Menu

হুজুরের স্ক্যান্ডেনেভিয়া সফর (তৃতীয় ও শেষ পর্ব)

[হুযুর (আইঃ) এর স্ক্যান্ডেনেভিয়া সফরঃ আবিদ খান সাহেবের ব্যক্তিগত ডায়েরী। ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদকৃত]

স্টকহোমে অতিথিদের সাথে হুজুরের সাক্ষাৎ

১৮ মে হুজুর ও তার কাফেলা স্টকহোমে প্রবেশ করে। সেখানে কয়েকজন সম্মানিত অতিথিদের সাথে হুজুর সাক্ষাৎ করবেন। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত, ভারতের রাষ্ট্রদূত, সুইডেনের একজন খৃষ্টান ধর্মযাজক, ইহুদীদের একজন প্রতিনিধি, অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও গবেষক। অতিথিগণ ইসলাম ও বিশ্ব পরিস্হিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।

অধ্যাপকগণ আহমদী ও অন্যান্য মুসলমানদের মধ্যে পার্থক্য জানতে আগ্রহী ছিলেন। হুজুর সকল প্রশ্নের বিস্তারিত ও পরিস্কার উত্তর দেন।

একজন হুজুরের কাছে জানতে চান খলীফাতুল মসীহ হিসেবে হুজুরের কি ক্ষমতা রয়েছে। হুজুর বলেন “খলীফা হল নবীর প্রতিনিধি। তাই তার কাজ হল নবী তাকে যেসব দায়িত্ব দিয়েছে সেগুলো ঠিকভাবে পালন করে নবীর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। এই কাজ হল মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার কাছে নিয়ে যাওয়া, মানুষের প্রতি মানুষের যে দায়িত্ব রয়েছে সেটি তাদেরকে বোঝানো এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করা।”

“খলীফাতুল মসীহ একজন আধ্যাত্মিক নেতা। প্রশাসনিক ভাবে তিনি আহমদীয়া মুসলিম জামাতের প্রধাণ হলেও, তিনি কোন সরকার বা রাজনৈতিক দলের নেতা হবার চেষ্টা করেন না। আমার বিশ্বাস হল দেশ ও ধর্ম দুইটি ভিন্ন ব্যাপার এবং খলীফার কাজ কাজ হল মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে দিক নির্দেশনা দেয়া।”

ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মিসেস বনশ্রী হ্যারিসন বলেন “ভারতীয় সরকার মনে করে আহমদীয়া মুসলিম জামাত ভারতের অনেক উপকার করেছে। আমরা মনে করি ধর্ম শান্তি স্হাপনের একটি উপায়।”

হুজুর তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন “ধর্ম হল মনের ব্যাপার এবং সকল ধর্মের মূল বক্তব্যই হল শান্তি, ভালবাসা ও সৌহার্দ্য। ”

ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত আইজ্যাক বলেন “আপনাদের জামাতের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। আমি আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আপনাদের জামাতকে ধন্যবাদ জানাই। ”

হুজুর বলেন “আহমদী মুসলমানগণ বিভিন্ন ধর্মের লোকের মধ্যে সুসম্পর্ক স্হাপনের চেষ্টা করে যাচ্ছে।”

একজন শিক্ষাবিদ হুজুরকে আহমদী ও লাহোরী জামাত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। হুজুর বলেন “লাহোরী জামাত খিলাফতকে স্বীকার করে না। যেখানে আমরা বিশ্বাস করি নবীর পরে খিলাফত প্রতিষ্ঠা হবে। এটি আমাদের ও তাদের মধ্যে মূল পার্থক্য। তাদের সাথে আমাদের ভাল সম্পর্ক রয়েছে। কয়েক বছর পূর্বে আমি বার্লিনে লাহোরী জামাতের মসজিদে গিয়েছিলাম। সেখানে ইমাম সাহেব আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাই নিঃসন্দেহে আমাদের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কোনরকম শত্রুতা বা ঘৃণা নেই। ”

 

একজন অতিথি হুজুরেরে কাছে জানতে চান বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক প্রতিবন্ধকতা কি? হুজুর বলেন “বর্তমানে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মানুষ সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাদের কর্তব্যকে ভুলে গেছে। তাই আমাদের প্রধান কাজ হল মানুষকে পুনরায় আল্লাহর দিকে নিয়ে যাওয়া। ”

আহমদী মুসলমানগণ হজ্জ্ব করতে পারে কিনা এর জবাবে হুজুর বলেন “কিছু আহমদী হজ্জ্ব করতে যায় কিন্তু তারা তাদের পরিচয় গোপন রাখে। মাঝেমাঝে তাদের কিছু সমস্যার সম্মুক্ষীণও হতে হয়। আমার বড় ভাই দুই বছর পূর্বে হজ্জ্ব করে এসেছেন।”

হুজুরের কাছে জানতে চাওয়া হয় আহমদীদের হজ্ব করার জন্য কোন বিকল্প স্হান রয়েছে কিনা। হুজুর বলেন “কোনকিছুই হজ্বের বিকল্প হতে পারে না। এটি ইসলামের একটি স্তম্ভ। অবশ্যই আমাদের কাছে কিছু পবিত্র স্হান রয়েছে যেমন কাদিয়ান, যেখানে প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং সেখানেই তার কবর রয়েছে। কিন্তু এটি কোনভাবেই মক্কার সমমর্যাদা সম্পন্ন নয়। ”

সাক্ষাতের শেষ দিকে হুজুরকে তার লক্ষ্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। হুজুর বলেন “আমাদের লক্ষ্য হল প্রতিটি মানুষ যেন তার সৃষ্টিকর্তার দিকে মাথা নত করে। কোন পার্থিব ক্ষমতা অর্জন বা কোন দেশ দখল করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং আমরা চাই মানবজাতি যেন একে অপরের প্রতি তাদের কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করে। আমরা চাই সকল মানুষ আধ্যাত্মিকভাবে উন্নতি করুক। সুইডেন, জার্মানী বা বিশ্বের অন্য কোথাও কোন প্রকার ক্ষমতা লাভের ইচ্ছা আমার নেই।”

হুজুর বলেন যে প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) বলেছেন “আমার কোন সিংহাসন বা মুকুটের কোন প্রয়োজন নেই। আমি কেবল আমার খোদার সন্তুষ্টি অর্জন করতে চাই। তাই বিশ্বের শক্তিশালী দেশসমূহের আমাদের ভয় পাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই, কারণ আমরা সম্পূর্ণভাবেই একটি আধ্যাত্মিক সংস্হা।”

 

হুজুরের শিষ্টাচার

এক পর্যায়ে হুজুর স্টকহোমের তরুণ মোবাল্লেগ ইনচার্জ কাশিফ সাহেবকে উর্দুতে কিছু জিজ্ঞেস করেন। এরপর হুজুর অতিথিদের বলেন “কিছুক্ষণ আমার মাতৃভাষায় কথা বলরার জন্য দয়া করে আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি কাশিফের কাছে জানতে চাচ্ছিলাম এখান থেকে তার বাসা কতদূর।”

অতিথিদের সাথে হুজুর প্রায় এক ঘন্টা আলাপ করেন। এর মধ্যে মাত্র ৩০ সেকেন্ড তিনি উর্দুতে কথা বলেন। কিন্তু হুজুরের শিষ্টাচার এতই উন্নতমানের যে তিনি এজন্যও অতিথিদের কাছে ক্ষমা চান। হুজুর উর্দুতে কি বলছিলেন সেটিও অতিথিদের বলেন যাতে তারা এটি মনে না করে যে তাদের সম্বন্ধে কিছু বলা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত।

 

স্হানীয় মোবাল্লেগ সাহেবের বাসা পরিদর্শন

হুজুর ও তার কাফেলা এরপর স্টকহোমের সদর সাহেব খালিদ মাহমুদ সাহেবের বাসায় যান। স্হানীয় জামাত সেখানেই হুজুর ও তার কাফেলাকে দুপুরের খাবার খাওয়ার প্রস্তাব দেয়। হুজুর খাবারের পূর্বে স্হানীয় মোবাল্লেগ কাশিফ সাহেবের বাসায় যান। তিনি জামেআ আহমদীয়া ইউকে থেকে পাশ করে বর্তমানে সুইডেনে মোবাল্লেগ হিসেবে কর্মরত আছেন। হুজুর সকল ওয়াকফে জিন্দেগীদের জন্য অনেক ভালবাসা রাখেন। এটি তার আর একটি দৃষ্টান্ত যেখানে হুজুর অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যেও কিছু সময় স্হানীয় মোবাল্লেগের বাসায় সফর করেন।

হুজুরের আগমনে কাশিফ সাহেব ও তার পরিবার অত্যন্ত আনন্দিত হয়। তিনি বলেন “হুজুরের আগমন আমাদের জন্য অত্যন্ত বরকত ও সম্মানের বিষয়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোন ভাষা আমার নেই। আমি কেবল সকল আহমদী ভাই বোন দের একটি কথাই বলতে চাই, যে আমাদের একজন খলীফা রয়েছেন যিনি সকলকে অত্যন্ত ভালবাসেন ও তাদের জন্য চিন্তা করেন।”

 

কাশিফ সাহেবের স্ত্রী নামুদ-এ-সাহার সাহিবা বলেন “আলহামদুলিল্লাহ, আজ আল্লাহ আমাদের অশেষ বরকত দিয়েছেন এবং আমাদের দোয়া কবুল করেছেন। খলীফার সাথে আমাদের আজ কিছু স্মরণীয় সময় কেটেছে। আমার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমাদের কোন যোগ্যতাই নেই, কিন্তু তা সত্ত্বেও পরমকরুণাময় আল্লাহতআ’লা আমাদের উপর অশেষ দয়া প্রদর্শন করেছেন।”

 

কাশিফ সাহেবের পিতা মাহমুদ সাহেব বলেন “হুজুরকে আমাদের বাসায় অভ্যর্থনা জানানো আমার জন্য বিরাট সম্মানের বিষয়। হুজুরের এই সফরে জামাত কিরকম প্রচারণা পেয়েছে তা নিয়ে মুরুব্বী সাহেবের সাথে আলাপ করেন। হুজুর বাসার সকল রুম পরিদর্শন করেন। হুজুরের সফর আমাদের সকলের জন্য বিশেষভাবে আমার নাতনীর জন্য অনেক আনন্দময় ছিল।”

 

তাৎক্ষণিক সফর

মোয়াল্লেম সাহেবের বাসা সফর করে হুজুর সদর সাহেবের বাসায় যান। বাসায় প্রবেশের সময় একজন আহমদী হুজুরের কাছে তার বাসায় যাবার আবেদন জানায়। হুজুর তখন গাড়ী থেকে নেমে গিয়েছিলেন। কিন্তু আহমদীর অনুরোধে আবার গাড়ীতে উঠে কিছু সময়ের জন্য তার বাসায় যান। আমি চিন্তা করলাম যে হুজুর জামাতের জন্য নিজের সকল সময় ব্যয় করে ফেলেন।

