রোযার তাৎপর্য এবং কতিপয় বিষয়

ভিতরের কন্টেন্টে যেতে নিচের বিষয় গুলোর উপর ক্লিক করুন

রোযার তাৎপর্য

রমযানে কুরআন পাঠের গুরুত্ব

রোযায় আল্লাহর নৈকট্য এবং দোয়া কবুলিয়্যত

রোযার আরও কয়েকটি বিশেষ উপকারী দিক

রোযা কাদের ওপর ফরয

রোযার নিষিদ্ধ দিন

যে সকল কারণে রোযা ভঙ্গ হয়

যে সকল কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না

রোযা সম্বন্ধে অন্যান্য জ্ঞাতব্য বিষয়

রোযার তাৎপর্য

ইসলামী ইবাদতের গুরুত্বপূর্ণ রোকন বা স্তম্ভ হলো সিয়াম বা রোযা পালন। চান্দ্র বছরের নবম মাসের নাম রমযান। রমযান মাসের নাম পূর্বে ছিল ‘নাতেক’ (তফসীর গ্রন্থ- ফাতহ আল-কাদীর)। রমযান শব্দটি ‘রময’ মূল ধাতু হতে এসেছে। এর অর্থ পিপাসায় উত্তপ্ত হওয়া। হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) এ সম্বন্ধে বলেছেন, “আরবী ভাষায় সূর্যের তাপকে রময বলা হয়। যেহেতু রমযান মাসে রোযাদার পানাহার ও যাবতীয় দৈহিক ভোগ-বিলাস হতে বিরত থাকে এবং আল্লাহ্র আদেশসমূহ পালন করার উদ্দেশ্যে নিজের প্রাণে ব্যগ্র তার তাপ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। হযরত রসূল করিম (সা.)-এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের দ্বিতীয় বছর মুসলমানদের ওপর রমযানের রোযা ফরয করা হয়। রমযানের ইতিহাস, নিয়ম-কানুন, উদ্দেশ্য এবং আদর্শ সম্বন্ধে আল্লাহ তা’লা কুরআন করীমে সূরা বাকারার ২৩ নং রুকুতে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন।
হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) আরো বলেছেন“কেবল অভু ক্ত এবং পিপাসার্ত থাকাই রোযার উদ্দেশ্য নয়, বরং এর একটি তাৎপর্য এবং প্রভাব আছে যা অভিজ্ঞতায় বোঝা যায়। মানুষের প্রকৃতির মাঝেই এটা নিহিত আছে যে, মানুষ যত কম খায় ততই তার আত্মশুদ্ধি এবং দিব্যদর্শন শক্তি বৃদ্ধি পায়। খোদার অভিপ্রায় এটাই, একটি খাদ্যকে কম করে অপর একটি খাদ্যকে বর্ধিত করা।
খলীফাতুল মসীহ্ সালেস (রাহে.) রমযানের ইবাদত সম্বন্ধে বলেন:“মাহে রমযান পাঁচটি ইবাদতের সমষ্টি। প্রথমটি হলো রোযা রাখা। দ্বিতীয়: ফরয নামায ছাড়াও রাত্রি জাগরণ অর্থাৎ, রাত্রে নফল ইবাদতসমূহ (তারাবীহ, তাহাজ্জুদের নামায ইত্যাদি) আদায় করা এবং বিনয়ের সাথে নিজ প্রভুর কাছে সব ধরনের মঙ্গল কামনা করা। তৃতীয়: বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা। চতুর্থ: দান-খয়রাত করা এবং পঞ্চম: প্রবৃত্তির কুপ্ররোচনা হতে পরিত্রাণ লাভের চেষ্টা করা।

রমযানে কুরআন পাঠের গুরুত্ব:

রমযানে কুরআন পাঠের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’লা বলেন,
(শাহ্রু রামাযানাল্লাযী উন্যিলা ফীহিল্ কুরআন)
অর্থাৎ, “রমযান সেই মাস যাতে অবতীর্ণ করা হয়েছে কুরআন।” (সূরা বাকারা: ১৮৬)
রমযান মাসের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব হলো, এ পবিত্র মাসে কুরআন করিম নাযিল করা হয়েছিল। আর প্রতি বছর এ মাসে জীব্রাইল (আ.)-এর মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে বছরের অন্যান্য সময়ে এবং পূর্বে যতখানি কুরআন অবতীর্ণ হতো, তা পুনরাবৃত্তি করা হতো। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ বছরের রমযান মাসে হযরত জীব্রাইল (আ.) তাঁর কাছে দু’বার প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত কুরআন করিম আবৃত্তি করেন। (বুখারী)। এতে তিনি বুঝতে পারেন, কুরআন করিম নাযিল সমাপ্ত হয়েছে। এ পবিত্র মাসে রোযার কল্যাণ, আজ্ঞানুবর্তিতা এবং কুরআন পাঠ এসব ইবাদত একত্রে মানবচিত্তে এক আশ্চর্য আধ্যাত্মিক অবস্থা সৃষ্টি করে। আঁ-হযরত (সা.) বলেন, “রমযান ও কুরআন বান্দার জন্যে সুপারিশ করবে। রোযা বলবে, ‘খোদা! আমি তাকে পানাহার এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিবৃত্ত রেখেছি, তাই তুমি তার জন্যে আমার সুপারিশ কবুল কর।’ কুরআন বলবে: ‘আমি তাকে রাত্রে নিদ্রা হতে বিরত রেখেছি এবং তাকে ঘুমাতে দেইনি, এ কারণে তার জন্যে আমার সুপারিশ কবুল কর।’ তাদের সুপারিশ কবুল করা হবে।” (বায়হাকী)।

রোযা রেখে কুরআন করিম পাঠ করা, এর অর্থ বুঝতে চেষ্টা করা এবং এর অনুশাসনাদি পালন করার মাধ্যমে মানুষের আধ্যাত্মিক দর্শনশক্তি সতেজ হয়। সে শয়তানি চিন্তাভাবনা ও প্রভাব হতে নিরাপদ থাকে। অধিকন্তু মানুষ এক অনাবিল আধ্যাত্মিক প্রশান্তি এবং পরম সম্পদ লাভ করে যা শুধু অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই উপলব্ধি করা যায়, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সুনিয়ন্ত্রিত সুখাদ্য যেমন দেহকে সুস্থ, সবল ও আনন্দময় করে, তেমনি সুনিয়ন্ত্রিত ইসলামী রোযা আত্মাকে সুস্থ, সতেজ ও উর্ধ্বগামী করে। বস্তুত মাহে রমযানেরপবিত্র দিনগুলো বড়ই বরকতপূর্ণ। যে নিতান্তই দুর্ভাগা এবং অপরিণামদর্শী, একমাত্র সে-ই এ কল্যাণ হতে নিজেকে বঞ্চিত রাখে এবং অন্যান্য দিনের মতই পানাহারে মত্ত থাকে।

রোযায় আল্লাহর নৈকট্য এবং দোয়া কবুলিয়্যত:

রোযার মাধ্যমে বান্দার হৃদয় যখন বিগলিত হয় এবং তার পার্থিব লালসাগুলো স্তিমিত হয়ে আসে, তখন তার আধ্যাত্মিক শক্তিসমূহ বিকাশ ও পরিবর্ধন লাভ করতে থাকে এবং তার আত্মা আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভের জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠে। বান্দার এ অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করে আল্লাহ্ তা’লা বলেন:
অর্থ: এবং আমার বান্দাগণ আমার সম্বন্ধে তোমাকে যখন জিজ্ঞেস করে তখন (বল যে) আমি নিকটেই আছি। আমি প্রার্থনাকারীর প্রার্থনার উত্তর দেই যখন সে আমার কাছে প্রার্থনা করে। সুতরাং তারাও যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার উপর ঈমান আনে যাতে তারা সঠিক পথ প্রাপ্ত হয়। (সূরা বাকারা: ১৮৭)।
আল্লাহ্ তালার প্র তি পূর্ণ আস্থা রেখে তাঁর বিধান অনুযায়ী রোযা রাখলে দোয়া কবুল হয়ে থাকে। আল্লাহ্ তালা বান্দার ডাকে সাড়া দিয়ে থাকেন। সেজন্যে কোন বিপদ আপদে পড়লে এ আদেশের অনুশীলনে রোযা রেখে দোয়া করলে বিপদ কেটে যায়।

রোযার আরও কয়েকটি বিশেষ উপকারী দিক:

(ক) সম্পূর্ণ একমাস রোযা এজন্য রাখতে হয় যেন এতে প্রবৃত্তি অবদমিত হয় এবং মানুষ আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের যোগ্যতার জন্য একটি পূর্ণ সময় পায়।
(খ) চাঁদের হিসাবে রোযা রাখার ফলে সব মৌসুমেরই অভিজ্ঞতা জন্মে এবং রোযার উদ্দেশ্য বছরে বছরান্তরে পূর্ণতা লাভ করতে পারে।
(গ বিশেষ মাসে রোযা রাখার উদ্দেশ্য হল সবাই জাতিগতভাবে একসঙ্গে বিশেষ অনুকূল পরিবেশের মাঝে রোযা রেখে এর পূর্ণ কল্যাণ লাভ করতে সক্ষম হওয়া।দান-খয়রাত ও ফিতরানা রোযার মাস বিশেষ দান-খয়রাতের এক সুবর্ণ সুযোগ আনয়ন করে। রোযার সাধনা এবং কৃচ্ছতা মালী কুরবানীর সাথে একত্র হয়ে এক মহান আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি করে। যাকাত, সদকা, ফিতরানা এবং অন্যান্য দান-খয়রাতের মাধ্যমে সমাজের গরীব-দুঃখী সবাই এ মহান সাধনায় অংশগ্রহণ করতে পারে এবং পবিত্র ঈদের খুশীতে শামিল হতে পারে। এ জন্যে হাদীসে এসেছে, মাহে রমযানে রসূল করিম (সা.) ঝড়ের গতিতে দান খয়রাত করতেন। বস্তুত সকল প্রকার রূহানী সাধনার সাথে মালী কুরবানীর এক মহান ত্যাগজনিত তৃপ্তিতেই এ পবিত্র মাসের উদ্দেশ্যাবলী পূর্ণ হয় এবং সত্যিকার অর্থে ঈদের মাধ্যমে এর পরিসমাপ্তি ঘটে।

রোযা কাদের ওপর ফরয

১। আল্লাহ্ তালা কুরআন মজীদে জানিয়েছেন,ফামান শাহিদা মিনকুমুশ্ শাহ্রা ফালইয়াসুম্হু অর্থাৎ, রমযান মাসে যে কেউ জীবিত এবং সুস্থ থাকে তার জন্য রমযান মাসে রোযা রাখা ফরয। (সূরা বাকারা: ১৮৬)।
২। প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান, সুস্থ, মুকীম (অবস্থানকারী) মুসলমান পুরুষ এবং মহিলার ওপর রমযান মাসের রোযা রাখা ফরয। বছরের শুধু রমযান মাসের রোযাই ফরয। বাকী অন্যান্য রোযা নফল।
৩। তবে রোগী ও মুসাফীর ব্যক্তিকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। (সূরা বাকারা: ১৮৫)। রোগ-মুক্তির পর এবং সফর হতে ফেরার পর সে অন্য কোন দিনে এ সকল রোযা পূর্ণ করবে।
৪। যারা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় আক্রান্ত এবং এ থেকে আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা ক্ষীণ বা এরূপ দুর্বল ব্যক্তি যাদের পক্ষে পরেও রোযা রাখা সম্ভব নয়, তারা এর পরিবর্তে নিজ নিজ সামর্থ্যানুযায়ী ফিদিয়া আদায় করে দিবে।
৫।কুরআন করীমে অসুস্থ এবং মুসাফিরের জন্য রোযা না রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রসূল (সা.) গর্ভবতী মহিলা, স্তন্যদাত্রী মাকেও অসুস্থের আওতাভু ক্ত বলে গণ্য করেছেন। এরূপভাবে সেই বালক-বালিকাও অসুস্থ তার অন্তর্ভুক্ত যার দৈহিক বৃদ্ধি সাধিত হচ্ছে। এ অবস্থায় রোযা রাখার ফলে তার স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এমন কমবয়সী ছেলে-মেয়েদের রোযা রাখার জন্য মা-বাবার বাধ্য করা উচিত নয়।
৬।দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছাত্র, যে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রয়েছে, সে-ও অসুস্থ বলে গণ্য হবে। কেননা পরীক্ষার দিনগুলোতে তার মস্তিষ্কের ওপর এমন চাপ থাকে যে, অনেকে পাগল হয়ে যায়। অনেকে গুরুতর অসুস্থ পর্যন্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং এর মাঝে কি-ই-বা উপকারিতা আছে, একবার রোযা রাখবে এবং তারপর চিরদিনের জন্য রোযা রাখা থেকে বঞ্চিত থাকবে? (ফিকাহ আহমদীয়া, পৃ. ২৭৩ ও ২৯০-২৯৯)।
৭।রোযা অবস্থায় ক্ষুধা-পিপাসার কারণে প্রাণহানির আশঙ্কাজনক অবস্থার সৃষ্টি হলে রোযা ভঙ্গ করতে হবে।

রোযার নিষিদ্ধ দিন

১) ঈদ-উল-ফিতরের দিন এবং ঈদ-উল-আযহার দিন রোযা রাখা নিষেধ। (মুসলিম)।
২) ১১, ১২ ও ১৩ যিলহজ্জ আইয়ামে তাশ্রীকের দিনগুলোতে রোযা রাখা নিষেধ। (তিরমিযী)।
৩) সন্দেহের দিন। (তিরমিযী)।
৪) রমযানের শুভাগমনের উদ্বোধনে রোযা রাখা নিষেধ। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত)।
৫) শুধুমাত্র জুমুআর দিন রোযা রাখা নিষেধ। পূর্বে অথবা পরে একদিন যোগ করে রোযা রাখা যেতে পারে। (বুখারী)।
৬) স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর নফল রোযা নিষেধ। (বুখারী ও মুসলিম)।

যে সকল কারণে রোযা ভঙ্গ হয়

জেনে-শুনে খাবার খাওয়া, পান করা এবং যৌন সর্ম্পক করার ফলে রোযা ভেঙ্গে যায়। টিকা লাগালে, ইচ্ছা করে বমি করলে, স্বেচ্ছায় বীর্যপাত করলে রোযা ভেঙ্গে যায়। যদি কেউ ভুল করে রমযানের রোযা ভেঙ্গে ফেলে তবে তার গুনাহ হবে না, কিন্তু কাযা আবশ্যক। রোযা রাখা অবস্থায় মহিলাদের মাসিক শুরু হলে অথবা শিশু জন্ম দেওয়ার কারণে নিফাসের রক্ত চলাকালীন সময়ে রোযা ভেঙ্গে যায়। অবশ্য পরবর্তীতে সেসব দিনের রোযার কাযা আবশ্যক। রমযানের রাত্রে স্ত্রী-সহবাস নিষেধ নয়।

যে সকল কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না

যদি কেউ ভুল করে কোন কিছু খেয়ে ফেলে তাহলে তার রোযা যেমন ছিল তেমনি থাকবে অর্থাৎ, রোযা ভঙ্গ হবে না। কেননা হুযূর (সা.) বলেছেন, যদি কেউ ভুল করে রোযা অবস্থায় কিছু খেয়ে ফেলে, তাহলে এতে করে তার রোযা ভঙ্গ হবে না। সে তার রোযা পূর্ণ করবে,কেননা তাকে আল্লাহ্তালাই খাইয়েছেন। (বুখারী,কিতাবুস সাওম)।
পেটে বা গলায় অনিচ্ছাকৃত বা অসাবধানতাবশত ধোঁয়া, মশা, মাছি, ধূলা-বালি চলে গেলে কিংবা কুলির পানি অজ্ঞাতসারে গিলে ফেললে রোযা ভঙ্গ হয় না। এরূপে কানে পানি গেলে অথবা ঔষধ দিলে, কফ ফেললে, থুথু গিলে ফেললে, অনিচ্ছাকৃত বমি করলে, চোখে ঔষধ দিলে, দাঁত থেকে রক্ত বের হলে, বসন্তের টিকা লাগালে, মেসওয়াক বা ব্রাশ করলে, ঘ্রাণ নিলে, নাকে ঔষধ দিলে, মাথায় বা দাড়িতে তেল দিলে, শিশু বা স্ত্রীকে চুমু দিলে, দিনের বেলায় ঘুমানোর সময় স্বপ্নদোষ হলে, মাথায় পানি দিলে, সুগন্ধি ব্যবহার করলে, আয়না দেখলে, শরীর মর্দন করলে এবং সেহরীর সময় ফরয গোসল না করার কারণে রোযা ভঙ্গ হয় না। হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, রসূল করিম (সা.) গোসল না করা অবস্থায় প্রভাত হলে (ফজরের নামাযের পূর্বে) গোসল করতেন এবং রোযা রাখতেন। (বুখারী ও মুসলিম)। দিনের বেলায় মহিলারা সুরমা লাগাতে পারে। পুরুষদের
দিনের বেলায় সুরমা ব্যবহার সর্ম্পকে হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.) বলেছেন, “দিনে সুরমা লাগানোর কি-ই-বা প্রয়োজন রয়েছে, রাতে ব্যবহার করুন। (ফিকাহ আহমদীয়া, পৃ. ২৭৭-২৭৯)।
খাদ্যবস্তু এবং অন্যান্য বিষয় সম্বন্ধে একটি মূলনীতি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) কর্তৃক এরূপে বর্ণিত হয়েছে: ইচ্ছাকৃতভাবে) শরীরে প্রবেশ করানো হয় এরূপ প্রত্যেক বস্তুতে রোযা ভঙ্গ হয় এবং (অনিচ্ছাকৃতভাবে) শরীর হতে বের হয় এরূপ বস্তুতে রোযা নষ্ট হয় না।

রোযা সম্বন্ধে অন্যান্য জ্ঞাতব্য বিষয়

রমযান মাসের চাঁদ দেখার পর অথবা অধিকাংশ লোকের চাঁদ দেখার সাক্ষ্য পাওয়ার পর অথবা শাবান মাসের ত্রিশ দিন পার হবার পর দিন হতে রমযানের রোযা শুরু হয়ে যায়। যদি ২৯ শাবান আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার পরেও কয়েকজন লোক চাঁদ দেখার সাক্ষ্য দেয় এবং তা সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় তাহলে পরদিন হতে রোযা শুরু করতে হবে। (মুসনাদ ইমাম আহমদ হাম্বল এবং অন্যান্য হাদীস)।
রোযা রাখার জন্য সুবেহ সাদেকের পূর্বে সেহরী খেতে হবে (বুখারী)। কোন কিছু না খেয়ে রোযা রাখা ঠিক নয়। এটা করা অপছন্দনীয়। এমতাবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। সেহরী দেরী করে খাওয়া এবং সূর্যাস্তের সাথে-সাথেই ইফতার করাকে হযরত রসূল করিম (সা.) পছন্দ করতেন। (তিরমিযী, আবূ দাউদ)।
যদি জানা যায়, খাওয়ার সময় প্রভাত হয়ে গিয়েছিল বা যখন ইফতার করা হয়েছিল তখনও সূর্য অস্ত যায়নি তাহলে সে রোযা হবে না, রোযা কাযা করতে হবে। (বুখারী)
সূর্যাস্ত হওয়ার পর এ দোয়া পড়ে ইফতার করতে হবে- আল্লাহুম্মা ইন্নি লাকা সুমতু ওয়াবিকা আমানতু ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতু।অর্থাৎ,হে আল্লাহ্! নিশ্চয় তোমার জন্যই আমি রোযা রেখেছি, তোমার উপর ঈমান এনেছি এবং তোমার দেয়া রিযিক দিয়ে ইফতার করছি। (আবু দাউদ, বাব: কাওলুল ইনাদাল ইফতার)।

খেজুর, দুধ অথবা পানি দিয়ে ইফতার করা সুন্নত। রসূল (সা.) এ সর্ম্পকে বলেছেন, যখন ইফতার করবে তখন খেজুর দিয়ে ইফতার কর কেননা এতে বরকত রয়েছে। যদি এটি সহজলভ্য না হয় তাহলে পানি দিয়ে ইফতার কর কেননা এটি অত্যন্ত পবিত্র জিনিস।(তিরমিযী, বাব: মা ইয়াসতাহিব্বু আলাইহিল ইফতার)।
অন্যদেরকে ইফতার করানো খুবই পুণ্যের কাজ।এ সর্ম্পকে আঁ-হযরত(সা.)বলেছেন,যে রোযাদারকে ইফতার করাবে তার জন্য রোযাদারের সমপরিমাণ পুণ্য রয়েছে, কিন্তু এতে করে রোযাদারের পুণ্যে কোন কমতি হবে না।(তিরমিযী, কিতাবুস সাওম)।
শাওয়ালের ৬টি নফল রোযা রাখাও অতি উত্তম। হাদীসে আছে,যে ব্যক্তি রমযানে রোযা রাখে এবং এরপর শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযাও রাখে, সে যেন সারা বছর রোযা রাখল। (মুসলিম)। এছাড়া হযরত রসূল করিম (সা.) প্রত্যেক চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে নফল রোযা রাখতেন। যে মুসলমান যুবক দরিদ্রতাবশত বিয়ে করতে অক্ষম তার জন্য প্রয়োজনমত নফল রোযা রাখা খুবই উপকারী। এতে প্রবৃত্তি দমন হয়ে চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষা হয়।
সারা বছর রোযা রাখা উচিত নয় (বুখারী)। সারা বছর রোযা রাখলে অন্যান্য অসুবিধা ছাড়াও রোযার যে উদ্দেশ্য তা ব্যাহত হয়। কারণ তখন রোযা রাখা শরীরের পক্ষে এমনভাবে অভ্যাস হয়ে যায় যে, রোযার ফলে যে বিশেষ উত্তাপ ও দহন সৃষ্টি হওয়ার কথা, তা হতে পারে না। ফলে আত্মশুদ্ধি এবং রোযার অন্যান্য উপকারিতা লাভ করা সম্ভব হয় না।

সহীহ্ হাদীসে আছে, যখন রমযান মাস আসে তখন বেহেশতের দরজাগুলোকে উন্মুক্ত করা হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। রোযা মু’মিনের জন্যে ঢালস্বরূপ। যে মিথ্যা কথা এবং তদনুযায়ী কাজ ত্যাগ করে না, আল্লাহ্র কাছে তার খাদ্য বা পানীয় পরিত্যাগ করার কোন মূল্য নেই। রমযান মাসে এক মহামান্বিত রাত আছে যা হাজার মাস হতে উত্তম। যাকে এ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে সে সব ধরনের মঙ্গল হতে বঞ্চিত এবং দুর্ভাগা।
রোযা রাখার গুরুত্ব সম্বন্ধে হযরত মসীহ্ মাওউদ (আ.)-এর উদ্ধৃতিটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য:
যার অন্তর এ কথায় আনন্দিত যে রমযান এসেছে এবং সে এ প্রতীক্ষায় ছিল রোযা এলেই রাখবে, অথচ অসুস্থতার জন্যে রোযা রাখতে পারে না এরূপ ব্যক্তি আকাশে রোযা হতে বঞ্চিত হবে না। দুনিয়ার অনেক লোক বাহানা খুঁজে এবং ভাবে, দুনিয়ার মানুষকে আমি যেরূপ ধোঁকা দিচ্ছি সেভাবে খোদাকেও ধোঁকা দিচ্ছি। বাহানাকারী নিজের পক্ষ হতে সমস্যা বানিয়ে নেয় এবং ওজরগুলোকে শামিল করে সমস্যাগুলোকে সঠিক সাব্যস্ত করে। কিন্তু খোদার দৃষ্টিতে সেগুলো সঠিক নয়। ওজর ও বাহানার দরজা খুবই বিস্তৃত। মানুষ চাইলে এ দিয়ে সারা জীবন বসে নামায পড়তে পারে এবং রোযা একেবারেই না রাখতে পারে। কিন্তু খোদা তার নিয়ত ও ভাবধারা অবগত। যার সততা ও আন্তরিকতা আছে খোদা জানেন, তার অন্তরে মর্মবেদনা রয়েছে, খোদা তাকে প্রকৃত পুণ্য হতে অধিক দান করেন। কারণ, মর্মবেদনা মর্যাদার বিষয়। বাহানাকারী ব্যাখ্যার উপর ভরসা করে, কিন্তু আল্লাহ্ তা’লার কাছে এ ভরসার কোন মূল্য নেই। (আল হাকাম, ১০/১২/১৯০২, পৃ. ০৯ )।
প্রত্যেক মুসলমানের জন্যে সার্বিক অর্থে সাধনার এক অপূর্ব সওগাত নিয়ে প্রতিবছর মাহে রমযান আসে। দৈহিক ও আধ্যাত্মিক তথা সার্বিক কল্যাণের জন্যে রমযানের কৃচ্ছতার মাঝে যে মহান সংকল্প ও শিক্ষা নিহিত তা পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের মাঝেই এ মাসের সার্থকতা রয়েছে। নিছক আচার-অনুষ্ঠান ও বাহ্যিকতার মাঝে বিশেষ কোন সার্থকতা নেই।
[সংকলিত]

[সুত্রঃ তৃতীয় পরিচ্ছেদ, ইসলামী ইবাদত ও দ্বীনি মা’লুমাত (ষষ্ঠ সংস্করণ, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩) ]