Menu

হুজুরের (আইঃ) জাপান সফর ২০১৫ ব্যক্তিগত ডায়েরী

[হুযুর (আইঃ) এর জাপান সফরঃ আবিদ খান সাহেবের ব্যক্তিগত ডায়েরী। ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদকৃত]

ভুমিকা

১৬ নভেম্বর ২০১৫, হুজুর ও তার কাফেলা ৮ দিনের জাপান সফর শুরু করেন। এ সময় হুজুর জাপানের বায়তুল আহাদ মসজিদের উদ্বোধন করবেন। হুজুর ও তার স্ত্রী সহ মোট নয় জন সদস্য সফরে ছিলেন। এদের মধ্যে পাঁচজন নিরাপত্তা দলের সদস্য ও বাকিরা হুজুরের অফিসের সদস্য। এছাড়া হুজুর নাদিম আমিনী সাহেবের অনুরোধে তাকে কাফেলার সদস্য হবার অনুমতি দেন। কিন্তু তাকে তার নিজের ব্যয়ভার বহন করতে হবে। পূর্বেও তিনি হুজুরের ইউরোপ সফরে ড্রাইভারের দ্বায়িত্ব পালন করেছেন।

হুজুরের ভালবাসা এবং সফরের প্রস্তুতি

সফরের পূর্বে হুজুর আমাকে কয়েকবার জাপান সফরের কথা বলেছেন। একদিন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে আমি সফরে গেলে আমার স্ত্রী মালার কোন অসুবিধা হবে কিনা। আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিল। তাকে কোন প্রয়োজনে হাসপাতালে যেতে হতে পারে। আমার ছেলে মাহিদের দেখাশনার জন্য কেউ আছে কিনা। আমরা এ ব্যাপারে কি কি ব্যবস্হার কথা চিন্তা করে রেখেছি তা আমি হুজুরকে বলি। হুজুর সেদিন আর কিছু বলেননি। কিন্তু পরের দিন হুজুর আমাকে জাপান সফরের জন্য প্রস্তুত হতে বলেন।

আমি এই সফরের জন্য বড়ই আগ্রহী ছিলাম। ২০১৩ সালে আমার হুজুরের সাথে জাপান সফরের সৌভাগ্য হয়েছিল এবং আমি হুজুরের সফরের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও ফলাফল লক্ষ্য করেছি।  ব্যক্তিগতভাবে আমার জাপান ও জাপানীজদের অনেক পছন্দ হয়েছে। গতবার জাপান সফরের পরে লন্ডনে যেয়ে আমি ভেবেছিলাম যে; হয়ত ১৫-২০ বছরের আগে আমার আর জাপান যাওয়া হচ্ছে না। তাই মাত্র দুই বছরের মধ্যেই আবার জাপান সফর আমার জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্য ও বরকতের বিষয়।

সফরের কয়েকদিন পূর্বে হুজুর জিজ্ঞেস করেন যে আমার গোছগাছ শেষ হয়েছে কিনা। হুজুর বলেন আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী খুব বেশি শীত পড়বে না। কিন্তু তারপরও আমাকে একটি সোয়েটার নিতে বলেন। হুজুর বলেন “আমি জানি তুমি ফুল হাতা সোয়েটার পছন্দ কর। কিন্তু আমার হাফ হাতা সোয়েটারই পছন্দ কারণ এটি আচকান কোটের সাথে পরা আরামদায়ক।”

ঘুম থেকে উঠে সময়মত মসজিদে পৌঁছানো

আমাকে ১৬ নভেম্বর সকাল ৮টার মধ্যে মসজিদ ফযলে পৌছাতে বলা হয়েছিল। আমি এ ব্যাপারে অত্যন্ত চিন্তিত ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল যে আমি সেসময় ঘুমিয়েই থাকব। তাই আমি আমার মোবাইলে কমপক্ষে দশটি এলার্ম ঠিক করি, আমার স্ত্রী মালাকেও তাই করতে বলি। আমার এক বন্ধুকেও বলি যে আমাকে ফোন দিয়ে জাগিয়ে দিতে।

সৌভাগ্যক্রমে প্রথম এলার্মেই আমি উঠে পড়ি। আমি বের হবার সময় আমার ছেলে মাহিদ ঘুমাচ্ছিল। এতে আমি খুশিই হলাম; কারণ আমাকে বের হতে দেখলে তার মন খারাপ হয়ে যেত।

আমি আমার স্ত্রী মালার কাছ থেকে বিদায় নেই। সে নয় মাসের সন্তানসম্ভবা ছিল। আমি ভেবেছিলাম আমি জাপান সফর করে এসে দেখব আমাদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে।

সাধারণত মসজিদ ফযল যেতে ২০-২৫ মিনিট সময় লাগে। তাই আমি ৭.১০ মিনিটে বের হই। কিন্তু রাস্তায় জ্যামের কারণে আমি ৭.৫০ মিনিটে মসজিদে পৌছাই। আমি ঠিক করি যে এরপর থেকে আরো আগে বের হব।

মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু এবং হিথ্রো এয়ারপোর্টে সামান্য বিরতি

হুজুর ও তার স্ত্রী ৮.১৫ মিনিটে বের হন। নীরব দোয়ার পর আমাদের কাফেলা হিথ্রো এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। সকাল ৯টায় আমরা এয়ারপোর্টে পৌছলাম। সেখানে আমরা এক ঘন্টার মতো অপেক্ষা করি। ইউকে জামাতের আমীর রফিক হায়াত সাহেব হুজুরকে বিদায় জানাতে এয়ারপোর্ট এসেছিলেন। তাই আমি তার সাথে সে সময় কিছুদিন পূর্বে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে আলাপ করি।

আমরা একমত হই যে এর ফলে ইউরোপে ইসলামবিরোধী অনুভূতি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এর ফলে আমাদের জামাতের প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা প্রচার করার সুযোগ পাওয়া যাবে।

একটি লম্বা প্লেন ভ্রমণ

আমি জাপান সফরের জন্য যতটা উদগ্রীব ছিলাম; ১২ ঘন্টা প্লেন জার্নির জন্য ততটা আনন্দিত ছিলাম না। নির্ধারিত সময় ১০:৪৫ মিনিটে প্লেন উড্ডয়ন করে। আমি চেয়েছিলাম করিডোরের পাশের সিটে বসতে। কিন্তু আমি জানালার পাশের একটি সিট পেলাম। আমার একপাশে একজন অপরিচিত ব্যক্তি ও অন্যপাশে মোবারক জাফর সাহেব। এর ফলে সিট থেকে বের হওয়া আমার জন্য একটু অসুবিধাজনক হয়ে গেল। তাই পুরো ফ্লাইটে আমি মাত্র একবার সিট থেকে উঠেছিলাম।

প্লেনে আমি বিভিন্ন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি। প্রথমে আমি পত্রিকা পড়ি। এরপর আমাদের হালকা নাশতা দেয়া হয়। আমি টিভি দেখি; তারপর দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয়। প্লেনেই আমি জোহর ও আসরের নামায পড়ে একটু ঘুমিয়ে নেই। এভাবে অনেকগুলো কর্মকান্ড সমাপ্ত করার পর আমি সামনের মনিটরে আমাদের প্লেনের বর্তমান অবস্হান দেখি। আমি ভেবেছি এতক্ষণে নিশ্চয়ই আমরা জাপানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। কিন্তু আমি খুবই হতাশ হই; কারণ জাপান পৌছাতে আরো ৯ ঘন্টা সময় লাগবে।

পুরো দিনের নামায ও একটি পুরনো স্মৃতি

জাপানের সময় ইউকে থেকে নয় ঘন্টা এগিয়ে রয়েছে। তাই আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামায আমাদের সিটে বসেই আদায় করি।

এসময় আমার একটি পুরনো স্মৃতির কথা মনে পড়ে। একবার হুজুর লস এঞ্জেলেস সফর শেষে লন্ডনে ফিরছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে আমার সিট হুজুরের সিটের কাছেই ছিল। সেটি একটি রাতের ফ্লাইট ছিল। সারারাত হুজুর নামায ও কোরআন শরীফ পাঠ করছিলেন। তিনি একদমই টিভি দেখেননি। হুজুর রিভিউ অফ রিলিজিয়নস এর নতুন সংখ্যা পড়েছিলেন।

জাপানে আগমন

আলহামদুলিল্লাহ আমাদের সফর নিরাপদেই সম্পন্ন হল। প্লেন হানেডা এয়ারপোর্টে সকাল ৭টায় অবতরণ করে। আমি প্লেন থেকে বের হয়ে দেখি যে হুজুর ও তার স্ত্রী বের হয়ে গেছেন। লম্বা প্লেন জার্নি সত্ত্বেও হুজুরকে সতেজ লাগছিল। আমি বড়ই ক্লান্তবোধ করছিলাম। কিন্তু আমি এটা ভেবে আনন্দিত ছিলাম যে আমরা জাপানে পৌঁছে গেছি।

ইমিগ্রেশনে আমাদের পাসপোর্ট চেক করে সিল মারা হয়। এয়ারপোর্টের দরজায় সদর জাপান আহমদীয়া ও মোবাল্লেগ ইনচার্জ আনিস নাদিম সাহেব ও জাপানের অন্যান্য আহমদীগণ হুজুরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে অন্যান্য দেশ থেকে আগত কিছু আহমদীও উপস্হিত ছিলেন।

ফুলের তোড়া

একজন আহমদী আতফাল হুজুরকে একটি ফুলের তোড়া দেয়। হুজুর সেটি আহমদ ভাইকে দেন। যেহেতু আমি আহমদ ভাই এর কাছে ছিলাম তই তিনি আমাকে সেটি দেন এবং হোটেল পর্যন্ত আমার কাছে সেটি রাখতে বলেন।

হুজুর, তার স্ত্রী ও কিছু কাফেলা সদস্য এরপর একটি লিফটে উঠেন। হুজুরের স্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে আমার ফ্লাইট কেমন লেগেছে। আমি বললাম “আমি খুব কমই ঘুমিয়েছি। তাই আমার মনে হচ্ছিল যে সময় যেন থেমে রয়েছে।” আমাকে সেই ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে থাকতে দেখে হুজুর বলেন

“এত বড় ফুলের তোড়া উপহার পাওয়ার আনন্দে তুমি ঘুমাতে পারনি।” হুজুরের কথা শুনে লিফটের সবাই হেসে ফেললাম।

হোটেলে আগমন

এয়ারপোর্ট থেকে আমরা হিলটন হোটেলে যাই। এটি টোকিওর বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্হিত। হুজুরের রুম ছিল ১২ তলায়। অন্যান্য কাফেলা সদস্যগণও একটি তলায় ছিল। আমি হুজুরের পাশের রুমেই ছিলাম। আহমদ ভাইও আমার সাথে পুরো সফরে একই রুমে ছিলেন। আমি ছোট বারান্দায় যেয়ে টোকিও শহরের সৌন্দর্য দেখি। একটি জিনিস আমি বুঝতে পারি না। সেখানে অনেক বিশাল বিশাল অট্টালিকা ও সামুদ্রিক দৃশ্যের মাঝে একটি স্ট্যাচু অফ লিবার্টির অনুলিপি রয়েছে। আমার মনে হল জাপানে আমারিকার ভালই প্রভাব রয়েছে।

সকালের নাশতার পরে আমরা কয়েক ঘন্টার জন্য আরাম করলাম। সত্যি কথা বলতে আমি যখন ঘুম থেকে উঠলাম তখন কয়টা বাজে এ সম্পর্কে আমার মাথা কাজ করছিলনা। সৌভাগ্যক্রমে গোসলের পর আমার মাথা কাজ করা শুরু করে।

মেইজি মন্দির ভ্রমণ

শিবুইয়া বিভাগের টোকিও শহরের মেইজি মন্দির ভ্রমণের জন্য হুজুরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেটি সম্রাট মেইজি ও তার স্ত্রীর জন্য একটি স্মৃতিসৌধ। তিনি ১৯ শতকের শেষ ও ২০ শতকের শুরুর দিকে জাপান শাসন করেছিলেন।

সম্রাট মেইজি জাপানের সকলের কাছেই অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তার সময়ে তিনি জাপানে অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন এবং জাপানকে একটি বিশ্ব শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাই তার মৃত্যুর পর তার সম্মানে ১৯১২ সালে এই মন্দির বানানো হয়। এটি ৭০০,০০০ বর্গমিটার জায়গা নিয়ে বানানো এবং এখানে ১২০,০০ টি গাছ রয়েছে।

প্রায় সময়ই যখন বিশ্বনেতারা জাপান সফর করেন তখন তারা মেইজি মন্দির থেকেই তাদের সফর শুরু করেন।

টোকিওতে ২০ মিনিট গাড়ী চালানোর পর দুপুর ৩ টার সময় আমরা মেইজি মন্দিরে পৌছলাম। সেখানে একজন তরুণ ধর্মযাজক ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে হুজুরকে অভ্যর্থনা জানান। জামাতের একজন কাছের বন্ধু ড: মাইক সাটা হুজুরকে স্বাগত জানান। তিনি একজন ব্যবসায়ী এবং তিনি লন্ডনে হুজুরের সাথে দুইবার সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি ২০১০ সালের ইউকে জলসা সালানায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যও দিয়েছিলেন।

বনভূমি দিয়ে পদভ্রমণ

আমরা প্রায় অর্ধেক মাইলের মত পথ অত্যন্ত সুন্দর বনভূমির মধ্য দিয়ে হেটে যাই। তরুণ ধর্মযাজক আমাদের গাইড হিসেবে কাজ করছিলেন। তিনি হুজুরকে মন্দিরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে বলছিলেন। রাস্তাটি খুব সুন্দর ছিল, একস্হানে কিছু স্হানীয় ফুল ফুঁটে রয়েছে। হুজুর তার ফোন বের করে জানতে চাইলেন যে এখানে ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে কিনা। অনুমতি পাবার পর হুজুর তার ফোন দিয়ে কিছু ছবি তুলেন। আমি নিশ্চিত যে বেশীরভাগ মানুষই অনুমতি না নিয়েই ছবি তুলেন। কিন্তু হুজুরের নৈতিকতার মান অনেক উঁচু স্তরের। তাই তিনি অনুমতি নিয়েই ছবি তুলেছেন।

আমরা এক স্হানে দেখলাম অনেকগুলো বড় ব্যারেল সারি করে রাখা রয়েছে। ধর্মযাজক আমাদের জানালেন যে এখন এগুলো খালি। কিন্তু এখানে সাকে রাখা হয়। এটি হল এক প্রকার মদ যেটি জাপানে বহুল ব্যবহৃত হয়।

পরবর্তী এক সপ্তাহে আমি দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করলাম যে মদ; জাপানী সংস্কৃতি ও তাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। হুজুর আমাকে বলেছেন যে একজন জাপানী তাকে বলেছে “জাপানে ইসলাম প্রবেশের একটি বিরাট বাধা হল যে ইসলাম মদ পান করার অনুমতি দেয় না।”

স্হানীয় প্রথাকে হুজুরের সম্মান

হুজুর একটি বড় বাশের তৈরী বেসিনের কাছে যান, যেটি পানিতে পূর্ণ ছিল। জাপানের একটি ঐতিহ্যগত প্রথা হল মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে অতিথিগণ এখানে তাদের হাত ও মুখ পরিস্কার করে। আমার মনে হল এটি ইসলামের ওযূ করার মতো একটি ব্যাপার। তাদের প্রথাকে সম্মান প্রদর্শন করতে হুজুর সেখানে হাত ও মুখ পরিস্কার করেন। এতে হুজুর একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেন; কোন প্রথা যদি ইসলামবিরোধী না হয় তাহলে সেটি পালন করে তাদের প্রথাকে সম্মান প্রদর্শন করা উচিৎ।

তাওহীদের বাণী প্রচার

হুজুর মন্দিরের প্রধাণ কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে সহকারী প্রধান পুরোহিত শিগেহিরো মিয়াজাকি হুজুরকে অভ্যর্থনা জানান। শিগেহিরো মিয়াজাকি কে পুরো জাপানে অনেক সম্মান করা হয়। তিনি বলেন হুজুরকে স্বাগত জানাতে পারা তার জন্য অনেক বড় সম্মানের বিষয়।

তিনি হুজুরকে মন্দিরের প্রার্থনা কক্ষ, চারপাশের বন ও গাছপালা দেখান। তিনি বলেন শিনটো ধর্মমতে চারপাশের প্রকৃতি আল্লাহর কাছে পৌছানোর একটি মাধ্যম।

তারা মনে করে প্রকৃতির বিভিন্ন জিনিস যেমন পানি, গাছ, বাতাস ইত্যাদি স্বর্গ থেকে এসেছে। এসব জিনিসকে তারা আল্লাহর পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তারা এসব জিনিসকে কামি বা আল্লাহ বলে থাকে। এটি শুনে হুজুর বলেন “বিশ্বের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও দৃশ্যাবলী আমাদের এক আল্লাহর মহত্ত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যিনি এই মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন। সকল প্রাকৃতিক জিনিসই আল্লাহতা’লার অস্তিত্বের প্রমাণ। ”

এপরর তিনি হুজুরকে একটি ছোট কাঠের উপর কিছু বার্তা লেখার জন্য আমন্ত্রণ জানান। মন্দিরের অতিথিরা এরকম কাঠের উপর বার্তা লিখে থাকেন। হুজুর তার এই বার্তায় আল্লাহর একত্ববাদের বার্তা প্রচার করেন এবং কিভাবে আল্লাহই সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা তা লিখেন। তিনি সূরা নূরের ৩৬ নম্বর আয়াতের উল্লেখ করে লিখেন “পৃথিবী ও আকাশের নূর হল আল্লাহ।”

সম্রাট মেইজি সম্বন্ধে হুজুর লিখেন “হে আল্লাহ, সম্রাট মেইজিকে এই দেশ ও বিশ্বে শান্তি স্হাপনের জন্য পুরস্কৃত কর।”

মেইজি মন্দিরে ভিডিও প্রদর্শনী

এপর হুজুরকে একটি হল রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সহকারী পুরোহিত সাহেব হুজুরকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানান। তিনি মেইজি মন্দির সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন। এপর আমরা একটি ৩০ মিনিটের ভিডিও দেখি। সেখানে সম্রাট মেইজির জীবন ও এই মন্দিরের নির্মাণকৌশল ও নির্মাণের উদ্দেশ্য দেখানো হয়। প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি মানুষ নিজেদের পরিশুদ্ধ করার জন্য এখানে আসেন। নতুন বছরের শুরুতে এখানে সবচেয়ে বেশী ভিড় হয়। তখন প্রায় ৩০ লাখ মানুষ এখানে আসেন।

ভিডিও দেখানোর সময় হুজুর সদর জামাত জাপানের কাছে জানতে চান যে এই ভিডিও মহিলাদের দিকেও দেখানো হচ্ছে কিনা। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় হুজুর, তার স্ত্রীর ও মহিলাদের প্রতি কতটা সম্মান প্রদর্শন করেন।

আলহামদুলিল্লাহ এই ভ্রমণ অত্যন্ত আনন্দদায়ক ছিল। একজন সফরকারী হিসেবে জাপানীদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।

হুজুর যেভাবে আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার করেছেন, যেখানে তাদের ধর্মীয় মতবাদ ইসলাম থেকে পুরোই আলাদা, সেটি সত্যিই অসাধারণ।

ড: সাটার আমন্ত্রণ

মন্দির থেকে আমরা মেইজি কিনেনকান যাই। এটি একটি রিসোর্ট, যেটি মন্দিরের মালিক পরিচালনা করেন। সেখানে বিয়ে ও সভা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেখানে ড: মাইক সাটা হুজুরের সম্মানে রাতের খাবারের আয়োজন করেন।

হুজুর একটি উপবৃত্তাকার টেবিলের মাঝে বসেছিলেন। তার ডানে ছিলেন ড: সাটা। আমাদের কাছে এটি স্পষ্ট ছিল যে ড: সাটা, হুজুর ও আহমদী জামাতকে অনেক সম্মান করে। ডিনারের পূর্বে তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি বলেন “২০০৯ সালে আমি ও আমার মেয়ে লন্ডন সফর করেছিলাম। তখন হুজুর তাদের জন্য ডিনারের আয়োজন করেন। আমি একটি ব্যাপারে আভিভূত হয়েছি যে হুজুর আমাদের জাপানী সংস্কৃতির দিকে লক্ষ্য লেখে আমাদের জন্য সুশি খাবারের ব্যবস্হা করেন।”

আমি লন্ডনের সেই ডিনারে উপস্হিত ছিলাম। আমার মনে ছিল হুজুরের এত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তখন তিনি ড: সাটার সাথে দুই ঘন্টা সময় কাটিয়েছিলেন।

উদ্বোধনী বক্তৃতায় ড: সাটা আরো বলেন যে তনি ২০১০ সালের ইউকে জলসায়ও উপস্হিত ছিলেন। তিনি জলসার আইডি কার্ডও বের করেন; এটি তিনি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পাঁচ বছর ধরে রেখে দিয়েছেন।

মেইজি কিনেনকান এ হুজুরের বক্তৃতা

ড: সাটার পর হুজুর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন “আমার মনে আছে ২০১৩ সালে আমি যখন জাপান এসেছিলাম তখনও ড: সাটা আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তাই তিনি আমাদের একটি ঐতিহ্য অনুসরণ করছেন তা হল “যখন কারো সাথে বন্ধুত্ব হয় সেটি সারা জীবনের জন্য।” আমি আশা করি ও দোয়া করি এই বন্ধুত্ব যেন আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মেও অক্ষুন্ন থাকে। ”

“মসীহ মাউদ(আঃ) তার জীবদ্দশায় ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যে আহমদীয়াত যেন জাপানে প্রকৃত ইসলামের প্রচার করতে পারে। আমি দেখেছি জাপানীরা খুবই উন্নত মনের মানুষ। আমি দোয়া করি তাদের এই গুণাবলী যেন তাদেরকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা বোঝার ও মানার তৌফিক দান করে।”

দশ পদের খাবার

পরবর্তী ৯০ মিনিট আমাদের জাপানের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবারের মেনু দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই কারণ সেখানে দশ পদের খাবার ছিল। বেশিরভাগ খাবারের নামই আমি আগে শুনিনি। তাই আমি নতুন খাবার চেখে দেখার জন্য বড়ই আগ্রহী ছিলাম।

আমাদের দুই প্রকার স্যুপ দেয়া হল। সাথে ছিল বিভিন্ন সামুদ্রিক খাবার, সুশি, ছোট চারকোনা করে কাটা মাংস। বেশিরভাগ খাবারই অত্যন্ত সুস্বাদু ছিল। যদিও দুই একটি খাবার আমার ব্যক্তিগত স্বাদের সাথে যায়নি।

একটি খাবারের ব্যাপারে আমি অনেক আশঙ্কায় ছিলাম। সেটি হল “চাইনীজ কচ্ছপের স্যুপ”। আমি কচ্ছপ খাবার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সেটি আসার পর আমি খাবারটির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলাম। কচ্ছপের মাংস একত্রে মিশিয়ে গোলাকার বল বানিয়ে সেটিকে স্যুপের মধ্যে দেয়া হয়েছিল। আমি ভাবছিলাম যে এটি খাব কিনা। তখন দেখলাম যে হুজুর বেশ স্বাভাবিকভাবেই এই স্যুপ খাচ্ছেন। তখন আমি ভাবলাম আমারও এটি অবশ্যই চেখে দেখা উচিৎ। আমি অবাক হলাম কারণ এটির স্বাদ আসলেই অসাধারণ ছিল।

পরবর্তীতে আমি হুজুরকে কচ্ছপ খাবার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি। হুজুর বলেন যে এটি খেতে তার কোন সমস্যা হয়নি এবং পূর্বে পাকিস্তানেও তিনি এটি খেয়েছিলেন। হুজুর সামুদ্রিক খাবার খুব পছন্দ করেন। হুজুর পরে এক সময় আমাকে বলেন “জাপানের আহমদী লাজনাগণ মাঝেমধ্যেই কিছু স্হানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করে পাঠাতো। একদিন তারা আমার জন্য অক্টোপাসের স্যুপ পাঠায়।”

আমি হুজুরকে জিজ্ঞেস করি যে অক্টোপাসের স্যুপ কি ভাল লেগেছিল। হুজুর বলেন যে “হ্যা। সকল প্রকার সামুদ্রিক খাবারই আমার পছন্দ।”

চপস্টিক ও ওয়াসাবী(জাপানীজ গাছ)

খাবার জন্য আমাদেরকে চপস্টিক দেয়া হয়েছিল। আমি এবং কয়েকজন নিরাপত্তা দলের সদস্য সেগুলো ব্যবহার করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সুবিধা করতে পারছিলাম না। পূর্বেও আমি চপস্টিক ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কোন লাভ হয়নি। এবার আমি কয়েক মিনিট চেষ্টা করে ওয়েটারকে চামচ ও ছুরি দিতে বলি।

একসময় আমি দেখলাম হুজুর চপস্টিক ব্যবহার করছেন। তাকে এ ব্যাপারে নিশ্চিতভাবেই আমার চেয়ে দক্ষ বলে মনে হল। আমাদের যখন সুশি দেয়া হল তখন মুনীর জাভেদ সাহেব আমাকে বললেন যে ওয়াসাবী অনেক ঝাল। আমি সেটি চেখে দেখলাম যে আসলেই এটি ইংল্যেন্ডের ওয়াসাবীর থেকে অনেক ঝাল হয়েছে। হুমায়ুন সাহেব বললেন যে পাকিস্তানী মরিচ এর চেয়ে অনেক বেশী ঝাল, তার তুলনায় এই ওয়াসাবী কিছুই নয়।

কুদ্দুস সাহেব বলেন যে তাহলে আপনি একবারেই পুরো ওয়াসাবী খেয়ে ফেলুন। হুমায়ুন সাহেব বললেন যে এটি কোন সমস্যাই নয়। এই বলে পুরো ওয়াসাবী একবারেই মুখে ঢেলে দিলেন। এরপরের দৃশ্য দেখে আমি না হেসে পারলাম না। হুমায়ুন সাহেব কিছুক্ষণ এমন ভাব করলেন যে এতে কোন ঝালই নেই। কিন্তু এরপর তিনি কয়েক মুহুর্ত পরপরই পানি খেতে লাগলেন। তার পানি গ্লাস শেষ হওয়া মাত্রই তিনি ওয়েটারকে দ্রুত আরো পানি দিতে বলছিলেন।

হুজুরের কৌতুকবোধের একটি উদাহরণ

সন্ধ্যায় হোটেলের একটি মিটিং রুমে মাগরিব ও এশার নামায আদায় করা হয়। নামাযের পর আমরা লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখন হুজুর আমাদের একটি ঘটনা বলেন। হুজুর আমার ডায়েরীতে হল্যান্ড সফরের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন।

হল্যান্ডে আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার আমিনী সাহেব হুমায়ুন সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন যে রাস্তা দিয়ে কোন গাড়ী আসছে নাকি। তিনি অনেক আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন যে “না”। তাই নাসির গাড়ি বের করে ডান দিকে ঘুরে যায়। কিন্তু সেমসয় সে দেখে যে অনেক বড় ও শক্তিশালী একটি ট্র্যাক্টর আমাদের খুব কাছ দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। সেটির সাথে ধাক্কা লাগলে আমরা নিশ্চিতভাবেই মাটির সাথে মিশে যেতাম। আমরা হুমায়ুন সাহেবের দিকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম। কিন্তু তিনি শান্তভাবে হাসতে হাসতে বললেন “তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে যে, কোন গাড়ী আসছে নাকি। এটি একটি ট্র্যাক্টর, গাড়ী নয়।”

আমরা লিফটে প্রবেশের পর হুজুর আমার হাত ধরে আমাকে বলেন “আমার মনে হয় না হুমায়ুন সাহেবের তোমার সাথে কোন শত্রুতা রয়েছে। মনে হয় তার শত্রুতা মুনীর জাভেদ সাহেবের সাথে।” হুজুরের কথা শুনে আমরা অনেক হাসলাম।

এটি খুবই আনন্দঘন মুহুর্ত ছিল। হুজুর সফরের সময় তার ভালবাসা ও কৌতুকবোধের মাধ্যমে সফরসঙ্গীদের প্রাণবন্ত রাখেন।

ট্রেন স্টেশনে সিকিউরিটি চেক

হোটেলের রুমে এসে আমি খুবই ক্লান্ত হয়ে গেলাম। কিন্তু আহমদ ভাইকে তখন ট্রেন স্টেশনে সিকিউরিটি চেক করতে যেতে হবে। হুজুর কাল সকলে সেখানে থেকে যাত্রা করবেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যে আমি তার সাথে যেতে চাই কিনা। আমি তার প্রস্তাবে আনন্দিত হলাম কারন এতে আমি টোকিও শহরের রাতের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পাব।

স্টেশনে পৌঁছে আহমদ ভাই দেখলেন যে; হুজুর ও তার স্ত্রী কোন কোন পথ দিয়ে স্টেশনে প্রবেশ করতে পারেন। তিনি দেখলেন কোন পথ দিয়ে আসতে কত সময় লাগে এবং স্হানীয় স্টেশন কর্মকর্তার সাথেও আলাপ করলেন। তিনি সকল ব্যবস্হা নিয়ে সন্তুষ্ট হবার পর আমরা বের হলাম। তখন প্রায় রাত ১১টা বাজে। কিন্তু তখনও স্টেশনে কালো স্যুট পরিহিত লোকজন দিয়ে পূর্ণ ছিল। তারা কাজ শেষে অফিস থেকে বাসায় ফিরছিল। স্হানীয় একজন খোদ্দাম আমাদের বলে যে জাপানীরা প্রায়ই রাত করে ঘরে ফিরে এবং কাল সকাল ৬টায় আবার তারা স্টেশনে আসবে কাজে যাবার জন্য।

টোকিও স্টেশনে হুজুরের সাথে কিছু সময়

১৮ নভেম্বর হুজুর ও তার কাফেলা বুলেট ট্রেন দিয়ে টোকিও থেকে নাগোয়া তে যাবেন। সেখানে জাপান জামাতের প্রধান অফিস রয়েছে। আমরা সকাল ১০:৩৫ মিনিটে টোকিও স্টেশনে পৌছলাম। কিন্তু আমাদের ট্রেন আসবে ১১.২৭ মিনিটে। হুজুর তখন স্টেশনের ভিতর পায়চারী করছিলেন। হুজুর আমাকে তার কাছে ডাকেন এবং পরবর্তী ২০ মিনিট আমার হুজুরের সাথে কিছু সময় কাটানোর সৌভাগ্য হয়।

একসময় হুজুর কিছু স্কুলগামী জাপানীজ তরুণ-তরুণীদের দেখতে পান। তাদের দেখে হুজুর বলেন “তারা খুব শান্ত এবং সুশৃঙ্খলভাবে হেঁটে চলেছে। তারা দুজন দুজন করে একজনের পিছনে আর একজন রয়েছে। তারা কোনরকম তাড়াহুড়ো করছে না। জাপানীজ বাচ্চাদেরও অসাধারণ শিষ্টাচার রয়েছে।”

ছেলদের দলের পিছনে মেয়েদের দল আসছিল। এটা দেখে হুজুর বললেন “তারা যদি মুসলমান হতো তাহলে লোকজন বলতো যে মুসলমানরা মেয়েদের পিছনে হাটতে বলে তাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। কিন্তু জাপানীজদের বেলায় এটা খুবই সাধারণভাবে দেখা হচ্ছে।”

আমি হুজুরকে কয়েকজনের কথা বলি যারা আমার লেখা হুজুরের হল্যান্ড-জার্মানী সফরের ডায়েরী পড়েছেন। হুজুর বলেন “ডায়েরীতে তুমি লিখেছ যে হল্যান্ডে আমি নামায কসর করিনি। কিন্তু জার্মানীতে ৫ দিনের সফরে যে আমি নামায কসর করেছি সেটি উল্লেখ করোনি।”

হুজুর একদম ঠিক কথা বলেছেন, আমি এই কথা ভুলে গিয়েছিলাম। তিনি জাপানেও নামায কসর করেছিলেন। আমি বললাম যে “আমি জার্মানীতে মির্যা করিম সাহেবের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছি। কিন্তু তখন আমি জানতাম না যে তিনি প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর পরিবারের একজন সদস্য।”

হুজুর বলেন “আমি লক্ষ্য করেছি যে তুমি লিখনি যে তিনি আমার আত্মীয়। আমি ভেবেছি এটি তুমি ইচ্ছা করেই দাওনি। তিনি আমার প্রথম কাজিন এবং তোমার শ্বাশুড়ীরও প্রথম কাজিন। ”

আমি হুজুরের কথা শুনে হাসলাম কারণ আমি জানতামই না যে জার্মানীতে আমি যার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তিনি আমার শ্বাশুড়ীর অত্যন্ত কাছের আত্মীয়; এবং তারও আমার সম্বন্ধে কোন ধারণা ছিল না।

 

হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে গতদিনের দশপদের খাবার আমার কেমন লেগেছে। আমি বলি যে খাবার অত্যন্ত ভাল হয়েছিল। হুজুর বলেন “আমি ড: সাটাকে বলি যে এরপর যখন আপনি লন্ডন আসবেন তখন আমাকে অবশ্যই ১২ পদের খাবার পরিবেশন করতে হবে।”

হুজুরের কথা শুনে আমি হাসলাম কিন্তু এই কথার মাধ্যমে হুজুরের বিনয় ও অতিথিপরায়ণতা প্রকাশ পায়।

হুজুরের স্ত্রীর প্রতি তার উদ্বেগ ও সম্মান

হুজুর আহমদ ভাই এর কাছে ট্রেনের প্ল্যাটফর্মের দূরত্ব সম্বন্ধে জানতে চান। হুজুর আহমদ ভাইকে সবচেয়ে কম দূরত্বের পথে যেতে বলেন যাতে হুজুরের স্ত্রীকে কম পথ হাটতে হয়। হুজুরের স্ত্রীর হাঁটুতে ব্যথা রয়েছে। তাই হুজুর সবসময় লক্ষ্য রাখেন যেন তাকে সবসময় কম পথ হাটতে হয়। হুজুর যখন তার স্ত্রীর সঙ্গে হাটেন তখন তিনি তার স্ত্রীর সাথে একসাথে হাটার জন্য তাঁর গতি কমিয়ে ফেলেন।

আমি যখনই তাদেরকে একসাথে হাটতে দেখি তখন আমার একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। কয়েক বছর পূর্বে আমি ও আমার স্ত্রী মালা মসজিদ ফযলের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হুজুর আমাদের হাটতে দেখেন এবং পরবর্তীতে আমাকে বলেন “আমি আমার জানালা দিয়ে দেখলাম যে তুমি ও মালা হাটছ। তোমার উচিৎ ছিল তার পাশাপাশি হাটা। কিন্তু তুমি তা না করে, তার সামনে সামনে হাটছিলে। যদি সে আস্তে হাটে তাহলে তুমিও আস্তে হাটবে।”

বুলেট ট্রেন যাত্রা

আরো একবার বুলেট ট্রেনে যাত্রার জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। ২০১৩ সালের জাপান সফরের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হল হুজুরের সাথে বুলেট ট্রেন যাত্রা।

নির্ধারিত সময়ে ট্রেন আসল। আমরা হুজুর ও তার স্ত্রীকে অনুসরণ করলাম। আমি ও আহমদ ভাই; হুজুর ও তার স্ত্রীর সিটের পিছনের সিটে বসলাম। টিকেট চেকের পর একজন কিছু খাবারের ট্রলী নিয়ে আসেন। হুজুর একটি বাদামের প্যাকেট কিনেন। কয়েকটি নেবার পর বাকি প্যাকেট তিনি কাফেলার সদস্যদের জন্য দিয়ে দেন। এরপর হুজুর একটি চিপসের প্যাকেটও কিনেন। কয়েকটি নিয়ে সেটিও তিনি আমাদের দিয়ে দেন।

যাত্রার সময় হুজুর আমাকে তার কাছে ডাকেন। আমি হুজুর কাছে যেয়ে হাটু গেড়ে বসি। কিন্তু সেটি যেহেতু দুই সিটের মাঝের করিডোর ছিল তাই একটু পরপরই ট্রেনের কর্মকর্তা আসছিল এবং আমি তাকে জায়গা দেবার জন্য সরে আসছিলাম। এরকম যখন তৃতীয়বারের মতো হল তখন হুজুর আমাকে আমার সিটে যেতে বললেন।

যাত্রার শেষের দিকে আলীম সাহেব ও মুনীর ওদেহ সাহেব ছবি ও ভিডিও করার জন্য হুজুরের অনুমতি চান। অনুমতি নিয়ে তারা ট্রেনে হুজুরের ছবি ও ভিডিও করে যেটি পরবর্তীতে এমটিএতে দেখানো হয়।

নাগোয়া আগমন

দুপুর ১টায় আমরা নাগোয়াতে আসলাম। আমরা সরাসরি নাগোয়া হিলটন হোটেলে চলে আসলাম। এখানেই আমরা পরবর্তী কয়েকদিন থাকব। আমরা ২৪ তলায় ছিলাম। এবারও আল্লাহর রহমতে আমার ও আহমদ ভাই এর হুজুরের পাশের রুমে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল।

বায়তুল আহাদ মসজিদে প্রথম সফর

বিকেলে হুজুর বায়তুল আহাদ মসজিদ যান। এটি হোটেল থেকে ২০-২৫ মিনিটের দূরত্বে। একজন মালয়শিয়ান যোহর ও আসরের নামাযের জন্য আযান দিতে গেলে হুজুর বলেন “মালয়শিয়ান কেন? জাপান জামাতের কোন সদস্য কেন আযান দিবে না?”

হুজুরের কথা শুনে জাপানের সদর সাহেব একজন স্হানীয় খাদেমকে আযান দিতে বলেন। এভাবে একজন জাপানীজ আহমদী জাপানের প্রথম আহমদী মসজিদে হুজুরের প্রথম নামাযের আযান দেবার সৌভাগ্য অর্জন করে।

আহমদীদের আবেগ ও অনুভূতি

সন্ধ্যায় হুজুর কিছু পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। অন্যান্য দেশ যেমন মালয়শিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও অনেক আহমদীও জাপানে এসেছিলেন। তাই তারাও হুজুরের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পায়।

আমি মালয়শিয়া থেকে আগত একজন তরুন আহমদী মুনীব আহমদ(২১বছর) এর সাথে কথা বলি। তার সফর সম্বন্ধে সে বলে “এখানে আসতে আমার ৬ ঘন্টা প্লেন ভ্রমণ করতে হয়েছে। জাপান আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হল হুজুরের সাথে দেখা করা। এখানে আসার জন্য আমাকে আমার চাকুরী ছেড়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু সেটি কোন ব্যাপার নয়। কারণ আমি জানি হুজুরের সাথে সাক্ষাতের বরকতে আমি ইনশাল্লাহ আরো ভাল চাকুরী পাব।”

 

আমি ইন্দোনেশিয়ার বন্ধুবৎসল ও হাসিখুশি একজন আহমদীর সাথে কথা বলি। তার নাম আব্দুল কাফি(৬৪ বছর)। তার সাথে কথা বলার পুরো সময়টাই তিনি হাসছিলেন। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে জীবনের এতগুলো বছর পর হুজুরের সাথে দেখা করে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি বলেন “হুজুরের সাথে সাক্ষাতের সময় আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল। আমি অত্যন্ত আনন্দিত ছিলাম। সাধারণত আমি অনবরত কথা বলতে পারি। কিন্তু হুজুরের সামনে আমি কোন কথাই বলতে পারছিলাম না। আমি হুজুরের সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞায় আভিভূত। হুজুর অত্যন্ত বিনয়ী এবং তিনি আমাদের প্রচন্ড ভালবাসেন। হুজুরের সাথে সাক্ষাত করতে পারাকে আমি আল্লাহর পরম বরকত বলে মনে করি। ”

ইন্দোনেশিয়ার একজন আহমদী আব্দুল নাসির(৪৮ বছর) সাহেব বলেন  “আমি ৩০০০ কিমি পথ অতিক্রম করে এখানে এসেছে। আমি কসম খেয়ে বলছি এখানে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হুজুরের সাথে দেখা করা ও তার পিছনে নামায আদায় করা। আমার আর কোন ইচ্ছা নেই। হুজুরের সাথে কয়েক মুহুর্ত আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমরা ইন্দোনেশিয়ার আহমদীগণ নিজেদের বঞ্চিত মনে করি। কারণ হুজুর আমাদের দেশে সফর করতে আসতে পারেন না। তাই আমরা হৃদয় দিয়ে দোয়া করি যেন পরিস্হিতি পরিবর্তন হয়ে যায় এবং হুজুর আমাদের দেশে আসতে পারেন।”

একটি আবেগময় সাক্ষাৎ

আল্লাহর রহমতে আমি বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অনেক আহমদীর সাথে কথা বলেছি। বিগত বছরগুলোতে তাদের অভিজ্ঞতা কি তা শুনেছি। সবচেয়ে আবেগময় কাহিনী আমি শুনেছি নাগোয়াতে ইন্দোনেশিয়া থেকে আগত একজন মহিলা ইনা সখিনা গুনাওয়ান এর কাছ থেকে।

২০১১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী ইন্দোনেশিয়ার আহমদী মসজিদে লোকজনের হামলায় তিনজন আহমদী শহীদ হন। সেসময় স্হানীয় প্রশাসন ও পুলিশ পাশেই দাড়িয়ে ছিল। কিন্তু তারা কোন পদক্ষেপ নেই নি। শহীদ তিনজন আহমদীর একজন ইনা সাহিবার স্বামী ছিলেন।

আমি যখন তার সাথে কথা বলছিলাম তখন আমি তার এই পরিচয় জানতাম না। এই আক্রমনের এক বছর পর তার আবার বিয়ে হয়। তার নতুন স্বামী আমাকে তার অতীত ইতিহাস বলেন। তখন আমি ইনা সাহিবাকে তার শহীদ স্বামী চন্দ্রা মোবারক সাহেব সম্বন্ধে জানতে চাই। তিনি বলেন “মোবারক সাহেবের সাথে বিয়ের পর আমি অনেক দিন মা হতে পারছিলাম না। আলহামদুলিল্লাহ ৮ বছর পর আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করেন। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় যখন আমার স্বামী শহীদ হন তখন আমি পাঁচ মাসের সন্তান সম্ভবা। তাই তিনি তার ছেলেকে দেখে যেতে পারেননি।”

তিনি একটি ছোট ছেলেকে দেখান যে পাশেই খেলা করছিল। তিনি বলেন এটিই সেই অলৌকিক সন্তান; তার বাবার শাহাদাতের কয়েক মাস পরেই তার জন্ম হয়েছিল। তার স্বামীর ইচ্ছা ছিল যে তাদের সন্তান আহমদী মোবাল্লেগ হবে। তাই তিনিও এই দোয়াই করেন যে তার ইচ্ছা যেন পূর্ণ হয়। তার স্বামীর শাহাদাত সম্বন্ধে তিনি বলেন “আমি তখন সন্তানসম্ভবা ছিলাম। তাই আমি তাকে সেদিন বাসাতেই থাকতে বলি। কিন্তু তিনি বলেন যে মসজিদকে রক্ষা করা তার দ্বায়িত্ব। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি যে মসজিদে হামলা হয়েছে এবং তিনি শহীদ হয়েছেন। কিন্তু এটা জানার পর আমার কোন রাগ বা ভয় অনুভূত হয়নি। বরং আমি অনেক শান্তি অনুভব করি। আসলে আমি সেই অনুভূতি ঠিক বলে বোঝাতে পারব না।”

আমাদের সাক্ষাতের সময় ইনা সাহিবা কেবল একবারই আবেগময় হয়ে পড়েন। শাহাদাতের পর হুজুরের ভালবাসার কথা বলার সময় তিনি চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন নি। তিনি বলেন “আমার স্বামীর শাহাদাতের পর আমি হুজুরের কাছ থেকে একটি বার্তা পাই। হুজুর বলেন আমার যখনই কোন কিছু প্রয়োজন হবে আমি যেন তাকে জানাই। আমাদের প্রতি হুজুর অপরিসীম ভালবাসা দেখান। তিনি স্হানীয় জামাতকে বলেন আমার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্হা করে দিতে বলেন এবং নিয়মিত আর্থিক সাহায্য করার নির্দেশ দেন। কিন্তু আমি যখন এটি জানলাম তখন আমি বললাম যে আমার ঘর বা অর্থের কোন প্রয়োজন নেই। আমি শুধু আমার প্রিয় খলীফার দোয়া চাই। হুজুরের দোয়া আমার সাথে আছে বলেই আমি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যশালী মনে করি। হুজুরের ভালবাসা ও দয়া দেখে আমি সবসময়ই আশ্চর্য হয়ে যাই। আমার জীবনের সকল ক্ষেত্রেই আমি সন্তুষ্ট ও খুশি।”

ইনা সাহিবা একটি সত্য স্বপ্নের কথা বলেন যেটি তিনি তার স্বামীর শাহাদাতের পুর্বে দেখেছিলেন। তিনি বলেন “শাহাদাতর দুই মাস আগে আমি স্বপ্নটি দেখি। স্বপ্নে আমার স্বামী আমাকে বলছেন যে আমি তোমার দেখাশোনা না করে যদি জামাত তোমার দেখাশোনা করত; তাহলেই আমি বেশি খুশি হতাম। তার শাহাদাতের পরে হুজুর আমাকে বলেন যে জামাত; আমার এবং আমার পরিবারের সবসময় দেখাশোনা করবে, আলহামদুলিল্লাহ।”

আমি তার বর্তমান স্বামী বাশারত আহমদ মাহমুদ সাহেবের সাথেও কথা বলি। তিনি কাদিয়ানের অধিবাসী। তিনি বলেন “আমি যখন ইন্দোনেশিয়ার শাহাদাতের কথা শুনি; তখন আমার তিনজন শহীদের স্ত্রীদের মধ্যে একজনকে বিয়ে করার ইচ্ছে মনে আসে। তাই আমি উপযুক্ত সময়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাই এবং ইনা সাহিবা দোয়ার পর প্রস্তাব গ্রহণ করেন।”

“আমার যখন দুই বছর বয়স তখন আমি বাবাকে হারাই। তাই আমি সবসময় একপ্রকার শূণ্যতা অনুভব করি। ইনা’র ছেলে তার বাবাকে জন্মের পূর্বেই হারিয়েছে। আমি তার জন্মগত পিতা নই। কিন্তু আমি কসম খেয়ে বলছি যে আমি তাকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালবাসা ও আদর দিয়ে বড় করব।”

আহমদীদের আবেগ

আমি সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম(২৪ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি জাপানে জন্মগ্রহণ করেছেন ও বড় হয়েছেন। কিন্তু এখন তিনি জামেআ আহমদীয়া কানাডায় পঞ্চম বর্ষের ছাত্র। জামেআ আহমদীয়া কানাডায় যে তিনজন জাপানীজ পড়াশোনা করছেন তাদের মধ্যে তিনি একজন। তার সাথে আমার ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আমি যখন বিভিন্ন জাপানীজ অতিথিদের সাথে কথা বলতাম তখন সে দোভাষী হিসেবে কাজ করত। হুজুরের জাপান সফরের গুরুত্ব সম্বন্ধে সে বলে “জাপানের বেশির ভাগ মানুষই আল্লাহকে বিশ্বাস করে না। তারা বিভিন্ন মিথ্যা খোদা ও প্রতিমার উপাসনা করে। ব্যক্তিগতভাবে আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে হুজুর এতদূর থেকে জাপানে এসেছেন তাদেরকে তাওহীদের বাণী প্রচার করার জন্য।”

আমি একজন বয়াতকারী আহমদী মূসা মারসান(৫৬ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি মালয়শিয়া থেকে এসেছেন। তিনি বলেন “আমি কেবল আমার আধ্যাত্মিক নেতার সাথে দেখা করতে এসেছি। আমার হৃদয়ে খলীফাকে দেখার তীব্র আকাঙ্খা ছিল। খলীফাকে দেখার পর আমি নিজেকে পুনর্জীবিত মনে করছি। আমার বিশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে। খিলাফত কে প্রকাশ করার জন্য আমার কাছে কেবল একটি শব্দই রয়েছে; সেটি হল ভালবাসা। খলীফা ও আমার মধ্যে কোন অন্তরায় নেই। এটি অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা ও তাদের অনুসারীদের মতো সম্পর্ক নয়; আমাদের এই ভালবাসা দ্বিপাক্ষিক।”

একটি সাধারণ টেনিস কোর্ট

মাগরিব ও এশার নামায পড়ে রাত দশটার দিকে হুজুর মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন। তখন তিনি লক্ষ্য করেন মসজিদের কাছেই একটি টেনিস কোর্ট রয়েছে যেখানে দুইজন জাপানীজ মেয়ে খেলছে। সদর সাহেবকে একটু চিন্তিত মনে হল। তিনি ভাবলেন হুজুর মসজিদের কাছে টেনিস কোর্ট থাকার ব্যাপারটি পছন্দ করবেন না। হুজুর তার মনোভাব বুঝতে পেরে বললেন “কোন সমস্যা? আমাদের লন্ডনের মসজিদ ফযলের পাশেও তো একটি টেনিস কোর্ট রয়েছে।”

ওয়াকফে নও ক্লাস

১৯ নভেম্বর হুজুর স্হানীয় ওয়াকফে নও বাচ্চাদের নিয়ে ক্লাস করেন। ছেলেদের ক্লাসে একজন তরুণ জাপানীজ কোরআন তিলাওয়াত করে। কিন্তু স্হানীয় জামাত কোন অনুবাদের ব্যবস্হা রাখেনি। হুজুর বলেন “তিলাওয়াতের অনুবাদ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এটি ছাড়া বাচ্চারা কিভাবে বুঝবে যে এখানে কি বলা হচ্ছে এবং তারা কিভাবে শিখবে?”

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সাথেসাথেই অনুবাদের ব্যবস্হা করা যেত। দুর্ভাগ্যবশত ক্লাসের অন্যান্য অংশেও বিভিন্ন প্রস্তুতির অভাব দেখা যায়। যেমন মসীহ মাউদ (আঃ) এর উদ্ধৃতি পাঠ করার সময় উর্দু উচ্চারণে অনেক ভুল দেখা যায়।

ক্লাসের পরে হুজুর বলেন যে ব্যবস্হাপকদের লক্ষ্য রাখা উচিৎ যেন এসব ক্লাসের জন্য বাচ্চাদের সঠিকভাবে প্রস্তুত করা হয়। এতে বাচ্চাদের কোন দোষ নেই। তারা কিভাবে সঠিক উচ্চারণ জানবে। বরং তাদের সঠীকভাবে শেখানোর দ্বায়িত্ব বড়দের।

 

মসীহ মাউদ(আঃ) এর প্রতি হুজুরের সম্মান

ক্লাসে একজন খাদেম হুজুরকে নিয়ে একটি উর্দু নযম পাঠ করেন। সেখানে সে হুজুরকে যুগের ইমাম বলে উল্লেখ করেন। তার নযম শেষ হবার পর হুজুর বলেন যে যুগ ইমাম প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই নযমের সেই স্হানে যুগ খলীফা ব্যবহার করা উচিৎ। হুজুর এমটিএ কে নির্দেশ দেন এটি সম্প্রচারের পূর্বে সেই অংশ যেন ঠিক করে দেয়া হয়।

সদর খোদ্দাম আহমদীয়া, জাপান

ক্লাসের পরে আমি সদর জামাত আহমদীয়া জাপানের সাথে কথা বলি। তার নাম এহসান রহমতুল্লাহ। তিনি ইন্দোনেশিয়ার অধিবাসী। হুজুরের ২০১৩ সালের জাপান সফরে হুজুর তাকে জাপানের সদর নিযুক্ত করেন। তিনি বলেন “গত কয়েকদিন ধরে আমার হুজুরকে খু্বই কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। যেমন আমি হুজুরের সাথে লিফটেও উঠেছি। একবার হুজুর আমার হাত ধরেছিলেন। তখন আমার মনে হয়েছে আমি অন্যরকম এক আধ্যাত্মিক পৃথিবীতে রয়েছি। ”

“এই সফরে হুজুরের পেছনে প্রথম নামায আদের সময় আমি অনেক আবেগপ্রবণ ছিলাম। হুজুর নামায শুরুর সময় আল্লাহু আকবার বলেছেন আর আমার চোখ থেকে পানি বের হওয়া শুরু হয়েছে। বিশ্বের লাখ লাখ আহমদীর মধ্যে আমি সেই ব্যক্তি যে হুজুরের সরাসরি পিছনে দাড়িয়ে নামায পড়ছি, এটি সত্যিই অবর্ণনীয়।”

হুজুরের সাথে কিছু সময়

দুইটি ওয়াকফে নও ক্লাসের পর হুজুর আমাকে তার অফিসে ডাকেন। সেখানে নামাযের পূর্ব পর্যন্ত আমি হুজুরের সাথে সময় কাটাই। হুজুর বলেন যে ছেলেদের ওয়াকফে ক্লাস প্রত্যশিত মান অনুযায়ী হয়নি। কিন্তু মেয়েদের ক্লাস তার চেয়ে ভাল ছিল।

মেইজি মন্দির ও সেদিনে রাতের খাবারের দিন হুজুর চপস্টিক দিয়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। হুজুর বলেন “ড: সাটা আমাকে দেখাচ্ছিলেন যে কিভাবে চপস্টিক ব্যবহার করতে হয়। আমি কিছুটা পারি কিন্তু এখনো পুরোপুরি নয়।”

হুজুর এরপর আমাকে চপস্টিক ব্যবহার করার পদ্ধতি দেখালেন যে কিভাবে চপস্টিক ধরতে হয়। হুজুর বলেন যে আমরা তিন দিন ধরে জাপান আছি। কিন্তু এখনো ঠিকভাবে বিশ্রাম নিতে পারিনি। আমি বলি যে আমি ফযরের পরে কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে নিয়েছি। হুজুর বলেন তিনি সে সময় জুমআর খুৎবা প্রস্তুত করছিলেন।

বায়তুল আহাদ মসজিদ উদ্বোধন

২০ নভেম্বর ২০১৫; হুজুর জুমআর খুৎবা প্রদানের মাধ্যমে নাগোয়াতে বায়তুল আহাদ মসজিদ উদ্বোধন করেন। এটি একটি ঐতিহাসিক দিন। কারণ এটি কেবল জাপানের নয়, বরং উত্তর-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে প্রথম আহমদী মসজিদ।

ফলক উন্মোচন করে মসজিদ উদ্বোধনের পর হুজুর জুমআর খুৎবা প্রদান করেন। সেখানে তিন বলেন “মসজিদ তৈরী করা কোন কাজেই আসবে না যদি না সেটিকে ইবাদতের কাজে ব্যবহার করা হয়।”

হুজুর তার খুৎবায় ফ্রান্সের সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানান। তিনি বলেন “দুঃখজনক ব্যাপার হল আজকাল নামধারী মুসলমানগণ এতটাই উগ্রবাদী হয়ে গিয়েছে; যে তারা নিরীহ মানুষকে বর্বর ভাবে হত্যা করার মাধ্যমে ইসলামের সেবা করার দাবি জানচ্ছে। ফ্রান্সের সন্ত্রাসী হামলা অত্যন্ত বর্বর ও জঘন্য একটি ঘটনা।”

জাপানে বসবাসরত আহমদীদের উদ্দেশ্যে হুজুর বলেন “এখানে বেশীরভাগ আহমদীই পাকিস্তান থেকে এসেছেন। পাকিস্তানে তাদের অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হতো। কিন্তু জাপানে তাদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে।”

“তোমাদেরকে আল্লাহাতা’লা এখানে বসবাস করার সুযোগ দিয়ে যে বরকত দিয়েছেন সেটি গভীরভাবে চিন্তা করবে। এখানে ধর্ম পালনে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। এখানে তোমাদের মসজিদকে মসজিদ বলার জন্য জেলে দেয়া হয় না। বরং এখানে তোমাদের “সালাম” কে স্বাগত জানানো হয়। ”

চুকয়ো টিভি তে সাক্ষাৎকার

জুমআর খুৎবার পর হুজুর চুকয়ো টিভি(CTV) কে একটি সাক্ষাৎকার দেন। এটি নাগোয়ার একটি টিভি চ্যানেল, যেটি ১৯৬৯ থেকে সম্প্রচার করে আসছে।

সাধারণত সাক্ষাৎকারের সময় যদি অনুবাদের প্রয়োজন হয় তাহলে দুইটি ভাষা ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ হুজুর ইংরেজী বা উর্দুতে বলবেন এবং তার কথা স্হানীয় ভাষায় অনুবাদ করা হবে।

কিন্তু এখানে তিনটি ভাষা ব্যবহার করা হবে। বেশী ভাষা ব্যবহার করা মোটেও আদর্শ নয়। কারণ এতে ভুল অনুবাদ হবার আশংকা থাকবে এবং হুজুরের মূল্যবান সময় নষ্ট হবে। তিনটি ভাষা ব্যবহার করার কারণ হল সাংবাদিক হুজুরকে ইংরেজীতে উত্তর দেবার অনুরোধ করেন। তিনি প্রশ্ন করবেন জাপানীজ ভাষায়। কিন্তু যিনি তার প্রশ্নকে অনুবাদ করবেন তিনি ইংরেজী অনুবাদে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলেন না। তাই তিনি উর্দুতে অনুবাদ করবেন। তাই ফলাফল দাড়ালো; সাংবাদিক জাপানীজে প্রশ্ন করবেন; অনুবাদক সেটি উর্দুতে অনবাদ করবে এবং হুজুর ইংরেজীতে উত্তর দিবেন।

 

আমি অনুবাদের ব্যাপারে আগেই কথা বলেছিলাম। তখন আমাকে বলা হয়েছিল যে সেখানে সরাসরি এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করা হবে। তাই আমি খুবই অবাক হলাম যখন তারা তৃতীয় ভাষা ব্যবহার করছিল। কিন্তু হুজুর অনেক ধৈর্যশীল ছিলেন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সকল প্রশ্নের উত্তর দেন।

নতুন মসজিদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে হুজুর তার খুৎবার কথাই পুনরাবৃত্তি করেন। “কেবল মসজিদ তৈরী করলেই হবে না। এটিও প্রয়োজনীয় যে মসজিদে যারা প্রবেশ করবে তারা যেন পূণ্যবান ব্যক্তি হয়।”

বিভিন্ন সন্ত্রাসী দল যেমন আইএসআইএস ও দায়েশ সম্বন্ধে তারা হুজুরের মতামত জানতে চান। হুজুর বলেন “এসকল দল যেসকল কর্মকান্ড করছে তা পুরোপুরি ইসলাম বিরোধী। ইসলাম কখনো বর্বরতা ও অবিচারের শিক্ষা দেয় না; বরং শান্তি ও ভালবাসার শিক্ষা দেয়। এসব দল কেবল ইসলামের নামে দূর্নাম অর্জন করছে।”

সাংবাদিক বলেন যে তিনি ২০১৪ সালে শান্তি সম্মেলনে হুজুরের দেয়া বক্তব্য শুনেছিলেন। তিনি হুজুরের বক্তব্যে খুবই প্রভাবিত হয়েছেন যে হুজুর বলেছেন আইএসআইএস এর রশদ ও অর্থ সরবরাহ বন্ধ করতে হবে।

হুজুর বলেন “আমি এই কথা পরবর্তীতে আরো অনেক স্হানে বলেছি। বিশ্ব শক্তি এবং জাতিসংঘ বড় বড় দেশের উপর সফলভাবে অবরোধ আরোপ করতে পারে। কিন্তু এখানে কেন তারা একটি সন্ত্রাসী দলের অর্থ সরবরাহ বন্ধ করতে পারছে না?”

যখন হুজুর প্রথমে আইএসআইএস এর অর্থ সরবরাহ বন্ধের কথা বলেন তখন কেউই এই বিষয়ে কথা বলেনি। কিন্তু গত কয়েক বছরে অনেকেই এই নিয়ে কথা বলছে। বিভিন্ন সরকার, সামরিক ব্যক্তিবর্গ ও বিশ্লেষকগণ বলছেন যে আইএসআইএস কে থামানোর সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে তাদের অর্থ সরবরাহ বন্ধ করা।

দুপুরের খাবারের জন্য অপেক্ষা

হুজুরের উত্তর শুনে সাংবাদিক বলেন “আমার সাক্ষাৎকার এখানেই শেষ করা উচিৎ। কারণ আমার পিছনে যারা রয়েছে তারাও নিশ্চয় আপনার সাক্ষাৎকার নেবার জন্য অপেক্ষা করছেন। ”

কিন্তু তার পেছনে কেবল আমি, মাজিদ সাহেব ও আরো কয়েকজন কাফেলা সদস্য ছিলাম। সাংবাদিক ভেবেছেন আমরাও হুজুরের সাক্ষাৎকার নেবার জন্য অপেক্ষা করছি। হুজুর তার কথা শুনে বলেন “তারা আমার সাক্ষাৎকার নেবার জন্য অপেক্ষা করছে না। তারা আমার অফিস কর্মী। তারা এখানে কেবল দুপুরের খাবারের জন্যই অপেক্ষা করছে।”

আমরা সবাই হাসতে শুরু করলাম। যখন সাংবাদিককে হুজুরের কথা অনুবাদ করে শোনানো হল তখন তিনিও হুজুরের কৌতুকে হাসতে লাগলেন।

শিংগেতসু সংবাদ সংস্হার সাথে সাক্ষাৎকার

দুপুরের খাবারের পর হুজুর আবার মসজিদে যান। সেখানে তিনি একজন আমেরিকান সাংবাদিককে একটি সাক্ষাৎকার দিবেন। তার নাম হল মাইকেল পেন। তিনি প্রায় ২০ বছর আগে জাপান চলে আসেন এবং শিংগেতসু সংবাদ সংস্হা স্হাপন করেন। তারা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমকে(যেমন আল-জাজীরা) সংবাদ সরবরাহ করে।

এই সাক্ষাৎকার ইংরেজীতে সম্পন্ন হয়। তিনি জিজ্ঞেস করেন “জাপানে আহমদী জামাতের ভবিষ্যত কি? কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি যে বর্তমানে এখানে আহমদীর সংখ্যা অত্যন্ত কম।”

হুজুর বলেন “যখন প্রতিশ্রুত মসীহ ভারতের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে তার দাবী করেন তখন তিনি একা ছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর সময় হাজার হাজার মানুষ আহমদীয়াত গ্রহন করেন এবং আজ পৃথিবীর দুইশত দেশের মধ্যে লাখ লাখ আহমদী রয়েছে। ”

“আমরা একটি ধর্মীয় সংগঠন এবং আমাদের কাজ হল ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করা। আমি দেখেছি যে জাপানীজরা অত্যন্ত ধার্মিক এবং তাদের নৈতিকতা অনেক উঁচু মানের। তাই আমি জাপানের ব্যাপারে মোটেও হতাশ নই। আমি বিশ্বাস করি একদিন অনেক জাপানীজই ইসলাম গ্রহণ করবে।”

সাংবাদিক জানতে চান যে হুজুরের খুৎবায় তিনি আহমদীয়াতকে জীবন্ত ইসলাম বলে উল্লেখ করেছেন; এর অর্থ কি? হুজুর বলেন “বেশীরভাগ নন আহমদী মুসলমানগণ মনে করেন যে আল্লাহপাক আর মানুষের সাথে কথা বলেন না। কিন্তু আহমদীগণ বিশ্বাস করে যে আল্লাহর কোন গুণাবলী কখনোই বন্ধ হয়ে যেতে পারে না।  ”

“আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহপাক এখনো নেক বান্দাগণের কাছে নিজেকে প্রকাশ করে থাকেন, তার সাথে কথা বলেন। এটিই হল জীবন্ত ধর্মের একটি লক্ষণ। যদি কোন ধর্ম মনে করে যে আল্লাহপাকের কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছে তাহলে সেটি সেই ধর্মের মৃত্যু নির্দেশ করে।”

সাক্ষাৎকারের পর হুজুর আমাকে বলেন “আমার কাছে এই সাক্ষাৎকার পূর্বের সাক্ষাৎকারের চেয়ে ভাল মনে হয়েছে কারণ এতে কোন অনুবাদের প্রয়োজন হয়নি। ”

এই সাক্ষাৎকারের পর হুজুরের নির্ধারিত সময়সূচিতে আর কিছু ছিল না। কিন্তু স্হানীয় জামাত হুজুরকে বিদেশ থেকে আগত আহমদীদের দের জন্য মোলাকাত পর্বের জন্য অনুরোধ করে। হজুর তার অনুমতি দেন। আমি চিন্তা করলাম হুজুর কতো দয়ালু। তিনি কিছুটা সময় পেয়েছিলেন কিন্তু সেটিও জামাতের জন্য দিয়ে দিলেন।

সাংবাদিকের প্রতিক্রিয়া

সাংবাদিক মাইকেল পেন বায়তুল আহাদ মসজিদ সফর ও হুজুরের সাথে তার সাক্ষাৎকার নিয়ে আল জাজীরায় একটি কলাম লিখেন। কিছুদিন পর তিনি লিখেন যে সেই কলামটি সে সপ্তাহে আল জাজীরা আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটের সবচেয় জনপ্রিয় কলাম ছিল। এটি সাংবাদিক হিসেবে তার লেখা সবচেয়ে সফল অনুচ্ছেদ। জাপান টাইমস তার লেখা কলাম থেকে হুজুরের একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করে যেখানে হুজুর বলেছেন “এই মসজিদ আমাদের উন্নতির একটি মাইলফলক। যদি এই মসজিদ শান্তি, ভালবাসা ও সৌহার্দ্যের বাণী ছড়িয়ে দিতে পারে তাহলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই এই মসজিদের প্রতি আকৃষ্ট হবে।”

মাইকেল পেন লিখেন এখন তাকে জাপানের বৃহত্তম ইংরেজী সংবাদপত্র জাপান টাইমস এর জন্য এ সম্পর্কে একটি ভিডিও প্রতিবেদন তৈরী করতে হবে। আমি পরে তার সাথে কথা বলি এবং তিনি বলেন “আপনাদের খলীফার কাছ থেকে আপনাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় লেগেছে; তিনি বলেছেন যে আল্লাহপাক এখনো মানুষের সাথে কথা বলেন। আমি নিজে যে অনুসন্ধান করেছি তাতে আমি দেখেছি যে শুধু আহমদীয়া মুসলিম জামাতই এই ধারণা রাখে। এই দিক থেকে বলা যায় যে এই জামাত অন্যান্য জামাত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ”

আহমদীদের আবেগ

আমি সেদিন কিছু আহমদীর সাথে কথা বলি যারা হুজুরের সাথে দেখা করেছেন। ইন্দোনেশিয়ার সিদি ওমর সাহেব সেখানকার রিজিওনাল আমীর। তিনি বলেন “সেখান স্হানীয় আহমদীদের মোল্লা ও উগ্রবাদীদের জন্য অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। বিপদ থাকা সত্ত্বেও আমাদের ঈমান অনেক মজবুত। আল্লাহর জন্য আমরা সকল কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি। ইন্দোনেশিয়ার সকল আহমদী মনে করে যে হুজুরের দোয়ার বরকতে আমরা ইনশাল্লাহ নিরাপদেই থাকব।”

একজন বয়স্ক ইন্দোনেশিয়ান মহিলা আসরিদা বলেন “হুজুরের সাথে কাটানো কয়েক মুহুর্তে পুরো জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়। কারণ হুজুরের দোয়াতে আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দেবার শক্তি রয়েছে। আমি একটি ব্যাপারে দুঃখিত যে হুজুর আমাদের থেকে এত দূরে থাকেন। আমরা কেবল মাঝেমাঝে হুজুরের সাথে দেখা করতে পারি। যদি আমি প্রতিদিন তার সাথে দেখা করতে পারতাম। ”

“আমার কাছে মনে হয়েছে হুজুরের সাথে যুক্ত থাকার সবচেয়ে ভাল উপায় হল প্রতি সপ্তাহে তার জুমআর খুৎবা শোনা। আমি যখন খুৎবা শুনতে পারি না তখন খুব উদ্বিগ্ন থাকি। তখন আমার মনে হয় আমার জীবনে কি যেন নেই। আমি যখন হুজুরের খুৎবা শুনি তখন সেই দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়। তখন আমার মনে হয় আমি সঠিক পথে চলছি। ”

আমি সাইদ ওয়াদুদ জানুদ সাহেবের(২৫ বছর) সাথে কথা বলি। তিনি অষ্ট্রেলিয়া থেকে এসেছেন। তিনি একজন তরুণ মোবাল্লেগ। তিনি জামেআ আহমদীয়া কানাডা থেকে পাশ করেছেন এবং বর্তমানে অষ্ট্রেলিয়াতে পোস্টিং প্রাপ্ত হয়েছেন। তার জাপান সফর তার জন্য অনেক স্মরণীয় হয়ে থাকবে কারণ এই সফরে হুজুর তার বিবাহের ঘোষণা দিবেন।

আমাদের জামাত সম্বন্ধে তিনি বলেন “আমাদের জামাতে একটি সার্বজনীন একতা রয়েছে যেটি অন্য কোথাও নেই। আমি যদি বিশ্বের কোন স্হানে যাই; যেখানে কোন আহমদী রয়েছে তাহলে সেখানে আমার পরিবারের কারো যাবার দরকার নেই। কারণ সেখানকার আহমদীরাই আমার পরিবার। যদি আমরা একই ভাষায় কথা নাও বলি সেটিও কোন সমস্যা নয়। কারণ আমরা সকলেই আহমদীয়াতের ভাষা জানি। আমাদের একতার মূল ভিত্তি হল খিলাফত।”

হুজুরের প্রজ্ঞার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সে বলে “২০১৪ সালে অষ্ট্রেলিয়ার ন্যশনাল আমীর মাহমুদ বেঙ্গলী সাহেব ইন্তেকাল করেন। তিনি পুরো অষ্ট্রেলিয়া জামাতের জন্য পিতার মতো ছিলেন। তাই তিনি মারা যাবার পর পুরো জামাতেরই মন খারাপ হয়ে পড়ে। এরপর হুজুর এনাম উল হক কাওছার সাহেবকে জামাতের আমীর নিযুক্ত করেন। তিনি অনেক দিন আমেরিকায় ছিলেন। তিনিও মাহমুদ সাহেবের মতো সবার প্রতি ভালবাসা রাখেন। এভাবে আমাদের জামাত সেই দুঃখকে কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। এতে আমি বুঝতে পারি যে হুজুর কতোটা প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেন। এটি আমার ঈমানকে আরো দৃঢ় করে।”

ঝেলাম আক্রমন

২০-২১ নভেম্বর রাতে আমি ও আহমদ ভাই দুজনেই ঘুমিয়ে ছিলাম। কিন্তু সারারাত ধরেই আহমদ ভাইয়ের ফোন আসতে থাকে। আমিও হোয়াটস আ্যপে পাকিস্তানের ঝেলাম আক্রমনের বিভিন্ন খবর পেয়ে থাকি। একটি আহমদী বিরোধী দল ঝেলামের একটি চিপবোর্ড ফ্যাক্টরিতে আক্রমণ করে। সময় যত যেতে থাকে আমরা বুঝতে পারি যে এটি অনেক বড় আক্রমণ ছিল। ফ্যাক্টরির পাশের অনেক আহমদী পরিবারও বিপদের মধ্যে রয়েছে। উচ্ছৃঙ্খল জনতা ফ্যাক্টরি এবং মির্জা নাসের তারেক সাহেবে(ঝেলাম বিভাগের আমীর) ও মির্জা আলী সাহেবের বাসায় আগুন দিয়েছে।

আমার কাজিন হামদা মির্জা আলী সাহেবের স্ত্রী। তাই সে আমাকে সেখানকার অবস্হা জানাতে থাকে এবং ছবি ও ভিডিও পাঠায়। তারা অনেক দুশ্চিন্তায় ছিল এবং হুজুরকে দোয়ার জন্য অনুরোধ জানায়। ফযরে হুজুর নামাযের জন্য মসজিদে আসেন। সেখানে আহমদ ভাই ও মুনীর জাভেদ সাহেব হুজুরকে ঝেলাম আক্রমণের কথা বলেন। হুজুর বলেন যে তিনি রাতেই এ ব্যাপারে জেনেছেন।

আমি দেখলাম যে হুজুর পুরোপুরি শান্ত রয়েছেন। আল্লাহর উপর তার অগাথ বিশ্বাস আবারো আমাদের সামনে প্রকাশিত হল। পরে হুজুর আমার কাছে ঝেলামের সর্বশেষ অবস্হা জানতে চান। আমি তাকে জানাই যে মির্জা নাসের তারেক সাহেব একপ্রকার গৃহবন্দী হয়ে রয়েছেন। তিনি বলেন “প্রধান ব্যাপার হল যে কোন আহমদীই আহত হয়নি, আলহামদুলিল্লাহ। সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি কোন গুরত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এবং পুলিশ যদি আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা এফআইআর দাখিল করে তাহলেই বা কি এসে যায়। এটি কেবল একটি কাগজের টুকরো।”

হুজুর এসময়ও পুরোপুরি শান্ত ও ধৈর্য্যশীল ছিলেন। তিনি আল্লাহর উপর অনেক কৃতজ্ঞ ছিলেন যে কোন আহমদীই আহত হননি।

সারাদিন এই আক্রমণের কথা চিন্তা করে আমি অনেক দুঃখিত ছিলাম। কিন্তু হুজুরের প্রতিক্রিয়া দেখে আমি বুঝতে পারলাম যে আজকে মন খারাপ করে বসে থাকার দিন নয়, বরং আজ আল্লাহতা’লার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার দিন।

হারিয়ে যাওয়া

২১ নভেম্বর জাপান জামাত বায়তুল আহাদ মসজিদ উদ্বোধন উপলক্ষে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এটি খুব বরকতময় অনুষ্ঠান বলে প্রমাণিত হয়েছিল। হুজুর ইসলামের প্রকৃত ও বরকতময় শিক্ষা জাপানীজদের সামনে সুন্দরভাবে উপস্হাপন করেন; আলহামদুলিল্লাহ।

হুজুর ও তার স্ত্রী ৪.১০ মিনিটে হোটেল থেকে বের হন। আমি মোবারক জাফর সাহেব ও নাদিম আমিনী সাহেবর সাথে এক গাড়ীতে ছিলাম। আমাদের নিয়মিত ড্রাইভার মাকবুল সাহেব সেদিন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই সেদিন বার্মার একজন আহমদী আমাদের গাড়ী চালাচ্ছিলেন। প্রথম সিগন্যালে আমাদের গাড়ী লাল লাইটে বাধা পড়ে যায়। আমরা ভেবেছিলাম যে আমরা শীঘ্রই কাফেলা গাড়ীকে ধরে ফেলতে পারব। কিন্তু ১৫-২০ মিনিট পর এটি পরিস্কার হয়ে গেল যে আমরা আমাদের নিয়মিত পথে যাচ্ছি না।

আমরা আমাদের ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল যে সে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে এবং তার কোন ধারণাই নেই যে মসজিদ কোথায় রয়েছে। সে আগে কখনো মসজিদে গাড়ী চালিয়ে যায়নি এবং সে মসজিদের ঠিকানাও জানে না।

আমি স্বীকার করব যে আমি খুবই বিরক্ত ও হতাশ হলাম। কারণ অনুষ্ঠানের পূর্বে হুজুর স্হানীয় সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ, অতিথি ও সংবাদ মাধ্যমের লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন। এখন এটি পরিস্কার যে আমরা ঠিক সময়ে পৌছাতে পারব না।

পূর্বেও বিভিন্ন সময় আমাদের গাড়ী পিছনে পড়ে গিয়েছিল। সেটি অত্যাধিক ট্রাফিকের কারণে হয়েছিল যেটি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার; যেটি এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা পুরোপুরি হারিয়ে গেছি কারণ আমাদের ড্রাইভারের কোন ধারণাই নেই যে আমাদের কোথায় যেতে হবে। এটি তার দোষ নয়। আমি স্হানীয় ব্যবস্হাপকদের কাজে মর্মাহত; তারা তাকে ঠিকানা না বলেই ড্রাইভ করতে বলেছে।

এপর আমরা আমাদের ফোনে মসজিদের ঠিকানা খুজি। নাদিম সেটি গুগল ম্যাপে সেটি দেয় এবং পরবর্তী সময় সে আমাদের গাইড হিসেবে কাজ করে।

অতিথিদের সাথে হুজুরের সাক্ষাৎ

আমরা বিকেল ৫টায় মসজিদে পৌছাই। আমি সরাসরি হুজুরের অফিসে চলে যাই। সেখানে হুজুর সম্মানিত অতিথিদের সাথে কথা বলছিলেন। তারা ৪.৩০ এর মধ্যেই চলে এসেছেন।

হুজুরের সাথে প্রথমে একজন জাপানীজ শিক্ষক ও তার শিক্ষার্থী দেখা করেন। আমরা আসতে আসতে সেই সভা শেষ হয়ে যায়। আমরা পরবর্তী সভার মাঝখানে আসি। তখন হুজুর জাপানীজ শিক্ষাবিদ মিসেস হিরোকো মিনেসাকি সাথ কথা বলছিলেন। তিনি আমাদের জামাত নিয়ে কয়েক বছর ধরেই গবেষণা করছেন।

জাপানের ২০১১ সালে ভুমিকম্পের পর আহমদী জামাতের মানবতা মূলক কর্মকান্ডের জন্য তিনি হুজুরকে ধন্যবাদ জানান। হুজুর বলেন “প্রয়োজনের সময় সাহায্য করা ইসলামিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই যখন, যেখানেই কারো সাহায্য প্রয়োজন হয় আহমদীয়া মুসলিম জামাত সবসময়ই তাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। ”

মিসেস হিরোকো ২০১৩ সালেও হুজুরের সাথে দেখা করেছিলেন। কিন্তু এবার তিনি তার সদ্য ভুমিষ্ঠ সন্তানকেও নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন যে তার সন্তান গাড়ীতেই ভূমিষ্ঠ হয়েছে। হজুর বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে বলেন “মনে হয় সে এই পৃথিবী দেখার জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব ছিল।”

নিপ্পো সংবাদপত্রে সাক্ষাতকার

হুজুর জাপানের জনপ্রিয় সংবাদপত্র নিপ্পোকে একটি সাক্ষাতকার দেন। তারা প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলা সম্বন্ধে হুজুরের মতামত জানতে চায়। হুজুর বলেন “প্যারিসের সন্ত্রাসী হামলা অত্যন্ত বর্বর একটি ঘটনা। পুরো বিশ্বকে শক্তভাবে এই ঘটনার নিন্দা জানানো উচিৎ। আমি এটি আগেও অনেকবার বলেছি যে এ ধরণের হামলা ইসলামিক শিক্ষার সম্পূর্ণ বিরোধী। আমি পুলিশ ও প্রশাসকদের সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীদের সম্বন্ধে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে বলব।”

শান্তির সংজ্ঞা

হুজুরের অফিসে রেভারেন্ড ওশিয়া নামে একজন খৃষ্টান ধর্মযাজক ছিলেন। তিনি একটি ইন্দোনেশিয়ান টুপি পড়ে ছিলেন। অনেক আহমদীও এটি পড়ে থাকে। এটি দেখে হুজুর বলেন “আপানাকে দেখে একজন আহমদী মোবাল্লেগ মনে হচ্ছে।”

তিনি হুজুরের কাছে শান্তির সংজ্ঞা জানতে চান। হুজুর বলেন “ইসলামিক শিক্ষা অনুযায়ী শান্তির সংজ্ঞা হল; একজন নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, অন্যদের জন্যও সেটিই পছন্দ করেব। এর মানে হল একজন নিজের অধিকারকে বেশী প্রাধান্য না দিয়ে অন্যদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গুরুত্ব দিবে। এটিই প্রকৃত শান্তি। ”

আমি পরবর্তীতে তার সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “আমি পুরো জীবনে এমন সুন্দর সংজ্ঞা শুনিনি। হুজুরের সংজ্ঞা আমার হৃদয়কে প্রশান্তি দিয়েছে।”

বায়তুল আহাদ মসজিদ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

কোরআন তেলাওয়াতের পর কয়েকজন অতিথি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। তারা হুজুরকে জাপানে স্বাগত জানান। এরপর হুজুর তার বক্তব্য দেন। হুজুর বলেন “আমরা ইসলামকে শক্তি বা জোর করে প্রচার করব না। বরং আমরা ভালবাসা ও সহানুভূতির মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করব। কাবা শরীফকেও এই উদ্দেশ্যেই তৈরী করা হয়েছিল; যে এর মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তি ছড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের মসজিদ হল একটি লাইট হাউজের মত যা চারদিকে শান্তির আলো ছড়িয়ে দিবে। ”

আধুনিক যুগে জিহাদের প্রকৃত অর্থ সম্বন্ধে হুজুর বলেন

“আমরা বিশ্বাস করি এই যুগে তরবারী দিয়ে জিহাদ করা প্রকৃত জিহাদ নয়; বরং প্রকৃত জিহাদ হল নিজের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করা। এই জিহাদ হল নিজের মধ্যে ভাল গুণাবলীর বিকাশ ঘটানো; ইসলামের প্রকৃত ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষাকে দুনিয়ার প্রান্তে প্রান্তে পৌছে দেয়া। ”

জাপানে ইসলাম প্রচারে আহমদীয়া জামাতের প্রচেষ্টা সম্বন্ধে হুজুর বলেন “আমরা জাপানের মানুষদের জানাতে চাই যে ইসলাম হল সেই ধর্ম; যা মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে সাহায্য করে। ইসলামের সাহায্যে আমরা আমাদের স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক তৈরী করতে পারি এবং মানবজাতির সেবা করতে পারি। ”

হুজুরের বক্তব্যের প্রভাব

আল্লাহর অশেষ রহমতে হুজুরের বক্তব্য অতিথিদের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। জামেআর শিক্ষার্থী ইব্রাহীমকে অনুবাদক হিসেবে ব্যবহার করে আমি অনেক অতিথির সাথে কথা বলি। আমি অবাক হই যে অনেকের মনেই পূর্বে ইসলামকে নিয়ে অনেক ভয় ভীতি ছিল। কিন্তু তারা হুজুরের কাছ থেকে ইসলামের শান্তিপূর্ণ শিক্ষার কথা শুনে বড়ই আশ্চর্য হয়েছেন।

আমি ব্রাজিলের একজন শীক্ষার্থী এডওয়ার্ডোর সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “আজকে আমি জানতে পারলাম যে সংবাদমাধ্যম ইসলামের যে চিত্র প্রকাশ করে সেটি পুরপুরি ভুল। আমি স্বীকার করছি যে খলীফার বক্তব্য শুনে আমি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। আজকের এই অনুষ্ঠান আমার চিন্তাধারা পুরোপুরি পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমি জেনেছি যে ইসলাম একটি শান্তিপূর্ণ ধর্ম এবং সন্ত্রাসীরা যেসব কর্মকান্ড করছে তার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। ”

মিসেস উযুকি নামে একজন মহিলা বলেন “আমি মনে করি আজকের দিনটি আমার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে দিবে। ইসলাম সম্পর্কে আমার চিন্তাধারা পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। খলীফা বলেছেন যে এই যুগ তরবারী দিয়ে জিহাদ নয়; বরং ভালবাসা দিয়ে জিহাদ করার যুগ। তার এই বক্তব্য আমার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ শিক্ষার্থী সিংগিসাকি ইউকি বলেন “এই সময়ের খলীফার এই বক্তব্য খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। কারণ জাপানে আমরা ইসলাম সম্বন্ধে খুব বেশী জানি না। আমাদের মধ্যে বেশীরভাগই ইসলামের নাম শুনে ভয় পাই। কিন্তু খলীফা আমাদের কাছে প্রকৃত ইসলামিক শিক্ষা তুলে ধরেছেন ও আমাদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণিত করেছেন এবং ইসলাম সম্বন্ধে আমার ধারণাকে পুরোপুরি পরিবর্তন করে দিয়েছেন। ”

রেভারেন্ড ওশিয়া যার সাথে হুজুর পূর্বে অফিসে কথা বলেছিলেন; তিনি বলেন “আমার ব্যক্তিগত মতামত হল জাপান সরকার শান্তির পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা বিভিন্ন বিষয়ে আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখাচ্ছে। তাই আমি দোয়া করি যেন আমাদের সরকার খলীফার দেখানো শান্তিপ্রিয় পথে চলেন। আমি দোয়া করি যেন খলীফা জাপানের সম্রাটের সাথে দেখা করেন ও তাকে শান্তির পথে চলার জন্য সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারেন। আমার আশংকা হচ্ছে যদি এরকম না হয় তাহলে আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো আর একটি ভয়াবহ ঘটনা দেখতে যাচ্ছি।”

জাতীয় আমেলার সাথে হুজুরের সাক্ষাৎ

২২ নভেম্বর রবিবার সকালে হুজুর বায়তুল আহাদ মসজিদে জাতীয় আমেলার সাথে একটি সভা করেন। সভার পূর্বে হুজুর সদর সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন যে গতদিনের অনুষ্ঠানে সকল অতিথিকে খাবার দেয়া হয়েছে কিনা। তিনি বলেন যে সকল অতিথিই ভালভাবে খাবার খেয়েছেন। হুজুর এরপর আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন যে আমি খাবার খেয়েছি কিনা। কারণ হুজুর লক্ষ্য করেছিলেন যে অনুষ্ঠানে আমি খাবার না খেয়ে বিভিন্ন অতিথিদের সাথে কথা বলছি। এত মানুষের মধ্যে এই সামান্য জিনিসের দিকেও হুজুর লক্ষ্য রেখেছেন।

সেদিন আমি খেতে পারিনি। তাই হুজুরের প্রশ্নে আমি চুপ করে থাকলাম। আমি ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দেইনি। কারণ আমাদের হোটেল শহরের কেন্দ্রেই অবস্হিত। তাই রাতের বেলা আমি ও আরো কয়েকজন কাফেলা সদস্য যারা তখনো খাইনি কাছের একটি রেস্তোরায় যেয়ে খেয়ে আসি।

যাইহোক হুজুরের এই প্রশ্নের ফলে স্হানীয় জামাত এরপর থেকে এই ব্যাপারটি আরো গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য রাখে। টোকিওতে পরবর্তী অনুষ্ঠানেও আমি খাবার সময় পাইনি। অনুষ্ঠানের পরে একজন খাদেম আমাকে বলে যে আমার জন্য খাবারের ব্যবস্হা করা হয়েছে।

আমেলা মিটিং এ হুজুর বিভিন্ন বিভাগের সেক্রেটারীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন ও তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। হুজুর ন্যশনাল সেক্রেটারী মাল সাহেবকে জামাতের মোট চাঁদা দানকারীর সংখ্যা জিজ্ঞেস করেন। তিনি প্রকৃত সংখ্যা না বলে একটি আনুমানিক সংখ্যা বলেন। হুজুর বলেন “আপনি একজন তরুণ ব্যক্তি। তাই আপনার উচিৎ আনুমানিক সংখ্যা না বলে, প্রকৃত সংখ্যা বলা।”

“আপনাকে সকল আহমদীকে এটা বোঝাতে হবে যে এই চাঁদা কোন ট্যাক্স নয়। আর্থিক কুরবানী করা আল্লাহর নির্দেশ। তাই তাদের চাঁদা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা বোঝা উচিৎ। তরবীয়ত বিভাগেরও এটা দ্বায়িত্ব যে তারা সকলকে বোঝাবে আর্থিক কুরবানীর সাথে আল্লাহপাকের বরকত রয়েছে এবং এটি তাদের ঈমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

হুজুর আমেলা সদস্যদের ভাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে একত্রে কাজ করার নসীহত করেন। তবলীগ ইনচার্জ ও আমেলা সদস্যদের নিজেদেরকে এমনভাবে তৈরী করতে হবে; যেন আহমদীগণ তাদেরকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করতে পারে।। তিনি সকলকে ধৈর্য্য ও অধ্যাবসায় এর সাথে কাজ করার পরামর্শ দেন। হুজুর বলেন “কখনোই হাল ছেড়ে দিবে না। সবসময় আন্তরিকতার সাথে তোমাদের কর্তব্য পালন করে যাবে। ইহকালে হোক বা পরকাল; একদিন তোমাদের এই কষ্ট অবশ্যই ফল দিবে। তোমাদের নেক কাজ ও উদ্দেশ্যর জন্য তোমরা অবশ্যই পুরস্কৃত হবে।”

জামাতের অর্থ খরচ করার প্রতি হুজুরের নির্দেশ

মিটিং এর সময় হুজুরকে জানানো হয় যে ১৯৯১ সালে টোকিও তে জামাত চড়ামূল্যে একটি জমি ক্রয় করে। পরবর্তী ২৪ বছরে তার দাম অনেক কমে গেছে। হুজুর বলেন “কোন সম্পত্তি ক্রয় করার পূর্বে জামাতের অবশ্যই সেটির সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা অসুবিধা বিবেচনা করে দেখা উচিৎ। কোন কিছু কেনার পরিকল্পনা করার পূর্বে ভবিষ্যতে তার কি অবস্হা হতে পারে তার জন্য কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মতামত নেয়া উচিৎ। সবসময় মনে রাখবে জে জামাতের অর্থ অনেক মূল্যবান। এটি জামাতের আহমদীদের আর্থিক কুরবানীর অর্থ। তাই এটি খরচ করার সময় অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করবে।”

হুজুরের আবেগপ্রবণ নসীহত

একজন আমেলা সদস্য বলেন যে মাঝেমাঝে আহমদীদের মাঝে এমন ঝগড়া ও বিদ্বেষ তৈরী হয় যেটা আহমদীদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। হুজুর বলেন “যখনই একজন মানুষ সমস্যায় পড়বে অথবা কোন অবিচারের স্বীকার হবে তখন তার উচিৎ আল্লাহর সামনে মাথা নত করে কাঁদা ও তার সাহায্য চাওয়া। মনে রাখবে যখন অবিচার ও বিপদের মুখে কেউ নীরব ও ধৈর্য্যশীল থাকবে তখন মহান আল্লাহতা’লা তার পক্ষ হয়ে কথা বলবেন এবং তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। তাই পরিস্হিতি যাই হোক না কেন সবসময় তোমার আহমদী ভাই ও বোনের সাথে ভালবাসার আচরণ করবে এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্হা রাখবে।  ”

হুজুর যখন এই কথাগুলো বলছিলেন তখন আমি লক্ষ্য করলাম যে অনেক আমেলা সদস্যের চোখ অশ্রুসিক্ত ছিল। হুজুরের কাছ থেকে এমন শক্তিশালী ও ঈমান বর্ধক নসীহত শুনে আমিও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম।

দৃষ্টান্ত স্হাপনের মাধ্যমে নেতৃত্বদান

মিটিং এর পর ন্যাশনাল জায়েদার সেক্রেটারী সাহেব হুজুরকে বলেন “জাপানের আহমদী বাচ্চারা যখন স্কুলে যায় তখন তারা ক্লাসে প্রবেশের পূর্বে তাদের জুতো র‍্যাকে সাজিয়ে রাখে। কিন্তু তারা যখন মসজিদে আসে তখন যেখানে সেখানে জুতো ফেলে রাখে। আমি বাচ্চাদের এর কারণ জিজ্ঞেস করি। তারা বলে স্কুলে সবাই নির্দিষ্ট স্হানে জুতো রাখে। মসজিদে আমরা আমাদের বড়দের অনুসরণ করি। তারা তো জায়গামতো জুতো রাখেন না। ”

হুজুর বলেন “কিভাবে আমাদের কাজ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের উপর প্রভাব ফেলে এটি তারই একটি উদাহরণ। তাই আমেলা সদস্য ও বয়োজ্যেষ্ঠদের উচিৎ নিজেদের সর্বোত্তম নৈতিকতা প্রদর্শন করা। যেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদেরকে নিজেদের আদর্শ মনে করতে পারে।”

আমেলা মিটিং প্রায় দুই ঘন্টা ধরে চলছিল। আমি যদিও সেই মিটিং এ কেবল একজন দর্শক ছিলাম। কিন্তু তারপরও আমি হুজুরের নির্দেশনা থেকে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি।

টোকিওর পথে একটি স্মরণীয় ট্রেন ভ্রমণ

২২ নভেম্বর বিকেলে হুজুর ও কাফেলা সদস্যগণ টোকিওর পথে রওনা দেন। এবারও আমরা বুলেট ট্রেনে যাই। আমি এবারও হুজুর ও তার স্ত্রীর পিছনের সিটে বসেছিলাম। মাঝপথে হুজুর উঠে দাড়ান। আমি ভাবলাম যে হুজুর হয়ত হাটবেন; তাই আমিও উঠে দাড়াই। কিন্তু হুজুর আমার পাশের খালি সিটে এসে বসেন। আলহামদুলিল্লাহ পরবর্তী কয়েক মিনিট আমার হুজুরের পাশে বসার সৌভাগ্য হয়। হুজুর আমার সাথে গতদিনের অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বার্তা বলেন। খিলাফত এ ওয়াক্ত এর এত কাছে বসে থাকা সেই মুহুর্তগুলো আমার কাছে অমূল্য। আমি যখন হুজুরের সাথে কথা বলছিলাম তখনই আমি ভাবছিলাম যে এই ট্রেন ভ্রমণ আমি সারাজীবন মনে রাখব, ইনশাল্লাহ।

হুজুর বলেন অনুষ্ঠানে একজন জাপানীজ ডাক্তার তাকে বলেন যে হুজুর ইসলামের যে শিক্ষা দিচ্ছেন সেই ইসলামকে তিনি জাপানে স্বাগত জানাবেন।

হুজুরের অবিচল হাত

বিকেল ৬.৩৫ মিনিটে আমরা টোকিওর হিলটন হোটেলে পৌছাই। সফরের শুরুতে আমরা যে রুমে ছিলাম এবারও সেই রুমেই উঠি। পৌছানোর পর হুজুর সদয়ভাবে আমাকে বলেন “টোকিওতে স্বাগতম” এবং আমাকে একটি ভিডিও দেখান। তিনি তার ফোন দিয়ে উচু অট্টালিকার ভিডিও করেছেন। ভিডিওটি দেখে আমি আশ্চর্য হলাম কারণ যখন কেউ ফোন দিয়ে ভিডিও করে তখন তার হাত কিছুটা কেঁপে থাকে। কিন্তু হুজুরের ভিডিও একটুও কাঁপেনি। মনে হচ্ছিল সেটি ট্রাইপডের উপর কোন ক্যামেরা থেকে তোলা হয়েছে।

নামাযের জন্য বিলম্ব

সেদিন সন্ধ্যা ৮ টায় নামায হবে। তাই আমি ও আহমদ ভাই সে সময় পর্যন্ত টিভি দেখছিলাম। ৭.৪০ মিনিটে আহমদ ভাই রুম থেকে বেরিয়ে যান। আমি মনে হয় ৫-৬ মিনিটের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এরপর আমি একটি কন্ঠস্বর শুনলাম যেটি আমাকে ডাকছে। আমি ভাবলাম আহমদ ভাই আবার রুমে ফিরে এসেছেন। কিন্তু চোখ খুলেই আমি বিস্মিত হলাম কারণ আমার বিছানার সামনে হুজুর দাড়িয়ে রয়েছেন।

হুজুর জিজ্ঞেস করলেন যে আমি কি নামায না পড়ার পরিকল্পনা করছি নাকি। এটি খুবই ভাল প্রশ্ন ছিল, কারণ নামাযের সময় হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। আমি হুজুরকে বললাম যে আমি ৭.৫০ মিনিটে এলার্ম দিয়ে রেখেছি। এটি বলা মাত্রই আমার ফোনের এলার্ম বেজে উঠল।

হুজুর আমার রুমের চারদিক দেখতে লাগলেন। আমার মনে হয় আমি তখনও কিছুটা ঘুমের মধ্যে ছিলাম। হঠাৎ করেই আমি হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম যে হুজুর টোকিওতে কোন দর্শনীয় স্হান ভ্রমণে যাবেন কিনা। এটি জিজ্ঞেস করেছি ভেবেই আমি লজ্জ্বিত হই। হুজুর বলেন “টোকিও ঘুরে দেখার আমার কোন প্রয়োজন নেই। আমি পূর্বেও টোকিও এসেছি এবং এটাই যথেষ্ট।”

হুজুর বলেন যে তিনি নামাযের জন্য নিচে যাচ্ছেন; আমারও ওযূ করে নামাযে যাওয়া উচিৎ। হুজুর যাবার পর আমি ওযু করি। আমি নামাযের প্রথম অংশ না পেলেও প্রথম রাকাতেই জামাতের সাথে নামাযে যোগ দেই।

হুজুরের সাথে কিছু মুহুর্ত

পরদিন ২৩ নভেম্বর আমি আমার রুমেই ছিলাম। সকাল ১১.৩০ মিনিটে আহমদ ভাই রুমে আসেন। তিনি আমাকে বললেন যে তার দেরী হয়ে যাচ্ছে তাই তিনি দ্রুত গোসল সেরে ফেলবেন।

কয়েক মিনিট পর আমি শুনলাম হুজুর সালাম বলে এবং নক করার পর আমাদের রুমে ঢুকলেন। ভাগ্য ভাল যে এবার আমি আগের দিনের মতো ঘুমিয়ে ছিলাম না। হুজুর বারান্দার দিকে মুখ করে রাখা একটি চেয়ারে বসলেন। আমি যে চেয়ারে বসেছিলাম হুজুর দেখলেন যে সেই চেয়ারের উপর আহমদ ভাই এর শার্ট ও টাই রাখা রয়েছে। তাই হুজুর আমাকে তার সামনের চেয়ারে এসে বসতে বললেন। আমি কিছু সময় হুজুরের সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য লাভ করলাম। আমি হুজুরকে বললাম যে আমি কয়েকদিন আগে নাগোয়াতে হুজুর যে বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটি পড়ছিলাম। আমি দেখলাম যে হুজুর স্বল্প সময়ে অনেক কিছু জিনিস বলেছেন। সেটি আমি তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারছি। হুজুর হেসে বলেন “দেখা যাচ্ছে তুমি প্রাথমিকভাবে আমার বক্তব্য বা খুৎবা যতটা পছন্দ কর; কিছু সময় পার হবার পর সেটি আরো বেশি করে পছন্দ কর।”

আমি বললাম যে হুজুরের বক্তব্য শোনার সময়ই আমার সেটি ভাল লাগে। কিন্তু যত দিন পার হতে থাকে  হুজুরের বক্তব্যের প্রজ্ঞা আমার কাছে আরো বেশী স্পষ্ট হতে থাকে। হুজুর বলেন “এরকম অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বয়স ও সংস্কৃতির লোক এসে থাকে। তাই আমি চেষ্টা করি এমন কিছু বিষয় বলতে যাতে সকলেই তা বুঝতে পারে।”

একটি অমুল্য লাফ

আমি তখন ভাবছিলাম যে আমি হুজুরের সাথে বরকতময় সময় কাটাচ্ছি আর আহমদ ভাই গোসল করছেন। তিনি জানেন না যে হুজুর এসেছেন এবং তার কাপড় চেয়ারের উপর। এ ব্যাপারটা কিভাবে সমাধান হবে আমি চিন্তা করছিলাম।

আমি যখন এসব চিন্তা করছিলাম তখন এমন একটি দৃশ্যের অবতারণা ঘটল যেটি সারাজীবন আমার স্মৃতিতে সবচেয়ে মজাদার ও স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে জমা থাকবে। তখন আমি হঠাৎ করেই বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ পাই। দেখি যে আহমদ ভাই কোমরে একটি তোয়ালে পেচিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বের হয়ে আসছেন। যখন তিনি দেখলেন যে আমার পাশে কে বসে আছে তখন তার চেহারা দেখার মতো হয়েছিল। আমি কখনো মুখের অভিব্যক্তি এত দ্রুত পরিবর্তন হতে দেখিনি। তার চোখে ভয় দেখা যাচ্ছিল এবং তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। আর কোন চিন্তা না করে আহমদ ভাই দ্রুত লাফ দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলেন। যদি সে সময় আহমদ ভাই এর গতি পরিমাপ করা যেত তাহলে আমি নিশ্চিত যে দেখা যেত তিনি কোন না কোন রেকর্ড অবশ্যই ভেঙ্গে ফেলেছেন।

আম নিশ্চিত যে হুজুর, আহমদ ভাইকে বের হতে দেখেছেন; কিন্তু কতটুক দেখেছেন সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত না। হুজুর চেয়ারে রাখা আহমদ ভাই এর কাপড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন “আমাদের উচিৎ এখন বাইর বের হওয়া কারণ আহমদের কাপড় এখানে রয়েছে।”

 

বের হবার সময় আমি আমার হাসি থামাতে পারছিলাম না। আমি হুজুরকে অনুসরণ করে রুম থেকে বের হলাম। রুম থেকে বের হবার পূর্বে আমি বাথরুমে নক করলাম। আহমদ ভাই উঁকি দিলে আমি তাকে বলি যে রাস্তা পরিস্কার।

ব্যক্তিগতভাবে আমি ঘটনাটিতে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। হল্যান্ড সফরে হুজুর আমাকে রাতের ঘুমানোর পোশাকে দেখে ফেলেছিলেন বলে আমি লজ্জ্বিত ছিলাম। কিন্তু এই ঘটনার তুলনায় সেটা কিছুই না। সারাটা দিন আমার যখনই এই ঘটনার কথা মনে হচ্ছিল আমি তখনই হাসছিলাম। এটি লেখার সময়ও আমি আমার হাসি থামাতে পারছি না।

করিডোরে বসে থাকা

রুম থেকে বের হয়ে হুজুর করিডোরের শেষ মাথায় একটি চেয়ারে বসলেন। সেখানে আর একটি চেয়ার ছিল যেখানে হুজুর আমাকে বসতে বলেন। কিছুদিন আগে আমি হুজুরকে একটি ভিডিও দেখিয়েছিলাম যেটি আমার স্ত্রী আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিল। সেখানে একজন চাইনিজ চোর মোটরবাইকে করে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার পাশে একজন তরুণীকে দেখে সে বাইক থেকে নামে ও তার পার্স ছিনতাই করে। কিন্তু তরুণীটি ভয় না পেয়ে দৌড়িয়ে বাইকের কাছে যায়। বাইকের চাবি বাইকের ইগনিশনেই লাগানো ছিল। সে তারপর চোরের বাইক নিয়ে চলে যায়। চোরটির চেহারায় তখন হতাশা ও ভয়ের ভাব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

হুজুর তখন সেই ভিডিওটির কথা বলেন। তিনি বলেন যে মহিলাটি চোরকে একটি শিক্ষা দিয়েছে। আমার মনে হল হুজুরের ভিডিওটি পছন্দ হয়েছিল; মাশাআ’ল্লাহ।

টোকিও রিসেপশন অনুষ্ঠান

কয়েক মিনিট পর আমি হুজুরের সাথে রিসেপশন হল রুমে গেলাম। জাপানী অতিথিদের হুজুরের বাণী পৌছানো ও তাদের সাথে হুজুরের সাক্ষাৎ করাই এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। এর ফলে খলীফাতুল মসীহ আরো একবার ইসলামের সুন্দর শিক্ষাসমূহ জাপানীজদের কাছে পৌছাতে পারবেন।

অতিথিদের বক্তব্য

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের পর দুইজন অতিথি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। একজন হলে ড: মাইক সাটা। যিনি সফরের শুরুতে হুজুরের জন্য রাতের খাবারের আয়োজন করেছিলেন। আর একজন হলেন মি: এনডো সিনিচি; ইনি টহুকো থেকে এখানে আসেন। ২০১১ সালের ভূমিকম্প ও সুনামীতে এই অঞ্চলই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্হ হয়েছিল।

আমি যদি ড: সাটার বক্তব্যের শুধু অডিও শুনতাম এবং তাকে পূর্ব থেকে না জানতাম; তাহলে আমি ভাবতাম যে একজন আহমদী বক্তৃতা দিচ্ছে। তিনি নিজের সম্বন্ধে কোন কথাই বলেন নি। তিনি হুজুরের সম্বন্ধে কথা বলেন এবং খলীফাতুল মসীহকে সম্বোধনের সময় তিনি বারবারই “হুজুর” শব্দটি ব্যবহার করছিলেন।

তিনি শ্রোতাদের বলেন যে কিভাবে হুজুর খলীফা হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি বলেন যে হুজুর বিশ্বে শান্তির বাণী ছড়িয়ে দেবার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। তার মনে হয়েছে “বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে শান্তি স্হাপনই হুজুরের লক্ষ্য।”

ড: সাটা তার বাগান থেকে একটি ছোট দেবদারু গাছ নিয়ে আসেন। তিনি এটি পুরস্কার হিসেবে দেন এবং ইচ্ছে প্রকাশ করেন যে গাছটিকে শান্তির প্রতীক হিসেবে বায়তুল আহাদ মসজিদে স্হাপন করা হোক। হুজুর তার অনুমতি দেন এবং অনুষ্ঠানে হুজুর ও ড: সাটা গাছটিতে পানি দেন। পরবর্তীতে গাছটিকে বায়তুল আহাদ মসজিদে লাগানো হয়।

আর একজন অতিথি এনডো সিনিচি তার বক্তব্যে ২০১১ সালের ভূমিকম্পের পর আহমদীয়া জামাতের মানবতামূলক কর্মকান্ডের প্রশংসা করেন। তিনি অনেক আবেগের সাথে বলেন “আহমদীয়া মুসলামনদের সাহায্য ও ভালবাসার করণেই আমাদের মধ্যে অনেকে এখনো জীবিত রয়েছে। আমরা কখনো এই ঋণ শোধ করতে পারব না।”

হুজুরের বক্তব্য

হুজুর তার বক্তব্যে বিশ্বের বর্তমান পরিস্হিতি ও ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা তুলে ধরেন। হুজুরের বক্তব্য আমার কাছে অনেক আবেগপ্রবণ মনে হয়েছে। তিনি বারবার ৭০ বছর পূর্বে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিউক্লিয়ার বোমা আক্রমণের কথা বলেন। হুজুর বলেন “আপনাদের দেশ জাপানকে সবচেয়ে ভয়াবহ ও দুঃখজনক ঘটনার স্বীকার হতে হয়েছে। হাজার হাজার জাপানীজকে নিশৃংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিউক্লিয়ার বোমার সাহায্যে দুইটি শহরকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে; যা পুরো মানবতার জন্য লজ্জ্বাজনক।”

“পূ্র্বের ইতিহাস থেকে বলা যায় যে জাপানই অন্যান্য দেশের চেয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা সবচেয়ে ভালভাবে বুঝতে পারবে। তাই জাপানকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।”

“জাপান সরকারের উচিৎ যেকোন রকম অমানবিকতা, নির্যাতন ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানো। তারা যে ঘৃণ্য আক্রমণের স্বীকার হয়েছিল সেটি যেন বিশ্বের আর কোথাও না হয় সেটি জাপানীজদের নিশ্চিত করতে হবে।”

জাপানে নিউক্লিয়ার আক্রমনের পর মুসলেহ মাউদ(রাঃ) এই ঘটনার নিন্দা জানান। হুজুর মুসলেহ মাউদ(রাঃ) উদ্ধৃতি পাঠ করেন “আমাদের ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা পুরো বিশ্বের সামনে আমাদের এই ঘোষণা দিতে বাধ্য করছে যে আমরা এই ভয়াবহ ঘটনা ও রক্তপাতকে কোন অবস্হাতেই সমর্থন করি না। যদি কোন সরকার আমার এই বক্তব্যকে পছন্দ নাও করে তাহলেও আমার কিছু যায় আসে না।”

হুজুর হযরত চৌধুরী জাফরুল্লাহ খান সাহেবের ঐতিহাসিক বক্তব্যের কথা বলেন। যেটি তিনি ১৯৫১ সাল সান ফ্রানসিসকো শান্তি সম্মেলনে দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি যুদ্ধ পরবর্তী জাপানের সাথে ন্যয়বিচার করার আহবান জানান। জাফরুল্লাহ খান জাপানের প্রতি অবরোধ আরোপের প্রস্তাবের প্রতি তীব্র নিন্দা জানান। হুজুর বলেন “জাফরুল্লাহ খান যদিও তখন পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি কোরআনের শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।”

হুজুর পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত পাঠ করেন যেখানে মানবসভ্যতাকে শান্তির প্রতি আহবান করা হয়েছে। বক্তব্য শেষ করার পূর্বে হুজুর বলেন “বিভিন্ন দলে বিভক্ত না হয়ে আমাদের উচিৎ হবে একত্র হয়ে এক অপরকে সাহায্য করা।”

প্রশ্নোত্তর পর্ব

হুজুরের বক্তব্যের পর জাপানী অতিথিদের সাথে হুজুরের একটি প্রশ্নোত্তর পর্ব হয়। হুজুরকে ইসলামে প্রতিমা পূজা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। হুজুর বলেন “সকল প্রকার প্রতিমার ইবাদত ইসলামে নিষিদ্ধ। কিন্তু সম্প্রতি সিরিয়াতে জঙ্গী দল দায়েশ বিভিন্ন ঐতিহাসিক মূর্তি ভাঙছে; সেটি সম্পূর্ণ ভুল। যদি তাদের ধ্বংস করতেই হতো তাহলে মহানবী(সাঃ) বা তার সাহাবীগণ কেন তা করেননি?”

একজন অতিথি বলেন যে হুজুরের বক্তব্যের মাধ্যমেই তিনি প্রথমবারের মতো জানতে পারেন যে ইসলাম একটি শান্তিপ্রিয় ধর্ম। অন্যান্য ধর্ম সম্বন্ধে ইসলামের কি মতামত তা তিনি জানতে চান। হুজুর বলেন “কোরআনের একটি মূল শিক্ষা হল যে ধর্মে কোন জোর জবরদস্তি নেই। আল্লাহতা’লার সকল নবীকে ভালবাসা ও তাদের সম্মান করা সকল মুসলমানের জন্য আবশ্য কর্তব্য।”

অতিথিদের সাথে সাক্ষাৎ

অনুষ্ঠানের পর হুজুর নীরব প্রার্থনা করেন। অতিথিদের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করা হয়। পরবর্তী ৩০ মিনিট আমি বিভিন্ন অতিথিদের সাথে কথা বলি। আমি মিঃ এটসেন এর সাথে কথা বলি। হজুরের বক্তব্য শোনার পর তিনি খুব আবেগপ্রবণ ছিলেন। তিনি বলেন “আমি নিজেকে অনেক সম্মানিত ও ভাগ্যবান মনে করছি; কারণ খলীফা জাপানীজদের ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা বোঝানোর জন্য এত দূর থেকে এসেছেন। সাধারণত আমাদের কোন মুসলামনের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ হয় না। কিন্তু আজকে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে মহান মুসলমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। আমরা অনেক ভাগ্যবান। আমি খলীফার চোখের মাঝে ন্যয়, সততা ও প্রজ্ঞা দেখতে পেয়েছি। তিনি জাপান এসেছেন আমাদের শান্তির বার্তা এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা পৌছিয়ে দিতে।”

জাপানীজ টাকেশি কোকো সাহেব বলেন “বেশীরভাগ জাপানী মসুলমানদের সম্বন্ধে খারাপ ধারণা পোষণ করে। কিন্তু আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনাদের খলীফা শান্তি ছাড়া আর কিছু নন। তিনি বলেছেন ৭০ বছর পূর্বে যে ভুল হয়েছে সেই বর্বরতা আর কোনভাবেই পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। ”

মি: মিউরা বলেন “খলীফা বলেছেন; এটি একে অন্যকে উত্তেজিত করার সময় নয় বরং এখন একত্র হয়ে একে অন্যের প্রতি ভালবাসার হাত বাড়িয়ে দেবার সময়।”

আশায়ি শিমবান এর সাথে সাক্ষাৎকার

আলহামদুলিল্লাহ টোকিওর অনুষ্ঠান অনেক বরকতময় বলে প্রমাণিত হয়েছিল। এরপর হুজুর আশায়ি শিমবান সংবাদপত্রকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। এটি জাপানের বহুল প্রচারিত একটি সংবাদ মাধ্যম। সংবাদিক হুজুরকে জিজ্ঞেস করেন যে বিশ্বের কোন কোন স্হানে আহমদীয়াত বিস্তার লাভ করেছে। হুজুর বলেন “জাপানে আমাদের জামাতের সদস্য অনেক কম। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য স্হানে বহু আহমদী রয়েছে। যেমন আফ্রিকাতে লাখ লাখ আহমদী রয়েছে। কিন্তু সংখ্যা কম হোক বা বেশী; গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল আহমদীদের সবসময় ইসলামদের প্রকৃত শিক্ষার অনুসরণ করে চলতে হবে।”

সাংবাদিক জানতে চান জাপানীজদের প্রতি হুজুরের কি বার্তা রয়েছে। জবাবে হুজুর বলেন “বর্তমান বিশ্ব আর একটি বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একটি দেশ হিসেবে জাপানের উচিৎ বিশ্ব শান্তি স্হাপন এবং সকল বিবাদ সমাধানের চেষ্টা করা।”

বিচলিতবোধ করা

সাক্ষাৎকার শেষ হবার পর সদর সাহেব হুজুরকে জানান যে নামাযের জন্য হল রুমকে প্রস্তুত করতে কিছুটা সময় লাগবে। তাই পরবর্তী ২০ মিনিট হুজুর যেখানে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সেখানেই থাকেন। কয়েক মিনিট পর হুজুর আমাকে ডাকেন এবং অতিথিদের সাথে আমার কি কথা হয়েছে তা জানতে চান।

গত কয়েক বছরে আমি হুজুরকে এরকম অনেক রিপোর্ট দিয়েছি। কিন্তু এবার পরিবেশ সম্পূর্ণ অন্যরকম ছিল। আমি হুজুরের বাম পাশে ছিলাম। আমার বাম দিকে ছিলেন কাফেলা সদস্য মুনীর জাভেদ সাহেব, মাজীদ তাহের সাহেব, মোবারক জাফর সাহেব এবং জাপান সদর সাহেব। তাদের উপস্হিতির জন্য আমি আরো বিচলিত বোধ করি। আমার উর্দু এমনিতেই খুব দুর্বল। হুজুর আমার দুর্বলতা ভালভাবেই জানেন তাই তিনি আমার ভুলভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু আমার আশেপাশে আরো শ্রোতা থাকার কারণে আমি আরো চাপে পড়ে যাই।

তারপরও আমি পরবর্তী ১৫ মিনিট অনবরত কথা বলে যাই। এরপর আমার মুখ একদম শুকিয়ে যায়। এটি আমার জন্য একটি ভাল অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ ছিল বলা যায়। এরপর আমার নিজের উপর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, মাশাআল্লাহ।

জাপানের কিটক্যাট

আমাদের হোটেল থেকে হাটা দূরত্বেই একটি শপিং মল রয়েছে। তাই বিকেলে আমরা কয়েকজন সেখানে বাসার জন্য কিছু উপহার কিনতে যাই। জাপানে আমি একটি জিনিস লক্ষ্য করেছি যে তাদের কিটক্যাট চকলেটের প্রতি আশ্চর্যরকম দুর্বলতা রয়েছে। সফরের শুরতেই একজন স্হানীয় খাদেম আমাকে বলেছিলেন যে জাপানে ২৪ প্রকার বিভিন্ন স্বাদের কিটক্যাট পাওয়া যায়। আমার পরিবারের সদস্যরাও চকোলেট পছন্দ করে। তাই এখানে আমি যেকোন দোকানে গেলেই দেখতাম যে তাদের কোন প্রকার কিটক্যাট রয়েছে। সেদিন শপিং মলে আমি একটি দোকান দেখি যেখানে ব্যাপক সংখ্যক কিটক্যাট সাজানো ছিল। সেখানে যখন আমি কিটক্যাটের স্বাদের বিবরণ পড়ি তখন একই সাথে আশ্চর্য ও ভীত হই। আমি কিছু বিচিত্র স্বাদের কিটক্যাট ক্রয় করা থেকে নিজেকে সামলাতে পারিনি; যেমন “ওয়াসাবী কিটক্যাট”, “সবুজ চা কিটক্যাট”, “মিষ্টি আলু কিটক্যাট”, “ষ্ট্রবেরী চীজকেক কিটক্যাট”, “ক্রিম বার্লি কিটক্যাট” ইত্যাদি।

আমি ওয়াসাবী কিটক্যাট পরখ করার জন্য উদগ্রীব ছিলাম। এর আগে আমি কেবল সুশির সাথেই ওয়াসাবী খেয়েছি। আমার মনে হল ওয়াসাবী কিটক্যাট খেতে দারুণ হবে।

তাই লন্ডনে পৌছে আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওয়াসাবী কিটক্যাট এর প্যাকেট খুলে আমার মুখে দেই। আমি ভেবেছেলিম অত্যন্ত মজাদার একটি স্বাদ পাব। কিন্তু আমি অনেক কষ্ট করে প্রথম টুকরোটি গিলতে সক্ষম হই। আমি ভাবছিলেম কেন একজন ওয়াসাবীর সাথে চকলেটকে মেশাতে চাইলো।

একটি আবেগপ্রবণ ঘটনা এবং শহীদদের প্রতি হুজুরের ভালবাসা

শপিং মলে আমরা কফি খাবার জন্য একটি দোকানে যাই। সেখানে ড: তানভীর আমাকে তার পিতা সাঈদ আহমদ শহীদ সম্বন্ধে বলেন। তিনি ২৮ মে, ২০১০ সালে লাহোর মসজিদ আক্রমণের সময় শহীদ হন।

তিনি আমাকে বলেন “রাবওয়াতে কবর দেবার সময় জামাতের বয়স্করা এবং মসিহ মাউদ(আঃ) এর পরিবারের সদস্যগণ নিজ হাতে আমাকে খাবার তুলে দিয়েছেন এবং এটি করতে পেরে তারা নিজেদের সম্মানিতবোধ করছেন। আমি এতে খুবই লজ্জ্বা পাচ্ছিলাম। কিন্তু প্রত্যেক আহমদীর ভালবাসা ও আবেগ দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম।”

“আমার পিতাকে কবর দেবার সময় অন্য আরো শহীদদেরও কবর দেয়া হচ্ছিল। আমি দেখলাম একজন বয়স্ক আহমদী মহিলা উন্মদের মতো এক কবর থেকে অন্য কবরে ছোটাছুটি করছেন। আমার মনে হল তিনি কাছেই কোন গ্রামে থাকেন। পাকিস্তানের অন্যান্য গ্রামের মানুষের মতোই তাকেও সহজ-সরল ও নিরক্ষর বলে মনে হল। ”

কবেক মিনিট পর ড: সাহেব তার কাছে গেলেন। তিনি ভাবলেন সেই মহিলা হয়ত দোয়া করার জন্য কোন নির্দিষ্ট শহীদের কবর খুঁজছেন। তিনি তার কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কোন শহীদের কবর খুজঁছেন। মহিলা তার দিকে তাকিয়ে বলেন “এরা সবাই আমার। এরা সবাই আমার। সকল আহমদী শহীদই আমার।”

ড: সাহেব বললেন “আমি বুঝলাম কেন তিনি পাগলের মতো এক কবর থেকে অন্য কবরে দৌড়াচ্ছিলেন। তিনি সকল শহীদকেই ভালবাসেন ও নিজের পরিবার বলে মনে করেন। ”

সেসময় হুজুর তার পরিবারের সকল সদস্যদের সাথে কথা বলেন। আমার মনে আছে সেসময় হুজুরের ব্যক্তিগত সহকারী সাহেবের অফিসে শহীদদের পরিবারের সদস্যদের লম্বা তালিকা ছিল। প্রতিদিন হুজুর একজন একজন করে সবার সাথে কথা বলতেন। তিনি তাদের সাথে অনেক সময় নিয়ে কথা বলতেন। তিনি তাদের আশ্বস্ত করতেন এবং তাদের অবস্হা জানতে চাইতেন। প্রতিটি আহমদীর প্রতি হুজুরের ভালবাসা সত্যিই অসাধারণ।

আহমদীদের সাথে সাক্ষাৎ

সোমবার জাপানে আমাদের শেষ দিন। তারমানে এই নয় যে হুজুর আজকে কম কাজ করবেন। বরং হুজুর সেদিন স্হানীয় জামাতের সদস্য ও অন্যান্য দেশ থেকে আসা সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আমি একজন ইন্দোনেশিয়ান মহিলা ট্রিয়াগোসটিয়ানি সাহিবার সাথে কথা বলি। তিনি তার স্বামী ও সন্তান নিয়ে জাপানে এসেছেন। হুজুরের সাথে প্রথমবারের মতো দেখা করে তার আনন্দের কোন সীমা ছিল না। কথা বলার সময় তিনি কাদঁছিলেন। তিনি বলেন “আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে হুজুরের সাথে দেখা করতে এসেছি। ব্যয়ভার বহন করার ব্যাপারটি আমাদের জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু হুজুরের সাথে দেখা করার আনন্দের কাছে এসব বাধা বিপত্তি কিছুই নয়। আমি অনেক ভাগ্যবান। আমি অনেক ভাগ্যবান। আমরা দোয়া করি হুজুর যেন ইন্দোনেশিয়া সফর করতে পারেন। হুজুরের সফরের বরকতে আমাদের দেশ পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যাবে। আল্লা্কে অশেষ ধন্যবাদ যে আমি, আমার স্বামী ও সন্তানসহ হুজুরের সাথে দেখা করতে পেরেছি।”

আমি ফারহান মালিক(৩৪ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি যখন শিশু ছিলেন তখন তার পরিবার জাপানে চলে আসেন। তিনি তার স্ত্রী(ইউকা জেসমিন) সহ হুজুরের সাথে দেখা করেন। তার স্ত্রী একজন জাপানীজ মহিলা। তিনি ২০০৯ সালে বয়াত করেন। ইউকা সাহিবা ইংরেজী পারেন না। তাই তার স্বামী অনুবাদকের কাজ করেন। ইউকা সাহিবা বলেন “আহমদী হবার পর আমি আমার সকল সমস্যা ও চিন্তা থেকে বের হবার একটি উপায় পেয়েছি। সেটি হল দোয়া। তাই যখনই আমি কোন সমস্যায় পড়ি আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি এবং তার কাছেই সাহায্য চাই। আল্লাহ সবসময় আমার সমস্যা সমাধান করে দেন।”

এয়ারপোর্টে হুজুরকে বিদায়

পরদিন সকাল ১১ টায় হুজুর নারিটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে লন্ডনগামী বিমানে উঠবেন। হোটেল থেকে বিমানবন্দর যেতে এক ঘন্টা সময় লাগে। তাই আমরা নীরব প্রার্থনার পর ৭.৫৫ মিনিটে হোটেল থেকে বের হই।

বিমানবন্দরে স্হানীয় আহমদী সদস্যগণ হুজুরকে বিদায় জানান। তাদের দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে খলীফার বিদায়ে তারা সকলেই বিমর্ষ। তারা জানে না এরপর কবে তারা খলীফার দেখা পাবে। হুজুর বিমানে উঠার পুর্বে তাদের সাথে দেখা করেন।

অশান্ত বিমান ভ্রমণ

সকাল ১১ টায় আমরা ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজ বিমানে উঠি। জাপান সফর শেষ হবার কারণে আমি কিছুটা দুঃখিত।

জাপানে আসার সময় আমাদের সফর নির্বিঘ্ন ছিল। কিন্তু এবার আমাদের বিমান ভয়ংকর ভাবে কাঁপছিল। ক্যাপ্টেন বিমানের কর্মীদেরও সিটে বসতে বললেন। বিমানের ঝাঁকুনি এতটাই তীব্র ছিল যে অনেকেই দুশ্চিন্তাগ্রস্হ হয়ে পড়েছিল। নাদিম আমিনী সাহেব আমাকে বলেন যে তার পাশে যে জাপানীজ মহিলা বসে আছেন তাকে দেখে মনে হচ্ছে যে তিনি মূর্ছা যাবেন। সাধারণ অবস্হায় আমিও হয়ত অনেক ভয় পেতাম। কিন্তু যতই ঝাঁকুনি হোক না কেন আমি একটুও ভয় পাইনি বা চিন্তিত হইনি। একই কথা সকল কাফেলা সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য। এর কারণ খুবই সহজ; কেননা আমরা জানতাম যে হুজুর এই প্লেনে রয়েছেন। ইনশাল্লাহ আল্লাহ আমাদের সকলকে রক্ষা করবেন। তাই “হে আল্লাহ আমাদের প্লেনকে রক্ষা কর” এই দোয়া না করে আমি আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলাম যে আমি খলীফাতুল মসীহর সাথে একই প্লেনে রয়েছি।

এক ঘন্টা পর ঝাঁকুনি থেমে গেল এবং পরে আর কোন সমস্যা হয়নি। আহমদ ভাই ও খাজা কুদ্দুস সাহেবের মাঝের সিটে আমি বসেছিলাম। বেশির ভাগ সময়ই আমি ঘুমিয়েছি। সাধারণত প্লেনে আমি ঘুমাতে পারি না। কিন্তু সফরের পূর্বে ড: তানভীর সাহেব আমাকে সফরে বমি ভাব না হবার কিছু ঔষুধ দিয়েছিলেন। সেই ঔষুধের প্বার্শপ্রতিক্রিয়া হল তন্দ্রাভাব আসা। আমি নিশ্চিত এ কারণেই আমি এত ভাল ঘুমিয়েছি।

লন্ডন আগমন

দুপুর ২.৪৫ মিনিটে আমরা লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরন করি। ইউকে আমীর সাহেব হুজুরকে স্বাগত জানান। আমাদের কাফেলা সখন মসজিদ ফযলে যায় সেখানে শত শত আহমদী আমাদের স্বাগত জানান।

উপসংহার

বাসায় পৌছে আমি জাপান সফরের অশেষ বরকত নিয়ে ভাবতে থাকি। যখন পুরো বিশ্ব অশান্তি ও নৈরাজ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে; যখন ইসলামকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে; তখন আমাদের খলীফা অত্যন্ত সুন্দরভাবে মহানবী (সাঃ) ও কোরআন এর সঠিক শিক্ষা জাপানীজদের মাঝে প্রচার করেছেন।

নাগোয়া ও টোকিওর অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন মিডিয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে হুজুরের শান্তির বার্তা সরাসরি জাপানীজদের কাছে পৌঁছেছে। মেইজি মন্দিরে হুজুর আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষা প্রচার করেছেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে হুজুর স্হানীয় মানুষদের কোরআনের শিক্ষার আলোকে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এটি অনেক সফল ও বরকতপূর্ণ একটি সফর। এজন্য আল্লাহতা’লা কে অশেষ ধন্যবাদ। আল্লাহপাক হুজুরকে সুস্বাস্হ্য দান করুন; দীর্ঘ ও আনন্দময় জীবন দান করুন এবং সকল আহমদীকে হুজুরের নির্দেশিত পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।