সদর সাহেবের বাসায় দুপুরের খাবার

সদর সাহেবের বাসায় দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয়। হুজুর ও তার স্ত্রী বাসার ভিতরে যান এবং আমাদের জন্য বাসার সামনের উঠানে খাবার দেয়া হয়। খাবারের মধ্যে ছিল ভেড়া ও মুরগির তরকারি এবং সবশেষে আইসক্রিম। আমি অনেক বেশি খেয়ে ফেলেছিলাম, তাই ঠিক করলাম যে আইসক্রিম আর খাব না। কিন্তু যখন সামনে আইসক্রিম এসে গেল তখন আমি লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। ভাবলাম যে একটু চেখে দেখি। সেটি খুব সুস্বাদু ছিল এবং আবহাওয়াও অনেক গরম ছিল। তাই আমি এক চামচ এক চামচ করে পুরো বাটিই শেষ করে ফেললাম।

 

স্টকহোমে বায়তুল আফিয়াত সফর

স্হানীয় জামাতের কেন্দ্র বায়তুল আফিয়াতে জোহর ও আসরের নামাযের ব্যবস্হা করা হয়েছিল। সেটি সদর সাহেবের বাসা থেকে কয়েক মিনিটের দুরত্বে ছিল। আমি খাবার শেষে গাড়ীর দিকে যাচ্ছিলাম তখন দেখলাম যে হুজুরও বাসা থেকে বের হচ্ছেন। আমাকে দেখে হুজুর জানতে চাইলেন যে আমি খাবার খেয়েছি কিনা। হুজুর অত্যন্ত ভালবাসার সাথে প্রশ্নটি করেছিলেন। আমার মনে হল যদি আমি ভালভাবে খাবার না খেয়ে থাকি তাহলে হুজুর আমাকে আবার খেতে পাঠাবেন এবং আমার জন্য আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবেন।

 

আমি হুজুরকে বলি যে আমি খেয়ে নিয়েছি। তারপর হুজুর তার গাড়ীতে উঠেন। আমরা বায়তুল আফিয়াত মসজিদে যেয়ে নামায আদায় করি।

 

অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা

হুজুরের স্ত্রী অন্যান্য লাজনা সদস্যদের সাথে সদর সাহেবের বাসাতেই ছিলেন। তাই কথা ছিল নামাযের পর আমরা আবার সদর সাহেবের বাসায় যাব। পরিকল্পনা ছিল যে আমরা সদর সাহেবের বাসা থেকেই গুটেনবার্গের (৪০০ কি.মি. দূরত্ব) উদ্দেশ্যে রওনা হব। মসজিদ থেকে সদর সাহেবের বাসায় আসতে ৩-৪ মিনিটের বেশি সময় লাগার কথা নয়। কিন্তু ১০ মিনিট গাড়ি চলার পরও আমরা সদর সাহেবের বাসায় পৌছলাম না। আমি চিন্তা করলাম যে আমরা কেন লম্বা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। আমার মনে হল মসজিদে যাবার রাস্তা থেকে এখন আমরা বড় রাস্তায় চলে এসেছি। এক সময় হুজুরের গাড়ি থেকে সংবাদ এল যে হুজুর জানতে চাচ্ছেন আমরা সঠিক পথেই সদর সাহেবের বাসায় যাচ্ছি কিনা।

এরপর আমি শুনলাম যে সুইডেনের জামাত ভুলে গিয়েছিল যে এখন আমাদের সদর সাহেবের বাসায় যাবার কথা। তারা সরাসরি গুটেনবার্গের দিকে রওনা দিয়েছিল। এটি একটি বিরল ঘটনা ছিল এবং তাদের এই ভুলের কথা শুনে আমি বিস্মিত হয়ে যাই। আমি চিন্তা করলাম যে কাফেলার দ্বায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গ কিভাবে এটি ভুলে যেতে পারে যে হুজুরের সম্মানিত স্ত্রী সদর সাহেবের বাসায় রয়েছেন। হুজুর যদি আমাদের মনে করিয়ে না দিতেন তাহলে আমরা হয়ত গুটেনবার্গেই চলে যেতাম। ভুল বোঝার পর কাফেলা গাড়ি ঘুরিয়ে সদর সাহেবের বাসার দিকে রওনা হয়।

 

আমি কয়েক বছর যাবৎ খলীফাতুল মসীহর সেবা করার সুযোগ পাচ্ছি। এ সময়ে আমি হুজুরকে খুব কমই রাগান্বিত দেখেছি এবং মানুষের সামনে কারও উপর রেগে যাবার ঘটনা তো আরও বিরল। কিন্তু এ সময় হুজুর স্হানীয় জামাত, বিশেষভাবে সদর মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়া সুইডেনের উপর অত্যন্ত বিরক্ত ছিলেন। কারণ কাফেলার যাত্রাপথ নির্ধারণ করা তারই দ্বায়িত্ব ছিল।

গাড়ি থেকে বের হয়ে হুজুর সদর সাহেব ও আমীর সাহেব সুইডেনকে কাছে ডাকেন। আমি সেমসয় ঠিক পিছনেই দাড়িয়ে ছিলাম। আমি শুনলাম যে হুজুর কঠিনভাবে তাদের বলছেন “আমি জানতে চেয়েছিলাম যে আমরা কোথায় যাচ্ছি। শুধুমাত্র এই কারণেই কাফেলা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। নাহলে তোমরা তো আমাদের সরাসরি গুটেনবার্গেই নিয়ে যেতে। এটি অসতর্কতার একটি চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। এখন থেকে সদর খোদ্দামের গাড়ি যেটি সামনে থেকে পথ দেখাচ্ছিল সেটি কাফেলার সবার পেছনে থাকবে। ”

হুজুর এরপর তার বাসার দিকে রওনা হলেন। আমি হুজুরের কয়েক মিটার পিছনেই ছিলাম। এসময় আমি শুনতে পেলাম হুজুর আমার নাম ধরে ডাকছেন। সাধারণত হুজুর ডাকলে আমাদের মনে একটি আনন্দের সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমি স্বীকার করব যে কিছুক্ষণ আগে হয়ে যাওয়া ঘটনার ফলে আমি চিন্তিত ছিলাম যে আমি কোন ভুল করে ফেললাম কিনা। কিন্তু হুজুরের দিকে তাকিয়ে হুজুরের মুখে হাসি দেখে আমার ভুল ভেঙে যায়। হুজুর বলেন “আবিদ, তুমি বা অন্যকেউ যদি ওয়াশরুমে যেতে চাও তাহলে তোমাদের কাছে ৫ মিনিট সময় আছে। এরপরই আমরা রওনা হব। ”

আমি সময়মতোই প্রস্তুত হই এবং শেষ পর্যন্ত হুজুর আমাদের ১০ মিনিট সময় দেন।

 

হুজুরের ভালবাসা ও দিকনির্দেশনা

আমাদের খলীফা এমন একজন মানুষ যে তিনি যদি কারো উপর রাগান্বিত হন, তারপরও তার প্রতি হুজুরের যে ভালবাসা রয়েছে সেটি সহজেই বোঝা যায়। সেদিন যখন কাফেলা একটি সার্ভিস স্টেশনে থামে তখন তিনি সদর খোদ্দাম কে ডাকেন এবং ভালবাসার সাথে ভবিষ্যতে কিভাবে দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে সে ব্যাপারে তাকে নসিহত করেন। হুজুর বলেন “মজলিস সদর হিসেবে সকল যাত্রার কাফেলার পূর্ণ বিবরণ তোমার কাছে থাকা উচিৎ। তোমার কাছে সকল গাড়ি এবং কোন গাড়িতে কে কে বসেছে সেটিরও তালিকা থাকতে হবে। যাত্রার শুরুতে তোমার নিশ্চিত হতে হবে যে সকলেই গাড়িতে উঠেছে। এরপরই তুমি কাফেলাকে যাত্রা শুরু করতে বলবে।”

 

হুজুর নিজেও কাফেলার নিরাপত্তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখেন। তিনি একটি সাধারণ নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন যে তার কাফেলার সর্বশেষ গাড়িতে সবসময় স্হানীয় সদস্য থাকবে। যেন হুজুরের কাফেলার কোন গাড়ি পিছনে পড়ে গেলে স্হানীয় গাড়ি সবসময় সাহায্যের জন্য প্রস্তুত থাকে। হুজুর সবসময় কোন গাড়ি কোথায় আছে এবং সব গাড়ি একত্রে আছি কিনা এ ব্যাপারে খোঁজ খবর রাখেন।

 

পরদিন আমি সদর খোদ্দামুল আহমদীয়া মনসুর আহমদ সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি তখনো তার ভুলের জন্য অনুতপ্ত ছিলেন এবং একইসাথে হুজুরের দিকনির্দেশনা পেয়ে আনন্দিত ছিলেন। তিনি বলেন “আমাদের ভুলের জন্য হুজুর প্রাথমিকভাবে রাগান্বিত ছিলেন। কিন্তু হুজুর আমাদের প্রতি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়া ও ভালবাসার আচরণ করেন। পরবর্তীতে তিনি আমাকে কাফেলা নিয়ে যাত্রা সম্বন্ধে দিকনির্দেশনা দেন। হুজুর আমাকে জার্মানীতে গিয়ে এক সপ্তাহ নিরাপত্তার ট্রেনিং নিতে বলেন। কারণ তাদের এ ব্যাপারে অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে। যদিও আমার হুজুরের ভালবাসা পাবার কোন যোগ্যতাই নেই কিন্তু তারপরও হুজুর আমাদের অত্যন্ত ভালবাসেন।”

 

সার্ভিস স্টেশনে বিরতি

যাত্রার ৪৫ মিনিট পর কাফেলা একটি সার্ভিস স্টেশনে বিরতির জন্য থামে। সেখানে হুজুর ড: আতাহার যুবায়েরকে তার কাছে ডাকেন। ড: সাহেব হুজুরকে গতদিনের স্টকহোমে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আগত একজন সংসদ সদস্যের কথা বলেন। হুজুরের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারের সময় সংসদ সদস্য হুজুরের কাছে করা প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর পাননি। কিন্তু তিনি যখন হুজুরের বক্তব্য শুনেন সেখানে তিনি তার প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর পেয়ে যান।

হুজুর বলেন “হ্যা। আমি তাকে তখন সংক্ষিপ্ত উত্তরই দিয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম পরবর্তী বক্তব্যে আমি সেই বিষয় পুরোপুরি ব্যাখ্যা করব। তিনি তখন তার উত্তর পেয়ে যাবেন।”

 

চিপস

সার্ভিস স্টেশনে যেখানে হুজুরের স্ত্রী ছিলেন সেখানে যাই। তিনি হুজুরের গতদিনের অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের সম্বন্ধে জানতে চান। হুজুরের স্ত্রী ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাকে প্রচারের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী। আমরা যখন কথা বলছিলাম তখন তারিক সাহেব হুজুরের স্ত্রীর জন্য এক কাপ কফি নিয়ে আসেন। তিনি হুজুরের জন্য কফি আনেননি কারণ হুজুর তখন টেবিলে ছিলেন না। কয়েকদিন পূর্বে হুজুরের স্ত্রী আমাদের বলেছিলেন যে হুজুরের কফি গরম অবস্হায় পরিবেশন করা উচিৎ।

কয়েক মিনিট পর হুজুর আসলে আমি তাকে পেপার কাপে কাপুচিনো কফি পরিবেশন করি। কারণ হুজুর আমাকে বলেছিলেন যে এসকল স্হানে তিনি পেপার কাপে খেতেই পছন্দ করেন। এরপর আমি অন্যান্য কাফেলা সদস্যদের কাছে যাই। কিছু সময় পর আমি হুজুরের কাছে যেয়ে জানতে চাই তাদের কিছু প্রয়োজন আছে কিনা। হুজুর বলেন এখানে নোনতা চিপস পাওয়া যায় কিনা। আমি রেষ্টুরেন্টে খবর নিয়ে জানতে পারি যে তাদের এখানে কোন চিপস্ নেই। এরপর আমি ও একজন স্হানীয় আহমদী বাইরে যাই ও ১০০ মিটার দূরের একটি পেট্রল স্টেশন থেকে ২টি বড় চিপসের প্যাকেট নিয়ে আসি। হুজুরকে প্যাকেট দেবার পর হুজুর জানতে চান “এগুলো কি হালাল?”

আমি বলি “জি হুজুর। একটি হল সাধারণ নোনতা স্বাদের ও অন্যটি একটি টক স্বাদের।”

হুজুর সাধারণ নোনতা স্বাদের চিপস্ রেখে দেন ও কাফেলা সদস্যদের জন্য অন্যটি নিয়ে যেতে বলেন।

 

বাচ্চাদের খেলার স্হান

হুজুর যেখানে বসেছিলেন তার কয়েক মিটার দূরেই বাচ্চাদের বিরাট খেলার স্হান রয়েছে। কয়েক মিনিট পর আমি ও মেজর সাহেব সেখানে যাই। আমরা যখন সেখানে দাড়িয়ে ছিলাম তখন মেজর সাহেব আমাকে বলেন যে হুজুরকে জানাতে গাড়ি যাত্রার জন্য তৈরি। সেসময় হুজুর আমাদের দিকেই আসছিলেন। হুজুর আমাদের জিজ্ঞেস করেন যে আমরা কোথায় দাড়িয়ে আছি। আমরা বলি যে এটি বাচ্চাদের খেলার জায়গা।

হুজুর বলেন “মনে হচ্ছে তোমরা খেলার জায়গাটি ভালই উপভোগ করছো কারণ তোমরা ঠিক মাঝখানে দাড়িয়ে আছ।”

আমি হুজুরের কথা শুনে হেসে ফেলি।

হুজুর তার চিপসের অর্ধেক খালি প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে বের হয়ে যান। আমি চিপসের প্যাকেটটি গাড়িতে নিয়ে যাই। আমরা সবাই সেটি উপভোগ করি কারণ আমরা জানি যে কিছুক্ষণ পূর্বে হুজুরও একই প্যাকেট থেকে চিপস খাচ্ছিলেন।

 

একটি বিরল দৃশ্য

আমাদের কাফেলা গুটেনবার্গের পথে রওনা হয়। মোবারক সাহেব আকাশের দিকে নির্দেশ করে বলেন যে আমাদের ডান পাশে সূর্য ও বাম পাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে। দিনের বেলা চাঁদ দেখেতে পাওয়া খুবই বিরল। আর সূর্য ও চাঁদ একই সাথে দেখতে পারা আরও বিরল একটি ঘটনা।

 

গুটেনবার্গ

আমরা রাত ৮.১৫ মিনিটে গুটেনবার্গের নাসের মসজিদে পৌছাই। সেখানে শত শত আহমদী হুজুরকে স্বাগত জানানোর জন্য সমবেত হয়েছিল। হুজুরকে দেখে তারা অত্যন্ত আনন্দিত হয়। খাবারের পর হুজুর নামায আদায় করেন। আমাদের থাকার স্হান হয়েছিল কামাল ইউসুফ সাহেবের ছেলে নিসার ইউসুফ সাহেবের বাসায়। কামাল ইউসুফ সাহেবে হলেন স্ক্যান্ডেনেভিয়ান অঞ্চলের প্রথম মিশনারী যিনি ১৯৫০ সালের দিকে এখানে তবলীগ করতে এসেছিলেন। তিনি আমাদের বলেন “আমি যখন প্রথম সুইডেনে আসি তখন জামাতের কোন রকম বাসস্হান ভাড়া করার সামর্থ্য ছিল না। তাই আমি ছাত্রদের হোস্টেলে থাকতাম। কিন্তু সেখানেও একটি নিয়ম ছিল যে একটাতা তিন দিনের বেশি কেউ হোস্টেলে থাকতে পারবে না। তাই প্রতি তিন দিন পরপর আমার জিনিসপত্র নিয়ে অন্য স্হান যেতে হতো।

তার কথা শুনে আমি চিন্তা করলাম যে এখনকার ওয়াকফে জিন্দেগীরা কতো সৌভাগ্যবান, কারণ পূর্বের যুগের মতো তাদের এতটা প্রতিকূল পরিস্হিতির সম্মুক্ষীণ হতে হয় না।

 

আহমদীদের আবেগ

১৯ মে ২০১৬ তারিখ হুজুর কিছু আহমদী সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আমি সেরকম কিছু আহমদীদের সাথে কথা বলি। বশির উদ্দীন আহমদ(৮২ বছর) ১৯৬৯ সাল থেকে সুইডেনে বসবাস করছেন। তিনি হুজুরের দূর সম্পর্কের আত্মীয় তিনি বলেন “আমি হুজুরকে তখন থেকেই চিনি যখন তিনি ছোট ছিলেন। খিলাফতের পরে আমি উনার মধ্যে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন দেখেছি। পূর্বে তিনি চুপচাপ ধরণের ছিলেন এবং সবার পিছনে থাকতেই পছন্দ করতেন। এখন তিনি পূর্বের মতোই বিনয়ী ও সাধারণ জীবনযাপন করেন কিন্তু এখন তার মধ্যে একপ্রকার আধ্যাত্মিক জ্যোতি ও প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ”

 

সুইডেনের আমীর সাহেব আমাকে একজন বসনিয়ান আহমদী সাবিনা বেনটেসান এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি একজন বয়াতকৃত আহমদী। সাধারণত আমি কোন মহিলাকে তার বয়স জিজ্ঞেস করি না, কারণ এটি একটি অশোভন ব্যাপার। কিন্তু সাবিহা সাহিবা নিজেই আমাকে বলেন “এটি লিখে নাও যে আমার বয়স ৭৬ বছর এবং আমি ১৯৯১ সাল থেকে আহমদী। খলীফা সবসময় সত্য কথা বলেন। তিনি অনেক পবিত্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। আমি হুজুরের স্ত্রীর সাথেও সাক্ষাৎ করি। তিনি আমার প্রতি অনেক দয়া ও ভালবাসা প্রদর্শন করেছেন। তার সাথে দেখা করেও আমি অনেক আনন্দ পেয়েছি। ”

“অন্তর থেকে আমি সবসময়ই আহমদী ছিলাম। কিন্তু এটি আমি অনেক পরে বুঝতে পারি। সারা জীবন আমি আন্তরিক ও দয়ালু মানুষের খোজঁ করেছি। যখন আমি আহমদীদের দেখা পেলাম আমি বুঝতে পারলাম যে আমি এদের খোঁজই করছিলাম। ২৫ বছর ধরে একজন আহমদী হিসেবে জীবনযাপন করার পর আমি বলতে পারি যে বর্তমান বিশ্বে আহমদীরাই সর্বৎকৃষ্ট মানুষ। ”

আমি তার কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় তিনি আমার দিকে তাকিয়ে সেভাবেই হাসেন যেভাবে একজন দাদী তার নাতির দিকে তাকিয়ে হাসেন। কিন্তু আমি জানতাম না যে তার মনে আরো গভীর আত্মীয়তার বন্ধন ছিল। তিনি চলে যাবার সময় আমাকে বলেন “আজ থেকে আমি তোমাকে আমার অতি প্রিয় একজন ছেলে হিসেবেই মনে করব।”

 

সতর্কবার্তা

আমি খবরে দেখি যে প্যারিস থেকে কায়রো যাবার পথে ইজিপ্ট এয়ারের একটি প্লেন বিধ্বস্ত হয়েছে। প্রথম কয়েক ঘন্টা মিশরের সরকার ও তাদের মিডিয়া বলতে থাকে যে এটি একটি সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে। আমি হুজুরকে সংবাদটি জানাই। হুজুর বলেন “এসকল সন্ত্রাসীরা শয়তানি আদর্শ অণুসরণ করে কারণ তাদের কোন নেতা নেই। তাই তারা এরকম ঘৃণ্য কর্মকান্ড করেই যাবে। তারা ইসলমের নাম নিয়ে এসব নিষ্ঠুর অপকর্ম করছে, যার কোন ভিত্তি প্রকৃত ইসলামে নেই। তাই আল্লাহ নিশ্চিতভাবেই একদিন তাদের ধ্বংস করে দিবেন। আমাদের সেই দিন পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে হবে। ”

হুজুরের বক্তব্য অত্যন্ত জোরালো ছিল। আমি দোয়া করি হুজুর যে সময়ের কথা বলছেন সেটি যেন দ্রুত চলে আসে।

 

জুতো রাখার জায়গা

২০ মে ২০১৬ হুজুর নাসের মসজিদে জুমআর খুৎবা প্রদান করেন। সেদিন সারা সকাল বৃষ্টি হয়েছিল। তাই সকল কাফেলা সদস্যদের মধ্যে জুমআর সময় জুতো কোথায় রাখা যায় তা নিয়ে বিতর্ক চলছিল। কারণ জুমআর পর সাংবাদিকের সাথে হুজুরের একটি সাক্ষাৎকার রয়েছে। আমরা যদি সবাই যেখানে জুতো রাখে সেখানে রাখি; তাহলে অনেক আহমদীর ভিড়ে জুতো নিতে অনেক সময় লেগে যাবে। আর আমরা হুজুরের সাক্ষাৎকারের সময় কোন প্রকার দেরী করতে চাচ্ছিলাম না। বিকল্প উপায় হল মসজিদের বাইরে জুতো রাখা। কিন্তু তাহলে বৃষ্টির কারণে জুতো ভিজে যাবে।

আমি বললাম যে আমরা সবাই যেখানে রাখে সেখানেই রাখি এবং নামাযের পর কোনভাবে জুতো নেয়া যাবে। ভিজে জুতোর চেয়ে তো এটি ভাল। কিন্তু মাজিদ সাহেব জুতো বাইরে রাখার ব্যাপারেই বেশি জোর দিচ্ছিলেন। তিনি বলেন যে আমরা যদি জুতোগুলো একটি বিশেষ কোণে কাত করে দেয়ালের সাথে রাখি তাহলে বৃষ্টির হাত থেকে জুতো রক্ষা পাবে।

 

সৌভাগ্যবশত মোবারক সাহেব অত্যন্ত ভাল উপায় বের করেন। তিনি একটি ব্যাগে জুতো রেখে সেটি মসজিদের বাইরে রেখে দেন। তার দেখাদেখি আমিও একই কাজ করি। এভাবে আমাদের জুতো ভিজে যাওয়া থেকে রক্ষা পায় এবং নামাযের পর আমরা দ্রুত জুতো নিতে পারি।

 

গুটেনবার্গে জুমআর খুৎবা

গুটেনবার্গে জুমআর খুৎবাতে হুজুর বলেন যে কিভাবে পুরো বিশ্বে এমনি মুসলমানদের মধ্যেও শয়তানি চিন্তাধারা ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন মুসলিম দেশে মাঝেমধ্যেই যে সন্ত্রাসী হামলা হয় এটি তারই প্রমাণ। হুজুর বলেন “মুসলিম বিশ্বে আজকাল কি হচ্ছে? আমরা দেখতে পাচ্ছি যে শয়তানি চিন্তাধারার প্রভাবে অহেতুক রক্তপাত ও হত্যাকান্ড সংঘটিত হচ্ছে। নিরপরাধ লোকদের শিরচ্ছেদ করে তারা বলছে যে এর ফলে তারা জান্নাত লাভ করবে। কিন্তু কোরআন এটি পরিস্কারভাবে বলে দিচ্ছে যে এধরণের মানুষের একমাত্র স্হান হল জাহান্নাম।  ”

 

“বর্তমানে সংবাদ মাধ্যম ও যোগাযোগ ব্যবস্হা সকলকে আরো কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে এর ফলে মানুষ তাকওয়া ও উন্নত নৈতকতা লাভ না করে বরং অনৈতিক ও ভুল কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে। ”

 

হুজুর খুৎবাতে পর্দা ও জিহাদেরও উল্লেখ করেন। বর্তমানে লক্ষ্য করা যায় যে কিছু অনৈতিক কর্মকান্ডকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে। কেবল তাই নয় বরং কোন কোন সমাজে এ সকল কাজকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে কিছু সরকার বলছে যে পর্দা হল স্বাধীনতার প্রতি একটি অন্তরায়। এর প্রভাবে কিছু আহমদী মহিলা তাদের পর্দা শিথিল করে ফেলেছে। কারণ পর্দা করার জন্য তাদের প্রতি যে উপহাস করা হয় সেটিকে তারা ভয় পায়। কিন্তু অনেক মহিলা এমনও আছেন যারা নিজিদের ঈমানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত আছেন। তারা বিশ্বাস করে যে ইসলামের প্রতিটি শিক্ষার পিছনে গভীর প্রজ্ঞা ও যুক্তি রয়েছে। এ ধরণের মহিলা পর্দাকে নিজেদের পছন্দ ও অধিকার বলে মনে করে।

 

হুজুর জামাতকে নসীহত করেন যে সকলে যেন তাদের পরিবার নিয়ে একত্রে জুমআর খুৎবা শুনে। এছাড়াও কমপক্ষে আরো এক ঘন্টা এমটিএর অন্যান্য অনুষ্ঠান দেখে।

 

এসভিটি ভাস্টের সাথে সাক্ষাৎকার

জুমআর খুৎবার পর হুজুর সরাসরি তার অফিসে চলে যান যেখানে তিনি এসভিটি ভাস্টে টিভি কে একটি সাক্ষাৎকার দিবেন। সাক্ষাৎকারের পূর্বে সাংবাদিক হুজুরকে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতে অনুরোধ করেন। কারণ তিনি বলেন যে তিনি টিভির জন্য যে ক্লিপ তৈরী করছেন সেটির সময় খুব সংক্ষিপ্ত।

আমার মনে হল তার এ মন্তব্য অপ্রয়োজনীয় এবং অসম্মানজনক ছিল। যদিও হুজুর তার কথার পর শান্ত ছিলেন কিন্তু হুজুরের উত্তর শুনে আমার মনে হল হুজুর সাংবাদিকের মন্তব্যটি পছন্দ করেন নি। হুজুর সাংবাদিকের মন্তব্যের জবাবে বলেন “প্রশ্নের উপর উত্তরের দৈর্ঘ্য নির্ভর করে। কারণ কিছু প্রশ্ন বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়।”

সাক্ষাৎকারে হুজুরকে ইসলামে সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদিতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করা হয়। হুজুর বলেন “ সন্ত্রাসীরা এসকল মতবাদকে ইসলামের সাথে জড়ানোর চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু ইসলামে সন্ত্রাসবাদের কোন স্হান নেই। এসকল সন্ত্রাসীরা কেবল তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ব্যস্ত। ইসলামি শিক্ষা হল যে ধর্মে কোন জোর জবরদস্তি নেই। সকলেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা ও এর থেকে বেরিয়ে যাবার ব্যাপারে স্বাধীন।  ”

 

আহমদীদের আবেগ

হুজুর বিকেলে কিছু আহমদী পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আমি তাদের মধ্যে উমর মালিক খান(৩০ বছর) নামে একজন খোদ্দামের সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “হুজুরের সাথে দেখা করা ও তার পিছনে নামায আদায় করা আমাদর জন্য একটি অনন্য অনুভূতি। নামাযের সময় হুজুরের তিলাওয়াত শুনে আমি অনেক আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি। সুইডেনে আমাদের জামাতের খুব বেশি পরিচিতি নেই। তাই গত কয়েকদিনে হুজুরের প্রভাব দেখে আমি অবাক হয়েছি। বলা যায় হুজুর একাই আহমদীয়া জামাতকে সুইডেনের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। পত্রিকা ও খবরের কাগজ সবখানেই আমাদের জামাত সম্বন্ধে খবর এসেছে।”

 

আব্দুল জব্বার(৩৬ বছর) ও তার স্ত্রী ডালিয়া জব্বার নামে এক আহমদী পরিবারের সাথে কথা বলি। ডালিয়া জব্বার লিথুয়ানিয়ার অধিবাসী এবং তিনি একজন বয়াতকারী আহমদী। হুজুরের সাথে সাক্ষাতের পর জব্বার সাহেব বলেন “আমি পাকিস্তানে বড় হয়েছি। আমি সবসময় চিন্তা করতাম যে আমার কি কখনো খলীফার সাথে দেখা করার সৌভাগ্য হবে। একমাত্র পাকিস্তাতে বসবাসকৃত আহমদীরাই যানে যে তারা খলীফার সাথে দেখা করার জন্য কতটা ব্যাকুল।”

তার স্ত্রী বলেন “আমি ২০০৭ সালে বয়াত করে আহমদী হই। আজ আমি প্রথমবার হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করি। এটি সত্যিই অসাধারণ এবং আমার জীবনের একটি স্মরণীয় মুহুর্ত। হুজুরের ভালবাসা ও দয়া আমার ঈমানকে আরো বৃদ্ধি করেছে। আহমদী হবার সিদ্ধান্ত নেয়াটা আমার জীবনরের সবচেয়ে ভাল সিদ্ধান্ত ছিল। আমি এখন একজন পুরোপুরি নতুন মানুষে পরিণত হয়েছে। আমি মনে করি আমি সঠিক পথে আছি ”

 

হুজুরের সাথে কিছু মুহুর্ত

আহমদীদের সাথে সাক্ষাতের পর হুজুর আমাকে তার রুমে ডাকেন। হুজুর বলেন যে জুমআর পর যে সাংবাদিক তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল তাকে কিছুটা অনভিজ্ঞ মনে হয়েছে। তার বেশির ভাগ প্রশ্নের মানই আশানুরূপ ছিল না। আমি হুজুরকে বললাম যে সাংবাদিক হুজুরকে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতে বলেছেন এই ব্যপারটি আমার ভাল লাগে নি। আমি তার উপর আরো বিরক্ত হয়েছি যখন আমি টিভিতে তার সম্প্রচারটি দেখি সেখানে হুজুরের সাথে তার সাক্ষাতকারের কোন অংশই দেখানো হয়নি। বরং সেখানে জুমআ সম্বন্ধে এবং হুজুর গুটেনবার্গ সফর করছেন এই কথা বলেছেন।

 

কিন্তু হুজুর আমার কথার উত্তরে বললেন “জামাত ও প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর বার্তা তো বহু মানুষের কাছে পৌছেছে। এটিই হল মূল বিষয়।”

আমি হুজুরকে বললাম যে একজন সুইডিশ নন মুসলিম প্রতিবেশি নিরাপত্তা দ্বায়িত্বে থাকা একজন খোদ্দামের কাছে আসেন। তিনি রাগান্বিতভাবে জানতে চান “আমি এইমাত্র টিভিতে দেখলাম যে এখানে একজন খলীফা এসেছে। তিনি কে? তিনি এখানে কি করছেন? কেন তিনি এখানে এসেছেন?”

তখন সেই খোদ্দাম তাকে জামাতের শান্তিপ্রিয় শিক্ষা ও হুজুরের আগমনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে। তিনি তাকে মসজিদে আসারও আমন্ত্রণ জানান। সব কথা শোনার পর তিনি শান্ত হন ও বন্ধুসুলভ আচরণ করেন।

হুজুর হাসেন ও বলেন “এতে প্রমাণিত হল যে আজ অন্তত একজন মানুষের কাছে আমাদের বার্তা পৌঁছেছে।”

হুজুরের এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে হুজুর প্রত্যক ব্যক্তির জন্যই চিন্তা করেন। তিনি চান যে ইসলাম নিয়ে মানুষের মনে যে ভুল ধারণা আছে সেটি যেন দূর করা যায়।

 

হুজুরের দিকনির্দেশনা

হুজুর লন্ডনে আমার স্ত্রী ও ছেলে মাহিদের খোঁজ খবর নেন। তিনি বিশেষভাবে আমার ছেলে বেশি বেশি করে কথা বলছে কিনা তা জিজ্ঞেস করেন। হুজুর জানেন যে আমি গত বছর ধরে এ বিষয় নিয়ে চিন্তিত। আমি হুজুরকে এ বিষয়টি জানানোর পর থেকেই হুজুর আমাকে দিকনির্দেশনা দেন ও দোয়া করেন।

প্রথম যখন আমি হুজুরকে এ কথা বলি তখন তিনি বলেন “তোমার উচিৎ মাহিদের সাথে বেশি করে কথা বলা। তুমি সাধারণত বেশি কথা বলো না। তাই তোমাকে এ জন্য বিশেষ চেষ্টা করতে হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় কমপক্ষে ৩০ মিনিট তার সাথে কথা বলবে এবং সে দ্রুতই কথা শিখবে।”

এর কয়েক সপ্তাহ পর আমি একজন বিশেষজ্ঞ স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপিষ্টের সাথে কথা বলি। তিনি আমাকে বলেন “তোমার উচিৎ মাহিদের সাথে বেশি করে কথা বলা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় কমপক্ষে ৩০ মিনিট তার সাথে কথা বলবে এবং সে দ্রুতই কথা শিখবে।”

আমি চিন্তা করলাম যে তিনি সারাজীবন এই বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। আর হুজুরের এ বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু আল্লাহ তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ হুজুরের নির্দেশনা ও দোয়ার বরকতে গত কয়েক মাসে মাহিদের কথা বলা অনেক উন্নত হয়েছে।

 

আহমদীদের আবেগ

২১ মে ২০১৬ তারিখে আমি ইউসুফ সালমান খান (২৮ বছর) একজন আহমদীর সাথে কথা বলি। তিনি হুজুরের সাথে তার সাক্ষাৎকারের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বলেন “আমাদের আধ্যাত্মিক নেতাকে আমাদের মাঝে পাওয়া অত্যন্ত সৌভাগ্য ও বরকতের বিষয়। আমাদের একজন আধ্যাত্মিক নেতা রয়েছেন যিনি আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন। আমি হুজুরকে যেকোন সময় চিঠি দিতে পারি এবং কেউ আমাদের এই সরাসরি সম্পর্ককে বাধা দিতে পারে না।”

 

আমি নিরাপত্তা দলের সদস্য আদিল জাফর(৩০ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “হুজুর আমাকে চিনতে পেরেছেন। এটি ভেবে আমি অত্যন্ত অবাক ও আবেগতাড়িত হয়ে গিয়েছি। আমরা অনেক সৌভাগ্যবান যে আমাদের খলীফা আমাদের সকলকে তার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক করার সুযোগ দেন।”

“গত কয়েকদিনে আমি খোদ্দামদের মধ্যে একটি আধ্যাত্মিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। আমি অনেক খোদ্দামের সাথে কথা বলেছি। তাদের মধ্যে অনেকে জামাত থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। তারা বলেছে যে হুজুরের বিনয় ও নম্রতা দেখে তারা অনেক অবাক হয়েছে। হুজুরের মধ্যে কোন অহংকার ও ঔদ্ধত্য নেই। তিনি আসলেই অসাধারণ।”

 

খোদ্দাম আমেলার সাথে মিটিং

হুজুর সুইডেনের মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়া আমেলার সাথে একটি মিটিং করেন। সেখানে মোহতামিম এশায়াত হুজুরকে খোদ্দাম পত্রিকার একটি কপি দেন। সেটি দেখে হুজুর কিছুটা অবাক হন। কারণ পুরো কভার পেজ জুড়ে একজন মহিলার ছবি দেয়া। যদিও মহিলা হিজাব পরিহিত ছিলেন কিন্তু খোদ্দাম পত্রিকার পুরো কভার পেজ জুড়ে এরকম ছবি দেয়া ঠিক হয়নি। হুজুর এরপর নির্দেশনা দেন যে খোদ্দামুল আহমদীয়া কোন ম্যাগাজিন ছাপানোর পূর্বে যেন সেটি সুইডেনের স্হানীয় মোবাল্লেগ কাশিফ সাহেবকে দিয়ে নিরীক্ষণ করিয়ে নেয়।

হুজুর জিজ্ঞেস করেন যে এটি কি মাসিক না পাক্ষিক পত্রিকা। তারা হুজুরকে বলে যে এটি কেবল মাত্র দ্বিতীয় প্রকাশন। হুজুর জানতে চান যে পূর্ববর্তী প্রকাশনা কবে হয়েছিল। এরপর মোহতামিম এশায়াত সাহেব যে উত্তর দিলেন আমি তা কখনো ভুলতে পারব না। তিনি বলেন “পূর্বের সংস্করণ ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল।”

তার কথা শুনে হুজুর হাসেন ও বলেন “প্রথম সংস্করণ ১৯৯৫ সাল ও দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৬ সাল। এভাবে চলতে থাকলে পরের সংস্করণ ২০৩৭ সালে প্রকাশিত হবে। তোমাদের উচিৎ বছরে কমপক্ষে নিয়মিতভাবে ২/৩ টি সংস্করণ প্রকাশ করা। ”

 

তারা বলেন যে পত্রিকার আর্টিকেল পাওয়া কষ্টসাধ্য। এটি শুনে হুযুর বলেন “৭/৮ বছর পূর্বে রিভিও অফ রিলিজিয়ন ম্যাগাজিন একই সমস্যায় পড়েছিল। সম্পাদক ও বোর্ডের সদস্যরা আমাকে বলেছিল যে মানুষ ম্যাগাজিনে আগ্রহী নয় এবং তারা আর্টিকেলও পাচ্ছেনা। ”

“এরপর আমি পুরো ব্যবস্হাপনাকে পরিবর্তন করি এবং ব্যক্তিগতভাবে তাদের দিকনির্দেশনা দেই। এখন রিভিও অফ রিলিজিয়ন প্রতি মাসে প্রকাশ হচ্ছে এবং মানও পূ্র্বের চেয়ে অনেক উন্নত। অনেক আর্টিকেল প্রকাশের অপেক্ষায় বসে আছে এবং এজন্য মাঝে মাঝেই বেশি পৃষ্ঠার সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়।”

 

আমার মনে হল আমেলার সদস্যদের মিটিং নিয়ে সেরকম পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। একজন সেক্রেটারী বলেন যে তার দেবার মত কোন রিপোর্ট নেই। হুজুর আমেলা সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন “তোমাদের বুঝতে হবে যে আমেলার সদস্য বা মোহতামিম টাইটেল নেওয়া তোমাদের উদ্দেশ্য নয়। তোমরা কেবল বলবে যে আমরা এই এই পদে রয়েছি, এটুকুই করা যথেষ্ট নয়। তোমাদের দ্বায়িত্বকে খুবই গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। তোমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে যেন তোমরা অন্যদের জন্য নিজেদেরকে আদর্শ হিসেবে উপস্হাপন করতে পার। যেন অন্যরা তোমাদের অণুসরণ করতে পারে।”

 

“মনে রাখবে কাউকে জামাতের কাছে টেনে নিয়ে আসা অনেক কঠিন; কিন্তু দূরে ঠেলে দেয়া খুবই সহজ।”

 

একটি মজাদার উক্তি

মোহতামিম মাল সাহেব বলেন যে আজকাল একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে যে সকল খোদ্দামরাই ক্যাশ টাকা রাখেনা, কার্ড রাখে। তার কথা শুনে হুজুর বলেন “একবার একজন আমাকে একটি ভিডিও পাঠায়। সেখানে একজন ভিক্ষুক একটি গাড়ির কাছে যেয়ে টাকা চায়। তারা তাদের মানিব্যাগ চেক করে তাকে জানায় যে তাদের কাছে শুধু কার্ড রয়েছে কোন ক্যাশ নেই। ভিক্ষুকটি হতাশ না হয়ে একটি পোর্টেবল ক্রেডিট কার্ড মেশিন বের করে তাদের দেয় যাতে তারা কার্ড দিয়ে ভিক্ষা দিতে পারে।”

 

“কিন্তু তোমাদের মনে রাখতে হবে যে আমরা কোন ভিক্ষা করছি না। জামাতের কারো অর্থের কোন প্রয়োজন নেই। তাই তোমাদের কাজ হল সকলকে বোঝানো যে আর্থিক কোরবানী আল্লাহর একটি নির্দেশ। এবং আল্লাহই তাদের কোরবানীর অশেষ বরকত দিবেন।”

 

হুজুরের সফরের বরকত

আমেলা মিটিং এর পর হুজুর সদর সাহেব কে বলেন “সদর সাহেব, আপনার উচিৎ ইউকে জলসায় এসে সেখানকার খোদ্দামরা কিভাবে কাজ করছে সেটি দেখা। সেখানে আপনি শিখতে পারবেন কিভাবে খোদ্দামদেরকে অনুপ্রাণিত করতে হয়।”

মিটিং এর পর মোহতামিম এশায়াত ওয়াহিদ রাজিউল্লাহ (৩৬ বছর) সাহেব আমাকে বলেন “হুজুর আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা ও গঠনমূলক সমালোচনা করেছেন যেন আমরা আরো ভাল কাজ করতে পারি। হুজুর দেখেছেন যে আমরা কত দূর্বল; কিন্তু তারপরও তিনি আমাদের কোন তিরস্কার করেননি। বরং তিনি আমাদের দয়া ও ভালবাসার সাথে বুঝিয়েছেন।  ”

 

আহমদীদের আবেগ

পরবর্তীতে আমি সেদিন একজন খোদ্দাম মালিক আমীর ইমরান (৩৬ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি কানাডার আমীর মালিক লাল খান সাহেবের ভাতিজা। তিনি আমাকে বলেন তাদের দুই বছরের মেয়ে অতিরিক্ত লাজুক। সে নতুন মানুষের সামনে যেতেই চায়না। তিনি ও তার স্ত্রী চিন্তিত ছিলেন যে হুজুরের সাথে তাদের মোলাকাতের সময় সে নিশ্চয়ই কেঁদে ফেলবে। তিনি বলেন “আমি ও আমার স্ত্রী ছাড়া আমাদের মেয়ে আর কারো কাছে যেতে চায় না। সে তার দাদা দাদীর সাথেও কথা ও খেলাধূলা করে না। সে যদি তোমার সামনে আসে তাহলে সে দৌড়িয়ে পালিয়ে যাবে ও লুকিয়ে পড়বে। ”

তার কথা শুনে আমি হেসে ফেলি এবং স্বাভাবিক হতে আমার কয়েক মিনিট সময় লাগে।

তিনি আরো বলেন “আমি ও আমার স্ত্রী দুজনেই অবাক হয়েছি। কারণ হুজুরের সাথে মোলাকাতের সময় সে আনন্দের সাথে হুজুরের হাত ধরে ছিল। আমরা যখন মোলাকাত শেষ করে বের হলাম সে আমাদের বলল যে সে আবার হুজুরের সাথে দেখা করতে চায়। এতে প্রমাণিত হয় যে আল্লাহ মানুষ ও বাচ্চাদের হৃদয়ে খিলাফতের ভালবাসা প্রথিত করে দেন। এমনকি বাচ্চারাও বুঝে যে খিলাফত হল শান্তি, ভালবাসা ও পবিত্র স্হান।”

“আমি ১৯৯৬ সালে পাকিস্তানে আহমদীয়াত গ্রহণ করি। ২০১১ সালে আমি হুজুরকে দোয়া করতে অণুরোধ করি যেন আমার বাবা ও দুই বোন আহমদীয়াত গ্রহণ করে। হুজুরের দোয়ার বরকতে কয়েক মাসের মধ্যেই আমার দুই বোন আহমদীয়াত গ্রহণ করে। আমার বাবা আহমদীয়াত গ্রহণ করেননি। কিন্তু তিনি যখন জানতে পারলেন যে আমি হুজুরের সাথে সাক্ষাত করতে যাচ্ছি। তিনি আমাকে বলেন যে আমি যেন তার জন্য হুজুরকে দোয়া করতে বলি।”

 

আমি একজন নতুন বয়াতকারী সুইডিশ আহমদী সারমাদ হাবনার সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আমার ভাল বন্ধু হয়ে গিয়েছেন। তিনি হুজুরের সুইডেন সফরের ব্যাপারে বলেন

“আমার মনে হচ্ছে হুজুর সুইডেন জামাতের আধ্যাত্মিক গাছে পানি দিতে এসেছেন। আমি দেখেছি যে যারা পূর্বে মসজিদ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল তারা এখন প্রতিদিন এখানে আসছে এবং গভীর আবেগ দিয়ে দোয়া করছে। ”

“আমি বিশ্বাস করি যে খলীফা যেখানেই যাবেন সেটি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ন স্হান হবে। কারণ তিনি সবসময় আল্লাহর ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন। আমি খলীফার কাছে থেকে দূরে যেতে চাই না। কারণ তিনি আমাদের আধ্যাত্মিকতাকে বৃদ্ধি করেন। আমার ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে যে দুই দিন পরই হুজুর ইউকে চলে যাবেন। ”

 

মোবাল্লেগ সাহেবের বাসায় হুজুরের সফর

সফরের সময় আমি সুইডেনের মোবাল্লেগ আগা ইয়াহিয়া খান সাহেবের সাথে পরিচিত হই। তিনি তার পরিবার সহ নাসির মসজিদের নিচে একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। সফরের শুরুতে তিনি হুজুরকে তার বাসায় আসার অনুরোধ করেন। সফরের শেষ দিন ২২ মে হুজুর তার অনুরোধ রাখেন।

পরবর্তীতে মোবাল্লেগ সাহেবের মেয়ে আমাল ইয়াহিয়া খান সাহিবা আমাকে তাদের বাসায় হুজুরের সফর সম্বন্ধে বলেন “হুজুর গুটেনবার্গে থাকার সময় প্রতি নামাযের পর আমরা দ্রুত আমাদের বাসায় চলে আসতাম। আমরা ভাবতাম হয়ত হুজুর আজ আমাদের বাসায় আসতে পারেন। দিন শেষ হয়ে যেত এবং আমরা দুঃখের সাথে নিজেদের স্বান্তনা দিতাম যে হুজুর জামাতের কাজে অনেক ব্যস্ত আছেন। ”

“তারপর ২২ মে তারিখ আমরা যখন সোফায় বসেছিলাম তখন শুনলাম যে আমাদের বাবা উচ্চস্বরে আসসালামু আলাইকুম বললেন। আমরা তার সালামে একটি অন্যরকম আনন্দ লক্ষ্য করলাম। আমরা সাথেসাথেই বুঝতে পারলাম যে হুজুর আমাদের বাসায় এসেছেন।”

“আমরা হুজুরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দৌড়িয়ে দরজার কাছে গেলাম। আমাদের চোখ দিয়ে সমানে অশ্রু ঝড়ছিল। ”

 

তিনি আমাকে বলেন যে তাদের রান্নাঘের ছয় বছর পূর্বে আগুন লেগেছিল। হুজুর সেটিও মনে রেখেছেন। রুমে যেয়ে হুজুর বলেন “এটিই তো সেই রান্নাঘর যেটিতে আগুন লেগেছিল এবং এখন এটিকে নতুন করে সাজানো হয়েছে।”

তারপর হুজুর দেয়ালে প্রতিশ্রুত মসীহ (আঃ) এর একটি ছবি দেখেন। তিনি বলেন “এই ছবিটি অনেক ঘোলা এসেছে। আপনাদের উচিৎ এখানে একটি উন্নতমানের ছবি লাগানো।”

 

খোদ্দাম ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে

জোহর ও আসরের নামাযের পর আমি নিরপত্তা দ্বায়িত্বরত একজন খোদ্দামকে দেখলাম যে সে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে লাগল। সৌভাগ্যবশত অন্য দুইজন খোদ্দাম এটি লক্ষ্য করে ও তাকে ধরে ফেলে। আমার মনে হল সে এক স্হানে অনেকক্ষণ দাড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।

আমারও একবার এরকম অবস্হা হয়েছিল। লন্ডন মসজিদে আমি একবার আতফালদের ক্লাসে বক্তৃতা দিচ্ছিলাম। সেখানে একই অবস্হায় ঘন্টাখানেক সময় বসে থাকতে হয়েছিল। আমি বুঝতে পারিনি যে আমার পা অবশ হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি যখন উঠে দাড়াই তখন ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যাই। আমার গোড়ালি মচকে যায় এবং কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সেখানে ব্যথা ছিল।

আমি হুজুরকে পুরো ঘটনা জানাই। হুজুর বলেন যে “যদি কখনো এক স্হানে অনেকক্ষন বসে থাকতে হয় তাহলে কিছুক্ষণ পরপর পায়ের অবস্হান পরিবর্তন করতে হবে। ”

এরপর হুজুর আমাকে কয়েক বছর পূর্বের একটি ঘটনা বলেন। তিনি তখন জার্মানীতে এমটিএর সাথে কাদিয়ান জলসার সমাপণী অধিবেশনে ছিলেন। হুজুর বলেন “আমি আমার চেয়ারে বসে লক্ষ্য করলাম যে খোদ্দাম নযম পড়ছিল সে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিল। কেউই সেটি লক্ষ্য করেনি কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে কিছু সমস্যা হয়েছে। তাই আমি নিজেই উঠে তার কলার ধরলাম যেন সে পড়ে না যায়। সৌভাগ্যবশত সে পড়ে যাবার পূর্বেই আমি তাকে ধরতে সক্ষম হলাম। স্বাভাবিক হবার পর সে তার নযম শেষ করার অনুমতি চায়। আমি তাকে আরো কয়েক লাইন পড়তে বলি। আলহামদুলিল্লাহ পরবর্তীতে সে ভালই আছে।”

 

আনসার আমেলা সদস্যদের সাথে মিটিং

হুজুর সুইডেনের আনসার আমেলা সদস্যদের সাথে একটি মিটিং করেন। মিটিং এ সদস্যরা হুজুরের কাছ থেকে কয়েক মিটার দূরে বসেছিলেন। হজুর হেসে বলেন “আপনাদের চেয়ারগুলো আরো কাছে নিয়ে আসা উচিৎ, কারণ আনসার সদস্য হিসেবে কেউ কেউ কানে কম শুনে থাকবে।”

সদস্যরা হুজুরের কথা শুনে হাসলেন ও চেয়ার সামনে নিয়ে আসলেন। হুজুর আমেলা সদস্যদের বলেন “আপনারা মাঝেমধ্যে কিছু দিকনির্দেশনা দিবেন ও মনে করবেন যে আপনাদের দ্বায়িত্ব শেষ, এটি যথেষ্ট নয়। মনে রাখবেন আল্লাহপাক মহানবী (সাঃ) কে যে কোন পরিস্হিতিতে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন। সুইডেনের জামাত অনেক ছোট। তাই আপনাদের উচিৎ নিজেদের জামাতকে অন্যান্য জামাতের জন্য আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলা। কারণ ছোট জামাতের মান উন্নয়ন করা তুলনামূলকভাবে সহজ। ”

 

মিটিং এ হুজুরকে জানানো হয় যে একজন আমেলা সদস্য বছরের ১১ মাস দুবাই থাকেন। সদর আনসারুল্লাহ বলেন যে তিনি সুইডেন জামাতে তার চাঁদা দেন এবং সেখানে বসেই জামাতের কাজ সম্পন্ন করে থাকেন।

কিন্তু হুজুর এতে সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি বলেন যে সুইডেনের কোন ব্যক্তিকে যেন তার জায়গায় দেয়া হয়।

হুজুর বলেন যে আহমদীরা যে দেশে থাকবে সে দেশেই তাকে চাঁদা দিতে হবে। যদি এক্ষেত্রে কোন সমস্যা থাকে তাহলে কেন্দ্রের অনুমতি নিয়ে তাকে অন্য দেশে চাঁদা দিতে হবে।

হুজুর বলেন “হযরত মুসলেহ মাউদ(রাঃ) বলেন যে আহমদীরা খোদ্দাম থাকার সময় অনেক কাজ করে থাকে। কিন্তু আনসার হবার পর সে অলস হয়ে যায়। তিনি এটি দুঃখের সাথে বলেছিলেন। পালন করার জন্য বলেন নি। কিন্তু আমি দুঃখের সাথে দেখতে পাচ্ছি যে তিনি কয়েক দশক আগে যা বলে গিয়েছিলেন সেটি এখনো সঠিক।”

 

আহমদীদের আবেগ

আমি ফাহিম তাহেরের (১৮ বছর) সাথে কথা বলি। তার ইচ্ছা সে জামেআ আহমদীয়াতে মোবাল্লেগ হবার জন্য পড়াশোনা করবে। তিনি বলেন “ধর্ম বিষয়ে পড়াশোনা করতে আমার সবসময়ই ভাল লাগে। আমি দেখেছি যে আহমদীয়াত সবসময় সকল প্রশ্নের যুক্তিসম্মত উত্তর প্রদান করে। তাই আমি নিশ্চিত যে খিলাফত আমাদের সঠিক পথে চালিত করছে।”

“হুজুরের উপস্হিতিতে আমার মনে হচ্ছে যে আমি নিজেকে জামাতের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। আমি মনে করি যে এই পৃথিবী একটি অস্হায়ী আবাস। প্রকৃত উদ্দেশ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও পরকালে জান্নাত লাভ করা। প্রতিদিন আমি নিজেকে মনে করিয়ে দেই যে এই জীবন হল আখিরাতের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। আমি মনে করি যে আমি খলীফার একজন প্রতিনিধি। তাই স্কুলে আমি সকলের সাথে ভালবাসা ও দয়ার সাথে আচরণ করি। ”

“সুইডেন একটি স্বাধীন ও সতন্ত্র দেশ। এখানে বেশিরভাগ তরুণেরই কোন ধর্মবিশ্বাস নেই। কিন্তু আমাদের জামাতের তরুণরা দৃঢ়ভাবে ইসলামের শিক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত। ”

 

এরপর আমি লিয়াকত আলী (৬৬ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি নরওয়ে থেকে হুজুরের সাথে দেখা করার জন্য সুইডেনে এসেছেন। তিনি বলেন “আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। খলীফার সামনে দাড়ানোর ও তার সাথে কথা বলার আমার কি যোগত্যা রয়েছে?”

 

“আমি করাচিতে বসবাস করতাম এবং আমার অনেক সম্পত্তি ছিল। কিন্তু আহমদী হবার কারণে আমার সব সম্পত্তি লুটপাট হয়ে যায়। তাই আমি ১২ বছর পূর্বে কপর্দকহীন অবস্হায় নরওয়েতে আসি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি পূর্বের চেয়ে লক্ষ গুণ ধনী ছিলাম। কারণ এখানে আমি স্বাধীনভাবে আমার খলীফার কথা শুনতে পারি এবং আমার পরিবারের সদস্যরাও স্বাধীনতার সাথে জামাতের কাজ করতে পারে। এটিই প্রকৃত সম্পদ, এটিই প্রকৃত সম্মান। ”

এ সময় তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। তিনি আরো বলেন “আমি অনেক কৃতজ্ঞ যে আমার সব পার্থিব সম্পদ লুট হয়ে গিয়েছে। কারণ এর পরিবর্তে আমি আধ্যাত্মিক সম্পদ লাভ করেছি। যেটি আমাকে ও আমার ভবিষ্যৎ বংশধরকে ইহকাল ও পরকাল দুই জীবনেই সাহায্য করবে।”

 

আমি একজন নিরাপত্তা কর্মী বিলাল মালিক (২৪) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি ডেনমার্ক থেকে হুজুরের সফরের শুরুতে এখানে এসেছেন। তিনি বলেন “আমার নিরাপত্তার দ্বায়িত্ব পালনের কোন পরিকল্পনা ছিল না। হুজুরের কোপেনহেগেন সফরের সময় হুজুর একবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসেন। এটি আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়। এরপর থেকে আমি প্রতিদিন নিরপত্তার দ্বায়িত্ব পালন করে আসছি। ”

 

“আমি ইউনিভার্সিটিতে দুবার ছুটির জন্য আবদেন করেছিলাম। কিন্তু তারা তা মঞ্জুর করে নি কারণ এখন পরিক্ষা চলছিল। তারপর আমি সিদ্ধান্ত নেই যে ছুটি ছাড়াই আমি হুজুরের দ্বায়িত্ব পালন করব। এজন্য হয়ত আমাকে এক বছর অতিরিক্ত পড়তে হবে। কিন্তু এটি বড় বিষয় নয়। কারণ আল্লাহর প্রতিনিধি এখানে এসেছেন। তাই আমি অন্য কোথাও যেতে চাই না। যদি তারা আমাকে ইউনিভার্সিটি থেকে বেরও করে দেয় তাহলেও আমি মনে করব সেটি আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের বিষয়।  ”

আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে তার পরিক্ষা বাদ দেবার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা। কিন্তু খলীফার জন্য তার প্রকৃত ভালবাসা লক্ষ্যণীয় ছিল। তাই আমার মনে হয় আল্লাহপাক তাকে তার নেক ইচ্ছার সঠিক প্রতিদান দিবেন, ইনশাল্লাহ।

 

বিবাহ অনুষ্ঠান

হুজুর সু্‌ইডেনে কয়েকটি বিবাহ পড়ান। বিবাহের ঘোষণা দেবার পূর্বে হুজুর বলেন “বিবাহ দুইটি পরিবারের জন্য একটি আনন্দের বিষয়। কিন্তু একই সাথে এতে সবারই দ্বায়িত্ব বৃদ্ধি পায়। এজন্য বিবাহের পূর্বে যে কোরআনের আয়াত পাঠ করা হয় সেখানে আছে, আল্লাহপাক সকল মুমিনকে তাকওয়ার সাথে কাজ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। যেন একে অপরের অধিকার, পারস্পরিক বিশ্বাস ও সবসময় সত্যের পথে থাকতে পার। ”

 

“আল্লাহ চান যেন আমরা কেবল বর্তমানের কথা চিন্তা না কে ভবিষ্যতের দিকেও লক্ষ্য করি। তাই সবসময় চিন্তা করবে যে তোমার কর্মকান্ড কি পরকালে তোমাকে সাহায্য করবে। তোমার সন্তানের কি ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। ”

 

আহমদীদের আবেগ

আমি সাত বছর বয়সের হুমায়ূনের সাথে কথা বলি। সে আমাকে বলে “আমি যখন হুজুরকে সালাম দেই ও তার সাথে হাত মেলাই, আমি আমর হৃদয়ে এক প্রকার পবিত্রতা অনুভব করি। আমি জানি না সেই অনুভূতি কিরকম কারণ আমি আগে কখনো এরকম অনুভব করিনি। ”

 

আমি একজন সিরিয়ার উদ্বাস্তু আলী জাবের(২৯ বছর) সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি ২০১৩ সালে সুইডেন এসেছিলেন। তিনি বলেন “যখন আন্যান্য সবাই ইউরোপে আসার জন্য দালাল ও চোরাকারবারী দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রতারিত হচ্ছিল। সেখানে আমি নিরাপদেই কোন ভিসা ছাড়াই ইউরোপে এসে পড়ি। ইমিগ্রেশন অফিসার কোন বিলম্ব ছাড়াই আমার পাসপোর্টে সিল মেরে দেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এসব হচ্ছে খলীফাতুল মসীহর দোয়ার ফলাফল।”

“আমি ১৯৯৫ সালে আহমদীয়াত গ্রহণ করি। আজ ২১ বছর পর আমি প্রথমবারের মতো আমার আধ্যাত্মিক নেতার সাথে দেখা করতে পারি। তাকে আমি সকলের চেয়ে বেশি ভালবাসি ও সম্মান করি। হুজুরের সামনে আমি বাক্যহারা হয়ে পড়েছিলাম কারণ তিনি এতই বিনয়ী ও দয়ালু। এমনকি হুজুর আমাকে বলেন যে আমি তার সাথে কোন ছবি তুলতে চাই কিনা। এতে বোঝা যায় যে হুজুর কতটা বিনয়ী একজন মানুষ। কারণ আমারই তো উচিৎ ছিল হুজুরের সাথে ছবি তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করা।  ”

 

ন্যাশনাল আমেলার সাথে মিটিং

ন্যাশনাল আমেলার সাথে মিটিং এ হুজুর সবাইকে তবলীগের উপর গুরুত্ব দিতে বলেন। হুজুর বলেন যে সকল আমেলা সদস্যকে প্রতি বছর কমপক্ষে একজন ও মোবাল্লেগদের কমপক্ষে দুইজনকে বয়াত করানোর চেষ্টা করা উচিৎ। সুইডিশদের প্রকৃতির দিকে লক্ষ্য রেখে সে অনুযায়ী তবলীগের পরিকল্পনা করা উচিৎ।

সংসদ সদস্যের প্রতি বার্তা

ন্যাশনাল মিটিং এ হুজুর একজন বসনিয়ান মহিলা সংসদ সদস্যের ব্যাপারে জানতে চান। তিনি গত বছর লন্ডনে হুজুরের সাথে দেখা করেছেন। সেখানে তিনি হুজুরকে সুইডেন আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু হুজুর এখানে আসার পর তিনি জামাতের কোন অনুষ্ঠানেই অংশগ্রহণ করেননি।

আমীর সাহেব হুজুরকে জানান যে সেই মহিলা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দলের সদস্য। সেই দল হুজুরের একটি মন্তব্যের ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করেছিল। কারণ এই সফরের শুরুর দিকে হুজুর বলেছিলেন যে হোমোসেক্সুয়ালিটিকে বাইবেল ও কোরআন সমর্থন করে না। সেই মহিলা সংসদ সদস্য হয়ত আমাদের অনুষ্ঠানে এসে তার দলকে অসন্তুষ্ট করতে চায়নি।

হুজুর বলেন “সেই সংসদ সদস্যকে আমার সালম দিবেন ও তাকে বলবেন যে আমি ভেবেছিলাম তিনি একজন সাহসী মহিলা। কিন্তু তিনি একজন মুসলমান হয়েও আমাদের অনুষ্ঠানে আসেননি। যেখানে তারই দলের একজন খৃষ্টান মহিলা সংসদ সদস্য আমাদের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। ”

 

জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়াবলী

ন্যাশনাল আমেলার মিটিং এর অনেক সময় জুড়ে জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়াবলী নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জায়েদাদ সেক্রেটারী জামাতের একটি পুরনো জমি বিক্রি করে দেবার ব্যাপরে বলেন। এর বিপরীতে আমীর সাহেব ও কিছু আমেলা সদস্য জমিটি বিক্রি না করার পক্ষে ছিলেন, তারা বলেন যে ভবিষ্যতে হয়ত সেটি জামাতের জন্য লাভজনক হতে পারে।

 

হুজুর বলেন “আমি ২০০৫ সালে যখন আসি তখন সেটি ভাল অবস্হায়ই ছিল। বর্তমান অবস্হা দেখে বোঝা যাচ্ছে যে আপনারা ঠিকভাবে দেখাশোনা করেননি। আমাদের উচিৎ জামাতের সম্পদ যেন সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা। ”

“যেহেতু এ বিষয়ে আমেলা সদস্যগণ একমত নয়, তাই আমি লন্ডন থেকে একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার পাঠাবো। তিনি সকল বিষয় পর্যবেক্ষন করে দেখবেন। পরবর্তী ন্যাশনাল শূরা তে এ বিষয়টি উপস্হাপন করবেন যেন বিস্তারিতভাবে সেখানে আলোচনা করা যায়।”

 

নিমন্ত্রন

হুজুর সফরের সময় অত্যন্ত ব্যস্ত থাকেন। তাই তিনি তার নিকট আত্মীয়দের দাওয়াতও অনেক সময় গ্রহণ করতে পারেন না। সুইডেন সফরের শেষ দিনে তিনি সুইডেনের আমীর সাহেবের দাওয়াত গ্রহণ করেন। আমীর সাহেব সকল কাফেলা সদস্যদেরও নিমন্ত্রণ করেন।

আমীর সাহেবের পুরো পরিবার হুজুরের জন্য অপেক্ষা করছিল। তাদের চোখে মুখে আনন্দ পরিস্কারভাবে বোঝা যাচ্ছিল। আমীর সাহেব হুজুরকে প্রথমে খাবার পরিবেশন করেন। হুজুর কিছু নান রুটি, মাছ ও কাবাব নেন।

খাবার সময় সবাই চুপচাপ খাচ্ছিল। আমি কয়েকবার কিছু বলব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু দেখলাম যে সবাই চুপচাপ রয়েছে। তাই আমি ভাবলাম আমারও চুপ থাকাই ঠিক হবে। প্রায় ১০ মিনিট পর হুজুর বললেন “আমার মনে হয় এটি সবচেয়ে নিরব খাবার যা আমরা খেয়ে এসেছি। ”

এ কথা শোনার পর আমি বললাম যে লন্ডনে মাশরুর ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শেষ হয়েছে। সেখানে কানাডার কাছে লন্ডনের দল হেরে গিয়েছে। হুজুর হেরে যাওয়া দলের ম্যানেজার ওমায়ীর আলীম সাহেবের কাছে বিস্তারিত জানতে চান। তিনি বলেন যে ফাইনালের দিন মাঠ খুব খারাপ ছিল।

হুজুর হাসেন ও বলেন “কানাডা দলের জন্য কি মাঠ ভাল ছিল?”

হুজুরের কথা শুনে আমরা হেসে ফেলি। ওমায়ীর সাহেবও বুঝতে পারেন যে মাঠ খারাপ হলেও দুই দলের জন্যই সেটি খারাপ ছিল।

লন্ডনে আসার পর হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করেন “তোমারা কি দাওয়াতে ঠিকমতো খেয়েছিল। আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে মাজিদ সাহেব বেশি কিছু খান নি। আমি আশা করব আমি চলে যাবার পর তিনি ঠিকভাবে খেয়েছিলেন। ”

আমি বললাম যে আমরা ঠিকভাবেই খেয়েছি।

 

আমীর সাহেবের মেয়ের অনুভূতি

আমীর সাহেবের মেয়ে নায়লা মোজাম্মিল সাহিবা আমাকে তার সেদিনের অনুভূতি বলেন। তিনি বলেন “আমাদের পুরো পরিবার বাসার বাইরে দাড়িয়ে হুজুরের জন্য অপেক্ষা করছিল। এক একটি গাড়ি পার হচ্ছিল আর আমাদের দুঃশ্চিন্তা বেড়ে যাচ্ছিল। আমরা কখনো রাস্তার দিকে এত মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকিনি। এক সময় হুজুর ও তার কাফিলা এসে গেল। আমার মনে হল আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হুজুরের গাড়ি আমাদের বাসার সামনে পার্ক হলো।”

“আমরা মহিলারা হুজুরের স্ত্রীর সাথে খাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। তিনি অনেক নম্র ও বিনয়ী। তিনি আমাদেরকে তার প্লেটে খাবার বেড়ে দিতেও দেননি। এতে বোঝা যায় যে তিনি কতটা বিনয়ী।”

 

“হুজুর খাবার শেষ করে মিষ্টি খাবার জন্য তার স্ত্রীর কাছে আসেন যেখানে আমরাও ছিলাম। এটি আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল। হুজুর এসে সোফায় বসেন। তিনি বলেন

“আমি ছেলেদেরকে উপরে রেখে এসেছি কারণ তারা আমার সামনে ঠিকভাবে খেতে পারছিল না। এখানে এসে আমি আপনাদের খাওয়াতে কোন অসুবিধা করছি না তো? ”

আমরা কে? আমাদের কোন যোগ্যতাই নেই। কিন্তু হুজুর যিনি আমাদের আধ্যাত্মিক নেতা আমাদের সকলের জন্যই চিন্তা করছেন।”

“পুরো অভিজ্ঞতাই একটি স্বপ্নের মতো ছিল। এখনো আমার এটি বিশ্বাস হচ্ছে না।”

 

কিছু দুঃশ্চিন্তাগ্রস্হ সময়

আমাদের কাফেলা গুটেনবার্গ এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে সকাল ৯ টায় মসজিদ নাসের থেকে রওনা হবে। সকালের ট্রাফিক জ্যামের জন্য আমরা বলেছিলাম যে আমাদের যেন হোটেল থেকে ৮ তার দিকে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ড্রাইভার জ্যামের মধ্যে আটকা পড়ে। তাই আমরা দুঃশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে যাই। আমাদের জন্য হুজুরের দেরী হয়ে যাবে এটি আমরা চিন্তাও করতে পারি না। ৮.১৫ তে আমি বলি যে আমরা একটী ট্যাক্সি নিয়ে নেই। হোটেল কর্মচারী বলল যে ট্যাক্সি আসতেও কিছু সময় লাগবে। অবশেষে ৮.২৫ মিনিটে গাড়ি এসে পৌছায়। আল্লাহর রহমতে আমরা ৮.৪০ মিনিটে মসজিদ নাসের পৌঁছাই।

নাসের মসজিদ থেকে বিদায়

৯ টার দিকে হুজুর তার বাসা থেকে বেরিয়ে আসেন। মসজিদ প্রাঙ্গনে শত শত আহমদী পুরুষ, মহিলা ও বাচ্চা হুজুরকে বিদায় জানানোর জন্য সমবেত হয়েছিল। হুজুরের বিদায়ে তারা অনেক ব্যথিত ছিল। নীরব প্রার্থনার পর হুজুর ও তার কাফেলা সকাল ৯টায় মসজিদ নাসের থেকে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ

এয়ারপোর্টে নিরাপত্তা পরিক্ষার পর আমরা একটি ছোট লাউঞ্জে বসি। সেটি দুই ভাগে ভাগ করা ছিল। এক ভাগে হুজুর ও তার স্ত্রী বসেন ও অন্যভাগে কাফেলা সদস্যরা বসি। আমাদের সাথে সুইডেনের আমীর সাহেব ও সদর সাহেবও ছিলেন। কিছুক্ষণ পর হুজুর আমাকে ডাকেন।

আমি হুজুরের কাছে গেলে হুজুর আমাকে বলেন “আবিদ, মাশাআল্লাহ্ তুমি একটি সুন্দর খয়েরী রং এর চামড়ার ব্যাগ নিয়ে সফর করছ।”

আমি বলি “জী হুজুর। এটি আমি এই সফর শুরুর আগের দিন কিনেছি। এতে আমি আমার ল্যাপটপ ও নোটবুক রাখি এবং এই সফরে এটি অনেক উপকারে এসেছে। ”

হুজুর ভালভাবে ব্যাগটি দেখে বলেন “এই সব চামড়ার ব্যাগের সমস্যা হল কিছুদিন পর চামড়া ক্ষয় হয়ে যায়। তাই ব্যাগের যত্ন নিতে হয় এবং নিয়মিত পলিশ করাতে হয়। তাহলেই ব্যাগটি অনেকদিন ভাল থাকে।”

হুজুরের সাথে কথা বলে আমি কাফেলা সদস্যদের কাছে যাই। সেখানে কফি, বিস্কিট ও চকলেট দেয়া হয়েছিল। কয়েক মিনিট পর মেজর সাহেব কফি নেন এবং একটি চকলেট নিয়ে তার মধ্যে ডুবিয়ে দেন। এটি দেখে সুইডেনের আমীর সাহেব বলেন “মেজর সাহেব, আপনি ভুল করে কফির মধ্যে চকলেট ডুবিয়ে দিয়েছেন।”

মেজর সাহেব উত্তরে বলেন “ভুল করে নয়। আমি পয়সা উশুল করার জন্য ইচ্ছে করেই এমনটি করেছি।”

 

কয়েক মিনিট পর হুজুর আমাকে আবার ডাকেন। হুজুর আমাকে জিজ্ঞেস করেন এয়ারপোর্টের ওয়াইফাই এর পাসওয়ার্ড কি। আমি হুজুরকে দেখিয়ে দেই কিভাবে লগ ইন করতে হয়। কিন্তু এয়ারপোর্টের ওয়াইফাই অত্যন্ত ধীর গতির মনে হল। হুজুর বলেন “আমি লক্ষ্য করলাম যে স্ক্যান্ডেনেভিয়াতে ওয়াই ফাই অনেক দুর্বল।”

হুজুর অন্যান্য কাফেলা সদস্যদের খবর জানতে চান। আমি বললাম যে কয়েকজন ঘুমিয়ে পড়েছে। বিশেষভাবে মাজিদ সাহেব অনেক ক্লান্ত ছিলেন। তিনি গত রাতে মাত্র দুই ঘন্টা ঘুমিয়েছেন। কারণ তিনি ফযরের পর মসজিদেই ছিলেন এবং সেখান থেকেই এয়ারপোর্টে আসেন।

 

দুইটি পর্বের পরিবর্তে তিনটি পর্ব

গত কয়েকদিনে আমি বিভিন্ন মানুষের সাথে যেসব কথা বলি তা হুজুরকে জানাই। হুজুর বলেন “আশা করি তুমি লন্ডনে যেয়ে তোমার ডায়েরী লেখার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ পেয়েছো।”

আমি মনে মনে চিন্তা করি যে আমি ডায়েরীটি দুইটি পর্বে লিখব। কিন্তু লন্ডনে আসার পর হুজুর বলেন “তোমার উচিৎ তিনটি পর্বে ডায়েরীটি লেখা। তাহলে সেটি পড়তে মানুষের সুবিধা হবে। প্রথম পর্ব হবে ডেনমার্ক, দ্বিতীয় পর্ব হবে মালমো ও স্টকহোম ও শেষ পর্ব হবে সফরের শেষের দিনগুলো নিয়ে।”

আল্‌হামদুলিল্লাহ, আমি অনেক ভাগ্যবান যে হুজুর আমার ডায়েরী নিয়ে এত সময় দেন এবং দিক নির্দেশনাও দেন।

সুইডেন থেকে বিদায় ও লন্ডনে ফিরে আসা

হুজুর কাফেলা সদস্যদের কাছে এসে আমীর সাহেব ও সদর সাহেবের দিকে লক্ষ্য করে বলেন “আমি চলে যাবার পর আপনারা দুইজনেই কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিবেন।”

কয়েক মিনিট পর আমরা হুজুরকে জানাই যে লন্ডনের প্লেন রওনা দেবার জন্য তৈরী। প্লেনে উঠে আমি লক্ষ্য করলাম যে হুজুর ও তার স্ত্রীর যেখানে বসেছেন সেখানে সামনে পা রাখার অনেক কম জায়গা। আমি  সফরে দোয়া করলাম যে প্লেনে হুজুর ও তার স্ত্রীর সফর যেন আরামদায়ক হয়।

প্লেনে আমি মেজর সাহেবের পাশে বসেছিলাম। তিনি আমাকে তার নাতির ছবি দেখালেন। প্লেন দুপুর ১২.১৫ তে লন্ডন পৌঁছায়। লন্ডনের সদর সাহেব ও আমীর সাহেব হুজুরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এয়ারপোর্টে এসেছিলেন।

আমীর সাহেব হুজুরকে দোয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কারণ ইউকে জামাত খিলাফত দিবসের পরের দিন একটি তবলীগী অনুষ্ঠান আয়োজন করতে যাচ্ছে। হুজুর জানতে চান যে অনুষ্ঠানটি খিলাফত দিবসে (২৭ মে) তারিখে কেন করা হল না।

আমাদের কাফেলা দুপুর ১.৪০ মিনিটে ফযল মসজিদে পৌঁছায়। সেখানেও শত শত আহমদী হুজুরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সমবেত হয়েছিল।

 

আমার স্ত্রী মালা, আমাদের দুই ছেলে মাহিদ ও মোশাহিদ কে নিয়ে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য এসেছিল।

 

উপসংহার

আল্‌হামদুলিল্লাহ, হুজুরের স্ক্যান্ডেনেভিয়া সফর অনেক বরকতপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়েছে। হুজুরের সফরের প্রভাব দেখতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। হাজার হাজার আহমদী আধ্যাত্মিক পুনর্জীবন লাভ করেছে এবং লাখ লাখ মানুষের কাছে আহমদীয়াত তথা প্রকৃত ও শান্তিপূর্ণ ইসলামের বাণী পৌঁছেছে।

অনেক মানুষ হুজুরের বিনয়, নম্রতা ও ভালবাসা প্রত্যক্ষ করেছে। আমরা দেখেছি যে কিভাবে মহান আল্লাহপাক সবসময় সকল বিষয়ে তার খলীফাকে সাহায্য করেছেন। আমরা দেখেছি যে আমাদের খলীফা সমসাময়িক বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়কে ইসলামের আলোকে সাহসিকতার সাথে ব্যাখ্যা করেছেন।

আমি দেখেছি যে কিভাবে সুইডেনের সরকারী দল হোমোসেক্সুয়ালিটি ও ছেলে-মেয়ের হাত মেলানোর বিষয়টি নিয়ে ইসলামের বিরোধিতা করছিল। সাংবাদিকরাও বার বার এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছিল। হুজুর ইসলামের প্রতি তার দৃঢ় বিশ্বাস থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। হুজুর বর্তমান ও ভবিষ্যতের আহমদীদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরী করেছেন।

হে আল্লাহপাক তুমি আমাদের খলীফাকে দীর্ঘ, সুস্থ এবং সমৃদ্ধ জীবন দান কর; আমীন।