমার বিরুদ্ধবাদীরা বিভ্রান্ত হয়ে যেত। কারণ আমি অত্যাচারের জবাবে তাদেরকে আলিঙ্গন করতাম। একবার আমি সামান্য সময়ের জন্য রেগে গিয়েছিলাম। কিন্তু এরপর আমি আমার স্বর উচুঁ করার জন্য তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। ”

 

আমি সামীন দুররে নামে একজনের সাথে কথা বলি। তিনি আমাকে তার জীবনে এমটিএর প্রভাবের কথা বলেন “শৈশব থেকেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আল্লাহপাক আমাদের প্রার্থনার জবাব দেন। আমি আমার জীবনেও এর প্রমাণ পেয়েছি। আমার যখন ১২ বছর বয়স তখন আমার পিতা-মাতা বাসায় এমটিএ চালু করেন যা আমার জীবনকে পুরোপুরি পরিবর্তন করে দেয়। তখন থেকেই আমি খলীফাতুল মসীহ রাবে(রঃ) ও খলীফাতুল মসীহ খামেস (আইঃ) এর বক্তব্য শুনি ও নামাযের গুরুত্ব সম্বন্ধে জানতে পারি। ”

 

একটি আবেগঘন বিবৃতি

আমি একজন আহমদী মহিলার সাথে কথা বলি যিনি হুজুরের সাথে কথা বলার পর অশ্রুসিক্ত ছিলেন। তিনি তার ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কথা বলেন। তিনি বলেন যে কয়েক বছর পূর্বে তার পিতা-মাতা তার এক পাকিস্তানী আত্মীয়ের সাথে তার বিয়ে দেন। বিয়ের পর তিনি বুঝতে পারেন যে তার স্বামী কেবল নামে আহমদী। প্রকৃতপক্ষে আহমদীয়াতের শিক্ষা সম্বন্ধে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি বলেন “আমি এটা কখনোই মেনে নিতে পারছিলাম না যে আমি এমন একটি ঘরে থাকব যেখানে প্রকৃত আহমদীয়াতের শিক্ষা নেই। তাই আমাদের দ্রুতই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ”

এরপর পুনরায় বিবাহ করতে তাকে অনেক সমস্যার সম্মুক্ষীণ হতে হয়েছে। যেখানেই তার পরিবার তার বিয়ের চেষ্টা করেছে সেখান থেকেই তাদের বলা হয়েছে যে তাদের ছেলে এমন কাউকে বিয়ে করবে না যা পূর্বে একবার বিবাহ হয়েছিল। যদিও তাদের ছেলেরও পূর্বে বিবাহ হয়ে ছিল।

এটি খুবই ভয়ানক ও অন্যায় আচরণ। আমি চিন্তা করতে পারি না যে এসকল ছেলের পরিবার কিরকম অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণ করছে যার সাথে ইসলামের দূরতম সম্পর্ক নেই।

তিনি আর একটি সমস্যার কথা বলেন যে “আহমদী ছেলেরা নন-আহমদী ও অমুসলমান মেয়েদের বয়াত গ্রহণ করিয়ে তাদের বিয়ে করছে। তাহলে জন্মগতভাবে আহমদী মেয়েদের কে বিয়ে করবে?”

“আমার যদি কখনও বিয়ে না করে থাকতে হয় তাহলেও আমি রাজি আছি। কারণ এর ফলে অন্তত আমি স্বাধীনভাবে একজন আহমদী মহিলা হিসেবে আমার জীবন কাটাতে পারব। কেউ আমার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এখন আমি নাসেরাতদের ক্লাস নেই এবং জামাতের কাজ করি। এটি আমার কাছে ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবন থাকার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

 

তার কথা শুনে আমর মনে হল কয়েক মাস পূর্বে হুজুর এই বিষয়ে জুমআর খুৎবায় আলোচনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে বয়াত করে বিয়ে করার ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর ফলে অনেক জন্মগত আহমদী মেয়ের বিয়ে করতে সমস্যা হচ্ছে। আহমদীদের উচিৎ তবলীগের মাধ্যমে আহমদী ছেলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা যাতে এই অসমতা দূর করা যায়।

 

আমি এটি চিন্তা করে অবাক হই যে এখনো কিছু আহমদী মহিলাকে এরকম কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্যে জীবন যাপন করতে হয়। আমি তার ঈমানের দৃঢ়তা দেখে আভিভূত হই। আমি তাকে বলি “ইনশাল্লাহ্ হুজুরের দোয়া তাকে সাহায্য করবে ও তাকে ধৈর্য্য দান করবে।”

 

আমি চিন্তা করলাম এই একটি ঘটনায় আমি অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছি। কিন্তু হুজুর এরকম অসংখ্য ঘটনা শুনে থাকেন এবং তিনি প্রত্যেক আহমদীকে গভীরভাবে ভালবাসেন। আমি কল্পনাও করতে পারি না সকল আহমদীদের দুঃখের কথা শুনে তিনি কতটা কষ্ট পেয়ে থাকেন।

 

মাজিদ সাহেবের লাঞ্চ

দুপুরে আমার খিদে পায়নি, তাই আমি খাবার না খেয়ে অফিসে চলে আসি যেখানে মাজিদ সাহেব, মোবারক সাহেব ও আমি কাজ করি। মাজিদ সাহেব আমাকে বলেন যে তার খুব ক্ষিদে পেয়েছে। তাই নামায শেষেই তিনি খাবার জন্য বেরিয়ে যান। ১৫ মিনিট পর তিনি আসেন এবং আমি লক্ষ্য করলাম যে তাকে কিছুটা বিরক্ত দেখাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে খাবার কেমন হল।

তিনি বললেন “আমি এখনো খেতে যাইনি। কারণ মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখি যে আমার জুতো নেই।”

তার কথা শুনে আমি দুঃখিত হলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে কেউ শত শত জুতোর মাঝে ভুল করে তার জুতো নিয়ে গেছে। আমি বললাম চলুন আর একবার ভাল করে খুঁজে দেখি। তিনি বললেন যে তিনি ভালভাবেই খুজেঁছেন এবং মাগরিব ও এশার পর আর একবার খুজঁবেন। হয়ত সেসময় যিনি ভুল করে জুতো নিয়েছেন, আবার তা নিয়ে আসবেন। কিন্তু তার জুতো আর পাওয়া যায়নি। তিনি পরবর্তীতে কাছের একটি দোকান থেকে একজোড়া জুতো কিনে নিয়েছেন। এরপর সফরের সময় তিনি তার জুতোর প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখতেন।

 

সারারাত নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন

মালমোতে ৪.০৫ মিনিটে ফযরের নামায আদায় করা হয়। তাই আমরা ৩.৫৫ মিনিটে হোটেল থেকে মসজিদে চলে আসতাম। সকালে সেখানে অত্যন্ত ঠান্ডা আবহাওয়া থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেখানে খোদ্দাম ও লাজনা সদস্যগণ বাইরে দাড়িয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিল। আমি চিন্তা করলাম যে আমাদের জামাতেই একমাত্র এরকম মানুষ পাওয়া সম্ভব; যারা আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে জামাতের জন্য দায়িত্ব পালন করাকে অত্যন্ত সম্মানের বিষয় বলে মনে করে।

 

নতুন আহমদীর কাহিনী

সুইডেনে আমি সারমাদ আহমদ(৩২ বছর) নামে একজন নতুন আহমদীর সাথে কথা বলি। পুরো সফরে তিনি সুইডেনের নিরাপত্তা দলের কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি অনেক অমায়িক ও বন্ধুত্বপূর্ণ। তিনি জামাতের প্রতি গভীর ভালবাসা রাখেন। তাকে দেখে ইংল্যান্ডের নতুন আহমদী বন্ধু জোনাথন বাটারওর্থের কথা মনে পড়ে। আমি সারমাদকে তার আহমদী হবার কাহিনী জানতে চাই। তিনি বলেন যে কোরআন পড়ে তার কাছে তা সত্য বলে মনে হয়েছে।

তিনি বলেন “সূরা বাকারার প্রথম পাঁচ আয়াত পড়ার পরপরই আমি বুঝতে পারলাম যে ইসলাম ধর্ম আমারই জন্য। আমি সারাজীবন যা খোঁজার চেষ্টা করছিলাম তা আমি পেয়ে গেছি। কোরআন পড়ে আমার মনে হয়েছে যে মহান আল্লাহপাক আমার সাথে সরাসরি কথা বলছেন।”

 

“মুসলমান হবার পর আমি ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলমানদের সাথে মেলামেশা এড়িয়ে চলতাম। মিডিয়াতে ইসলামবিরোধী বিভিন্ন প্রচারণার কারণে আমার মনে মুসলমানদের নিয়ে অনেক ভীতি ছিল। কিন্তু কয়েক মাস পর আমি ইসলাম সম্বন্ধে আরো জানার জন্য ভাল মুসলমান বন্ধু খুঁজতে লাগলাম।”

 

“এক রাতে আমি মাথা নত করে আল্লাহর কাছে কিছু ভাল মুসলমান বন্ধুর জন্য দোয়া করি। এর ঠিক তিন মাস পর আমি আইসল্যান্ডের একটি বাজারে হাঁটছিলাম। সেখানে আমি এক বয়স্ক দম্পত্তিকে দেখতে পাই যাদের দেখে ধার্মিক বলে মনে হচ্ছিল। তারা ছিলেন আইসল্যান্ডের আহমদী মিশনারী মোবাল্লেগ ও তার স্ত্রী। আমি তাদের কাছে গেলাম এবং বললাম যে দয়া করে আমাকে একজন ভাল মুসলমান হবার নিয়ম কানুন শিক্ষা দিন।”

“আমি যেসব আহমদীর সাথে মিশতাম তাদের আচরণে আমি বড়ই আভিভূত ছিলাম। কিন্তু আমি যখন ইউটিউবে অন্যান্য মুসলমানদের ভিডিও দেখতাম তারা সেখানে প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) কে অভিশাপ দিত ও (নাউযুবিল্লাহ্) মিথ্যাবদী বলত। তাই আমি সঠিক পথে ছিলাম কিনা এ নিয়ে চিন্তিত ছিলাম।”

 

এরপর একটি ঘটনা তার সকল সন্দেহ দূর করে দেয় এবং আহমদীয়াত সত্যতা সম্বন্ধে তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে। তিনি বলেন

“২০১০ সালের ২৮ মে তারিখে লাহোরে আহমদী মসজিদে অনেক আহমদীদের শহীদ করা হয়, এই ঘটনা শুনে তখন আমি অত্যন্ত মর্মাহত হই। কিন্তু এরপর হুজুরের জুমআর খুৎবা শুনে আমি অত্যন্ত অবাক হই। হুজুর অত্যন্ত পরিস্কারভাবে বলেন যে আমরা এই হিংস্রতার জবাব হিংস্রতা দিয়ে নয় বরং দোয়ার মাধ্যমে দিব। হুজুরের এই বক্তব্য শুনে আমি চিন্তা করলাম যে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস আছে বলেই আহমদী খলীফা এরকম বক্তব্য দিতে পেরেছেন। এরাই প্রকৃত জামাত যারা কেবল আল্লাহরই প্রতি ভরসা রাখে।”

