Menu

হুজুরের জার্মানী সফর আগস্ট ২০১৭ (২য় পর্ব)

জার্মানী জলসাগাহ পরিদর্শন

২৪ আগস্ট ২০১৭ তারিখ বিকেল ৫.৩৫ মিনিটে হুজুর জার্মানীর বায়তুস সুবুহ মসজিদ থেকে কার্লশূর শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সেখানেই জার্মানীর জলসা সম্পন্ন হবে। ২ ঘন্টা সফরের পর আমরা কার্লশূর শহরে  পৌঁছাই। সেখানে শত শত আহমদী হুজুরকে স্বাগত জানানোর জন্য উপস্হিত ছিল। রাত ৮ টার সময় জার্মানীর আমীর সাহেবকে নিয়ে হুজুর জলসাগাহ পরিদর্শন করেন।

হুজুর লঙ্গরখানায় অনেক সময় থাকেন, সেখানে জলসার সময় যেসব খাবার পরিবেশন করা হবে সেগুলো দেখেন। খাবার চেখে দেখার পর হুজুর সেখানকার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন।

হুজুর ক্যাম্পিং এর স্হানে যান যেখানে জলসার সময় আহমদীদের থাকার জন্য তাবুর ব্যবস্হা করা হয়েছে। হুজুর কয়েকজন আহমদী মহিলাকে জিজ্ঞেস করেন যে তাবুতে তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা? এরপর হুজুর লাজনাদের অংশ পরিদর্শন করেন।

হুজুর হিউম্যানিটি ফার্স্ট এর স্টল পরিদর্শন করেন এবং আতাহার জুবায়ের সাহেবের (হিউম্যানিটি ফার্স্ট বিভাগের প্রধান) কাছে জানতে চান যে আফ্রিকার জন্য এপ্রিল মাসে মোবাইল আই ক্লিনিক কেনা হয়েছিল সেটি সেখানে পৌঁছেছে কিনা? আতাহার সাহেব হুজুরকে জানান যে ক্লিনিকটি বেনিনের কাস্টমসে আটকে রয়েছে।

আতাহার সাহেব আমাকে বলেছিলেন যে বেনিনের আমীর সাহেব তাকে বলেছেন কাস্টমস থেকে সেটি বের হতে কমপক্ষে তিনদিন লাগবে। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যার সময়ই তিনি আমাকে বলেন যে বেনিনের আমীর সাহেব জানিয়েছেন যে কোনভাবে ক্লিনিকটিকে কাস্টমস ছেড়ে দিয়েছে এবং বর্তমানে সেটি জামাতের কাছে রয়েছে।

আতাহার সাহেব আমাকে বলেন “আমরা অনেক সৌভাগ্যবান, কারণ প্রতিদিনই আমরা খিলাফতের বরকত প্রত্যক্ষ করছি। আমীর সাহেব আমাকে পরিস্কারভাবে বলেছেন যে সাপ্তাহিক বন্ধের কারণে সোমবারের আগে ক্লিনিকটির ছাড়া পাবার কোন আশাই ছিল না। কিন্তু হুজুরের প্রশ্ন করার কিছু সময়ের মধ্যেই ক্লিনিকটিকে কাস্টমস ছেড়ে দেয়। এর ফলে স্হানীয় অধিবাসীদের সেবা প্রদানে খলীফাতুল মসীহ যে ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন সেটি পূর্ণ হয়। ”

সক্রিয়ভাবে কাজ করা

হুজুর জার্মানীর ১০০ টি মসজিদ তৈরী প্রকল্পের একটি প্রদর্শনীতে যান। সেখানে হুজুর জার্মানীর সেক্রেটারী জায়েদাদ (সম্পত্তি) কাছে জানতে চান যে কোন মসজিদগুলো প্রায় তৈরী হয়ে গিয়েছে। তিনি হুজুরকে বলেন যে গত সফরের হুজুর নির্দেশ দিয়েছিলেন যে কোন মসজিদ আগে নির্মাণ করা হবে সেটি হুজুর নিজেই নির্দেশ দিবেন। কারণ মসজিদ তৈরী করতে যেয়ে জার্মান জামাত কেন্দ্র থেকে অনেক অর্থ নিয়ে নিয়েছে। তিনি বলেন যে এজন্য হুজুরকে চিঠি দেয়া হয়েছে এবং তারা জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।

হুজুর বলেন “আপনারা কি অনন্ত সময় ধরে অপেক্ষা করতে থাকবেন? আমি এসব চিঠি কেন্দ্রের ফাইনান্স অফিসে দিয়ে দেই এবং তাদেরকে নির্দেশনা দেই। আপনাদের উচিৎ তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করা। আমি চাই আপনারা নিয়মিতভাবে কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রাখবেন এবং তারা আমার নির্দেশমতো আপনাদের দিক নির্দেশনা দিবে।  ”

আমি অনেক সময় লক্ষ্য করেছি যে বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাগণ বলে থাকেন যে তারা কেন্দ্রে চিঠি দিয়েছেন এবং উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছেন। অনেক সময় তারা এটা বুঝাতে চায় যে তারা তাদের কাজ করেছে এবং যদি কোন দেরী হয়ে থাকে তাহলে সেটি কেন্দ্রের উত্তরের জন্যই হচ্ছে, যদিও তারা মৌখিকভাবে এটি বলে নি। মাঝে মাঝে এমন হয় যে হুজুর কোন জামাত থেকে রিপোর্ট চান এবং তারা কখনো দেরী করে। কিন্তু হুজুরকে আমি কখনো কোন বিষয়ে দেরী করতে দেখিনি। তিনি আমার দেখা সবচেয়ে দক্ষ মানুষ। স্হানীয় জামাতের উচিৎ কেন্দ্রের সাথে সবসময় যোগাযোগ রাখা।

জামাতের কর্মকর্তাদের প্রতি বার্তা

জলসাগাহ পরিদর্শনের পর হুজুর জলসার কর্মকর্তাদের প্রতি বক্তব্য দেন। হুজুর বলেন “স্বেচ্ছাসেবকরা এখন তাদের কাজে অনেক দক্ষ হয়ে উঠেছে। অনেকে এমন কাজও করে যার সাথে তার কর্মজীবনের কাজের কোন মিলই নেই। এটি আল্লাহর অশেষ রহমত যে তিনি জামাতকে এরকম নিবেদিত ও নিঃস্বার্থ কর্মী দান করেছেন। যারা জলসায় আগত মসীহ মাউদ(আঃ) এর অতিথিদের নিজেদের সাধ্যমত সেবা করে। ”

হুজুর জামাতের সিনিয়র কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন “আমার জামাতের তরুণ ও সাধারণ স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে কোন চিন্তা নেই। আমার সকল চিন্তা হল জামাতের সিনিয়র কর্মকর্তাদের নিয়ে। তাদেরও উচিৎ একই রকমভাবে নিঃস্বার্থ ও বিনীতভাবে একে অপরের সাথে সাহায্য করা। কোন কর্মকর্তার কখনো এমন মনে করা উচিৎ নয় যে তার কারণেই তাদের দপ্তর সফলভাবে কাজ করছে। তাদের মনে রাখতে হবে সকল সফলতাই আল্লাহর বরকতের জন্য অর্জিত হয়। তাই আমি আজকে সাধারণ কর্মীদের উদ্দেশ্য কিছু বলছি না কারণ আমি বিশ্বাস করি যে তারা নিবেদিতভাবে তাদের কাজ করে যাবে। আমার বার্তা হল সিনিয়র কর্মকর্তাদের প্রতি। আমি তাদের বলব তারা যেন ভালবাসা, সহমর্মিতা ও অন্যান্য বিভাগের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের কাজ সম্পন্ন করেন। ”

হুজুরের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জার্মানীতে কয়েকজন কর্মকর্তা আমার কাছে এসে বলছিল যে কিছু বিভাগের সিনিয়র কর্মকর্তা তাদের সাথে সহযোগিতা করছে না এবং এর ফলে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। হুজুরের বক্তব্য শুনে বোঝা গেল জামাতের সিনিয়র কর্রকর্তাদের মধ্যে যে কিছু সমস্যা রয়েছে সেটি হুজুর লক্ষ্য করেছেন। তাই হুজুর সকলকে নিঃস্বার্থ ও বিনীতভাবে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে বলেছেন।

 

 

আল্লাহর রাস্তায় কোরবানী

জলসায় কর্মরত কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্যের পর হুজুর দোয়া করেন। এরপর মাগরিব ও এশার নামায আদায় করান। হুজুর যখন তার বাসায় যাচ্ছিলেন তখন তিনি জলসা অফিসারকে জিজ্ঞেস করেন যে জলসার জন্য কোন ভেড়া সদকা দেয়া হয়েছে কিনা?

জলসা অফিসার ইলিয়াস সাহেব বলেন “হুজুর, আমরা ৭টি ভেড়া সদকার জন্য প্রস্তুত করেছি যেটি গরীবদের মাঝে বিতরণ করে দেয়া হবে।”

হুজুর বলেন “পুরো জলসার জন্য মাত্র সাতটি ভেড়া কোরবানী করা যথেষ্ট নয়। বরং জলসার তিনদিনের প্রতিদিন সাতটি করে কোরবানী দিন। এগুলো কাদিয়ান, রাবওয়া ও আফ্রিকাতে হতে পারে।”

হুজুর এসময় অত্যন্ত গম্ভীর ছিলেন। তার স্বরে বোঝা যাচ্ছিল যে মানবীয় প্রচেষ্টা জামাতকে কেবল একটি স্তরে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু জলসা একমাত্র আল্লাহপাকের রহমত ও দয়ার ফলেই বরকতমন্ডিত হতে পারে।

জার্মানীতে জুমআর খুৎবা

২৫ আগস্ট ২০১৭ তারিখ জার্মানী জলসার প্রথম দিন। ঐতিহ্য অনুযায়ী হুজুর আহমদীয়াতের পতাকা উত্তোলন ও নীরব প্রার্থনার মাধ্যমে জলসা উদ্বোধন করেন। দুপুর ২ টার সময় হুজুর জুমআর খুৎবা দেবার জন্য মসজিদে আসেন।

হুজুর বলেন “বর্তমান যুগে ইউরোপে আল্লাহর উপর থেকে মানুষের বিশ্বাস উঠে গেছে এবং মানুষ নাস্তিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। দুঃখজনক হল অনেক মুসলমান মনে করে যে ইউরোপের জাগতিক উন্নতির মূল কারণ হল তারা ধর্মকে বাদ দিতে পেরেছে। কিন্তু তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তাদের মনে রাখতে হবে ধর্মকে ভুলে কখনো কোন লাভ হবে না। আল্লাহর ইচ্ছা ছিল যারা নাস্তিকতায় ডুবে গিয়েছে তাদের যুক্তিতর্ক ও সঠিক উত্তরের মাধ্যমে ভুল প্রমাণিত করা। এজন্য আল্লাহপাক আহমদীয়া মুসলিম জামাতকে সৃষ্টি করেছেন। আমরা বিশ্বে ইসলামের শান্তিপূর্ণ বাণী প্রচার করে আসছি। তাই আহমদীদের বস্তুবাদীতায় ভেসে যাওয়া ও আল্লাহপাক থেকে দূরে সরে যাওয়া উচিৎ নয়। বরং আমাদের লক্ষ্য হল আল্লাহর অস্তিত্বকে প্রমাণ করা, ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করা এবং দোয়ার কবুলিয়তের নিদর্শন দেখানো।”

প্রেস কনফারেন্স

জুমআর পর হুজুর জার্মানীর সাংবাদিকদের সাথে ৩০ মিনিটের প্রেস কনফারেন্স করেন। একজন জার্মান সাংবাদিক হুজুরকে বলেন “আমি মনে করি আহমদীগণ উদারনীতির অনুসারী/(লিবারেল), এ প্রেক্ষিতে হোমোসেক্সুয়ালিটি সম্বন্ধে আপনার মতামত কি?”

হুজুর তাকে বুঝিয়ে বলেন যে আহমদীগণ কখনো নিজেদের লিবারেল বলে দাবী করে না। আমাদের একমাত্র দাবী হল যে আমরা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার অনুসরণ করি। হুজুর আরো বলেন “আমি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এবং আমি পবিত্র কোরআনে বিশ্বাস করি। যেখানে বলা আছে হোমোসেক্সুয়ালিটি কোন ভাল বিষয় নয়। এটিও লক্ষ্যণীয় যে কেবল কোরআনই এই কথা বলে না বরং বাইবেলে হোমোসেক্সুয়ালিটির বিরুদ্ধে আরো ব্যপকভাবে বলা আছে। আমার ধর্মীয় শিক্ষা অনুযায়ী আমি এমন কিছুকে পছন্দ করতে পারি না যাকে মহান আল্লাহপাক অপছন্দ করেন। কিন্তু যদিও আমি হোমোসেক্সুয়ালিটিকে সমর্থন করি না, কিন্তু আমি এটিও চাইবনা যে তাদেরকে কোনরকম অত্যাচার ও দুর্ব্যবহার করা হোক।  ”

হুজুরকে বার্লিনে একটি মসজিদের কথা বলা হয় যেখানে নারী-পুরুষ পাশাপাশি নামায পড়তে পারে এবং হোমোসেক্সুয়ালিটির মানুষও সেখানে আমন্ত্রিত।

হুজুর বলেন “মসজিদে নারী-পুরুষ পাশাপাশি নামায পড়তে পারার যে ব্যাপার সেটি ভুল। কারণ আমরা মহানবী(সাঃ) এর রীতিই অনুসরণ করি। তার সময়ে নারী-পুরুস মাঝেমাঝে একই রুমে নামায আদায় করতেন। কিন্তু তারা আলাদা দাড়াতেন। এই সময়ে আমাদের মহিলাগণ তাদের ইবাদতের জন্য পৃথক স্হানই পছন্দ করবেন।”

“যদি কোন হোমোসেক্সুয়াল মানুষ মসজিদে এসে অন্যান্য মানুষের মতো আল্লাহর ইবাদত করতে চায়, তাহলে সে করতে পারে। এতে কোন বাধা নেই।”

একজন প্রশ্ন করেন “কোন মুসলমান যদি হোমোসেক্সুয়াল হয়ে যায় তাহলে কি তাকে মুরতাদ ঘোষণা দিতে হবে?”

হুজুর বলেন “একজন মুসলমান আর একজন মুসলমানকে মুতাদ বলতে পারে না; যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি নিজেই ধর্মত্যাগের ঘোষণা দেয়। মহানবী(সাঃ) বলেছেন যে ব্যক্তি কলেমা পড়ে তাকে কেউ নন-মুসলিম বলতে পারবে না। সকল বিষয়ে আহমদীগণ মহানবী(সাঃ) এর অনুসরণ করে থাকি। পক্ষান্তরে যারা ঘোষণা করে বেড়ায় যে তারা ইসলামকে রক্ষা করছে তারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়েছে। ”

একজন সাংবাদিক বলেন যে কিছু মুসলমান সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য দেয় না।

হুজুর বলেন “আমি কেবল আমার নিজের ও আহমদী জামাতের কথা বলতে পারি। আমরা সকল প্রকার সন্ত্রাসবাদকে ঘৃণা করি এবং এগুলো ইসলামিক শিক্ষার সম্পূর্ন বিরোধী। যেখানে শান্তিপূর্ণভাবে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করা হয় ও হামলায় নিহতদের স্মরণে সভা করা হয়, সেখানে আহমদীগণ অবশ্যই যোগ দেয়। আমাদের জন্য এটি হল সমাজের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা। আমাদের দায়িত্ব হল সকল প্রকার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা। এটিই হল সমাজের সাথে ইন্টিগ্রশনের প্রকৃত উপায়।  ”

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন “ঈসা(আঃ) ও পোপ ফ্রান্সিস সম্বন্ধে আপনার মতামত কি?”

হুজুর বলেন “আমরা বিশ্বাস করি ঈসা(আঃ) আল্লাহ প্রেরিত নবী ছিলেন। আমরা আরো বিশ্বাস করি আহমদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর মধ্যে পূর্বের যুগের ঈসা(আঃ) এর মতো একইরকমের গুণাবলী ছিল। যেমন দুজনেই শান্তিপ্রিয় ও দয়ালু ছিলেন। আমরা কিভাবে ঈসা(আঃ) সম্বন্ধে খারাপ চিন্তা করতে পারি? বরং আমরা তাকে আল্লাহর প্রকৃত নবী হিসেবে সম্মান করি এবং ভালবাসি।  ”

“পোপ ফ্রান্সিস সম্বন্ধে আমি ইসলামিক পরিভাষা ব্যবহার করে বলতে চাই, তাকে আমি ঈসা(আঃ) এর খলীফা বলে মনে করি। কারণ খৃষ্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী তিনি হলেন ঈসা(আঃ) এর উত্তরাধিকারী।”

একজন মহিলা সাংবাদিক প্রশ্ন করেন “আমি বিশ্বাস করি আহমদীগণ সমাজের সাথে ভালভাবেই ইন্টিগ্রেটেড হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজ আমি শুনলাম যে আপনি মহিলাদের সাথে হাত মেলান না? ”

হুজুর হেসে বলেন “অতীতে আমাকে অনেকবার এরকম প্রশ্ন করা হয়েছে। এটি সত্য যে আমার ধর্মের বাধ্যবাধকতার কারণে আমি মহিলাদের সাথে হাত মেলাই না। কিন্তু এটিও সত্য যে যদি কোন মহিলার কোনরকম সাহায্যের প্রয়োজন হয় তাহলে আমিই সর্বপ্রথম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিব। ”

“মানুষ হাত মেলানোর বিষয়টিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে মনে হয় এটিই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং কেবল ইসলামেই নারী-পুরষের মধ্যে একটি দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। ইহুদীদের শিক্ষাও এরকম এবং আমেরিকাতে কিছু ইহুদী ধর্মযাজকও মহিলাদের সাথে হাত মেলান না। কিন্তু আমি কখনো কাউকে এ ব্যাপারে আপত্তি করতে দেখিনি। কারণ তারা চায় না যে তাদেরকে কেউ ইহুদিবিদ্বেষী বলুক। কিন্তু আপনারা একই বিষয়ে মুসলমানদের সমালোচনা করে থাকেন।”

হুজুরের উত্তর অত্যন্ত সুন্দর ছিল। একদিকে তিনি বলেন যে প্রকৃত মুসলমান মহিলাদের কে কোন কিছু থেকে বঞ্চিত করে না এবং যখনই কোন মহিলার কোন সাহায্যের প্রয়োজন হবে, একজন প্রকৃত মুসলমান সবসময়ই তাকে সাহায্য করবে।

অন্যদিকে হুজুর সংবাদ মাধ্যমের কপটতাও তুলে ধরেন। যেখানে তারা ইসলামের কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি করে কিন্তু সেই একই বিষয় অন্য ধর্মে থাকলেও সেগুলো নিয়ে কোন কথাই বলে না।

আল্লাহর রহমতে হুজুর অত্যন্ত সুন্দরভাবে ইসলামের শিক্ষাকে প্রচার করেছেন। কয়েকজন সাংবাদিক ইসলামকে দূর্নাম করার চেষ্টা করেছিল এবং তারা চেয়েছিল হুজুর যেন তার মতামত পরিবর্তন করেন। কিন্তু হুজুর অত্যন্ত শান্ত ছিলেন এবং তিনি ইসলামের শিক্ষা থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি।

লাজনাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য

২৬ আগস্ট ২০১৭ তারিখে হুজুর জলসাতে দুইটি বক্তব্য রাখেন। দুপুরে হুজুর লাজনাদের জলসাগাহে তাদের জন্য এবং বিকেলে প্রধান জলসাগাহে নন-মুসলিম ও নন-আহমদী অতিথিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন।

লাজনাদের বক্তব্যে হুজুর বলেন যে নন মুসলমানগণ ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে যে ইসলামে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় এবং তাদের জোরপূর্বক সবসময় ঘরে আটকে রাখা হয়। হুজুর অত্যন্ত সুন্দরভাবে মিথ্যা অপবাদ খন্ডন করেন এবং ইসলামে নারীদের প্রকৃত মর্যাদা তুলে ধরেন। যেমন বলা হয় ইসলামে জোর করে বিবাহ দেয়া হয়। কিন্তু মহানবী(সাঃ) বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেছেন।

হুজুর বলেন “বিবাহের সময় কন্যার বাবা তার পক্ষে সম্মতি প্রদান করে থাকে। কিন্তু এটি করার জন্য অবশ্যই দেখতে হবে যে তার কন্যা যেন বিয়েতে সম্মতি প্রদান করে। যদি কোন বাবা-মা তার মেয়ের সম্মতি ব্যতিত বিয়ে দেয় তাহলে এটি অনেক বড় অবিচার। এটি সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী কাজ। ”

অত্যন্ত আবেগের সাথে হুজুর বলেন “সে সময় মেয়েদের এতটাই অসম্মানের চোখে দেখা হত যে মানুষ তাদের কন্যাকে মেরে ফেলত; সে যুগে মহানবী(সাঃ) শিক্ষা দিয়েছেন যে মেয়েরা তাদের পরিবারের জন্য গর্বের কারণ এবং তাদের সকল অধিকার অবশ্যই পূরণ করতে হবে।   ”

এরপর হুজুর সন্তানদের প্রতি পিতামাতার কর্তব্যের কথা বলেন। তাদের দায়িত্ব হলো সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা। হুজুর বলেন যে কিছু আহমদী বাবা-মা তাদের সন্তানদের অনেকক্ষন ভিডিও গেমস খেলতে দেয় অথবা ঘন্টার পর ঘন্টা টিভির সামনে বসিয়ে রাখে। এর ফলে পরিবারে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

বক্তব্যের শেষ দিকে হুজুর পর্দার গুরুত্ব সম্বন্ধে বলেন। হুজুর বলেন “সাধারনভাবে মহিলাদের মাঝে পর্দার মান কমে গিয়েছে কিন্তু জার্মান আহমদী মহিলাদের পর্দার মান অত্যন্ত উন্নত। এটি এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে আমাকে জার্মান মহিলাদের বলতে হচ্ছে তারা যেন জন্মগত আহমদী মহিলাদের পর্দার গুরুত্ব সম্বন্ধে বোঝায়। ”

অতিথিদের প্রতি হুজুরের বক্তব্য

বিকেল ৪ টার সময় হুজুর জলসায় আগত অতিথিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন।

হুজুর বলেন “ইসলাম বলে যে মানুষের জন্ম যেখানেই হোক না কেন, তাদের গায়ের রং যাই হোক না কেন সকল মানুষই সমান। মহানবী(সাঃ) এর এই ঘোষণা যে সকল মানুষই জনন্মগতভাবে সমান; পরবর্তীতে সার্বজনীন মানবাধিকারের পথ সুগম করে।  ”

হুজুর তার বক্তব্যে সকল প্রকার সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করেন।

হুজুর বলেন “সন্ত্রাসী কিছু মুসলিম দল ও কিছু নামধারী মোল্লাগণ হতাশাগ্রস্হ মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর পরিবর্তে তাদেরকে ভুল পথে পরিচালিত করে সন্ত্রাসবাদের দিকে নিয়ে যায়। একইরকমভাবে আমরা দেখেছি যে কিছু মুসলমান সরকার তাদের জনগণকে শোষণ করে ও তাদের প্রতি অত্যাচার করে। এর ফলে বিভিন্ন শ্রেণী তৈরী হয় এবং পরিণামে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ বেঁধে যায়।”

মুসলমান দেশে পশ্চিমা দেশগুলোর অস্ত্র বিক্রির সমালোচনা করে হুজুর বলেন “পশ্চিমা বিশ্ব ও অস্ত্র ব্যবসায়ীগণ তাদের লাভের জন্য মুসলিম বিশ্বে সংঘাত সৃষ্টি করে রাখে। এ ধরণের স্বার্থপর নীতি খুবই দুঃখজনক। এর ফলে বিশ্বের শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে। ”

“গত ৭০ বছর ধরে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের নীতিই চলে আসছে। যেখানে একটি দেশ শান্তির জন্য অন্য দেশের চেয়ে আরো শক্তিশালী মরণাস্ত্র তৈরী করছে। তারা যাই দাবী করুক না কেন; এ ধরণের পদক্ষেপ কখনো শান্তি স্হাপন করতে পারে না। একদিন এরকম হতে পারে যে এক পক্ষ একটি বাটন চাপ দিবে এবং পরিণামে পুরো বিশ্ব এমন হত্যাকান্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখবে যা পূর্বে কখনো হয়নি। ”

হুজুর বলেন যে মানবজাতি যদি তাদের সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারে তাহলেই আজকের যুগের এই সমস্যার সমাধান হবে। হুজুর বলেন “আমরা আহমদীগণ মনে করি না যে এভাবে অস্ত্র তৈরীর প্রতিযোগিতা করে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বরং আমরা বিশ্বাস করি যে প্রকৃত শান্তি স্হাপনের রাস্তা হল আল্লাহর নির্দেশিত রাস্তা। মানবজাতির তার সৃষ্টিকর্তাকে চেনার সময় এসে গেছে। মানবজাতিকে সেই সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে হবে যিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক।  ”

হুজুরের বক্তব্যের প্রভাব

আলহামদুলিল্লাহ, অতিথিদের উপর হুজুরের বক্তব্যের গভীর প্রভাব পড়ে। আমি কিছু অতিথিদের সাথে কথা বলি যারা সকলেই হুজুরের বক্তব্যের প্রশংসা করে এবং বলে যে হুজুরের এই বার্তা আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিৎ।

আমি স্পেনের একজন প্রফেসর জেসাস সাহেবের সাথে কথা বলি। তিনি বলেন “এটি একটি অসাধারণ বক্তব্য ছিল। খলীফার প্রতিটি বাক্যেই গভীর অর্থ ছিল। তার বক্তব্য রাজনীতিবিদদের থেকে পুরোই আলাদা কারণ তারা কেবল তাদের শ্রোতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য অর্থহীন বক্তব্য দিয়ে থাকেন। অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে খলীফার বলেছেন যে পৃথিবী যেভাবে চলছে তাতে ভয়াবহ যুদ্ধ হবার আশংকা রয়েছে। কিন্তু তিনি কেবল আমাদের সতর্কই করেন নি বরং কোরআনের আলোকে তার সমাধানও দিয়েছেন। আমি তার সততা ও শান্তি স্হাপনের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। ”

গোমের আর্টেম নামক একজন অতিথি বলেন “আজকে খলীফা আমাকে বুঝিয়েছে যে ইসলাম একটি শান্তিপূর্ণ ধর্ম। তিনি ঠিক কথাই বলেছেন; যে একজন খৃষ্টান যদি কোন খারাপ কাজ করে আমরা খৃ্ষ্টান ধর্মকে দোষারোপ করি না; তাহলে এটি কিভাবে ন্যয়বিচার হতে পারে যে কোন মুসলমান কোন খারাপ কাজ করলে আমরা ইসলামকেই দোষারোপ করব? ইসলামের কয়েকটি কথা আমার খুব ভাল লেগেছে। যেমন ইসলাম বলে আল্লাহ সকল মানুষেরই আল্লাহ, সকল মানুষই জন্মগতভাবে সমান, এক জাতির উপর অন্য জাতির কোন প্রাধান্য নেই এবং ইসলাম সকল প্রকার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে।  ”

মিসেস নাটিয়া নামে একজন মহিলা অতিথি বলেন “খলীফা এমন একজন মানুষ যিনি অন্যদেরকে আকর্ষণ করেন, তিনি অনেক জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান। তিনি খুবই দয়ালু এবং তিনি প্রমাণ করেছেন যে এটি তার ধর্মেরই শিক্ষা। তিনি তার বক্তব্যে ইসলামের সত্যতা ও বিশ্ব রাজনীতির প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরেছেন। আমি তার বক্তব্যে কোন ভুল খুঁজে পাইনি। তার প্রতিটি কথাই আমার কাছে সত্য মনে হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে অনেক বর্ণবাদ ও পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। তাই খলীফার কাছ থেকে এই বার্তা শোনা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ব্যাপার যেখানে মহানবী(সাঃ) বলেছেন যে একজন সাদা ব্যক্তি কালো ব্যক্তির থেকে উত্তম নয়।  ”

অতিথি মিসেস টাকার বলেন “আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে কিছু মানুষ এই শান্তির বার্তা শুনতে চায় না. কিন্তু কেন চায় না তা আমি বুঝতে পারছি না। তারা এটি ভাবতেই পছন্দ করে যে ইসলাম একটি সন্ত্রাসী ধর্ম। তাদেরকে এর বিপক্ষে কোন প্রমাণ দেয়া হলেও তারা তা মানতে রাজী নয়। অন্যদিকে অনেক ভাল মানুষও রয়েছে যারা প্রকৃত ঘটনা জানতে চায়। আমি আশা করব তারা খলীফার বক্তব্য শুনবে যেখানে তিনি কোরআনের আয়াত দিয়ে খুব সুন্দরভাবে ইসলামকে ব্যাখ্যা করেছেন। ”

অতিথি মিঃ জোনাস বলেন “খলীফার প্রতিটি কথারই গভীর অর্থ ও উদ্দেশ্য রয়েছে। আমার ভাল লেগেছে যে খলীফা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের কথা বলেছেন এবং আমাদের বলেছেন আমরা যেন একই ভুল না করি। বিশ্বে মরনাস্ত্র তৈরীর যে প্রতিযোগিতা চলছে সে ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক করেন। তিনি আরও বলেছেন যে মানুষ যখন মহানবী(সাঃ) কে গালি দেয় তখন আহমদীদের অনেক কষ্ট হয়। কিন্তু আহমদীগণ কখনো এর জন্য সহিংস আচরণ করবে না বা তাদের নবীকে গালী দিবে না। আমি তার ব্যক্তিত্ব ও বাকশৈলী দেখে অত্যন্ত আভিভূত। ”

সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার

অতিথিদের উদ্দেশ্য বক্তব্য দেবার পর হুজুর জার্মান সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার দেন। একজন সাংবাদিক হুজুরকে জিজ্ঞেস করেন “চরমপন্থী মুসলমানা সবসময়ই জামাতের উপর অত্যাচার করে আসছেন। এজন্য আপনি কখনো আপনার জীবন নিয়ে ভীত হয়েছিলেন কি? ”

হুজুর বলেন “যদিও আমার প্রাণের ঝুঁকি রয়েছে কিন্তু আমি এটি নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করতে পারি না। তাহলে আমি আহমদীয়া মুসলিম জামাতের খলীফা হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করতে পারব না। আমি যখন পাকিস্তানে ছিলাম তখন এই ঝুঁকি আরো বেশি ছিল। কারণ সেখানকার আইন অত্যাচার-কারীদের পক্ষে ছিল। এখানে আইন সকলের জন্যই সমান।”

হুজুরকে সন্ত্রাসী দল দায়েশের খিলাফতের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়। হুজুর বলেন “এই নামসর্বস্ব খিলাফত গত কয়েক বছরে কি অর্জন করেছে। কোন ভাল কাজ করেনি। সে কেবল ধ্বংস ও হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এখন বলা হচ্ছে যে সে হয়ত মারা গিয়েছে আর জীবিত থাকলেও পালিয়ে আছে। কিন্তু ইসলামে একজন প্রকৃত খলীফা কখনো বিশ্বে থেকে লুকিয়ে থাকবে না। ”

“কয়েক বছর আগে একজন সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল যে আমি কি দায়েশের খিলাফত নিয়ে চিন্তিত কিনা? যে তাদের খিলাফত হয়ত অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে। আমি তাকে বলেছিলাম যে এই নামসর্বস্ব খিলাফত নিজেই একসময় মৃত্যুবরণ করবে। এখন এটিই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। ”

একজন হুজুরকে জিজ্ঞেস করেন “আপনি কি আল্লাহর উপর বিশ্বাস করেন?”

হুজুর বলেন “অবশ্যই। আমি এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস করি যিনি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমার দোয়া শুনেন ও কবুল করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন সময়ে তার অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছি। আমার দোয়ার মাধ্যমে আমি আমার খোদাকে দেখেছি ও চিনেছি। তিনিই একমাত্র আল্লাহ যিনি সকল দেশের মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য নবীদের প্রেরণ করেছেন। ”

আলজেরিয়ান অধ্যাপকের সাথে সাক্ষাৎ

সন্ধ্যার সময় হুজুর কয়েকটি মিটিং করেন। এর মধ্যে এক মিটিংএ হুজুর আলজেরিয়ার একজন অধ্যাপকের সাথে সাক্ষাৎ করেন। আলজেরিয়াতে গত কয়েক বছর ধরে আহমদীয়া জামাতকে অনেক অত্যাচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আহমদীদের মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। সরকারী কর্মকর্তা ও সংবাদ মাধ্যম জামাতের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালিয়ে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করেছে। তারা এরকম প্রচারণাও চালিয়েছে যে নাউজুবিল্লাহ, আলজেরিয়ার আহমদীগণ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত।

হুজুর তার কিছু খুৎবাতেও বলেছেন যে এ ধরণে মিথ্যা প্রপাগান্ডা জামাতের অগ্রগতিকে রোধ করতে পারবে না, বরং আহমদীয়াতের বাণী সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। আহমদীগণ এরকম বিপদের সময় অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে, তাদের ঈমান আরো দৃঢ় হয়েছে। আলজেরিয়ার সরকার জামাতকে দুর্বল করতে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল পরিশেষে তাদের এসব কর্মকান্ডের ফলে জামাত আরো শক্তিশালী হয়েছে।

আলজেরিয়ার অতিথি বলেন “আমার সরকার আহমদীদের সাথে যেরকম আচরণ করেছে এজন্য আমি ক্রুদ্ধ। আমি তাদের ন্যয়বিচার করতে বলছি। আহমদীদের সাথে যেরকম অত্যাচার করা হয়েছে সেজন্য আমি ব্যথিত। কিন্তু আমি এটিও দেখেছি যে এই কঠিন সময়ের ফলে আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাণী পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ”

হুজুর তাকে বলেন “পাকিস্তান ও কয়েকটি আরব দেশে আমরা এরকম অত্যাচারের সাথে পরিচিত। কিন্তু একই সাথে আমরা এটিও চাই যে সকল মুসলমান ভাই ভাই হয়ে একত্রে কাজ করুক। কারণ আমরা সকলেই একই কলেমা পাঠ করি। যদি মুসলমানগণ এর অর্থ বুঝতে পারে তাহলে বিভিন্ন দলে দলে যে দ্বন্ধ রয়েছে সেটি দূর হয়ে যাবে। এর ফলে মুসলমানগণ আরো শক্তিশালী হবে। বর্তমান মুসলিম বিশ্বে একদিকে আছে ইরান ও অন্যদিকে সৌদি আরব। সুন্নী দেশগুলো কাতারের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে, তারা আবার ইয়েমেনেও আক্রমণ করছে। মুসলমানগণ একে অন্যকে আক্রমণ করে উম্মতকে আরো বিভক্ত করে দিচ্ছে।  ”

“একজন নিরপেক্ষ মুসলমান অধ্যাপক হিসেবে আপনার উচিৎ আপনাদের নেতাকে বলা যেন তারা একে অন্যকে কাফের ঘোষণা করা বন্ধ করে। তাদের মনে রাখা উচিৎ মহানবী(সাঃ) বলেছেন যে ব্যক্তি কলেমা পাঠ করবে সেই মুসলমান।  ”

“আলজেরিয়ার আহমদীগণ অত্যন্ত আনন্দিত, কারণ তাদের উপর অত্যাচারের ফলে আহমদীয়াতের বাণী সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি নিশ্চিত সরকার খুবই দুঃখিত হবে যখন তারা দেখবে যে তারা যেই ধর্মকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করছিল মানুষ সেই ধর্মেই যোগদান করছে। ”

অতিথি হুজুরকে বলেন যে আলজেরিয়া আহমদীদের কাছে ঋণী; কারণ হযরত জাফরুল্লাহ খান সাহেব আলজেরিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছিলেন। তিনি হুজুরের কাছে তার তিন বছরের ছেলের জন্য দোয়া চান যে এখনো কথা বলতে পারে না।

হুজুর তার ছেলের বিস্তারিত খবর জানতে চান। হুজুর তার জন্য দোয়া করেন ও বলেন যে তাকে যেন স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট দেখানো হয়।

অতিথি হুজুরকে ধন্যবাদ দেন ও আলজেরিয়া আসার আমন্ত্রণ জানান।

হুজুর বলেন “যদি আলজেরিয়ার অন্যান্য মানুষ আপনার মতো হয় তাহলে আমি সেখানে আসতে পারি। আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমার কোথাও যাবার জন্য বিশেষ নিমন্ত্রণের প্রয়োজন নেই। আমি আশা করি একদিন আমি আলজেরিয়া যেতে পারব। ”

অতিথি হুজুরকে এক বক্স খেজুর উপহার দেন। তিনি বলেন আলজেরিয়ার সংস্কৃতিতে মানুষ যাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে তাকে খেজুর উপহার দেয়। এরপর তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। হুজুর তার সাথে মোলাকাত করেন। আলজেরিয়ার বর্তমান পরিস্হিতির প্রেক্ষিতে বলা যায় এটি একটি অভাবনীয় দৃশ্য।

পুনরায় সাক্ষাৎ

আমি যখন এই ডায়েরী লিখছি তখন ডিসেম্বর ২০১৭। কিছুদিন পূর্বেই আলজেরিয়ার সেই অধ্যাপক লন্ডনে এসে মসজিদ ফযলে হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি হুজুরকে জানান যে তার ছেলে, যে পূর্বে ঠিকভাবে কথা বলতে পারত না বর্তমানে ভালভাবেই কথা বলে। তিনি এবং তার স্ত্রী তাদের ছেলের জন্য হুজুরের দোয়ার ফলে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।

হুজুর এই সুসংবাদ শুনে বলেন “আলহামদুলিল্লাহ, আমি দোয়া করি আল্লাহপাক তাকে সুস্বাস্হ্য ও দীর্ঘ জীবন দান করুন, ইনশাল্লাহ।”

আলজেরিয়ান অতিথি বলেন “আপনার সাথে জার্মানীতে সাক্ষাৎ করার পর আমি মানুষকে ইসলাম আহমদীয়াতের সত্যতা বোঝানোর চেষ্টা করি। আমি তাদেরকে বলি যে আপনারা শান্তিপ্রিয় ও অনুগত নাগরিক। আমি দুঃখিত যে পূর্বে আমি আপনাদের জামাত সম্বন্ধে জানতাম না; তাহলে আমি আরো আগে থেকেই আপনাদের সাহায্য করতাম। ”

হুজুর বলেন “সেটি কোন সমস্যা নয়, এখন তো আপনি আমাদের সম্বন্ধে জানতে পেরেছেন। আমরা আপনার প্রচেষ্টাকে ধন্যবাদ জানাই।”

আলজেরিয়ান অতিথি হুজুরকে জিজ্ঞেস করেন হুজুর কি অরগানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন(OIC) (৫৭ টি মুসলিম দেশের সংগঠন) এর উদ্দেশ্যে কোন বক্তব্য দিবেন কিনা?

হুজুর বলেন “আহমদীয়া মুসলিম জামাতের প্রধাণ হিসেবে তারা কখনো আমাকে আমন্ত্রন জানাবে না। হয়ত তারা ব্যক্তি হিসেবে আমাকে ‘মির্যা মাশরুর আহমদ’ কে আমন্ত্রন জানাতে পারে। কিন্তু আমি সেটি গ্রহণ করতে পারব না। যদি তারা কখনো আহমদীয়া মুসলিম জামাতের খলীফা হিসেবে আমাকে আমন্ত্রন জানানোর সাহসিকতা দেখায় তাহলে আমি চিন্তা করতে পারি। ”

লিথুয়ানিয়া প্রতিনিধি

হুজুর লিথুয়ানিয়া থেকে জলসায় আগত প্রায় ১২ জন অতিথিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। একজন তরুণ অতিথি হুজুরকে বলেন “আমি জলসায় আগত আহমদীদের সাথে সাক্ষাৎ করে অনেক প্রভাবিত হয়েছি। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন দেশে যেসব সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে তার কারণে আমার মনে এখনো কিছুটা ইসলামভীতি রয়েছে। ”

হুজুর তাকে বলেন “আপনার উচিৎ কয়েকজন পথভ্রষ্ট মানুষের কর্মকান্ডের দিকে লক্ষ্যা না করে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা কি সেটা জানা। আপনি আমার অতিথি হিসেবে এক মাস লন্ডনে আসুন। আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে আপনার ইসলামের ব্যাপারে যে ভীতি রয়েছে তা সম্পূর্ণ দূর হয়ে যাবে।  ”

একজন নবাগত আহমদী টমাস বলেন “আমি ২০১৩ সালে নরওয়েতে কাজ করার সময় আহমদীয়াত সম্বন্ধে জানতে পারি। আমি অনেক বই পড়ে মসীহ মাউদ(আঃ) এর সত্যতা বুঝতে পারি।  ”

“আমি পূর্বে বিশ্বাস করতাম যে কোন ব্যক্তি যদি কোন ভুল করে তাহলে তাকে কোনভাবেই ক্ষমা করা যায় না। কিন্তু আহমদীয়াতের শিক্ষা বলে যে আল্লাহপাক পরম করুণাময় ও অসীম দয়াময়। আমার আপনাদের ধর্ম খুবই পছন্দ হয়েছে এবং আমি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। ”

হুজুর বলেন “আমাদের ধর্ম হল ইসলাম। তাই বলা উচিৎ ইসলাম ধর্ম আপনার পছন্দ হয়েছে।  ”

একজন বয়স্ক অতিথি বলেন “আমি আপনাকে শান্তি ও ভালবাসার দূত বলে মনে করি। আমি চাই আপনার বাণী আরো বেশী মানুষের কাছে পৌঁছে যাক। ”

“ব্যক্তিগতভাবে আমি মাঝেমাঝে চিন্তা করি যে আমি আমার নিজের দোষত্রুটির প্রতি লক্ষ্য করি না। এ ব্যাপারে আপনার উপদেশ কি?”

হুজুর বলেন “আমি আপনাকে সেই উপদেশই দিতে পারি যা মহানবী(সাঃ) দিয়েছেন। তিনি বলেছেন প্রকৃত সংশোধনের জন্য আমাদের মনে রাখতে হবে যে আল্লাহপাক সবসময় আমাদের দেখছেন। মনে রাখবেন আপনি অন্যদের কাছ থেকে কিছু লুকিয়ে রাখতে পারবেন; আমি নিজেকেও প্রবোধ দিতে পারবেন যে আপনি কোন ভুল কাজ করছেন না; কিন্তু আল্লাহর কাছ থেকে কোন কিছুই গোপন রাখতে পারবেন না। তাই প্রকৃত সংশোধন ও উন্নতির জন্য আল্লাহর উপর বিশ্বাস থাকা আবশ্যকীয়। ”

একজন শিল্পী হুজুরকে তার হাতে আঁকা ছবি (হুজুরের প্রতিকৃতি) উপহার দেন।

হুজুর তাকে বলেন যে হুজুর মানুষের ছবি আঁকা পছন্দ করেন না। হুজুর মোবাল্লেগ সাহেবকে নির্দেশ দেন তিনি যেন অতিথিকে ভালভাবে ছবির বিষয়ে ইসলামের শিক্ষা কি তা বুঝিয়ে দেন এবং হুজুরকে ভালবেসে তিনি যে উপহার এনেছেন এজন্য তার প্রশংসা করেন।

এ ঘটনা হুজুরের সবসময় ইসলামের নীতি অনুসরণের একটি দৃষ্টান্ত। হুজুর অতিথিকে পরিস্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ইসলামে মানুষের এরকম ছবি আকাঙ্খিত নয়। একই সাথে তার মনে যেন আঘাত না লাগে সেদিকেও তিনি লক্ষ্য রেখেছেন।

 

আরব প্রতিনিধি

এরপর হুজুর একটি বড় হলরুমে প্রায় ৩০০ জন আরব প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন নন আহমদী। একজন হুজুরকে জিজ্ঞেস করেন “আহমদী মহিলারা কি নন আহমদী পুরুষদের বিয়ে করতে পারবে?”

হুজুর বলেন “মাঝেমাঝে নিতান্ত প্রয়োজনে এই অনুমতি দেয়া হয়, কিন্তু যেই ইমাম বিয়ে পড়াবে তাকে অবশ্যই আহমদী হতে হবে। কিন্তু সাধারণত বর-কনে দুজনেই যদি আহমদী হয় তাহলেই উত্ত্ম। তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আহমদীয়াতের শিক্ষা ভালভাবে গ্রহণ করতে পারবে এবং ঘরে শান্তি বজায় থাকবে। ”

“আমাদের জামাতের একতার জন্য এটি চেষ্টা করা প্রয়োজন যেন দুই পক্ষই আহমদী হয়। প্রতিশ্রুত মসীহ(আঃ) এর নির্দেশকে আমাদের প্রাধান্য দিতে হবে কারণ আমরা আমাদের মালিক মহানবী(সাঃ) এর নির্দেশ মতোই তাকে মেনেছি। ”

একজন জানতে চান আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য দোয়া ছাড়া আর কোন উপায় আছে কিনা?

হুজুর বলেন “দোয়াই হল সেই পন্থা যেটি আল্লাহপাক শিখিয়েছেন এবং আমিও এই রাস্তাই অনুসরণ করি। আমি সেইরকম মুসলিম নেতা নই যারা দাবী করে তাদের সাথে আল্লাহর সরাসরি পৌছানোর রাস্তা রয়েছে! আমার রাস্তা হল আমার মালিক মহানবী হযরত মোহাম্মদ(সাঃ) এর রাস্তা। ”

ভুল সময়ে নারা

নামাযের পর হুজুর যখন জলসাগাহ থেকে বের হন তখন আহমদীগণ হুজুরের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ান, হুজুরও উত্তরে তাদের প্রতি হাত নাড়ান। কিছু আহমদী তখন উৎসাহী হয়ে নারা দেয়া শুরু করে। হুজুর সাথেসাথেই তাদের থামতে ইশারা করেন।

আমি চিন্তা করলাম জলসার সময় এভাবেই নারা দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু হুজুর বুঝিয়ে দিলেন যে নামাযের সময় এভাবে নারা দেয়া উচিৎ নয়। নামাযের সময় জলসাগাহ মসজিদে রূপ নেয়। তাই মসজিদের আদব বজায় রাখার জন্য সেসময় নীরবতা পালন করা উচিৎ। এছাড়া কিছু মানুষ তখন বিতর নামায পড়ছিল তাই তাদেরও অসুবিধা হবে।

প্রতিটি মুহুর্ত হুজুর আমাদের কোন কাজটি ভুল ও কোনটি সঠিক সে ব্যাপারে তরবিয়ত প্রদান করেন।

একটি অনন্য কর্তব্য

নামাযের পর আমি হোটেলে আমার রুমে যাই। একজন খোদ্দাম সাঈদ আখতার মাকসুদ আমাকে হোটেলে পৌছে দেয়। সে আমাকে বলে যে সে চার বছর জার্মান আর্মীতে কাজ করেছে এবং জাতিসংঘের শান্তিমিশনে কসোভো তে কর্মরত ছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল সে দীর্ঘ সময় আর্মীতে কাজ করবে। কিন্তু তার মা তার জন্য সবসময় দুশ্চিন্তাগ্রস্হ থাকতেন। তাই তিনি অবসর গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনি জলসায় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আমি তাকে তার মিলিটারী কর্তব্য ও জলসার নিরাপত্তার মধ্যে তুলনা করতে বলি।

তিনি বলেন “সাধারণ মানুষের জন্য কসোভোর মতো যুদ্ধ প্রবণ এলাকায় কাজ করা অনেক কঠিন। কিন্তু খলীফাতুল মসীহর নিরাপত্তা কর্মীর দায়িত্ব পালন করা সম্পূর্ণ নতুন রকম একটি অভিজ্ঞতা। কসোভোতে আমি আমার দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করেছি। কিন্তু হুজুরের জন্য কাজ করার অনুভূতি একদমই আলাদা। আমি যখনই হুজুরকে হেঁটে যেতে দেখি আমার ভিতরে একপ্রকার ভালবাসা সৃষ্টি হয়। হুজুরের প্রতি সেই গভীর ভালবাসার জন্যই এই কাজ আরো কঠিন মনে হয়। আমি এটিও বুঝি যে আল্লাহপাকই খলীফাতুল মসীহর প্রকৃত রক্ষাকারী। কিন্তু তারপরও আমি ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্বের চাপ অনুভব করি। তাই এই কাজ করা সম্পূর্ণ আলাদা এবং অত্যন্ত সম্মানের, যার কোন তুলনা নেই।  ”

আবেগপ্রবণ মহিলা

২৭ আগস্ট ২০১৭ তারিখ জার্মানী জলসার শেষ দিন। এ দিন জার্মানী জামাতের একজন মোবাল্লেগ আমার কাছে এসে বললেন একজন বয়স্ক মহিলা আমার সাথে দেখা করতে চাচ্ছেন। তাই আমি তার সাথে যাই।

সেই মহিলা আমাকে বলেন যে তার স্বামী অল্প বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন এবং তার মেয়েরা এখনো বিয়েই করেনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই যেকোন মায়ের মতো তিনিও তার মেয়েদের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্হ। যে তার মেয়েরা কখনো বিয়ে করে তাদের নিজেদের পরিবার তৈরী করতে পারবে কিনা।

তিনি আমার সাথে দেখা করতে চাইবার কারণ সম্বন্ধে বলেন “মাঝেমাঝে আমরা বাসায় হুজুরকে নিয়ে আপনার লেখা ডায়েরী পড়ি। তাই আমরা জানি আপনি হুজুরের সাথে দেখা করতে পারেন ও তার সাথে কিছু সময় থাকতে পারেন। তাই এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয় হবে যদি আপনি হুজুরের কাছে আমার মেয়েদের জন্য দোয়া করার অনুরোধ করেন। ”

“হুজুরকে বলবেন যে আমরা কোন অর্থ-সম্পদ চাই না। আমাদের একমাত্র শর্ত হল মেয়েদের বর যেন ধার্মিক হয়, জামাতের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক থাকে এবং সবসময় খিলাফতের আনুগত্য করে। আমাদের কেবল এই একটিই চাওয়া রয়েছে। ”

বয়স্ক মহিলা তার কথা বলার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। আমি তাকে ওয়াদা করি যে আমি হুজুরকে তার দোয়ার আবেদন পৌঁছে দিব।

জলসা সালানা জার্মানীর সমাপ্তি অধিবেশন

২৭ আগস্ট ২০১৭ তারিখ বিকেলে জলসার সমাপ্তি অধিবেশন শুরু হয়। সকল আহমদী খিলাফতের হাতে বয়াত নেয়। এরপর ৪.৫৫ মিনিটে হুজুর সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন। যেসব মানুষ ইসলামকে সন্ত্রাসী ধর্ম বলে হুজুর তার বক্তব্যে এসব অপবাদ যুক্তির মাধ্যমে ভুল প্রমাণ করেন।

হুজুর অত্যন্ত আবেগের সাথে মহানবী(সাঃ) এর সময় মুসলমানগণ যেরকম অবর্ণনীয় অত্যাচারের সম্মুক্ষীণ হয়েছিল সেটি ব্যাখা করেন; তারা অনেক বছর ধরে ধৈর্য্যের সাথে এমন অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করে। যেমন কোন মুসলমান মহিলার দুই পা দুই উটের সাথে বাধা হতো এবং উটকে দুই দিকে দৌড়ানো হত, এতে সেই মহিলার শরীর দ্বিখন্ডিত হয়ে যেত। কিছু মুসলমানকে অমানুষিক ভাবে পেটানো হত, তাদের মরুভূমির গরম বালুতে শুইয়ে রেখে ভারী পাথর চাপিয়ে দেয়া হতো।

হুজুর বলেন “ইসলামের প্রাথমিক যুগে যেসব মুসলমানদের অমানুষিক অত্যাচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের ঈমান কখনো দুর্বল হয়নি, কারণ তাদেরকে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে যেসব সন্ত্রাসী ও জালিম শাসক রয়েছে যারা জঘন্য কর্মকান্ড করছে তারা কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না, বরং জাহান্নামই হল তাদের একমাত্র স্হান। ”

“পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারা’র ১৯৪ আয়াতে আল্লাহপাক পরিস্কার ভাবে বলে দিয়েছেন ইসলামকে ধ্বংসের জন্য শত্রুপক্ষ যখন আক্রমন করে কেবল তখনই নিজেদের রক্ষার জন্য তাদের যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অন্যের সম্পত্তি বা জায়গা দখলের জন্য যুদ্ধ করার অনুমতি ইসলামে নেই।  ”

মহানবী(সাঃ) এর মক্কা বিজয়ের ব্যাপারে হুজুর বলেন “মক্কার কুরাইশগণ মুসলমানদের উপর অনেক বছর ধরে অমানুষিক নির্যাতন করেছে। তাই মক্কা বিজয়ের পর মহানবী(সাঃ) তাদের যেকোনরকম কঠোর শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু মহানবী(সাঃ) যিনি সকল মানজাতির জন্য রহমতস্বরূপ এবং শান্তির যুবরাজ ছিলেন তিনি সকলকে ক্ষমা করে দিলেন। তিনি বলেন যারা শান্তিতে বাস করতে চায় এবং তাদের নিজেদের ধর্ম পালন করতে চায় তারা নিশ্চিন্তে সেটি করতে পারে। ”

বক্তব্যের শেষে হুজুর দোয়া করান এবং ঘোষণা দেন যে আল্লাহর রহমতে এবারের জলসায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেছে। হুজুর বলেন “জার্মানী জলসায় ইউকে থেকে প্রায় ২৭৫০ জন আহমদী এসেছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় জার্মানী থেকে ইউকে জলসায় এর চাইতে বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল।  ”

জার্মান জামাতের মানুষ হুজুরের এই কথা শুনে আনন্দিত হয়।

নতুন আহমদীদের সাথে সাক্ষাৎ

জলসার পর হুজুর কিছু নতুন আহমদীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। একজন আরব মহিলা হুজুরকে বলেন “হুজুর আমার জন্য দোয়া করবেন; আমি অনেক ভীত কারণ আমার মনে হচ্ছে আল্লাহপাক আমার উপর রাগান্বিত। ”

হুজুর অত্যন্ত ভালবাসার সাথে বলেন “কোন চিন্তা করবেন না; আল্লাহ আপনার সাথে আছেন। আল্লাহর কাছে নিয়মিত দোয়া করতে থাকুন। মাঝেমধ্যে আমাদের অনেক পরীক্ষা ও বিপদের মধ্য দিয়ে যেতে হয়; কিন্তু যারা ধৈর্য্য ধারণ করে আল্লাহপাক তাদের পুরস্কৃত করেন। আমি লাজনাদের উদ্দেশ্যে যেই বক্তব্য দিয়েছি সেটি শুনুন ও অনুসরণ করার চেষ্টা করুন। ইনশাল্লাহ, আল্লাহপাক আপনার উপর সন্তুষ্ট হবেন।  ”

সিরিয়া থেকে আগত একজন নতুন আহমদী হুজুরের সাথে কথা বলার সময় অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন যে সিরিয়ার যুদ্ধে তার পরিবারের চার সদস্য মৃত্যুবরণ করেছে এবং তার মা বর্তমানে শরণার্থী শিবিরে আছেন। হুজুর তার ও তার পরিবারের জন্য দোয়া করেন।

একজন জার্মান আহমদী হুজুরকে আনুগত্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে। তিনি বলেন “হুজুর, আমাদেরকে বলা হয় আনুগত্য করা ঈমানের একটি অংশ। এই আনুগত্যের কি কোন সীমা রয়েছে? ”

হুজুর বলেন “আমাদের খলীফা প্রদত্ত সকল মা’রুফ সিদ্ধান্ত মানতে হবে, মা’রুফ সিদ্ধান্ত হল যেসকল সিদ্ধান্ত শরীয়ত সম্মত। প্রকৃতপক্ষে কোরআনের শিক্ষার অনুসরণ করাই হল খিলাফতের আনুগত্য করা, কারণ খলীফা কখনো তার অনুসারীদের কোরআন বহির্ভূত কোন কিছু করার নির্দেশ দিতে পারে না। এটিও মা’রুফ ও আনুগত্যের প্রকৃত অর্থ।”

“মহানবী(সাঃ) এর যুগে তিনি একটি অভিযানে কয়েকজনকে পাঠান এবং তাদের মধ্যে একজনকে অভিযানের নেতা নিযুক্ত করে দেন। সফরের সময় নেতা সবাইকে আগুনে ঝাপ দেবার আদেশ দেয়; কিন্তু সকলেই সেই আদেশ অমান্য করে। পরবর্তীতে তারা পুরো ঘটনা মহানবী(সাঃ) কে বলে। মহানবী(সাঃ) বলেন যে তারা সেই আদেশ অমান্য করে সঠিক কাজ করেছে। কারণ সেই আদেশ ইসলাম সম্মত ছিল না। তাই সেক্ষেত্রে আনুগত্য করাই ভুল সিদ্ধান্ত।  ”

একজন গ্রীক আহমদী বলেন “হুজুর আমি এপ্রিল ২০১৭ তে বয়াত করেছি। অনুগ্রহ করে আমার ডায়েরীতে কোন বার্তা লিখে দিন। আপনি যে কোন ভাষায় এটি লিখতে পারেন, আমার সেটি বোঝার কোন প্রয়োজন নেই, আমি কেবল আপনার বরকত চাই। ”

হুজুর তার ডায়েরীতে লিখেন “আল্লাহপাক আপনাকে ঈমানের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার ও বয়াতের শর্তসমূহ পালন করার তৌফিক দান করুন। ”

সিরিয়ার একজন কিশোর বালক হুজুরকে বলে যে সেদিনই বয়াত গ্রহণ করেছে। সে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে হুজুরের কাছে দোয়া চায়, তার চোখ দিয়ে তখন অশ্রু ঝরছিল। সে বলে “আমরা অনেক দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। যুদ্ধের সময় আমাদের বাসা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। এরপর আমরা একটি গাড়ীতে দিন কাটিয়েছি। হুজুর, অনুগ্রহ করে আমাদের জন্য দোয়া করুন। ”

হুজুর বলেন “আল্লাহপাক আপনাকে ও আপনার পরিবারকে সবসময় সুরক্ষিত রাখুন এবং সবসময় আপনার সাথে থাকুন।

স্লোভেনিয়া প্রতিনিধি

জলসার পর হুজুর ও তার কাফেলা ফ্র্যাঙ্কফোর্টে ফিরে আসেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সাথে হুজুর সাক্ষাৎ করেন। স্লোভেনিয়ার একজন নন-মুসলিম অতিথি হুজুরকে প্রশ্ন করেন “মুসলমানরা যে দেশে থাকবে তারা কি সেই দেশের সকল আইন মানতে বাধ্য; নাকি বিশেষ পরিস্হিতিতে তারা কিছু আইন অমান্য করতে পারে? ”

হুজুর বলেন “আল্লাহপাক বলেছেন আমাদের আল্লাহ, তার নবী(সাঃ) এবং নেতার কথা মানতে হবে। এই যুগে নেতা বলতে দেশের আইন ও সরকারকে বোঝানো হয়। তাই মুসলমানের দেশের আইন মেনে চলতে হবে। কিন্তু যদি কোন আইন তাদের মৌলিক ধর্মীয় অধিকার পালনে বাধা দেয় তাহলে সেটি তারা মানবে না। ”

“উদাহরণস্বরূপ পাকিস্তানের আইন আহমদীদের কলেমা পড়া, নামায আদায় করা ও সালাম দিতে বাধা দেয়। এগুলো হল ইসলামের মৌলিক শর্ত। তাই এক্ষেত্রে আমরা দেশের আইন মানতে পারব না। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে একজন মুসলিম দেশের সকল আইন মেনে চলবে। যদি কোন আইন মেনে চলতে অবর্ণনীয় কষ্টও হয় তাহলেও কোন বিদ্রোহ করা যাবে না বরং সে পরিস্হিতিতে এমন দেশে চলে যেতে হবে যেখানকার পরিস্হিতি সুবিধাজনক। ”

“পাকিস্তানে আমরা আইনের বাধা সত্ত্বেও আমাদের ধর্ম পালন করে যাচ্ছি। এটিও ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী করছি। ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলামবিরোধীরা মহানবী(সাঃ) ও তার সাহাবীদের আল্লাহর ইবাদত করতে বাধা প্রদান করত, কিন্তু অনেক অত্যাচার সত্ত্বেও তারা আল্লাহর প্রতি ইবাদত পালনে কোন আপোষ করেনি।  ”

একজন মহিলা অতিথি বলেন “আমি হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে(রঃ) একটি উদ্ধৃতি পড়েছি যেখানে তিনি বলেছেন নৈতিকতার সাথে ধর্মের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাহলে কি একজন নাস্তিক কখনো ন্যায়পরায়ণ ও ভাল কাজ করতে পারবে না? ”

হুজুর বলেন “আমি বলিনি যে নাস্তিকরা অসৎ বা তাদের মধ্যে কোন ভাল গুণাবলীই নেই। আপনি যে উক্তি পড়েছেন তার অর্থ এটি নয়। প্রকৃত অর্থ হল আমরা বিশ্বাস করী আল্লাহর নবীগণই সমাজে নৈতিকতার বীজ রোপণ করেছেন। আল্লাহ তার প্রতিনিধি পাঠানোর পূর্বে মানুষ আদিম, অসামাজিক ও পশুর মতো জীবন-যাপন করত। তাই আমরা বিশ্বাস করি নবীরাই নৈতিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। এর অর্থ এই নয় যে নাস্তিকদের মাঝে কোন ভাল গুণাবলীই নেই।  ”

একজন অতিথি প্রশ্ন করেন “হুজুর, একজন মানুষের নৈতিকভাবে উত্তম হতে হলে কেন তাকে পরকালে বিশ্বাসী হতে হবে?”

হুজুর বলেন “বর্তমান বিশ্বে মানুষকে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখতে শাস্তির ভয় দেখানো হয়। উদাহরণস্বরূ্প বলা যায় কেউ হয়ত কোন কিছু চুরি করতে বা কোন খারাপ কাজ করতে চায়, কিন্তু যেহেতু জেলে যাবার ভয় রয়েছে তাই সে কাজটি করে না। একই যুক্তি ধর্মীয় জীবনে পরকালের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়। মানুষের উন্নতির জন্য কিছু ধর্মীয় আইন রয়েছে এবং আমরা বিশ্বাস করি মানুষ যদি সেগুলো মেনে না চলে তাহলে তাকে তার ফল ভোগ করতে হবে। ”

“আল্লাহর প্রতি আমাদের যে ভয় তার মূলে রয়েছে ভালবাসা। যেভাবে একজন বাচ্চা তার মাকে দুঃখ দিতে চায় না, একইভাবে আমরাও আমাদের সৃষ্টিকর্তাকে হতাশ করতে চাই না। অপরদিকে মহান আল্লাহপাক পরম করুণাময় – অসীম দয়াময়। তাই যারা ভাল কাজ করে কিন্তু আল্লাহ ও পরকালের উপর বিশ্বাস রাখে না; তাদেরকেও ভাল কাজের জন্য পুরস্কৃত করা হবে।   ”

সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও কিরগিজিস্তানের প্রতিনিধি

সিঙ্গাপুরের একজন আহমদী হুজুরকে পুনরায় সেখানে যাবার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন সেখানকার আহমদীগণ অধীর আগ্রহে হুজুরের জন্য অপেক্ষা করছে। হুজুর বলেন “আমার সিঙ্গাপুর অনেক পছন্দ হয়েছে এবং ইনশাল্লাহ আমি আবার সেখানে যাব। সেখানে গেলে আমি স্হানীয় ও প্রতিবেশী দেশসমূহের আহমদীদের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পাব। ”

কিরগিজিস্তানের প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন আহমদী ছিলেন যিনি ঘানা জামেআতে পড়াশোনা করছেন। হুজুর তাকে চিনতে পারলেন। ঘানার খাবার ও তাদের দেশের খাবারের মধ্যে অনেক পার্থক্য। হুজুর তাকে বলেন “আমি যখন আপনার সমস্যার কথা জানতে পারি তখন জামেআ কর্তৃপক্ষকে বলি তারা যেন আপনার অভ্যাস অনুযায়ী খাবার দেবার চেষ্টা করেন। আমি আশা করি এখন আপনার কিছুটা সুবিধা হয়েছে।  ”

তিনি হুজুরকে ধন্যবাদ জানান ও বলেন যে এখন তিনি তার পছন্দের খাবার পাচ্ছেন।

হুজুর কিরগিজিস্তানের আহমদীদের কথা জিজ্ঞেস করেন এবং দোয়া করেন যেন আল্লাহপাক জামাতের সকল সমস্যা দূর করে দেন। হুজুর বলেন “আমি আপনাদের সকলকে দোয়া করার অণুরোধ জানাচ্ছি যেন পরিস্হিতির উন্নতি হয় এবং আমি একদিন সেখানে সফর করতে পারি। ”

আলবেনিয়া প্রতিনিধি

হুজুর আলবেনিয়া থেকে আগত একটি বড় প্রতিনিধিদলের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে সরকারী কর্মকর্তা ও অন্যান্য নন-মুসলিম অতিথিও ছিলেন। একজন নন-আহমদী ইমাম প্রশ্ন করেন “মহানবী(সাঃ) বলেছেন যে ইমাম মাহদী(আঃ) এর আগমনের একটি চিহ্ন হল তিনি কেয়ামতের খুব সন্নিকটেই আসবেন। আহমদীগণ মনে করে ইমাম মাহদী(আঃ) এসে গিয়েছেন। তাহলে কি কেয়ামতও অতি সন্নিকটে? ”

হুজুর বলেন “কেউ কি বলতে পারে কখন কেয়ামত সংঘটিত হবে? কেউ বলতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মহানবী(সাঃ) এর সাহাবগণও কেয়ামতের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। ইমাম মাহদী(সাঃ) যদি কেয়ামতের কয়েক দিন পূর্বে আসেন তাহলে এই সামান্য সময়ে তিনি কিভাবে পুরো বিশ্বের সংশোধন করবেন। এটি কোন যুক্তিযুক্ত কথা নয়। তাই আমরা যখন মহানবী(সাঃ) এর কথার অর্থ করি তখন সেটি প্রজ্ঞা ও যুক্তির মাধ্যমে করতে হবে।  ”

“এটিও বলা আছে যে ইমাম মাহদী(আঃ) ক্রশ ধ্বংস করবেন। যদি আমরা আক্ষরিক অর্থে নেই তাহলে কি এটি বোঝা যায় যে ইমাম মাহদী(আঃ) তার জীবন মানুষের ঘরে ঘরে যেয়ে ক্রশ ধ্বংস করে বেড়াবেন। তাই আমাদের হাদীসের প্রকৃত অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। প্রকৃত অর্থ হল ইমাম মাহদী(আঃ) এমন সময় আসবেন যখন কেয়ামতের খুব কাছাকাছি থাকবে কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আগামীকাল বা কয়েক বছরের মধ্যেই কেয়ামত সংঘটিত হবে। ”

“মুসলমানদের উচিৎ কেয়ামতের জন্য অপেক্ষা না করে যিনি ইমাম মাহদী(আঃ) হবার দাবী করেছেন তার সত্যতার পক্ষে কোন নিদর্শন রয়েছে কিনা সেটি লক্ষ্য করা। আমরা এমন যুগে বাস করি যেখানে সবাই যুক্তি বুঝে। তাই মানুষকেও এমন উত্তর দিতে হবে যা যুক্তিযুক্ত। নাহলে বর্তমান যুগে কেউ ইসলাম গ্রহণ করবে না। ”

স্নেহপরায়ণ মুহুর্ত

প্রশ্নোত্তর চলার সময় ৪-৫ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে তার মায়ের হাত ছাড়িয়ে হুজুরের কাছে ছুটে যায়। হুজুরের নিরাপত্তা কর্মীগণ তাকে তার মায়ের কাছে যেতে বলেন। কিন্তু হুজুর বাচ্চাটিকে কাছে আসতে বলেন এবং সে হুজুরের পায়ের কাছে এসে বসে পড়ে। এরপর প্রশ্নোত্তর চলতে থাকে এবং সেই বাচ্চাটি সেখানেই আনন্দ ও গর্বের সাথে বসে থাকে। বাচ্চাটির মা তাকে ইশারা দিয়ে ডাকতে থাকেন কিন্তু বাচ্চাটি প্রথমে তার মায়ের কথাও শুনে না। কয়েক মিনিট পর সে তার মায়ের কাছে ফিরে যায়। এটি অত্যন্ত সুন্দর ও স্মরণীয় দৃশ্য ছিল।

কাজাকাস্তান প্রতিনিধি

কাজাকাস্তানের প্রতিনিধিদের মধ্যে দুইজন আহমদী তরুণ ছিল যারা ঘানার জামেআতে পড়াশোনা করছিল। তাদের কিগিজিস্তান বন্ধুর মতো তাদেরও খাবার নিয়ে অসুবিধা হচ্ছিল। হুজুর তাদের বলেন “আমি জামেআ কর্তৃপক্ষকে তোমাদের অসুবিধার কথা বলেছি। আমি জানি কাজাকাস্তান ও কিরগিজিস্তানের স্যুপ অনেক বিখ্যাত; তাই আমি তাদেরকে বলেছি তোমাদের জন্য যেন সেটি তৈরী করে দেয়। ”

“সকল জামেআ ছাত্রদের জন্য সুষম খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একইসাথে তোমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে একজন মোবাল্লেগ হিসেবে তোমাদের যেকোন পরিস্হিতিতে কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি যখন ঘানাতে ছিলান তখন পরিস্হিতি এখনকার চেয়ে অনেক কঠিন ছিল। আমার ঘানার স্হানীয় খাবার খাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। কারণ বেশীরভাগ সময়ই পাকিস্তানী খাবার তৈরী করা সম্ভব ছিল না।”

দুজন ছাত্রই উর্দুতে কথা বলছিল। হুজুর তাদের প্রশংসা করে বলেন “মাশা’আল্লাহ, কাজাকাস্তান ও কিরগিজিস্তানের ছাত্রগণ খুব দ্রুতই উর্দু শিখছে এবং ভাল করছে। ”

এরপর হুজুর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন “আপনাদের উচিৎ প্রতিবছর ইউকে অথবা জার্মানীতে এসে আমার সাথে দেখা করা। যদি ইউকে তে আসেন তাহলে আমি বেশী সময় দিতে পারব, ইনশাল্লাহ। আপনাদের উচিৎ প্রতিবছর একমাস করে আমার সাথে সময় কাটানো।  ”

কাজাকাস্তানের একজন ছাত্র বলে “হুজুর আমি আপনাকে অনেক ভালবাসি।” সে এটি বলে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে।

হুজুর তাকে জাযাকাল্লাহ বলেন এবং ছাত্রদের ও অতিথিদের আংটি উপহার দেন।

মিটিং এর শেষে যেই ছাত্রটি হুজুরের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করেছিল সে এগিয়ে আসে ও হুজুরের সাথে কোলাকুলি করে, পূর্বে সে তার আবেগকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারলেও এবার তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে থাকে। এটি একটি অভাবনীয় দৃশ্য যে কিভাবে খিলাফতের প্রতি ভালবাসায় একজন কিশোরের হদয় বিগলিত হয়। তাদের দেশের জামাত যদিও অনেক ছোট এবং তাদেরকে অনেক সমস্যার সম্মুক্ষীণ হতে হচ্ছে কিন্তু তারপরও খিলাফতের প্রতি তাদের ভালবাসার সামন্যও কমতি নেই।

ইন্দোনেশিয়া প্রতিনিধি

ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন ছিলেন যার উপর ২০১১ সালে মসজিদে আহমদীয়ার হামলার সময় আক্রমণ করা হয়েছিল এবং তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তিনি তার কবজিতে একটি ক্ষতচিহ্ন দেখান। ডাক্তাররা প্রায় ৭ ঘন্টা অপারেশন করে তার হাত রক্ষা করতে পেরেছিলেন। এরপরে তার সুস্হতার গতি দেখে ডাক্তারও অবাক হয়ে যায়। হুজুর বলেন “এখন আপনার ঈমান আরো উন্নত মানের হতে হবে কারণ আল্লাহপাক আপনাকে আরোগ্য দিয়েছেন এবং অভাবনীয় দ্রুততার সাথে সুস্হতা দান করেছেন।  ”

আহমদীগণ হুজুরকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং হুজুর তাদের উত্তর দেন। এরপর হুজুর বাচ্চাদের কলম উপহার দেন। এরপর বয়স্ক আহমদীগণও হুজুরকে অনুরোধ করেন তাদেরকেও যেন অনুগ্রহ করে হুজুর কিছু উপহার দেন এবং হুজুর তাদের অনুরোধ রাখেন।

এস্তোনিয়া, পর্তুগাল ও কসোভোর প্রতিনিধি

এস্তোনিয়ার প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন আরব মহিলা ছিলেন যিনি অনেক আবেগের সাথে কথা বলছিলেন। তিনি বলেন “আমি ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো জার্মানী জলসায় অংশগ্রহণ করেছিলাম এবং বর্তমানে বয়াত করে আহমদীয়াত গ্রহণ করেছি। আমার বাবা-মা ফিলিস্তিনে থাকেন; আমি কি তাদেরকে আমার আহমদীয়াত গ্রহণের কথা ফোনে জানাতে পারি?”

হুজুর বলেন “আপনি যখন ফিলিস্তিনে যাবেন তখনই তাদেরকে শান্তভাবে ও যুক্তি সহকারে আপনার বক্তব্য বুঝিয়ে বলবেন। ফোনে বলার চেয়ে সামনাসামনি বলাই উত্তম। ”

পর্তুগালের প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন ছিলেন যিনি রাষ্ট্রপতির পদের জন্য গতবার নির্বাচনে দাড়িয়েছিলেন। তিনি বলেন “হুজুর, দয়া করে পর্তুগাল আসুন এবং আপনার শান্তির বাণী প্রচার করুন। কারণ সেখানে এটির খুবই প্রয়োজন। এর ফলে সেখানকার মুসলমানগণ দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ব পলানে আরো সচেষ্ট হবে কারণ আপনি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করছেন। ”

হুজুর বলেন “হ্যা, আমিও সুযোগ খুজঁছি কখন সেখানে যাওয়া যায়। সময়ের দাবি হল আমরা যেন নতুন বাধা সৃষ্টি না করে ভেদাভেদ ভুলে একসাথে কাজ করি।”

গিনিবিসাউ এর একজন আফ্রিকান নও-মোবাইন বলেন “জলসায় অংশগ্রহণ করা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা। আমার আবেগকে প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। একমাত্র আল্লাহপাকই আমার মনের ভাষা জানেন। গিনি বিসাউ তে আমার ভাই ও কাজিন কে আহমদীয়াত গ্রহণের জন্য অত্যাচার করা হয়েছে। আমার মনে হয় তাদের আত্মত্যাগের জন্য আল্লাহপাক আমাকে খলীফার সাথে দেখা করার সম্মান দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন।  ”

পর্তুগালের একজন পুলিশ অফিসার বলেন “আমি জলসার নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়েছি। ”

হুজুর বলেন “জলসায় আপনি যে শৃঙ্খলা দেখেছেন তার কারণ হল আহমদীগণের ধর্মের প্রতি ভালবাসা। আমরা জানি প্রকৃত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর এবং আল্লাহপাক সব শুনছেন ও দেখছেন। তাই আমরা কোন মানুষকে ভয় পাই না কিন্তু আমরা আমাদের খোদাকে অসন্তুষ্ট করতে চাই না। তাই আহমদী মুসলমানগণ কোন খারাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকে। ”

পুলিশ অফিসার বলেন “মিডিয়াতে যেই ইসলাম প্রচার করা হয়; ইউরোপের সেটি না শুনে এই ইসলামের বাণীই শোনা উচিৎ। ”

কসোভো থেকে একজন মোবাল্লেগ ও দুইজন মোয়াল্লেম আসেন। তারা বলেন সেখানে প্রায় ১৩০ জন আহমদী রয়েছেন। হুজুর বলেন “আপনাদের একজন মোবাল্লেগ ও দুইজন মোয়াল্লেম রয়েছে, তাই জামাদের সদস্য সংখ্যা এতদিনে ৫০০ জন হওয়া উচিৎ ছিল। প্রতিবছর তাজনীদের সংখ্যা ৫০০ করে বৃদ্ধি পাওয়া উচিৎ। যখন জামাতের সংখ্যা ২০০ হবে তারপর থেকে প্রতিবছর সংখ্যা দ্বিগুন হওয়া উচিৎ। তখনই আমি সন্তুষ্ট হবে ও মনে করব যে মোবাল্লেগ ও মোয়াল্লেমগণ আশানুরূপ কাজ করছে।   ”

কসোভোর একজন আহমদী বলেন “হুজুর, আমি দুই দিন আগে বয়াত করেছি। আমার আবেগকে আপনার কাছে সঠিকভাবে ব্যক্ত করা আমার জন্য অসম্ভব। আপনার সামনে বসতে পারা আমার জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় সম্মানের বিষয়। দয়া করে আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। তিনি আহমদীয়াত গ্রহণের পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন; যদিও কয়েক বছর পূর্বে তিনি আপনার সাথে দেখা করেছিলেন।  ”

হুজুর বলেন “আল্লাহপাক তার উপর দয়া করুন।”

নারীদের অধিকার

কয়েক মিনিট পর হুজুর লক্ষ্য করেন কসোভোর একজন নন-মুসলিম মহিলা রুমের পিছন দিকে বসে আছেন। হুজুর তাকে সামনে বসতে বলেন এবং বলেন যে আশা করি কেউ আপনাকে পিছনে বসতে বাধ্য করেনি।

তিনি বলেন যে তাকে কেউ পিছনে বসতে বাধ্য করেনি এবং তিনি হুজুরের সাথে কথা বলতে পেরে আনন্দিত। তিনি একজন মনোবিজ্ঞানী এবং পরবর্তী ১৫ মিনিট তিনি ইসলামে নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন “জলসায় আমার সব বক্তব্যই ভাল লেগেছে বিশেষভাবে আপনার বক্তব্য। কিন্তু নারী-পুরষের বসার স্হান আলাদা হবার ব্যাপারটি আমার পছন্দ হয়নি। আপনি আপনার বক্তব্যে বলেছেন ইসলামে নারী-পুরষকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে কিন্তু এখানে আমি তার ব্যাবহারিক প্রয়োগ দেখতে পেলাম না। ”

হুজুর তাকে জিজ্ঞেস করেন “এর ফলে কি আমাদের মহিলারা দুঃখিত বা অত্যাচারিত বলে মনে হয়েছে?”

তিনি বলেন আমি জলসার সময় নারীদের স্হানে যাইনি, পুরো সময় পুরুষদের স্হানেই ছিলাম।

হুজুর বলেন “আপনার উচিৎ দুই স্হানে যেয়েই নারী ও পুরুষদের সাথে কথা বলা। কিন্তু আপনি অর্ধেক তথ্য দিয়েই আপনার মতামত দিচ্ছেন। আপনার মনে হচ্ছে নারীদের উপর অবিচার করা হচ্ছে কিন্তু এ ব্যাপারে আপনি তাদের সাথেও কথা বলেননি। আপনার সফরের বাকি সময়ে আপনি আহমদী মহিলাদের সাথে কথা বলুন। আপনি ভবিষ্যতে যেকোন সময় আমাদের অতিথি হিসেবে আসতে পারেন এবং একজন মনোবিজ্ঞানী হিসেবে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পারেন যে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য করা হচ্ছে কিনা। ”

তিনি বলেন যে তিনি আসবেন এবং আরো বলেন “আমি ইসলামে নারী-পুরুষের সমান অধিকার সম্বন্ধে বিশ্বাস করতে পারব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা একত্রে সহাবস্হান করতে পারবে। ”

এরপর হুজুর ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সমান অধিকারের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। হুজুর বলেন “নারীদের মূল দায়িত্ব হল সন্তানদের তরবিয়ত প্রদান করা, একইসাথে সকল আহমদী মেয়েদের পড়াশোনায় উৎসাহ দেয়া হয়। অনেকেই কেবল পড়াশোনায় নয় বরং পেশাদারী জীবনেও অনেক ভাল করছে। ”

মনোবিজ্ঞানী হুজুরকে পর্দার ব্যাপারে আপত্তি করে বলেন যে তিনি শিখেছেন যোগাযোগের একটি অন্যতম মাধ্যম হল দৃষ্টির সংযোগ হওয়া।

হুজুর বলেন “কাউকে মুসলমান হতে বাধ্য করা হচ্ছে না। ইসলাম বলে ধর্মের ব্যাপারে কোন জোর নেই। কিন্তু যদি কেউ স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাহলে তাকে কোরআনের শিক্ষা মেনে চলা উচিৎ। কোরআন বলে যে নারী-পুরুষের দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে। পুরুষের প্রকৃতি নারীদের থেকে আলাদা। তাই সমাজ ও মানুষকে নিরাপদ রাখার জন্য কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা জরুরী।  ”

আমার মনে হচ্ছিল তিনি আরো কিছু বলে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের দিকে যাচ্ছিলেন। তখন হুজুর উঠে দাড়ান ও হাসেন। হুজুর বলেন “আমার আরো মিটিং এ যেতে হবে। যারা ছবি তুলতে চায় তারা সামনে আসতে পারে। ”

পুরো সময় হুজুর অত্যন্ত শান্ত ছিলেন। হুজুর যুক্তির মাধ্যমে সকল প্রশ্ন ও সমালোচনার উত্তর দেন। হুজুর যখন দেখলেন যে তাদের বক্তব্য অপ্রয়োজনীয় তর্কের দিকে চলে যাচ্ছে তখন অমায়িকভাবে মিটিং শেষ করেন।

ছবি তোলার সময় মনোবিজ্ঞানী হুজুরকে বলেন “এটি অত্যন্ত চমৎকার আলোচনা ছিল। আমাকে সময় দেবার জন্য ও বিস্তারিতভাবে প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য ধন্যবাদ।”

তিনজন নতুন বন্ধু

দুপুরের খাবারের বিরতির সময় আমি ঘানার তিনজন জামেআ ছাত্রের সাথে কথা বলি যারা আগের দিন হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। আমি তাদের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করি।

কিরগিজিস্তানের আশহিরালি বলেন “আমি ২০০৯ সালে আহমদীয়াত গ্রহণ করি। পূর্বে আমি ওহাবী মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম এবং সিরিয়াতে পড়াশোনা করতাম। আমি নিশ্চিত আহমদীয়াত গ্রহণের ফলে আমার ও আমার পরিবারের জীবন রক্ষা হয়েছে। কারণ আমি পূর্বে ওহাবী মতাদর্শে এতটাই বিশ্বাসী ছিলাম যে হয়ত একদিন আমি কোন সন্ত্রাসী দলে যোগ দিতাম এবং এতদিনে হয়ত আমি মৃত্যুবরণ করতাম। কিন্তু আল্লাহপাক আমাকে রক্ষা করেছেন! আমি সিরিয়াতে নয়জন বন্ধুসহ পড়াশোনা করতে গিয়েছিলাম। তাদের মধ্যে চার জন সন্ত্রাসী দল দায়েশের পক্ষে লড়াই করতে যেয়ে মারা গিয়েছে এবং অন্যরাও এখনো সিরিয়াতে লড়াই করছে।  ”

“নিঃসন্দেহে আহমদীয়াত আমাকে শারীরিকভাবে রক্ষা করেছে। কিন্তু যেটি আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল আহমদীয়াত আমাকে আধ্যাত্মিকভাবেও রক্ষা করেছে। এর মাধ্যমে আমি ইসলামের প্রকৃত মর্ম অনুধাবন করেছি এবং আমি এখন ধর্মকে ভালবাসতে শিখেছি। আমি এখন প্রকৃত খিলাফত লাভ করেছি, খলীফা এমন একজন নেতা যিনি আমাদেরকে সন্তানের মতো ভালবাসেন এবং আমরাও তাকে বাবার মতো ভালবাসি। পূর্বে আমার ইসলাম সম্বন্ধে কোন গভীর জ্ঞানই ছিল না। কিন্তু এখন আমার জীবনের একটি প্রকৃত উদ্দেশ্য রয়েছে এবং আমি আমার ধর্মের জন্য সারাজীবন কাজ করে যেতে চাই।  ”

হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে তিনি বলেন “আমি এমটিএ তে হুজুরের খুৎবা দেখে থাকি এবং সেখানে হুজুরকে দেখে অনেক গম্ভীর বলে মনে হয়, তাই আমি সাক্ষাতের পূর্বে কিছুটা ভীত ছিলাম। আজকে হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গিয়েছে। আমার পূর্বের ভয়, ভালবাসা দ্বারা প্রতিস্হাপিত হয়ে গিয়েছে। হুজুরের প্রতিটি দৃষ্টি ও কথা তার প্রতি আমার ভালাবাসাকে আরো বৃদ্ধি করেছে।”

“আমাদের কোন যোগ্যতাই নেই, কিন্তু খলীফা চান আমরা যেন কিছু করি। তার পদ্ধতি হল ভালবাসা এবং এই ভালবাসা বিশ্বের সকল অস্ত্র থেকেও শক্তিশালী। তার ভালবাসা ও দয়া এই বিশ্বকে পরিবর্তন করতে পারে। আমরাও এর একটি প্রমাণ, কারণ হুজুর আমাদের জীবনকেও চিরতরে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। ”

কাজাকাস্তানের দাউদ বলেন “আজ আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগপ্রবণ দিন, কারণ আমি হুজুরকে অত্যন্ত ভালবাসি। ঘানার জামেআতে পড়ার সময় আমি হুজুরকে অনেকবার স্বপ্নে দেখেছি। আজ সেই স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। আমার উর্দুতে কথা বলা হুজুরের পছন্দ হয়েছে এবং এজন্য আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি হুজুরের সাথে কোলাকুলি করারও সুযোগ পেয়েছি, যার ফলে আমার আর একটি আশা পূর্ণ হয়েছে। ”

কাজাকাস্তানের আইটযাহান বলেন “আমি জামেআতে ভর্তি হয়েছি কারণ আমি বিশ্বে আহমদীয়াতের বাণী ছড়িয়ে দিতে চাই। আমি খলীফাতুল মসীহর একজন আধ্যাত্মিক যোদ্ধা হতে চাই। আজ হুজুরকে দেখে আমার সংকল্প আরো দৃঢ় হয়েছে। আমি ওয়াদা করছি খিলাফতের জন্য আমি যে কোন প্রতিবন্ধকতা ও কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত রয়েছি। আমি যে কোন পরিস্হিতিতে আমার খলীফার পাশে থাকব। ”

আমাদের আলোচনার শেষে দাউদ বলেন “সবার শেষে আমি বলতে চাই ‘ইন্নি মাকা ইয়া মাশরুর’ আমরা সবসময় হুজুরের সাথে আছি এবং থাকব। হুজুর আপনি যখন সারা বিশ্বে শান্তির বাণী প্রচার করে যাবেন আমরা সবসময় আপনার পাশে থাকব. আমরা আপনাকে সবসময় মান্য করব! মান্য করব! মান্য করব! ”

হাঙ্গেরী ও বসনিয়ান প্রতিনিধি

হাঙ্গেরীর একজন মহিলা অতিথি বলেন “হুজুর আমি হাঙ্গেরী থেকে আপনার বক্তব্য শোনার জন্যই এসেছি; কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমি অসুস্হ হয়ে পড়ি। আহমদীগণ আমাকে যে সম্মান দিয়েছে এতে আমি আভিভূত। তারা আমার প্রতি নিজেদের পরিবারের সদস্যের মতোই লক্ষ্য রেখেছে। এই ভালবাসা সারাজীবন আমার মনে থাকবে। হাঙ্গেরীতে আহমদীগণ বড়দিনে প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের খেলনা উপহার দিয়েছে। এটি সমাজের মানুষের মধ্যে আহমদীদের সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব তৈরী করেছে এবং ইসলাম সম্বন্ধে তাদের অনেক ভুল ধারণা দূর হয়েছে। ”

হুজুর বলেন “আমাদের জামাত এমন কাজ করেছে শুনে আমি আনন্দিত। তাদের উচিৎ আগামী বছর গুলোতেও এরকম কাজ করা। ”

বসনিয়ার একজন মহিলা বলেন “আমার তিন মাসের একটি শিশু রয়েছে। সে ঘুমের মধ্যেই মাঝে মাঝে হাসে। মানুষ আমাকে বলে যে তারা ফেরেশতাদের দেখে হাসে। এটি কি সত্যি?”

হুজুর বলেন “শিশুরা নিজেরাই ফেরেশতার মতো এবং তারা সম্পূর্ণ পবিত্র। তারা মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে এবং এ কারণে হাসে। ”

সার্বিয়ার একজন মহিলা বলেন “বসনিয়ার যুদ্ধের সময় আমি আহমদীয়া জামাত সম্বন্ধে জানি এবং বয়াত করি। আমি হুজুরকে দোয়ার জন্য অণুরোধ করছি যেন সার্বিয়াতে জামাত ছড়িয়ে পড়ে। আমার স্বামী জার্মানীতে কাজ করছে। দোয়া করবেন তিনি যেন আর ভিসা না পান; যেন তিনি সার্বিয়াতে জামাতের জন্য কাজ করতে পারেন।  ”

এরকম অনন্য দোয়ার অনুরোধ শুনে হুজুর হাসেন ও বলেন “মাশা’আল্লাহ, আমাদের জামাতের নারীদের মধ্যে ঈমানের এরকম মানই প্রয়োজন। এটি পরিস্কার যে আপনার পার্থিব জিনিসের প্রতি কোন আগ্রহ নেই। আপনার একমাত্র লক্ষ্য হল ধর্মের তবলীগ করা যেন জামাত ছড়িয়ে পড়ে। যতক্ষণ আমাদের জামাতে আপনার মতো মা ও স্ত্রী রয়েছে আমাদের জামাত ইনশাল্লাহ ক্রমাগত উন্নতি করতে থাকবে। ”

“আপনার স্বামীর ভিসার ব্যাপারে আমি দোয়া করি যেখানে আল্লাহপাক বরকত রেখেছেন সেখানেই যেন উনি যান। ”

মেসিডোনিয়া, বুলগেরিয়া, ইতালী এবং বুরকিনা ফাসো প্রতিনিধি

মেসিডোনিয়ার একজন নন-মুসলিম মহিলা বলেন “হুজুর, ইসলামের কোন বিষয়টিকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন? ”

হুজুর বলেন “মুসলমানদের উচিৎ তাদের সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক তৈরী করা। এটি করার উপায় হলো দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া। যদি কোন মানুষের আল্লাহর সাথে সম্পর্ক থাকে তাহলেই সে ভাল মুসলিম হতে পারবে। ”

মেসিডোনিয়ার আর একজন মহিলা বলেন “জলসার সময় আমি মহিলাদের পাশে গিয়েছিলাম। আমি দেখেছি যে মহিলারাও ছেলেদের মতো স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করছে। আমার মনে হয়েছে তারা সমান অধিকার ভোগ করছে। কিন্তু আমার মনে প্রশ্নে এসেছে যে ইসলাম মনে করে নারীদের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো সন্তান ও ঘর দেখাশোনা করা। তাহলে কি তারা প্রকৃত সমান অধিকার পেতে পারে? ”

হুজুর বলেন “আমি জলসায় আমার বক্তব্যে নারী-পুরষের কাজের ভিন্নতার ব্যাপারে বক্তব্য দিয়েছি। তাদের কাজের ভিন্নতা তাদের সমান অধিকারের ব্যাপারে কোন প্রতিবন্ধকতা নয়। আপনি কি জানেন জলসাতে পুরষরা নারীদের জন্য রান্না করেছে! তাই নারীরা এসময় তাদের সময় উপভোগ করতে পেরেছে এবং পুরুষরা তাদের জন্য রান্না করেছে! ”

বুলগেরিয়ার একজন বয়স্ক মহিলা বলেন “হুজুর আমি জলসায় অংশগ্রহণকারীদের নৈতকতা ও শিষ্টাচার দেখে আভিভূত হয়েছি। তাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসার স্পৃহা আমার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাদের মধ্যে কে গরীব আর কে বিত্তশালী সেটি বোঝার কোন উপায় ছিল না। তাদের সকলকেই সমান বলে মনে হচ্ছিল। সকলের মুখেই সবসময় হাসি ছিল।  ”

হুজুর বলেন “এটিই হল প্রকৃত ইসলাম।”

হুজুর বুরকিনা ফাসোর প্রতিনিধিদের একজন আহমদী সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন যিনি সম্প্রতি আহমদীয়াত ছেড়ে দিয়েছেন। তারা বলে যে সেই ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে কিন্তু ব্যক্তিগত সম্মানের জন্য জামাতে পুনরায় আসতে লজ্জ্বাবোধ করছে।

হুজুর বলেন “আপনারা তাকে বলুন তিনি যেন আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন; যেন আল্লাহপাক তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন। যদি সে জামাতে আসতে চায় তাহলে কোন অহংকার বা সম্মান যেন তাকে বাধা না দেয়। ”

“আল্লাহর রহমতে বুরকিনা ফাসোর জামাত খিলাফতের প্রতি ভালবাসায় খুবই আন্তরিক একটি জামাত। আমি মনে করি এটি আফ্রিকার একটি অন্যতম সেরা জামাত। আমি দোয়া করি তাদের এই আন্তরিকতা যেন না কমে বরং প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পায়।  ”

ভুল হিসাব

প্রতিনিধিগণ হুজুরকে বলে যে তারা বুরকিনা ফাসোতে আরো বিদ্যালয় তৈরী করতে চায়। হুজুর তাদের উৎসাহ দেন ও বলেন যে তারা যেন গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় তৈরীতে গুরুত্ব দেয় যেন আফ্রিকার স্হানীয় বাচ্চারা পড়ালেখা শিখতে পারে। আলোচনরা সময় হুজুর নতুন বিদ্যালয় তৈরীর খরচ সম্বন্ধে আলোচনা করতে থাকেন। এক সময় হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে আমার ফোনের ক্যালকুলেটরে কয়েকটি যোগ করতে বলেন।

আমি স্বীকার করছি যে আমি সে সময় কিছুটা অন্যমন্সক ছিলাম এবং হুজুর কি কি নাম্বার যোগ করতে বলছিলেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না। আমি তারপরও সাহস করে যোগ করি এবং বলি “হুজুর যোগফল প্রায় ৮০০০।”

হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে বলেন “এটি অসম্ভব।”

হুজুর নিজেই যোগ করে বলেন যে প্রকৃত যোগফল হল ২৯০ লাখ। আমি হুজুরের কথা শুনে অত্যন্ত লজ্জ্বিত হই।

হুজুর হাসেন ও বলেন “ক্যালকুলেটরের সাহায্য নিয়েও তুমি যোগ করতে পার না! মনে হয় তোমার আফ্রিকানদের মতো উজ্জ্বল রেশমী কাপড় পরিধান করা উচিৎ। ”

সামান্য বিষয়ের প্রতি মনোযোগ

নামাযের পূর্বে হুজুরের হাতে কয়েক মিনিট সময় ছিল। হুজুর তখন ইউএসএর কাজা বোর্ডের প্রেসিডেন্ট কুদুস মালিক সাহেবকে তার অফিসে ডাকেন। হুজুর জানেন যে তিনি আমার বন্ধু তাই তিনি আমাকেও আসতে বলেন। কুদুস সাহেব হুজুরের কাছে সর্বোত্তম উপায়ে কাজা বোর্ডের দায়িত্ব পালনে হুজুরের দিক নির্দেশনা চান। হুজুর বলেন “মনে রাখবে শারীরিক ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ তালাকের ঘটনায় যদি পুরুষ কোন ভাল যুক্তি দেয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তুমি মাথা নাড়িয়ে থাকবে। কিন্তু পর্দার কারণে যদি মহিলা কোন ভাল যুক্তি দেয় তাহলে হয়ত তুমি মাথা নাড়াবে না। এর ফলে মহিলা মনে করতে পারে যে তুমি পুরুষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছ।  ”

“তাই লক্ষ্য রাখবে শারীরিক ভাষা যেন সবসময় নিরপেক্ষ থাকে। যদি কোন পক্ষ কোন ভাল যুক্তি দেয় তাহলে সেটি মনে রাখবে কিন্তু বাইরে প্রকাশ করবে না। একইভাবে কেউ যদি কোন দুর্বল যুক্তি দেয় তাহলেও সেটিকে পাত্তা না দেবার মতো আচরণ দেখাবে না। ”

“খিলাফতের পূর্বে আমিও কাজীর দায়িত্ব পালন করেছিলাম। আমি লক্ষ্য রাখতাম আমার কোন শারীরিক ভাষা যেন কোন পক্ষের প্রতি পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণ প্রকাশ না করে। অবশ্যই মানুষ যখন তাদের বিষয় পেশ করবে কিছু বিষয়ের সাথে তুমিও একমত হবে; কিন্তু সেগুলো বাইরে প্রকাশ করবে না। এরপর তুমি ন্যায়ের সাথে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করবে। ”

আমি নিজেও আইন পড়েছি ও কয়েক বছর চর্চা করেছি। কিন্তু কখনো এরকম বিশ্লেষণী উপদেশ শুনিনি। আমাদের পড়াশোনার সময় ন্যয়বিচার করার কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু কখনো শারীরিক ভাষা নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়া হয়নি। কিন্তু এ ব্যাপারে হুজুরের কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও হুজুর বুঝেন যে সামান্য পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণও ন্যয়বিচার ব্যহত করতে পারে। আমি বিশ্বাস করি এটি হল খিলাফতের সত্যতার প্রমাণ এবং আল্লাহপাক এভাবেই সকল বিষয়ে খলীফাকে সাহায্য করেন।

লন্ডনে ফিরে আসা

২৯ আগস্ট ২০১৭ তারিখে আমাদের কাফেলা বায়তুস সুবুহ থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সকাল ১০ টায় হুজুর দোয়া পড়িয়ে যাত্রা শুরু করেন। ১১.২০ মিনিটে আমাদের কাফেলা একটি সার্ভিস স্টেশনে থামে। সেখানে হুজুর গাড়ী থেকে নেমে আমাকে ডাকেন। আমি এই সুযোগে গতদিনের কিছু ঘটনা হুজুরকে বলি। হুজুর দয়া করে শুনেন ও মতামত দেন। সেই সময় মাত্র কয়েক মিনিট স্হায়ী হয়েছিল; কিন্তু সফরের সময় হুজুরের সাথে সমান্য মুহুর্তও অনেক উপভোগ্য।

এরপর আমরা আবার যাত্রা শুরু করি। কয়েক ঘন্টা যাবার পর ব্রাসেলসে বায়তুস সালাম মসজিদে নামাযের জন্য বিরতি নেই। যদিও সময় কম ছিল তারপরও হুজুর কিছু স্হানীয় আহমদী ও নতুন বয়াতকারী আহমদীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বাচ্চাদের চকোলেট বিতরণ করেন।

সেখানে খুবই গরম ছিল। হুজুর একজন স্হানীয় আহমদীকে বলেন “এখানে এত গরম যে আমার মনে হচ্ছে আমি আফ্রিকা এসে গেছি। ”

এরপর আমরা আবার যাত্রা শুরু করি এবং বিকেল ৫.১৫ মিনিটে ক্যালসিসে পৌঁছাই। অনেক যানজটের কারণে ইউরোটানেলে উঠতে আমাদের ৬.৫৫ মিনিট বেজে যায়। ৬.৩০ মিনিটে আমরা ইউকে পৌঁছাই।

আমি তখন ভাবছিলাম যে গত কয়েক মাস হুজুরের অনেক ব্যস্ত সময় কেটেছে। হুজুর ইউকে শান্তি সম্মলেন, জার্মানী সফর, রমযান, ইউকে জলসা এবং এরপর জার্মানী জলসায় অংশ নিয়েছেন। হয়ত আগামী কয়েক সপ্তাহ সূচী কিছুটা কম থাকবে। কিন্তু আমি পরবর্তীতে বুঝতে পারলাম যে আমি ভুল চিন্তা করছিলাম।

কয়েকদিন পরই ঈদ-উল-আযহা, এরপর মজলিস খোদ্দামুল আহমদীয়া ও লাজনা দের বার্ষিক ইজতেমা যেখানে হুজুর সমাপণী বক্তব্য প্রদান করেন।

অতিরিক্ত দিন

ব্যক্তিগতভাবে আমার জার্মানী সফর আরো একদিন বাকি ছিল। এবার জার্মানীতে হুজুর এত ব্যস্ত ছিলেন যে আমাকে পূর্বের সফরের মতো সময় দিতে পারেন নি। তাই সফরের পর আমি যখন হুজুরের অফিসে যাই তখন হুজুর আমার উপর অনুগ্রহ করে আমাকে ৯০ মিনিটের বেশি সময় দেন। এ সময় হুজুর সফরে আমার অভিজ্ঞতা ও যাদের সাথে কথা বলেছি সে সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেন।

আমি বলি যে জার্মানীতে একজন আহমদী আমাকে বলেন যে রাবওয়াতে খোদ্দামগণ যে তরবিয়ত পায় সেটি পশ্চিমাদের থেকে উত্তম। হুজুর বলেন “এটি ঠিক যে রাবওয়াতে মানুষকে ভাল মানের তরবিয়ত প্রদান করা হয়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল সেই তরবিয়তের উপর আমল করা এবং সবসময় নিজের উন্নতির চেষ্টা করা। নাহলে বিশ্বের সকল প্রশিক্ষণ নিয়েও কোন লাভ নেই। ”

“পাকিস্তানের জামাত অনেক প্রতিষ্ঠিত এবং তাদের দক্ষ জনবল রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি জামাতের সকল সিদ্ধান্ত যুগ খলীফাই প্রদান করে থাকেন, পাকিস্তানের জামাতও এর বাইরে নয়। ”

সাক্ষাতের পর আমি যখন বের হচ্ছিলাম তখন হুজুর বলেন “আগামী কয়েক সপ্তাহে ইউকে খোদ্দাম ও লাজনাদের বার্ষিক ইজতেমা হবে এবং তাদের আমি ইংরেজীতে বক্তব্য দিব। ”

এটি শুনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হলাম; কারণ হতে পারে হুজুরের বক্তব্যের নোট নেবার জন্য আমি হুজুরের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য পাব। হুজুরের সাথে প্রতিটি মুহুর্ত কাটানো অত্যন্ত সৌভাগ্যের ব্যাপার।

আবেগপ্রবণ মন্তব্য

জার্মানী সফর মাত্র দশ দিনের হলেও, প্রতিটি দিনই অত্যন্ত বরকতময় ছিল। হুজুর এসময় গিসেন শহরে মসজিদ উদ্বোধন করেন, কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন, শত শত আহমদীদের সাথে সাক্ষাৎ করেন, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেন এবং জলসাতে ঈমান বৃদ্ধিকারী বক্তব্য প্রদান করেন।

আমাদের খলীফা প্রতিটি মুহুর্ত আমাদের দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি আমাদের উন্নতির জন্য প্রতিটি মুহুর্ত আমাদের জন্য ব্যয় করেন। আল্লাহপাক তার উপর যে বিশাল দায়িত্ব প্রদান করেছেন তিনি সবসময় সেটি পালন করে আসছেন; কিন্তু তারপরও তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বিনীত মানুষ। প্রতিটি দিন আমি হুজুরের বিনয় ও নিরহঙ্কারের প্রমাণ দেখতে পাই।

যেমন জার্মানী ডায়েরীর প্রথম পর্বে আমি একজন জামাত মোবাল্লেগের কথা উল্লেখ করেছিলাম। যিনি বলেছিলেন “ আমি খিলাফতের পূর্বে হুজুরের জীবন সম্বন্ধে যতই আলোকপাত করি, আমি বুঝতে পারি যে আল্লাহপাক কেন তাকে খলীফাতুল মসীহ নির্বাচন করেছেন।”

আমি হুজুরকে কয়েকদিন আগে মন্তব্যটি শুনাই। হুজুর সাথেসাথেই তার কাজ বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন “তাই নাকি? আমি তো আজ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম না। ”

মহান আল্লাহপাক খলীফাতুল মসীহ আল খামেস (আইঃ) কে দীর্ঘ ও সু্স্হ জীবন দান করুন এবং আহমদীদেরকে সর্বদা খিলাফতের প্রতি অনুগত থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।