ছয় বছর পর সামাদ মনে করেন যে আহমদীয়াত গ্রহণ করে তিনি কোন ভুল করেননি। আহমদীয়াতের সত্যতা তার কাছে এখন পরিস্কার। তিনি অন্তরের শান্তি খুঁজে পেয়েছেন। তিনি আমাকে আরো বলেছেন যে তিনি এখন বিবাহ করে সুখী জীবন কাটাচ্ছেন এবং তাদের একজন শিশু সন্তানও রয়েছে।

 

মাহমুদ মসজিদ উদ্বোধন

১৩ মে ২০১৬ হুজুর মালমোর মাহমুদ মসজিদ উদ্বোধন করেন। এই দিনটির জন্য স্হানীয় জামাত অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছিল। দুপুর ২টায় হুজুর তার বাসস্হান থেকে বেরিয়ে আসেন এবং মসজিদ উদ্বোধন করেন। এরপর তিনি মসজিদে যেয়ে জুমআর খুৎবা দেন।

খুৎবায় হুজুর বলেন যে এই মসজিদ তৈরীর জন্য সুইডেন জামাতের নারী, পুরুষ ও শিশু সকলেই অনেক আর্থিক কুরবানী করেছেন। একজন তার গাড়ী বিক্রি করে মসজিদের জন্য অর্থ দেন। মহিলারা তাদের ব্যক্তিগত গয়না বিক্রি করে এবং বাচ্চারাও তাদের পকেটমানি থেকে দান করে। বাচ্চাদের সম্বন্ধে হুজুর বলেন “আমাদের আহমদী বাচ্চারা ছোটবেলা থেকেই জানে যে যে ব্যক্তি এখানে মসজিদ তৈরীতে সাহায্য করবে সে পরকালে জান্নাতে নিজেদের ঘর তৈরী করবে।”

হুজুর বলেন “বাহ্যিক সৌন্দর্য্য একটি মসজিদের প্রকৃত সৌন্দর্য নয়। বরং এই মসজিদে যারা আসে; তাদের আত্মার পবিত্রতা ও আচরণই মসজিদের প্রকৃত সৌন্দর্য।”

 

টোয়েন্টি ফোর মালমোর সাথে সাক্ষাৎকার

জুমআর নামাযের পর হুজুর “টোয়েন্টি ফোর মালমো” কে একটি সাক্ষাৎকার দেন। হুজুরকে সাংবাদিক বলেন যে ইংরেজী তার মাতৃভাষা নয়। তাই কোন কিছু পরিস্কারভাবে বোঝা নে গেলে তিনি তার জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নেন। হুজুর হাসেন ও বলেন “কোন চিন্তা করবেন না। আমার মাতৃভাষাও ইংরেজী নয়।”

সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেন যে আপনাদের জামাত কি এতবড় মসজিদকে মানুষ দিয়ে পূর্ণ করতে পারবে। হুজুর বলেন “যদি আপনার মতো উদার মনের মানুষ আমাদের সাথে একত্র হয় তাহলে অবশ্যই আমরা মসজিদ পূর্ণ করতে পারব।”

তিনি জানতে চান যে হুজুর কিভাবে খলীফাতুল মসীহ নির্বাচিত হন। হুজুর বলেন

“আমাদের একটি নির্বাচনী কমিটি রয়েছে যেখানে প্রধান অফিস কর্মী, ন্যাশনাল প্রসিডেন্ট, মোবাল্লেগ এবং আরো কিছু সদস্য আছেন যারা খলীফার ইন্তেকালের পর একত্র হন। এই নির্বাচন ভিডিওতে সংরক্ষণ করা হয়। প্রত্যেকেই একটি করে ভোট দিতে পারেন। কোন ব্যক্তিই তার নিজের নাম প্রস্তাব করতে পারেন না। কেউ কারো জন্য প্রচারণাও চালাতে পারবেন না।”

সাবাদিক প্রশ্ন করেন যে হুজুর তার পূর্ববর্তী খলীফাগণের চেয়ে উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অনেক বেশী সোচ্চার। এ ব্যাপারে হুজুর বলেন “আমি যে বার্তা প্রচার করছি পূর্ববর্তী খলীফাগণও সেই একই বার্তা প্রচার করেছিলেন। যেমন আমাদের তৃতীয় খলীফা “ভালবাসা সবার তরে, ঘৃণা নয় কারো পরে”  এই স্লোগান উদ্ভাবন করেছিলেন। বর্তমান বিশ্ব পরিস্হিতির কারণে আমাকে এই বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। যদি সারা বিশ্বে শান্তি স্হাপন হয় তখন আমি হয়তো অন্যান্য বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিব।”

 

শরণার্থী সংকট সম্বন্ধে হুজুরের প্রতিক্রিয়া

সিরিয়া ও ইরাকে যুদ্ধের ফলে বর্রমানে যে শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে সে ব্যাপারে হুজুর বলেন “১৯৮০ সালে আফগান যুদ্ধের সময় লাখ লাখ আফগান শরণার্থী সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানে প্রবেশ করে। সেখানে শরণার্থী ক্যাম্প করে তাদের রাখা হয়। তখণ বিভিন্ন দেশ অর্থ, ত্রাণ, খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে পাকিস্তানে আসা শরণার্থীদের সাহায্য করে। আফগানিস্তানের পরিস্হিতি স্বাভাবিক হলে অনেক শরণার্থীই নিজ দেশে ফিরে যায়। এই ব্যবস্হা তখন সফল হয়েছিল এবং এখনও এরকম ব্যবস্হা গ্রহণ করা যেতে পারে। এভাবে সিরিয়া ও ইরাকের প্রতিবেশী দেশগুলোকে শরণার্থী সংকট মোকাবেলায় অন্যান্য দেশ সাহায্য করতে পারে। এতে ইউরোপ ও পাশ্চাত্য দেশগুলোতে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যে ঘৃণা তৈরী হচ্ছে তা কমে যাবে। এর ফলে সন্ত্রাসীরা শরণার্থী ছদ্মবেশে পাশ্চাত্যে প্রবেশ করতে পারবে না।”

 

৪.২৫ মিনিটে সাক্ষাৎকার শেষ হয় এবং হুজুর ৪.৩০ মিনিটে তার দুপুরের খাবার খান। হুজুর কখনো নিজের কথা চিন্তা করেন না, সবসময় ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচারে চেষ্টা করেন।

 

আতফাল ক্লাস

সেদিন হুজুর সুইডনেরে আতফালদের একটি ক্লাস নেন। ক্লাসের একজন ছেলে হুজুরকে প্রশ্ন করে যে স্কুলে স্প্যানিশ, জার্মান ও ফ্রেঞ্চ ভাষার মধ্যে কোনটি সে শিখবে। হুজুর বলেন যে জামাতে ইতিমধ্যেই অনেক জার্মান ও ফ্রেঞ্চ ভাষা জানা লোক রয়েছে। তাই তার উচিৎ হবে স্প্যানিশ ভাষা শেখা।

প্রত্যেকটি বিষয়ে হুজুর জামাতের কথা চিন্তা করেন। বৈষয়িক ভাবে চিন্তা করলে একজন ব্যক্তি জার্মান বা ফ্রেঞ্চ ভাষাই শিখতে চাইবে, যেন তাদের রাজনীতি ও ব্যবসায় উন্নতি হয়। কিন্তু খলীফায়ে ওয়াক্ত সবসময় চিন্তা করেন কিভাবে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষআকে দূর-দূরান্তে পৌঁছে দেয়া যায়।

 

করমর্দন সমস্যা

একজন আতফাল সুইডেনে করমর্দন নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন করে। হুজুর তাকে ডেনমার্কের ঘটনা উল্লেখ করেন। হুজুর বলেন “একজন ডেনিশ রাজনীতিবিদ তার দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তিনি তার সাথে করমর্দন করেন নি।”

হুজুর মাথা সামান্য নাড়িয়ে তাকে সম্মানজনকভাবে অভিবাদন জানান; তার কাছে ক্ষমা চান এবং তাকে বলেন যে কেন তার পক্ষে করমর্দন করা সম্ভব নয়।

পরবর্তীতে সেখানে উপস্হিত আর একজন রাজনীতিবিদ আমাদের জানান যে তার সঙ্গী রাজনীতিবিদের সাথে হুজুর করমর্দন না করায় তিনি কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু তিনি এটিও তার সঙ্গীকে বলেন যে এতে তার অপমানিত হবার কিছু নেই কারণ সম্মান প্রদর্শন করার বিভিন্ন রীতি রয়েছে।

এখানে একজন ডেনিশ রাজনীতিবিদ অন্যজনের কাছে ইসলামিক শিক্ষা প্রচার করছেন। হুজুর বাচ্চাদের বলেন যে ইসলামিক শিক্ষা মেনে চলতে কখনো ভয় পাবে না এবং মনে রাখবে প্রত্যেক ইসলামিক শিক্ষার পিছনে গভীর প্রজ্ঞা রয়েছে।

আমরা কখনোই হুজুরকে এরকম পরিস্হিতির সম্মুক্ষীণ হতে দিতে চাই না। স্হানীয় জামাত যদি অতিথিদের এ ব্যাপারে পূর্বেই জানিয়ে দিত তাহলে এরকম পরিস্হিতি হতো না। কিন্তু কোপেনহেগেনে তারা এটি করতে ভুলে গিয়েছিল।

ইসলামের প্রতি হুজুরের দৃঢ় বিশ্বাস

আতফাল ক্লাসের পর তারা রুম থেকে বের হয়ে যায় কারণ এরপর সেখানে নাসিরাতদের ক্লাস হবে। এসমসয় আমি হুজুরের কাছে যেয়ে তার গ্লাসে পানি ঢেলে দেই। হুজুর তখন আমাকে বলেন যে সেদিনের সংবাদপত্রে কিছুদিন পূর্বে দেয়া হুজুরের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদপত্রে বলা হয়েছে যে হুজুর বলেছেন কোরআন এবং বাইবেল উভয় কিতাবেই সমকামিতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপর কয়েকজন রাজনীতিবিদ জামাতের সাথে যোগাযোগ করে বলেছেন যে তারা হুজুরের এই বক্তব্যে হতাশ হয়েছেন।

এ ব্যাপারে হুজুর বলেন যে “তারা কি মনে করল এতে কিছু আসে যায় না। আমাদের জামাতের কোন ব্যক্তির সাহায্যের কোন প্রয়োজন নেই। ইসলাম ধর্ম আমাদের কি শিক্ষা দেয় তা আমাদের কখনো লুকানো উচিৎ নয়।”

অন্যান্য সময়ের মতো এ বিষয়েও হুজুর ইসলামিক শিক্ষার উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

 

 একটি বিশৃঙ্খল অবস্হা

সুইডেন জামাত ১৪ মে, ২০১৬ তারিখে মাহমুদ মসজিদ উদ্ধোধনের জন্য একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। পরিকল্পনা ছিল যে মসজিদ প্রাঙ্গনে যে বড় হলরুম রয়েছে সেখানেই অনুষ্ঠান হবে। কিন্তু হল রুমটি পুরোপুরিভাবে তখনো তৈরী হয়নি। তাই জামাতকে বিকল্প ব্যবস্হার চিন্তা করতে হচ্ছিল। অনুষ্ঠান অন্য স্হানে করাও সম্ভব নয়; কারণ আমন্ত্রণপত্র অনেক আগেই বিতরণ করা হয়ে গেছে। আমি আমীর সাহেবকে বললাম যে মসজিদ প্রাঙ্গনে প্যান্ডেল করে অনুষ্ঠান করা যায় কিনা। তিনি বললেন যে বাতাসের বেগ অনেক বেশী, তাই এটি করা সম্ভব নয়। অবশেষে সিদ্ধান্ত হল যে মসজিদেই অনুষ্ঠান করা হবে।

হুজুর মসজিদে অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেন। অনুষ্ঠানের দিন সকালে স্হানীয় জামাত মসজিদের হল তৈরী করতে থাকে। তাদের অনেক কাজের মধ্যে কিছু কাজ হল একটি স্টেজ তৈরী করা, চেয়ার-টেবিল আনা, এমটিএর সেট আপ করা ইত্যাদি। অনুষ্ঠান ১১টায় শুরু হবার কথা। আমি ও অন্যান্য অফিস কর্মী ১০টার দিকে সেখানে যাই। আমি দেখি অনেক অতিথিই চলে এসেছেন। কিন্তু মসজিদের ভিতরে না যেয়ে তারা বাইরের অপেক্ষা করছেন। পরবর্তী এক ঘন্টায় আরো অতিথি আসেন এবং বাইরে ধৈর্য্যের সাথে অপেক্ষা করতে থাকেন; কারণ ভিতরের হলরুম তখনো তৈরী হয়নি।

সত্যি কথা বলতে অনুষ্ঠানের ব্যবস্হাপনা সুসংগঠিত ছিল না। আমি অনেক বিব্রতবোধ করছিলাম এবং অতিথিদের জন্যও খারাপ লাগছিল। ১০.৪০ মিনিটের দিকে টেবিল বসানো শেষ হল কিন্তু ছুরি-চামচ, প্লেট তখনো দেয়া হয়নি। লন্ডনের এমটিএ দল তাদের ক্যামেরা সেটআপ শেষ করে টেবিল সাজানোয় সাহায্য করতে লাগল। আমিও আমার খাতা কলম রেখে স্হানীয় খাদেমদের সাহায্য করতে শুরু করলাম। আমাকে একটি বিশেষভাবে ন্যাপকিন ভাজ করে রাখতে বলা হল। কয়েকবার চেষ্টার পর আমি যখন ভাজ করা শিখে গেলাম তখন বলা হল যে সব ন্যাপকিন আবার নতুনভাবে ভাজ করতে হবে। কারণ এখন যেভাবে আছে সেভাবে থাকলে ক্যামেরাতে ভাল ছবি উঠবে না।

অনেকেই এতে বিরক্ত হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুজুর এসে পড়বেন এবং অতিথিরাও বাইরে অপেক্ষা করছেন; আর আমরা কিভাবে ন্যাপকিন ভাজ করা হবে তা নিয়ে বৃথা সময় নষ্ট করছি। খুবই বিশৃঙ্খল অবস্হা বিরাজ করছিল। এমটিএর আতাউল আউয়াল আবাস্সী সাহেব ন্যাপকিন ভাজ করতে করতে আমাকে বলেন “আবিদ সাহেব; এরকম অনুষ্ঠান পূর্বে দেখেছেন কি?”

সত্যি কথা বলতে এরকম অনুষ্ঠান  আমি পূর্বে কখনো দেখিনি। সময় যত ১১ টার কাছে যেতে লাগল আমার ভয় ততো বাড়তে লাগল। কিন্তু এখনো কোন অতিথিই চেয়ারে বসতে পারেন নি।

 

বিশৃঙ্খল অবস্হা থেকে শান্তিপূর্ণ অবস্হা

আমি দেখলাম যে ঘড়িতে ১১ টা বেজে গেল। তখনো আহমদীগণ আতঙ্কিতভাবে দৌড়াদৌড়ি করে চেয়ার টেবিল সেট করছে। আমি দেখলাম হুজুর সময়মতো মসজিদে প্রবেশ করলেন। হুজুর এই বিশৃঙ্খল অবস্হা দেখে দ্রুত অতিথিদের নিয়ে আসার  নির্দেশ দিলেন। হুজুর বলেন যে টেবিল পরেও সেট করা যাবে; কিন্তু অতিথিদের কোনভাবেই বাইরে দাড় করিয়ে রাখা উচিৎ নয়। এটিই খিলাফতের বরকত, কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই পুরো পরিবেশ পরিবর্তন হয়ে গেল। স্হানীয় জামাত অতিথিদের ভিতরে নিয়ে আসতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই হলরুম পূর্ণ হয়ে গেল। সকলের আতঙ্কিত অবস্হা কিছুটা শান্ত হল।

 

হুজুরের সাথে কিছু সময়

হুজুর বুঝলেন যে সবকিছু তৈরী হতে কিছুটা সময় লাগবে। তাই তিনি তার অফিসে যান এবং আমাকে ডাকেন। হুজুর বলেন যে ডেনমার্কের চেয়ে মালমোতে ঠান্ডা বেশি। তাই তিনি আমাকে জানালা ও ফ্যান বন্ধ করে দিতে বলেন। হুজুর অতিথিদের সংখ্যা জানতে চান। আমি বললাম যে স্হানীয় জামাত বলেছে অতিথিদের সংখ্যা ১০০ জন; কিন্তু আমার কাছে আরো কম বলে মনে হয়েছে। হুজুর বলেন

“সেটি কোন সমস্যা নয়। যদি ৩০-৪০ জন অতিথিও উপস্হিত থাকে তাহলে তাদের কাছে ইসলামের প্রকৃত বার্তা পৌঁছাবে এবং তারা তাদের নিজস্ব গন্ডীতে সেই বার্তা পৌঁছে দিবে।”

শেষ পর্যন্ত ১০০ জন অতিথিই এসেছিলেন। শ্রোতার সংখ্যা ১২ জন হোক বা ১ হাজার হোক; হুজুর সংখ্যা নিয়ে চিন্তা করতেন না। তার একমাত্র লক্ষ্য হল ইসলামদের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করা। এরপর হুজুর হাসেন ও বলেন “আবিদ, তুমিও ন্যাপকিন ভাজঁ করছো ও টেবিল সেটআপ করছো!”

আমি মাথা ঝাকিয়ে বললাম “জী হুজুর।” কিন্তু হুজুর এ কথা জানলেন কিভাবে এটি ভেবে আমি অবাক হলাম। আমি বললাম হুজুর জুমআর খুৎবায় স্হানীয় জামাতের আর্থিক কুরবানীর কথা বলেছেন; এতে স্হানীয় আহমদী খুশী হয়েছেন। হুজুর বলেন “তাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে আমি বলেছি মসজিদ তৈরী করা কেবল প্রথম পদক্ষেপ। এখন মসজিদ পূর্ণ করা এবং সবসময় ইসলামিক শিক্ষা মেনে চলা তাদের দায়িত্ব।”

মাহমুদ মসজিদ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

কয়েক মিনিট পর হুজুরকে জানানো হয় যে সব অতিথি আসন গ্রহণ করেছেন এবং সবকিছু তৈরী আছে। ১১.২০ মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হয়। আমীর সাহেবের স্বাগত বক্তব্যের পর মালমোর মেয়র কেন্ট অ্যান্ডারসন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। এতে তিনি বলেন “আমি সম্মানিত অতিথি, হযরত মির্যা মাশরুর আহমদকে আমাদের শহরে স্বাগত জানাচ্ছি। তিনি বিশ্বে শান্তি স্হাপনের জন্য যে চেষ্টা চালাচ্ছেন সে সম্পর্কে আমি জানি এবং এখানে তার উপস্হিতি আমাদের জন্য এক বিরাট সম্মান।”

 

হুজুরের বক্তব্য

অতিথিদের বক্তব্যের পর হুজুর তার বক্তব্য প্রদান করেন যেখানে তিনি মসজিদ তৈরীর প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন। হুজুর বলেন “আমি সকল অতিথি, শহর ও দেশের নাগরিকদের আশ্বস্ত করছি যে এই মসজিদকে ভয় পাবার কোন কারণ নেই। ঘৃণা ও বিদ্বেষ নয়; বরং সমাজে শান্তি, ভালবাসা ও সম্প্রীতি ছড়ানোই একজন প্রকৃত মুসলমান ও মসজিদের কাজ।”

 

“মহানবী (সাঃ) এর সময়ে আল্লাহপাক একটি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলতে বলেছিলেন। কারণ সেটি শান্তি ও ইবাদতের জন্য নয় বরং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য তৈরী করা হয়েছিল। কোরআন পরিস্কারভাবে বলে যে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে যে মসজিদ তৈরী করা হয় সেটিকে ভেঙ্গে ফেলতে।”

 

“আমি একটি বিষয় পরিস্কার করে বলতে চাই যে এই মসজিদের দরজা প্রত্যেক শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য উন্মুক্ত। যারা আল্লাহর ইবাদত করতে চায় এবং সমাজে একতা, শান্তি ও সৌহার্দ্য ছড়িয়ে দিতে চায়।”

 

হুজুর বলেন “প্রকৃত মুসলমানদের দায়িত্ব হলো তারা যে সমাজে থাকে তার উন্নতির জন্য কাজ করা এবং প্রতিবেশী, অনাথ ও দুঃস্হদের সাহায্য করা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে সাহায্য করতে হবে। যারা পূর্বে কোন আশার আলো দেখতে পাচ্ছিল না, আহমদী মুসলমানগণ তাদের আশার বাণী শোনায়।”

“আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য যেন একটি অভিশপ্ত পৃথিবী রেখে না যাই সেজন্য শান্তি প্রচেষ্টার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। আমদের নিশ্চিত করতে হবে যে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নতশীল পৃথিবী রেখে যাচ্ছি।”

 

একটি ব্যক্তিগ্ত চিন্তা

হুজুরের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সফরের কয়েক সপ্তাহ পর এবং ব্রেক্সিটের কয়েক দিন পূর্বে আমি এই ডায়েরী লিখি। আমি দেখলাম কিভাবে ইউকে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে জুয়া খেলছে এবং তাদের দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। তখন আমার মালমোতে হুজুরের এই সতর্কবাণীর কথা মনে পড়ল। আমার মনে হল একমাত্র খলীফাতুল মসীহ এ ব্যাপারে চিন্তা করেন যে বিশ্বে আজকে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সেটি পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

 

হুজুরের বক্তব্যের প্রভাব

দুপুরের খাবারের সময় আমি কয়েকজন অতিথিদের সাথে কথা বলি। টেবিলগুলো অনেক কাছাকাছি ছিল তাই সেগুলোর মাঝ দিয়ে বিভিন্ন টেবিলে যেয়ে অতিথিদের সাথে কথা বলার জন্য শারীরিক কসরতের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আমি এ ধরণের কাজের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলাম না। তাই আমাকে নিচুঁ হয়ে, বা অনেক ঘুরপথে বিভিন্ন টেবিলে যেয়ে অতিথিদের সাথে কথা বলতে হচ্ছিল।

 

অনেক অতিথিকে মনে হল তারা হুজুরের বক্তব্য শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। আমি মিখায়েল নামে একজনের সাথে কথা বলি। তার পিতামাতা পোল্যান্ডের অধিবাসী হলেও তার জন্মের পূর্বেই তারা সুইডেনে চলে আসেন। তিনি বলেন “আমি আল্লাহর উপর বিশ্বাস করি। কিন্তু এ দেশের অনেকেই তা করে না। তাই আমি গর্বিত যে একজন মানুষ(আপনাদের খলীফা) এখানে এসেছেনে যার সৃষ্টিকর্তার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। ”

 

রবার্ট নামে একজন সুইডিশ রাজনীতিবিদ বলেন “খলীফা তার বক্তব্যে বলেছেন একজন প্রকৃত মুসলমান শান্তি ছড়িয়ে দিবে। আমি যখন তার সাথে দেখা করি তখন অন্তরে একপ্রকার শান্তি অনুভব করি। তাই আমি জানি তিনি একজন প্রকৃত মুসলমান। তার উপস্হিতিতে এবং তার কথা শুনে আমি অত্যন্ত নিরাপদবোধ করি।”

একজন খৃষ্টান নেত্রী মিসেস জনসন বলেন “আমি খলীফার কথা শুনে অনেক অবাক ও আবেগআপ্লুত হয়েছি। কারন আমি আজ একজন মুসলিম নেতার কথা শুনেছি যিনি শান্তির কথা বলছেন। এই দেশে এরকম শান্তির বার্তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। ”

 

একজন সুইডিশ অতিথি লারস বলেন “খলীফার বক্তব্য আমাকে এতটাই অনুপ্রাণিত করেছে যে আমার মনে হল আমি এক ভিন্ন জগতে রয়েছি। খলীফা একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ। তিনি কোরআন থেকে ব্যাখ্যা করেছেন যে ইসলাম একটি শান্তিপূর্ণ ধর্ম এবং ধর্ম হল সম্পূর্ণ মনের ব্যাপার, এতে কারো কোন জোর জবরদস্তি নেই।”

আর একজন অতিথি অ্যান্ডারস বলেন “মালমোতে মানুষ মসজিদকে ভয় পায়, কারণ তারা মনে করে এখানে জঙ্গীরা থাকে। কিন্তু খলীফা আমাদের বুঝিয়েছেন যে জঙ্গীরা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা অনুসরণ করছে না। প্রকৃত জিহাদ অস্ত্র দিয়ে নয় বরং তা করতে হয় মুখের বাণী ও কলমের লেখা দিয়ে। ”

আমি পিটার নামে একজন অতিথির সাথে কথা বলি যিনি ইহুদী সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে এসেছিলেন। তিনি বলেন যে হুজুরের বক্তব্য তার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং তিনি ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সম্পর্কে নতুন করে ভাবার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তিনি বলেন “খলীফার কথা শুনে আমার মনে হয়েছে যে মুসলমানরাও আমাদের ভাই। তাই প্যালেস্টাইনদের প্রতি আমার সহানুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে; কারণ তাদের মধ্যেও আপনাদের মতো শান্তিপ্রিয় মানুষ রয়েছে। ”

 

একজন আহমদীর অনুভূতি

অনুষ্ঠানের পর আমি সুইডেন জামাতের ওয়াকাস নাসির সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “হুজুর যখন ১১ টার সময় মসজিদে আসেন তখন পরিস্কার বোঝা যাচ্ছিল যে আমরা অনুষ্ঠানের জন্য তৈরী ছিলাম না। সেখানে অনেক গন্ডগোল হচ্ছিল। আমার মনে হয়েছিল যে হুজুর অনেক রেগে যাবেন এবং আমাদের বকাবকি করবেন। কিন্তু হুজুর একদম শান্তভাবে অতিথিদের ভিতরে নিয়ে আসতে বললেন। হুজুর অনেক দয়ালু, জ্ঞাণী ও ধৈর্য্যশীল। আমি বিশ্বাস করি যে হুজুরের স্নায়ু স্টীলের মতো দৃঢ়।”

“আমি রাবওয়াতে হুজুরকে খিলাফতের পূর্বে দেখেছি। তিনি তখন গোপনে নিজের কাজ করে যেতেন। আমার মনে হয়েছিল তিনি বড় সমাগমে কথা বলতে পছন্দ করেন না। কিন্তু আমি যখন দেখি সেই একই ব্যক্তি সংসদে বক্তব্য দিচ্ছে, জামাতকে সকল কাজে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে এবং অসীম সাহসিকতার সাথে সব কিছুর জবাব দিচ্ছে তখন আমার বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয় যে আল্লাহপাক সকল কাজে খলীফাতুল মসীহকে সাহায্য করেন। অনেক বছর পূর্বে আমি যাকে রাবওয়াতে দেখেছিলাম তিনি পুরোপুরিভাবে পরিবর্তন হয়ে গেছেন।”

 

হুজুরের দোয়ার কবুলিয়ত

হুজুর সেদিন কিছু আহমদী পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আমি তাদের কারো কারো সাথে কথা বলি। আমি এক তরুণ দম্পত্তি মোবাশশের মাহমুদ(২৯বছর) ও তার স্ত্রী যানুবিয়া হামীদ এর সাথে কথা বলি। তাদের দুজনের মুখই হাস্যোজ্জ্বল ছিল। যানুবিয়া সাহিবা বলেন “হুজুরের সাথে সাক্ষাতের সময় মনে হল আমি জান্নাতে আছি। হুজুর অনেক দয়ালু। তিনি বলেন যে আমাদের ৫ মাস বয়সের ছেলে অনেক হাসিখুশি ও মিশুক। হুজুরের কথা শুনে আনন্দে আমার চোখে জল চলে আসল।”

তিনি আমাকে তার ছেলেকে দেখান। সে অনেক হাসিখুশি ছিল। তিনি বলেন যে “জন্মের সময় তার একটি কান ঠিকভাবে গঠিত হয়নি। তাই আমি ও আমার স্বামী খুব চিন্তিত ছিলাম। আমরা লন্ডনে যেয়ে হুজুরের সাথে দেখা করে দোয়ার জন্য আবেদন করি। হুজুর আমাদের বাচ্চার জন্য দোয়া করেন ও বলেন যে কোন চিন্তা না করতে, ইনশাল্লাহ সে ঠিক হয়ে যাবে। সুইডেনে যেয়ে আমাদের বাচ্চা কানে কিরকম শুনতে পায় তার একটি পরিক্ষা করা হয়। আল্লাহর রহমতে তার কান একদম ঠিক ছিল। এমনকি ডাক্তারগণও এতে অনেক আশ্চর্য হয়েছিল।”

 

একজন আবেগপ্রবণ খাদেম

হুজুরের সফরের সময় কাছের বিভিন্ন দেশ যেমন নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড থেকে অনেক আহমদী হুজুরের সাথে দেখা করার জন্য সুইডেনে এসেছেন। তাদের মধ্যে ফিনল্যান্ডের সদর খোদ্দামও ছিলেন। তিন আমাকে তার একটি ব্যক্তিগত ঘটনার কথা বলেন যেটি তার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন “সুইডেন সফরের পূর্বে আমি দুর্ঘটনাবশত আমার একটি আঙ্গুল কেটে ফেলি। ক্ষত অনেক গভীর ছিল এবং হুজুরের সাথে মোলাকাতের দিন ব্যথা অনেক বেড়ে গেল, আমার মনে হল যে সেখানে ইনফেকশন হয়ে গেছে। মোলাকাতের পূর্বে আমি আমার আঙ্গুল ভাল করে টেপ দিয়ে পেঁচিয়ে নেই যেন হুজুরের হাতে ইনফেকশনের স্হান না লাগে। ”

 

“মোলাকাতের পর হুজুরের সাথে ছবি তোলার সময় হুজুর আমার হাত অনেক জোরে চেপে ধরেন। তখন আমার আঙ্গুল প্রচন্ড ব্যথা করে উঠে। আমি মোলাকাত শেষ করে বের হয়ে টেপ খুলে ফেলে প্রচন্ড অবাক হই। কারণ আমি দেখি যে আমার আঙ্গুলের কাটা দাগ আছে কিন্তু সেখানে ইনফেকশনের কোন চিহ্নই নেই।”

“অনেকের কাছে এটি অনেক সামান্য ব্যাপার মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এটি খিলাফতের সত্যতার নিদর্শন। এই ঘটনা আমাকে অত্যন্ত গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে এবং আমি তা কখনোই ভুলতে পারব না।”

 

একজন বন্ধুর সাথে কিছু সময়

আমার খুব কাছের বন্ধু কুদ্দুস মালিক সাহেব মাহমুদ মসজিদ উদ্বোধন অনুষ্ঠানের জন্য সুইডেন এসেছিলেন। তিনি আমেরিকার অধিবাসী; কিন্তু ওকালাত এ তবশীর এর নির্দেশ অনুযায়ী তিনি গত দুই মাস কাজাকাস্তান ও কিরগিজিস্তান থেকেছেন। বাড়িতে যাবার পূর্বে হুজুর তাকে সু্ইডেনে মাহমুদ মসজিদ উদ্বোধন অনুষ্ঠান অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন। তার মতো একজন ভাল বন্ধুর সাথে কথা বলে আমার ভাল লাগে। তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা অনবরত কথা বলে যেতে পারেন, যেই গুণটি আমার কোনকালেই ছিল না।

আমরা খিলাফতের বিভিন্ন বরকত নিয়ে আলোচনা করি এবং আমাদের বাবা হবার অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করি। আমরা লক্ষ করি যে বাবা হবার পরপরই আমাদের চুল সাদা হতে শুরু করেছে।

এ সময় তিনি হুজুরের সাথে কিছু সময় কাটানোরও সুযোগ পান। তিনি বলেন যে সে সময়টুকু তার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহুর্ত।

 

একটি জনাকীর্ণ খাবার রুম

হুজুরের সফর ১০ দিন হয়ে গেল এবং আতদিন আমরা লঙ্গর খানার খাবর খেয়ে এসেছি। আমাকে স্বীকার করতে হবে যে আমি কিছু ভিন্ন স্বাদের খাবারের জন্য প্রার্থনা করছিলাম। আমার এক সময় মনে হল যে আলু ও গোশত আমার পক্ষে আর খাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু পরক্ষণেই এরকম চিন্তা করার জন্য আমার অনুশোচনা হল। আমি চিন্তা করলাম যে আমি ডেনমার্ক ও সুইডেনে খেতে আসিনি বরং একজন ওয়েকফে জিন্দেগী হিসেবে আমার কর্তব্য পালন করতে এসেছি। তাই সেদিন আমি ডাইনিং রুমে যে লঙ্গর খানা আলু গোশত বা অন্য যে কোন খাবারই তৈরী করুক না কেন তার খাবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রস্তুত ছিলাম।

আমি অস্বীকার করব না যখন ডাইনিং রুমে যেয়ে কেএফসির চিকেন, পিজা ও ল্যাম্ব শর্মা দেখলাম তখন আমি অত্যন্ত খুশি হলাম। সেদিনের ফাস্ট ফুডের মতো মজাদার খাবার আমি অনেক দিন খাইনি। এই খাবারের সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্যদিনের তুলনায় ডাইনিং রুম দ্রুত ভর্তি হয়ে যায়।

 

আহমদীদের আবেগ

১৫ মে হুজুর কিছু আহমদী পরিবারের সাথে দেখা করেন। আমি একজন সু্‌ইডিশ আহমদী পার সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করে আমার জ্ঞান বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি হুজুরের কাছে দিক নির্দেশনা চাইলে হুজুর আমাকে অর্থ সহ সূরা ফাতিহা শিখতে বলেন।”

তিনি বলেন যে আহমদী হবার পর তিনি কেবল একটিমাত্র অসুবিধার সম্মুক্ষীণ হয়েছেন। সেটি হল এখানে সব জামাতী অনুষ্ঠান উর্দু ভাষায় হয়। তাই তিনি উর্দু শেখার চেষ্টা করছেন। আমি বললাম যে এটি খুবই ভাল কথা যে আপনি উর্দু শিখছেন; কিন্তু স্হানীয় আহমদীদেরও উচিৎ যে সুইডিশ ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্হা রাখা।

 

আমি হাফিয মুহাম্মদ তালহা(২৫ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনিও প্রথমবারের মতো হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি বলেন “হুজুরের সাথে দেখা করার আনন্দে আমি এখনো কাঁপছি। আমার মনে হচ্ছে আমি এক ভিন্ন জগতে আছি। সুইডেনে চলে আসার আমার উদ্দেশ্য এখন সার্থক বলে মনে হচ্ছে।”

 

স্টকহোমের উদ্দেশ্যে যাত্রা

১৬ মে, ২০১৬ তারিখে আমাদের কাফেলা স্টকহোমের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। সফরে প্রথমবারের মতো আবহাওয়া খুব ঠান্ডা ছিল। আমি নিজেকে গরম রাখার জন্য অনবরত মসজিদ প্রাঙ্গনে পায়চারি করছিলাম। কয়েক মিনিট পর মোবারক জাফর সাহেব বললেন যে জার্মানী থেকে আসা একজন আহমদী সিদ্দীক ডগার সাহেব আমার সাথে একটি ছবি উঠাতে চাচ্ছেন। আমি অনেক অবাক হলাম কারণ আমি তাকে ঠিক সেভাবে চিনি না। যাহোক আমি তার সাথে ছবি তোলার জন্য দাঁড়ালাম। তখন আমি জানতে পারলাম যে তিনি আমাকে ফ্রান্সের আমীর সাহেব মনে করেছেন। এতে আমি কিছুটা লজ্জ্বিত হলাম ও আতঙ্কিতও হলাম। কারণ ফ্রান্সের আমীর সাহেব আমার থেক অনেক বেশি বয়স্ক। দুপুর ১২.২০ মিনিটে নীরব প্রার্থনার পর হুজুর ও তার কাফেলা স্টকহোমের উদ্দেশ্য রওনা দেয়।

 

যাত্রাপথে দুপুরের খাবার ও নামায আদায়

১ ঘন্টা চল্লিশ মিনিট ড্রাইভ করার পর আমাদের কাফেলা দুপুরের খাবার ও নামাযের জন্য একটি হোটেলের সামনে থামে। হোটেলের মিটিং রুমে জোহর ও আসর নামায জমা করে আদায় করা হয়। নামাযের পর হুজুর মাহমুদ খান সাহেবকে বলেন

“আমি গাড়ীতে যে ম্যাগাজিন পড়ছিলাম সেটি আবিদকে দাও।”

মাহমুদ সাহেব হুজুরের গাড়ী থেকে আমাকে “দি ইকোনোমিস্টের” বিশেষ সংখ্যা ‘২০১৬ তে বিশ্বের অবস্হা’ বের করে দেন।

 

খাবারের মধ্যে মাংস ও মাছ ছিল। আমি মাছ নেই। পরবর্তীতে আমি হুজুরকে খাবার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করি । হুজুর ও তার স্ত্রী দু্জনেই মাছ নিয়েছিলেন। ৩.২০ মিনিটে আমরা আবার আমাদের সফর শুরু করি। তখন অনবরত বৃষ্টি হচ্ছিল; কিন্তু তারপরও চারপাশের প্রকৃতি অত্যন্ত সুন্দর ছিল। একটি স্হান অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর ছিল : রাস্তার একপাশে বিশাল লেক ও অন্যপাশে ঘন সবুজ বন।

 

সার্ভিস স্টেশনে বিরতি

৬.২০ মিনিটে আমরা একটি সার্ভিস স্টেশনে বিরতি নেই। হুজুর একটি লম্বা করিডোর ধরে হাঁটতে থাকেন। কিছুদূর যেয়ে তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন

“সুইডেন যেমন লম্বা ও সরু একটি দেশ, এই সার্ভিস স্টেশনও সেরকম লম্বা ও সরু।”

হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন “স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশের মধ্যে সুইডেনেই কি স্হলভাগের আয়তন বেশি?”

আমি এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম না। তাই আমি বললাম “আমার মনে হয় তাই হবে।”

পরে আমি খোঁজ নিয়ে দেখলাম যে হুজুরের কথাই সঠিক। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশের মধ্যে সুইডেনের স্হলভাগ সবচেয়ে বেশি; এরপরেই রয়েছে নরওয়ে।

 

কফি

আমি হুজুরের সম্মানিত স্ত্রীর সাথেও কথা বলি। তিনি সার্ভিস স্টেশনে একটি টেবিলে বসেছিলেন। তিনি আমার স্ত্রী মালা ও সন্তানদের খোঁজখবর নেন। এমন সময় মেজর সাহেব আমাকে ডেকে হুজুর ও তার স্ত্রীর জন্য দুই কাপ কাপুচিনো কফি দেন তাদের টেবিলে নিবে যাবার জন্য। আমি কফি নিয়ে সেখানে যাই। হুজুরের স্ত্রী একটি কফি নেন এবং বলেন যে হুজুর যখন এখানে আসবেন তখন তার কফি গরম অবস্হায় পরিবেশন করতে।

আমি আমার ভুলে লজ্জ্বিত হই। হুজুর আসার পূর্বেই তার জন্য সেখানে কফি নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি কারণ সেটি ঠান্ডা হয়ে যাবে। হুজুরের স্ত্রী হুজুরের প্রতিটি সামান্য  বিষয়ের প্রতিও লক্ষ্য রাখেন দেখে আমি অবাক হলাম।

কিছুক্ষণ পর হুজুর আসলে আমি হুজুরের জন্য কফি আনতে যাই। দুর্ভাগ্যবশত সার্ভিস স্টেশনে কফি পরিবেশনের কাপ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি হুজুরের কফি সাধারণ একটি মগে করে নিয়ে যাই। হুজুরকে এভাবে কফি দেবার জন্য আমি বিব্রতবোধ করছিলাম। কিন্তু হুজুর আমাকে এ বিষয়ে কোন চিন্তা না করতে বলেন। হুজুরের স্ত্রী আমাকে পাশের একটি টেবিলে বসতে বলেন। তখন ওমাইর আলিম আমার জন্য কাগজের কাপে করে কফি নিয়ে আসে। হুজুর বলেন “তোমার উচিৎ ছিল আমাকে এরকম একটি কাপে কফি দেয়া। এসব স্হানে আমি এই ধরণের কাপে কফি খেতেই পছন্দ করি।”

আমি হুজুরকে বললাম যে তাহলে আমি কাগজের কাপে আর এক কাপ কফি নিয়ে আসি। হুজুর হেসে বললেন “তার কোন প্রয়োজন নেই। তুমি কি চাও আমরা সারাদিন এখানে বসেই কাটিয়ে দেই।”

এটি হুজুরের সাধারণ জীবন যাপনের একটি নমুনা, যে হুজুর এসব স্হানে মগের চেয়ে কাগজের কাপেই কফি খেতে পছন্দ করেন।

সেখানে আমি কিছু কেক ও ডোনাট দেখলাম এবং ভাবলাম হুজুর ও তার স্ত্রীর জন্য কিছু নিয়ে যাই। কিন্তু এক দল বলল যে হুজুর এরকম কেক পছন্দ নাও করতে পারেন। তাই হুজুর ও তার স্ত্রী কফির সাথে কেবল বিস্কিট খেলেন।

পরবর্তীতে আমি এ জন্য আফসোস করি; হয়তবা হুজুর কেক পছন্দ করতেন। পূর্বের সফরে আমি লক্ষ্য করেছি যে আহমদ ভাই হুজুরকে বিভিন্ন প্রকার খাবার পরিবেশন করতেন। হুজুর কিছু খেতেন এবং বাকিগুলো কাফেলা সদস্যদের খাবার জন্য ফেরত পাঠাতেন। নিঃসন্দেহে বলা যায় আমি এ ব্যাপারে আহমদ ভাইয়ের চেয়ে কম অভিজ্ঞ এবং আমার আত্মবিশ্বাসেরও অভাব রয়েছে।

হুজুর কফি খাবার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে সুইডেন কেমন লাগছে। আমি বলি যে আমি মসজিদের বাইরে কোথাও যাইনি। হুজুর বলেন “আমরা ৬ ঘন্টা ধরে গাড়িতে আছি। এ সময় কি তুমি কিছুই দেখতে পাওনি? ”

 

আমি লজ্জ্বিত হলাম এবং চিন্তা করলাম হুজুরকে বিভিন্ন দেশ এভাবেই গাড়ির জানালার কাচের মধ্যে দিয়ে দেখতে হয়। কারণ বেশির ভাগ সময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখার কোন আলাদা সময় বরাদ্দ থাকে না। ডেনমার্ক ও সুইডেনেও এরকম কোন বিরতি নেই।

 

স্টকহোমে আগমন

সার্ভিস স্টেশন থেকে আরো ৪৫ মিনিট ড্রাইভিং এর পর আমরা স্টকহোমে এসে পৌছলাম। সেখানে আমরা হোটেল শেরাটনে উঠলাম। একদিন বৃষ্টির পর তখন আবহাওয়া রৌদ্দজ্জ্বল ছিল। হোটেলটি শহরের মাঝখানে ছিল। তাই সেখানে যাবার পথে আমরা অনেক সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং দেখতে পাই। আমার মনে হল পুরো শহরটি পানি দ্বারা বেষ্টিত। আমি পরবর্তীতে জানলাম যে স্টকহোমকে ‘উত্তরের ভেনিস’ বলা হয়। আমি অবশ্য কখনো ভেনিসে যাইনি।

হুজুর সন্ধ্যা ৭.৫৫ মিনিটে হোটেলে পৌছান। সেখানে কিছু স্হানীয় আহমদী ও জামাতের সদস্যগণ হুজুরকে স্বাগত জানান। এরপর হুজুর ও তার স্ত্রী তাদের রুমে যান। এবারও আমি ও মোবারক জাফর সাহেব এক রুমে থাকছি।

হোটেলে একটি রুমে আমাদের রাতের খাবার দেয়া হয়। এরপর হুজুর মাগরিব ও এশার নামায আদায় করান। সারাদিন লম্বা সফরের পর আমি ভেবেছিলাম ফযরের পূর্ব পর্যন্ত ঘুম দিব। এই সফরে ফযরের নামায ৪:০০-৪:১৫ মিনিটের মধ্যে হয়ে থাকে। তাই আমি মুনীর জাভেদ সাহেবকে ফযরের নামাযের সময় জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন যে ফযরের নামায ৩ টায় হবে। প্রথমে আমি মনে করলাম যে আমি হয়ত ভুল শুনেছি। তাই আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম। তিনি আবার বললেন যে ৩ টার সময় নামায। আমি অনেক ক্লান্ত ছিলাম তাই ৫ টি এলার্ম সেট করলাম। সৌভাগ্যবশত প্রথম এলার্মেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।

 

একজন বয়স্ক আহমদীর বয়াত গ্রহণের কাহিনী

১৭ মে ২০১৬ হুজুর কিছু আহমদীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেদিন ৭২ বছরের একজন সু্‌ইডিশ আহমদী মোহাম্মদ ইউসুফ সাহেব হুজুরের সাথে দেখা করেন। হুজুরের সাথে সাক্ষাতের পরই আমি তার সাথে কথা বলি। তিনি ৫ বছর পূর্বে বয়াত করেন। তিনি বলেন একদিন তিনি সুইডেনের রাস্তা দিয়ে হাটছিলেন। তখন হঠাৎ করে তুমুল বৃষ্টিপাত শুরু হয়। তিনি আশ্রয়ের স্হান খুঁজতে থাকেন। পাশেই একটি আহমদী স্টল ছিল। তিনি সেখানেই আসেন।  উপস্হিত একজন আহমদী তাকে একটি লিফলেট পড়তে দেন। ইউসুফ সাহেব বলেন “আমি লিফলেটটি পড়ি এবং সেখানে দুইটি বাক্য আমার অনেক ভাল লাগে। সেগুলো হল ভালবাসা সবার তরে, ঘৃণা নয় কারো পরে এবং তরবারীর জিহাদ নয়, কলমের জিহাদ

“পাঁচ বছর পর আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে আমি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম। বর্তমান বিশ্বে যে অরাজকতা চলছে আহমদীয়াত তার থেকে আমাদের শান্তির পথে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে।”

মুসলমান হবার পর তার পরিবার ও বন্ধুরা অনেক দুঃখ পেয়েছিল। এখনো অনেকে এটি বিশ্বাস করতে পারেন না। কিন্তু এখন অনেকেই দেখতে পাচ্ছেন যে আহমদীরা অত্যন্ত দয়ালু ও শান্তিপ্রিয় মানুষ। তাই এখন পরিস্হিতি পূর্বের চেয়ে ভাল। তিনি বলেন যে এখন তার অমসুলমান স্ত্রী রমযান মাসে তার ইফতারীর জন্য বিশেষ খাবার রান্না করেন।

 

আহমদীদের আবেগ

আমি একজন আহমদী জিসান খুররাম(৩৫ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি রাবওয়ার অধিবাসী হলেও ২০১০ সালে সুইডেন চলে আসেন। তিনি খিলাফতের পূর্বে কয়েকবার হুজুরকে রাবওয়াতে দেখেছিলেন। কিন্তু খলীফার সাথে তার এটিই প্রথম সাক্ষাৎ। তিনি বলেন “১৯৯৭ সালে আমি হুজুরকে প্রথম দেখি যখন তিনি নাযির এ আলা নির্বাচিত হন। তখন থেকেই তিনি অনেক আধ্যাত্মিক ব্যক্তি ছিলেন। আমি তখন খুব অল্পবয়্স্ক ছিলাম, তখন তাকে দেখেই আমার হৃদয়ের উপর গভীর প্রভাব পড়েছিল। ”

“আমার যখন ৭ বছর বয়স তখনই আমার বাবা মারা যায়। আমাদের পরিবারের কোন অর্থ ছিল না। তাই আমার পড়ালেখার জন্য আমরা জামাতের কাছে আবেদন করি। প্রাথমিকভাবে আমার আবেদন গৃহীত হয়নি। তারপর আমি সরাসরিভাবে খলীফাতুল মসীহ(রাবেঃ) কাছে পত্র লিখি। তিনি আমার আবেদন মঞ্জুর করেন। আমাদের বর্তমান খলীফা তখন নাযির এ আলা ছিলেন; তিনি আমাকে সেই অর্থ প্রদান করেন।”

“আমি সাক্ষ্য দিতে পারি যে খলীফাতুল মসীহ এতিমদের কথা চিন্তা করেন ও তাদের ভালবাসেন। তিনি তাদের ভালবাসা দেন, আশ্রয় দেন এবং হেফাযত করেন।”

তিনি অশ্রুসিক্ত অবস্হায় বলেন “আমি শপথ করে বলছি যে আমি আমার জীবন, সম্পত্তি ও সবকিছু খলীফাতুল মসীহর জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। কারণ খলীফাতুল মসীহই আমাকে রক্ষা করেছিলেন যখন আমার কিছুই ছিল না।”

 

আমি এক তরুণ দম্পত্তির সাথে কথা বলি। তারা হলেন আসহার ওয়াসীম(২৯ বছর) সাহেব ও তার স্ত্রী ফাইকা নুদরাত সাহিবা। তার লাহোরের অধিবাসী। তারা দুজনেই হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করে অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। ফাইকা সাহিবা বলেন “আমি আমার হাসি থামাতে পারছিনা। হুজুরের সাথে সাক্ষাতের মুহুর্তগুলো এক সেকেন্ডেই শেষ হয়ে গেল। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমি হুজুরের সাথে দেখা করেছি। আমি বুঝতে পারছি এখন আমার রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু এটি ভাল লক্ষণ কারণ আমি মনে করি হুজুরের সাথে দেখা করে আমার আধ্যাত্মিকতা বৃদ্ধি পেয়েছে।”

 

তিনি হাসতে হাসতে বলেন যে হুজুরের সামনে তার স্বামী কথাই বলতে পারছিলেন না। আমি বললাম যে এটি কোন ব্যাপার নয়। কারণ আমি নিয়মিত হুজুরের সাথে দেখা করি; কিন্তু তারপরও মাঝেমাঝে আমি হুজুরের সামনে কথা বলতে পারি না।

 

আমি তিনজন নতুন আহমদীর সাথে কথা বলি। আয়মান(২২ বছর) ও আলমাস(২৭ বছর) সিরিয়া ও ইরাক থেকে শরণার্থী হিসেবে সুইডেনে এসেছে। জেসাস মারিটনেজ(৫৫ বছর) হলেন দক্ষিণ আমেরিকার অধিবাসী। তারা হুজুরের সাথে দেখা করে অনেক আনন্দিত ছিলেন। তারা বলেন যে আহমদীয়াত গ্রহণের ফলে তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। সিরিয়া থেকে আগত আয়মান সাহেব বলেন

“আজ হুজুরের সাথে দেখা করে আমি অনেক আবেগআপ্লুত হয়ে গেছি। তিনি অনেক জ্ঞাণী ও দয়ালু ব্যক্তি। তিনি অনেক গভীর প্রজ্ঞাসম্পন্ন কথা বলেছেন। আমরা সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে কথা বলি। হুজুর বলেন যে যারাই নিষ্ঠুরতা করছে তারা ইসলামিক শিক্ষাবিরোধী কাজ করছে এবং এটি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না।”

ইরাক থেকে আগত আলমাস সাহেব দুই বছর পূর্বে আহমদীয়াত গ্রহণ করেন। তিনি বলেন “আমি এত আনন্দিত যে কথা বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার চোখে আনন্দের অশ্রু। আমি আজ খলীফার সাথে দেখা করেছি যিনি অনেক দয়ালু। তিনি আমাদের সকলকে দিক নির্দেশনা দেন। তার সাথে দেখা করা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহুর্ত।”

জেসাস মার্টিনেজ সাহেব বলেন “আমি মাত্র তিন মাস পূর্বে আহমদীয়াত গ্রহণ করেছি। এত তাড়াতাড়ি হুজুরের সাথে দেখা করে আমি নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করছি। হুজুরের মতো একজন ধার্মিক মানুষের সাথে দেখা করে আমার ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি শুনে অদ্ভুত মনে হতে পারে কিন্তু আমি ইতোমধ্যেই আমার মধ্যে এক প্রকার পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। আমার মনে হচ্ছে আমি আল্লাহর আরো কাছে চলে এসেছি।”

 

কিছু বরকতময় মুহুর্ত

মোলাকাত পর্ব শেষ হবার পর হুজুর আমাকে তার অফিসে ডাকেন। আমি হুজুরকে বলি যে আমি একজন জার্মান খাদিম এর সাথে কিছুদিন পূর্বে কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন যে হুজুর বক্তব্য দেবার সময় মাঝেমাঝে নোট দেখে পড়েন। তিনি বলেছিলেন খলিফাতুল মসীহ রাবে(রঃ) নোট ছাড়া পড়তেন। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন স্হানে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের সময় তিনি দেখেছেন যে হুজুরের বক্তব্য সকলের উপর কিরকম গভীর প্রভাব ফেলে। তাই তিনি তার পূর্বের চিন্তাধারার জন্য লজ্জ্বিত। হুজুর বলেন “প্রতিশ্রুর মসীহ(আঃ) কে আল্লাহপাক বলেছেন যে “তোমাকে সম্মানিত করা হয়েছে” যদি আমরা বিশ্বাস করি যে এই প্রতিশ্রুতি এখনো বহাল আছে এবং খলীফাদের সাথেও আল্লাহর সাহায্য রয়েছে; তাহলে খিলাফতে ওয়াক্ত কিভাবে বক্তব্য দিচ্ছে সেটি কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কারণ মহান আল্লাহপাক সবসময়ই তাকে সাহায্য করবেন।”

হুজুর এরপর আমাকে বলেন যে কেন তিনি নোট দেখে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন “আমি যদি নোট দেখে না বলি তখন আমার বক্তব্য বেশি দীর্ঘায়িত হয়ে যায়। যখন আমি জামেআ আহমদীতে বক্তব্য দেই তখন আমি কোন নোট ছাড়াই দেই। আমার ইচ্ছা থাকে যে ১০-১৫ মিনিট কথা বলব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার বক্তব্য ৪০-৪৫ মিনিট লম্বা হয়।”

 

হুজুর বলেন যে সেদিন স্টকহোমে তার একটি বক্তব্য দেবার কথা। প্রাথমিকভাবে কথা ছিল হুজুর সুইডেনের কালমার শহরে যেয়ে বক্তব্য দিবেন। কিন্তু কিছু সমস্যার কারণে সেটি বাতিল করা হয়। হুজুর বলেন “কালমারে আমার যে বক্তব্য দেবার কথা সেটি আমি কিছুটা পরিবর্তন করেছি এবং আজকে সন্ধ্যায় এখানে সেটি বলব। আমি যে নোট তৈরী করেছিলাম ইনশাল্লাহ সেটি অন্য কোন অনুষ্ঠানে বলা যাবে।”

আমি হুজুরকে বলি যে এই সফরের পর হুজুর আমাকে ক্যালিফোর্নিয়ার খোদ্দাম ইজতেমায় অংশগ্রহণের জন্য ইউএসএ যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি বলি যে আমার বন্ধু আমির সফীর সাহেব( রিভিই অফ রিলিজিয়নস এর এডিটর) দুই মাস ধরেই ইউএসএ আছেন। তিনি সেখানকার খোদ্দামদের মধ্যে অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। আমি চিন্তা করছি যে তার তুলনায় আমার কথা তাদের কাছে অত্যন্ত একঘেয়ে লাগবে।

এসব সামান্য জিনিস নিয়ে চিন্তা করার জন্য হুজুর আমার প্রতি কোনরকম বিরক্তি প্রকাশ করেননি। বরং তিনি আমার প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও ভালবাসা দেখান। তিনি আমার বক্তব্যের বিষয় জানতে চান। আমি বলি যে আমার বক্তব্যের বিষয় হল ‘খিলাফতের বরকত’।

 

হুজুর বলেন “বক্তব্যের শুরুতে খোদ্দামদের মনে করিয়ে দিবে যে পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সাঃ) এর ভবিষ্যতবাণী অনুযায়ী আহমদীয়াত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা যদি জীবন্ত খোদায় বিশ্বাস করি তাহলে আমাদের এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে খিলাফতের সাথে সবসময়ই আল্লাহর সাহায্য রয়েছে।”

“তারপর তাদের বলবে যে খিলাফতের সাথে সফরে তুমি কি কি বরকত লক্ষ্য করেছ। তোমার কিছু অভিজ্ঞতা তাদেরকে বলো। তুমি যেসব অমুসলমান ও অ-আহমদীদের সাথে কথা বলেছো তাদের কথা বলো; যে কিভাবে খলীফার কথা শুনে ইসলামের প্রতি তাদের নেতিবাচক চিন্তাধারা পরিবর্তন হয়েছে। ”

 

“তাদেরকে এই সফরে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠানে মহিলার কথা বলবে। যার স্বামী মনে করেছিল আমাদের অনুষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলা হবে। কিন্তু অনুষ্ঠানের পর তাদের চিন্তা পুরোপুরি পরিবর্তন হয়েছে।”

 

আমি হুজুরের দিক নির্দেশনার জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। হুজুরের এই ব্যস্ত সফরে আমি তার কাছে থেকে এত বিস্তারিত নির্দেশনা আশা করিনি। হুজুরের নির্দেশনার কারণেই ইউএসএ তে আমার বক্তব্য আমার ধারণার চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।

হুজুরের সাথে কাটানো সেই মুহুর্তগুলো অনেক মূল্যবান। মাঝেমাঝে আমার মনে হয় যে হুজুর আমার প্রতি অসুন্তষ্ট। গত দুই-তিন দিন ধরে আমার মনে এই চিন্তা ছিল। তাই হুজুরের সাথে সেই সময় কাটানোর ফলে আমর মন থেকে দুশ্চিন্তা দূর হয়েছে।

হুজুর আমার প্রতি আসলেই অসুন্তষ্ট ছিলেন কিনা তা আমি জানি না। কিন্তু আমি মনে করি মাঝে মাঝে এরকম মনে হওয়া ভাল। কারণ এতে আমার ইসতেগফার ও আল্লাহর ইবাদতের প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।

 

হুজুরের মিডিয়া সাক্ষাতকারের প্রতিক্রিয়া

সেদিন সকালে সুইডেনের আমীর সাহেব হোটেলের লবিতে আমার দিকে আসেন। তাকে কিছুটা চিন্তিত মনে হচ্ছিল। তিনি আমাকে জানান সুইডেনে সরকারী দল (সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল) জামাতকে জানিয়েছে যে তারা সেদিনের সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে না। পূর্বে জানানো হয়েছিল যে কয়েকজন সংসদ সদস্য অনুষ্ঠানে আসবেন। কারণ হুজুর সুইডিশ সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে বাইবেল ও কোরআনের শিক্ষা সমকামিতা সমর্থন করে না। সরকারী দল বলেছে যে তারা এতে হতাশ হয়েছে এবং এজন্য তারা অনুষ্ঠানে আসবে না।

কয়েক মিনিট পর হুজুর আসলে আমীর সাহেব তাকেও খবরটি জানান। হুজুর বলেন “তারা ব্যাপারটিকে রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করছে। সরকারী দল মনে করে যে সমকামিতা সমর্থন করে তারা তাদের দলকে রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু তারা ভুল করছে; প্রকৃত কথা হল তারা এর ফলে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছে।”

 

হুজুরের বক্তব্য অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। সবসময়ের মতো হুজুর এবারও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখেছেন। তিনি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও প্রজ্ঞার সাথে কোনরকম আপোষ করেননি।

আমার মনে কোন সন্দেহ ছিল না যে সন্ধ্যার অনুষ্ঠান অনেক বরকতময় হবে। কিন্তু সরকারী দলের এরকম অদূরদর্শী চিন্তাধারায় আমি হতাশ হয়েছি। সুইডেনে জামাতের শান্তিপূর্ণ ইতিহাস রয়েছে। সমাজে আমাদের অনেক অবদান রয়েছে। কিন্তু সরকার সবকিছু ভুলে যেয়ে একটি বিষয়েরই উপর তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যা খুবই দুঃখজনক।

সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে সরকারী দলের একজন সংসদ সদস্যা(মিসেস হিলেভি লারসন) এসেছিলেন। তিনি সুন্দর একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন স্হানে আহমদীদের উপর যে অত্যাচার হচ্ছে তার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলেন। তিনি বলেন যে এত অত্যাচার সত্ত্বেও আহমদীগণ সবসময় ভালবাসা ও শান্তির বাণী ছড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি বিশ্বে শান্তির বাণী প্রচারের জন্য হুজুরের প্রশংসা করেন। তিনি জানান যে হুজুরকে সুইডেনে স্বাগত জানাতে পেরে তিনি আনন্দিত।

তার দলের অন্যান্য সদস্যরা যেখানে আমাদের অনুষ্ঠান বর্জন করেছিল সেখানে তার এরকম বক্তব্য আমার অত্যন্ত ভাল লেগেছে। হুজুরও তার বিশ্বস্ততা ও সাহসের প্রশংসা করেছেন।

হুজুর আমাকে বলেন “আমি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলের এমপি কে বলেছি যে আমি আজ ভেবেছিলাম যে আপনার দল শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আপনি একাই অনুষ্ঠানে উপস্হিত হয়ে এবং আপনার বক্তব্য দিয়ে আপনার দলকে রক্ষা করেছেন। আমি আশা করি ও দোয়া করি যে আপনি যেন আপনার দলের নেতা হতে পারেন।”

আমি এ বিষয়টি প্রকাশ করব কিনা এ নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। তাই আমি সুইডেনে হুজুরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করি। হুজুর বলেন “অবশ্যই তুমি এটি প্রকাশ করবে। তুমি পরিস্কারভাবে এ বিষয়ে লিখবে যেন লোকজন এ ব্যাপারে আমাদের অবস্হান ও বিশ্বাস জানতে পারে। ”

 

স্টকহোমে পরিভ্রমণ

বিকেলে জোহর ও আসরের নামাযের পর কয়েক ঘন্টা সময় ছিল। তাই যখন অন্যান্য কাফেলা সদস্যরা দুপুরের খাবার খাচ্ছিল আমি তখন আমার কোট নিয়ে একটু হাটাহাটি করার জন্য বের হলাম। আমার কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না। সেটি অনেক সুন্দর রৌদ্দজ্জ্বল দিন ছিল, তাই হাঁটতে খুব ভালই লাগছিল। এক ঘন্টা হাটার পর আমি আবার হোটেলের দিকে হাঁটা শুরু করি। আসার পথে আমি দোকান থেকে বাসার জন্য কিছু উপহার নেই।

 

সম্মানিত অতিথির সাথে মিটিং

সন্ধ্যায় সুইডেন জামাত একটি অত্যন্ত সফল একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের পূর্বে কিছু সম্মানিত অতিথি হুজুরের সাথে কথা বলার সুযোগ পান। তারা হুজুরকে প্রশ্ন করেন ও বিভিন্ন বিষয়ে তার দিকনির্দেশনা চান। একজন অতিথি হুজুরের কাছে জামাত বিশ্বে শান্তি প্রচেষ্টায় যে কাজ করছে তা সম্বন্ধে জানতে চান। হুজুর বলেন “আমাদের লক্ষ্য হল বিশ্বকে রক্ষা করা এবং সমগ্র মানবজাতির মধ্যে শান্তি ছড়িয়ে দেয়া। আমরা শান্তি, ভালবাসা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ একটি পৃথিবী রেখে যেতে চাই। যত বাধা বিপত্তিই আসুক না কেন আমরা আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখব।”

একজন সংসদ সদস্য বলেন যদি কেউ কারো দ্বারা অত্যাচারিত হয় তাহলে সে তার প্রতি ঘৃণা ও প্রতিহিংসার আচরণ করে থাকে। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করেছেন যে আহমদী মুসলমানরা সম্পূর্ণ অন্যরকম। তারা যে কোন পরিস্হিতিতেই ধৈর্য্য ধারণ করে থাকে। হুজুর বলেন “আমরা আহমদী জামাতের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মাহদী(আঃ) এর শিক্ষা অনুসরণ করছি। তিনি আমাদের ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা ও ভালবাসার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে জয় করতে শিখিয়েছেন। তাই আমরা কখনো উগ্র আচরণ করি না এবং আইনকে আমাদের হাতে তুলে নেই না। ”

 

স্টকহোম অনুষ্ঠান

সন্ধ্যা ৭.১৫ মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হয়। কোরআন তিলাওয়াত ও সুইডেনে আমীর সাহেবের বক্তব্যের পর কিছু অতিথি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রদান করেন। একজন অতিথি হিললেভি লারসন(সংসদ সদস্য) তার বক্তব্যে বলেন “আমি কোনভাবেই বুঝতে পারি না যে আহমদী মুসলমানদের কেন অত্যাচার করা হয়। আর এটি তো কোনভাবেই মেনে নিতে পারি না যে যারা অত্যাচার করছে তারাও মুসলমান। কিন্তু ঘৃণার প্রতিদান আপনারা সবসময়ই ভালবাসা দিয়ে দিয়েছেন। যুদ্ধের বিপরীতে আপনারা শান্তি স্হাপনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।”

 

ভালটার মাট (গ্রীন পার্টির সংসদ সদস্য) বলেন “আপনারা আহমদীরা কেবল শান্তির কথাই বলেন না, যেমনটি কিছু রাজনীতিবিদ করে থাকেন। বরং আপনারা শান্তি স্হাপনে সবসময় কাজ করে যাচ্ছেন। ”

 

হুজুরের বক্তব্য

অতিথিদের বক্তব্যের পর হুজুর তার বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি ইউরোপে শরণার্থীদের নিয়ে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তার বিস্তারিত সমাধান দেন। হুজুরের সামাধান অত্যন্ত সময়োপযোগী ছিল; কারণ সুইডেন অন্যান্য দেশের তুলনায় (জার্মানী ব্যতীত)অনেক বেশি শরণার্থী গ্রহণ করেছে (১লাখ ৬০ হাজার)।

হুজুর সাহায্যকারী দেশ ও শরণার্থী উভয়ের দায়িত্ব সম্বন্ধে বলেন “শরণার্থীরা শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য তাদের দেশ ছেড়ে এখানে এসেছে। এই দেশ তাদেরকে সেই নিরাপত্তা ও আশ্রয় দান করেছে। তাই এখন তাদের আবশ্য কর্তব্য এখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা এবং দেশের আইন কানুন মেনে চলা।”

“আমি সরকারকে বলব তারা যেন লক্ষ্য রাখেন যে দেশের স্হানীয়দের অধিকার যেন কোনভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। এটি খুবই সংবেদনশীল বিষয় এবং অনেক সাবধানতার সাথে এটির প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ এর ফলে যদি স্হানীয়দের মনে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে কোন ঘৃণা তৈরী হয় তাহলে দ্রুত সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ”

 

“শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে হবে ও তাদের দেখাশোনা করতে হবে। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে যে তারা যেন স্হানীয়দের থেকে বেশি সুযোগ সুবিধা না পায়। তাহলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। এতে স্হানীয়রা শরণার্থীদের একঘরে করে দিবে এবং এতে তারা উগ্রপন্থী মতবাদের দিকে ঝুঁকে পড়বে। ফলে পরিস্হিতি দ্রুত আয়ত্বের বাইরে চলে যেতে পারে।”

 

হুজুর কোরআনের আলোকে বিশ্ব শান্তি স্হাপনের মূলতত্ত্ব ব্যাখা করেন। হুজুর বলেন “প্রকৃত শান্তি স্হাপনের মূল বিষয় হল সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।”

হুজুর শক্তিধর দেশসমূহ ও জাতিংঘের মতো সংগঠনের দায়িত্ব সম্বন্ধে বলেন “জাতি সংঘ সনদ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে বিংশ শতাব্দীতে ২য় বিশ্ব যুদ্ধের মতো একটি ভুল থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা তাদের মূল দায়িত্ব। এত বড় একটি দায়িত্ব হাতে নিয়ে জাতিসংঘের উচিৎ বিশ্ব শান্তি স্হাপনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা। ”

 

“আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিৎ; আমরা কি চাই না আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে? নাকি আমরা তাদের জন্য যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত ও দুঃখময় একটি পৃথিবী রেখে যাব? ”

 

হুজুরের বক্তব্যের প্রভাব

অনুষ্ঠানে আমি বিভিন্ন অতিথিদের সাথে কথা বলি। আমি ইরাক থেকে সুইডেনে আসা সালাম নামে খৃষ্টান শরণার্থীর সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “ইরাকে খলীফার(হযরত মাশরুর আহমেদ) মতো একজন মানুষও নেই; যিনি সত্য কথা বলেন এবং বিশ্বে প্রকৃতই যা কিছু হচ্ছে তা মানুষের কাছে প্রকাশ করেন। ইরাকিরা যদি খলীফার কথা শুনতো তাহলে আমাকে আমার দেশ ছেড়ে এখানে এসে সুইডিশদের থেকে ভিক্ষা চাইতে হতো না।”

মিসেস সালিবা নামে একজন অতিথি বলেন “খলীফার বার্তা অত্যন্ত পরিস্কার ছিল। একে অন্যকে সম্মান করো। নিজেদের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে তা সানন্দে মেনে নাও; সেগুলোকে ব্যবহার করে বিবাদ সৃষ্টি করো না। তিনি বিশ্ব শান্তি স্হাপনের জন্য যে লড়াই করছেন আমি তার প্রশংসা করি। ”

একজন সুইডিশ অতিথি গোরাম সাহেব বলেন “আমার খুব ভাল লেগেছে যে তিনি বলেছেন যদি শরনার্থীদের দেখভাল না করা হয় তাহলে বিশ্বে ঘৃণার একটি দুষ্ট চক্র ছড়িয়ে পড়বে। বিশ্বে যে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে তিনি তা বন্ধ করতে চান। আমি তার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।”

অ্যারন নামে একজন অতিথি খুব আবেগপ্রবণ ছিলেন। তিনি বলেন “এরকম শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমি পূর্বে কখনো আসিনি। সকল স্তরের মানুষ একজন মুসলমান নেতার শান্তির বার্তা শুনতে এখানে এসেছে। এটি আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। তিনি সত্যিই একজন মহান নেতা এবং ইতিহাসের পাতায় তার স্হান হওয়া উচিৎ।”

 

স্টকহোমের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য মাত্র দুই সপ্তাহের সময় পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু তারপরও এটি অত্যন্ত সফল ও বরকতপূর্ণ অনুষ্ঠান ছিল যেখানে খলীফাতুল মসীহ ইসলামের শান্তিপূর্ণ শিক্ষাকে সুন্দরভাবে প্রচার করতে পেরেছেন।

 

মিষ্টান্ন খাবার

অনুষ্ঠানের খাবারও বড়ই সুস্বাদু ছিল। প্রধাণ খাবার ছিল আলুর সাধে গ্রিল স্যালমন। আমি স্যালমন খেতে খেতে চিন্তা করছিলাম যে প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল অতিথিদের লঙ্গরখানার এশিয়ান খাবার পরিবেশন করা হবে। সৌভাগ্যবশত এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়; কারণ স্টকহোম থেকে এখানে খাবার আনতে যানজটের জন্য দেরী হয়ে যেতে পারে। যানজটের কারণে আমি কখনো এত খুশি হইনি।

গ্রিল স্যালমন অনেক সুস্বাদু ছিল। কিন্তু খাবারের সাথে কোন মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়নি। তাই নামাযের পর আমি আমার রুমে যেয়ে কিছু চকোলেট খেয়ে মিষ্টি খাবার স্বাদ নিবারণ করি। নামাযের পর আমি দেখলাম অনেকেরই আমার মতো অবস্হা। তারা সকলেই ভাবছে যে মিষ্টান্ন কোথায় গেল। আমরা জানলাম যে খাবারের পর মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়েছে; যখন আমরা হল থেকে বের হয়ে এসেছিলাম। সৌভাগ্যবশত তখনো অনেক খাবার বাকি ছিল। তাই প্রায় সকল কাফেলা এবং সুইডেন জামাতের সদস্য পুনরায় হল রুমে ফিরে গেল।

 

মূল্যবান মুহুর্ত

রাত ৯.২৫ মিনিটে হুজুর হল রুম থেকে বের হন। মাগরিব ও এশার নামায শুরু হতে আরো ২০ মিনিট সময় ছিল। কিন্তু হুজুর তার রুমে না যেয়ে আমাদের নামাযের জন্য নির্ধারিত রুমের বাইরে রাখা সোফাতে বসলেন। কিছুক্ষণ পর একজন আমাকে বলল যে হুজুর আমাকে ডাকছেন। আমি হুজুরের কাছে গেলে হুজুর আমাকে তার পাশে বসতে বললেন।

হুজুর বলেন “অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়েছে। তারপরও অনেক অতিথিই এসেছেন এবং অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমও যদি আসত তাহলে আরো ভাল হতো। ”

হুজুর সংবাদমাধ্যম নিয়ে আমীর সাহেবের সাথে কথা বলেন। হুজুর ভেবেছিলেন  সমকামিতা সম্বন্ধে তার বক্তব্য সরকারের পছন্দ হয়নি দেখে জামাত ইচ্ছে করেই সংবাদমাধ্যমকে দাওয়াত দেয়নি। কিন্তু আমীর সাহেব বললেন যে ব্যাপারটি তা নয়। মিডিয়াকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাদের প্রধাণ আগ্রহ ছিল মালমোতে মসজিদ উদ্ধোধন।

হুজুর বলেন যে সুইডেন শরণার্থীদের দ্বারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্হ হয়েছে। তাই আমি এই বক্তব্যে কিভাবে এই সমস্যা সমাধান করা যায় তা ইসলামিক শিক্ষার আলোকে ব্যাখ্যা করেছি।

আমি হুজুরকে আমার অতিথিদের সাথে যে কথা হয়েছে তা বলি। একজন অতিথি বলেছেন “আপনাদের খলীফা সুইডেন সম্বন্ধে বেশ কিছু কথা বলেছেন যার অনেক কিছু আমি নিজেই জানতাম না।”

 

হুজুর বলেন “একজন সংসদ সদস্য আমাকে বলেছেন যে আমি আমার বক্তব্যে সুইডেনের একটি স্হানীয় সংবাদের কথা উল্লেখ করেছি যার সম্বন্ধে তার কোন ধারনাই ছিল না।”

এরপর হুজুর বলেন “স্টকহোমে দিন অনেক বড় কারণ মাগরিবের সময় হল রাত ৯.৪৫ মিনিট ও ফযরের সময় হল ভোর ৩ টা। ”

আমি হুজুরকে বললাম যে মুনীর জাভেদ সাহেব যখন আমাকে বললেন ফযরের নামায ৩ টার সময় তখন আমি ভাবলাম তিনি আমার সাথে ইয়ার্কি করছেন।

আলহামদুলিল্লাহ, হুজুরের সাথে কাটানো মুহুর্তটি অনেক মূল্যবান ছিল। সফল অনুষ্ঠানের পর হুজুরকে সন্তুষ্ট মনে হচ্ছিল।

 

বরকতপূর্ণ ২য় সপ্তাহ

আলহামদুলিল্লাহ, হুজুরের স্ক্যান্ডেনেভিয়া সফরের ২য় সপ্তাহ শেষ হল। এটি অত্যন্ত বরকতময় সপ্তাহ ছিল। হুজুর মাহমুদ মসজিদ উদ্বোধন করেছেন; মালমো ও স্টকহোমে অতিথিদের বক্তব্য প্রদান করেছেন; মিডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং বিভিন্ন মিটিং করেছেন। হুজুর অনেক আহমদীর সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ করেছেন।

আমি হুজুরের স্টকহোমের বাকি দিনগুলো এবং গুটেনবার্গ সফরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি