Menu

আল্লাহ্‌

হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আঃ) তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ইসলামী নীতি দর্শন’-এর এক স্থলে আল্লাহ্‌র পরিচয় এভাবে তুলে ধরেছেনঃ

“অতঃপর ইহাও জানা আবশ্যক যে, যে খোদার দিকে আমাদিগকে কুরআন শরীফ আহ্বান করে, তাঁহার নিম্নরূপ গুণাবলী লিখিত আছেঃ

هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ

الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ

هُوَ اللَّهُ الْخَالِقُ الْبَارِئُ الْمُصَوِّرُ لَهُ الْأَسْمَاء الْحُسْنَى يُسَبِّحُ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

رَبِّ الْعَالَمِينَ

الرَّحْمـنِ الرَّحِيمِ

مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ

أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ

الْحَيُّ الْقَيُّومُ

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ * اللَّهُ الصَّمَدُ * لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ * وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُواً أَحَدٌ

অর্থাৎ, “সেই খোদা এক-অদ্বিতীয় ও অংশীবিহীন, তিনি ব্যতীত কেহই আরাধ্য ও আনুগত্যের যোগ্য নহে” (৫৯:২৩)। ইহা এই জন্যই বলিয়াছেন যে, তিনি অংশীবিহীন না হইলে সম্ভবতঃ তাঁহার শক্তির উপর শত্রুর শক্তি প্রবল হইতে পারিত। এই অবস্থায় ঐশী মর্যাদা বিপন্ন এবং তিনি যে বলিয়াছেনঃ “তিনি ব্যতীত কেহই আরাধ্য নাই,” ইহার অর্থ, তিনি এমন কামেল খোদা যাহার গুণাবলী ও কামালত এরূপ উচ্চ ও মহান যে, বিশ্ব চরাচরে কামেল গুণাবলীর জন্য কোন খোদার নির্বাচন করিতে চাহিলে, কিংবা মনে মনে শ্রেয়ঃ হইতে শ্রেয়তর এবং উচ্চ হইতে উচ্চতর কোন খোদার গুণাবলী কল্পনা করিতে চাইলে, যাঁহাকে ছাড়াইয়া কেহ উত্তম হইতে পারে না, তিনিই আল্লাহ্‌ বা খোদা হন, যাঁহার আরাধনায় তুচ্ছ বস্তুকে শরীক করা অন্যায়। অতঃপর তিনি বলিয়াছেনঃ “তিনি আলেমুল গায়েব”। অর্থাৎ তাঁহার সত্তাকে একমাত্র তিনিই জানেন। তাঁহার সত্তাকে কেহ পরিবেষ্টন করিতে পারে না। চন্দ্র সূর্য এবং প্রত্যেক সৃষ্ট বস্তুর আপাদ মস্তক আমরা দর্শন করিতে পারি, কিন্তু খোদার আপাদ মস্তক দর্শনে আমরা অক্ষম। পুনরায় তিনি বলিয়াছেনঃ “তিনি আলেমুশ শাহাদাহ”। অর্থাৎ কোন জিনিষ তাঁহার দৃষ্টির অগোচর নহে। ইহা হইতে পারে না যে, তিনি খোদা বলিয়া অভিহিত হইয়া বস্তু জগৎ সম্বন্ধে উদাসীন। তিনি বিশ্বের অণুপরমাণু পর্যন্ত দেখেন। কিন্তু মানুষ তাহা পারে না। তিনি জানেন, কখন তিনি এই জগৎ-বিধানকে ভাঙ্গিয়া ফেলিবেন এবং কেয়ামত আনিবেন এবং পুনরুত্থান ঘটাইবেন। তিনি ছাড়া কেহ জানে না যে, এরূপ কখন হইবে। সুতরাং, তিনিই খোদা যিনি সকল প্রকারের সময়কেই জানেন। তিনি আবার বলিয়াছেনঃ “হুওয়ার রহমান”। অর্থাৎ তিনি প্রাণী সকলের অস্তিত্ব ও উহাদের কর্মের পূর্বে শুধু আপন দয়ায়, কোন স্বার্থের জন্য নহে বা কাহারও কর্ম ফলেও নহে, তাহাদের জন্য আরামের সমগ্রী যোগাইয়া থাকেন। যেমন, সূর্য ও পৃথিবী এবং অন্য সব জিনিষ আমাদের অস্তিত্ব লাভের পূর্বে ও আমাদের কার্য সাধনের পূর্বে, আমাদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন। এই দানের নাম খোদা নিজ গ্রন্থে রহমানিয়্যত এবং এই কাজের দিক হইতে নিজের নাম রহমান রাখিয়াছেন। তিনি পুনরায় বলিয়াছেনঃ- “আর্‌ রহীম”। তিনি খোদা, যিনি উত্তম কাজের সর্বোত্তম পুরস্কার দেন। কাহারও শ্রমকে বিনষ্ট করেন না। এই কাজের দিক হইতে তিনি রহীম এবং এই গুণের নাম রহীমিয়্যত। তারপর তিনি বলিয়াছেনঃ “মালেকে ইয়াওমিদ্‌দীন”। অর্থাৎ সেই খোদা প্রত্যেকের পুরস্কার বা শাস্তি স্বহস্তে ধারণ করেন। তাঁহার এমন কার্য নির্বাহক নাই, যাহাকে তিনি আকাশ ও পৃথিবীর শাসন ক্ষমতা সঁপিয়া দিয়া নিজে পৃথক হইয়া বসিয়া আছেন এবং নিজে কিছুই করেন না। এমনও নহে যে, সেই কার্য নির্বাহকই যত পুরস্কার ও শাস্তি দেয় বা ভবিষ্যতে দিবে। তারপর তিনি বলিয়াছেনঃ

الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ

“আল মালেকুল কুদ্দুস”। অর্থাৎ “সেই খোদা বাদশাহ, যাঁহার কোনই কলঙ্ক নাই” (৫৯:২৪)

ইহা সুস্পষ্ট যে, মানুষের বাদশাহাত কলঙ্কহীন নহে। দৃষ্টান্ত স্থলে, যদি কোন বাদশাহের সব প্রজা কষ্ট পাইয়া বা বিতাড়িত হইয়া দেশ ত্যাগ করিয়া অন্য দেশ অভিমুখে পলায়ণ করে, তবে তাহার বাদশাহী কায়েম থাকিতে পারে না। কিংবা যদি সব প্রজা দুর্ভিক্ষ পীড়িত হয়, তাহা হইলে রাজস্ব কোথা হইতে আসিবে? যদি প্রজাগণ বাদশাহের সহিত তর্ক আরম্ভ করিয়া দেয় যে, তাঁহার ও প্রজাদের মধ্যে এমন কি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পার্থক্য আছে, তাহা হইলে তিনি তাহাদের নিকট নিজের কি বিশেষ যোগ্যতা সাব্যস্ত করিবেন? বস্তুতঃ খোদা তা’লার বাদশাহী এ প্রকারের নহে। তিনি মুহূর্তে সব দেশ লয় করিয়া অন্য সৃষ্টি আনয়ন করিতে পারেন। যদি তিনি এইরূপ ক্ষমতাবান স্রষ্টা ও শক্তিমান প্রতিপালক না হইতেন, তাহা হইলে তাঁহার বাদশাহাত নির্যাতন ছাড়া চলিতে পারিত না। কারণ তিনি একবার বিশ্ববাসীকে ক্ষমা এবং মুক্তি দান করিয়া অন্য জগৎ কোথা হইতে আনিতেন? মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণকে পৃথিবীতে পুনঃ প্রেরণের জন্য আবার ধর পাকড় ও নির্যাতনের পথে কি প্রদত্ত ক্ষমা ও মু���্তিকে প্রত্যাহার করিতে হইত না? তদবস্থায়, তাঁহার ঐশী-কর্মকান্ডে পার্থক্য ঘটিত এবং তিনি পৃথিবীর বাদশাহ্‌গণের ন্যায় এক কলঙ্ক কালিমা লিপ্ত বাদশাহ হইয়া পড়িতেন, যাহারা দেশের জন্য আইন-কানুন তৈরি করে, যাহারা কথায় কথায় বিগড়াইয়া যায় এবং নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য যখন দেখিতে পায় যে, নির্যাতন ছাড়া গতি নাই, তখন তাহারা নির্যাতনকে মাতৃ-স্তন্যের দুধের ন্যায় মনে করে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, রাজকীয় আইনে একটি জাহাজকে বাঁচাইতে একটি নৌকার সকল আরোহীকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করাকে ও সত্য সত্যই বিনষ্ট করাকে, সিদ্ধ রাখা হইয়াছে। কিন্তু খোদার পক্ষে এই প্রকার অসহায় হওয়া অনুচিত। সুতরাং যদি খোদা সর্বশক্তিমান ও অনস্তি-ত্ব হইতে সৃষ্টিকারী না হইতেন, তাহা হইলে তিনি হয় দুর্বল রাজাদের ন্যায় মহিমার পরিবর্তে অত্যাচারের দ্বারা কাজ লইতেন, অথবা বিচারক হইয়া খোদায়ীকেই বিদায় দিতেন। পরন্ত খোদার জাহাজ সকল মহিমার সহিত প্রকৃত বিচারের উপরে চলিতেছে। তিনি আবার বলিয়াছেন, ‘আস্‌সালাম’ অর্থাৎ, সেই খোদা, যিনি ত্রুটি-বিচ্যুতি, বিপদ-আপদ ও কঠোরতা হইতে নিরাপদ, বরং শান্তি দাতা। ইহার অর্থও স্পষ্ট। কারণ যদি তিনি নিজেই বিপদগ্রস্থ হইতেন, লোকের হাতে মারা পড়িতেন এবং তাঁহার ইচ্ছা-শক্তি ব্যর্থ হইত, তাহা হইলে এই মন্দ নমুনাকে দেখিয়া মন কি প্রকারে এই বলিয়া সান্ত্বনা লাভ করিতে পারিত যে, এহেন খোদা আমাদিগকে নিশ্চয় আপদ মুক্ত করিবেন? আল্লাহ্‌ তা’লা মিথ্যা উপাস্যদের সম্বন্ধে বলেনঃ

إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَن يَخْلُقُوا ذُبَاباً وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ وَإِن يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئاً لَّا يَسْتَنقِذُوهُ مِنْهُ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ *

مَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ *

“যে সব মানুষকে তোমরা খোদা বানাইয়া বসিয়া আছ, তাহারা সকলে মিলিয়া একটি মাছি সৃষ্টি করিতে চাহিলেও, কখনও তাহা পারিবে না, এমনকি একে অপরকে সাহায্য করিলেও না। বরং যদি মাছি তাহাদের কোন জিনিষ ছিনাইয়া লইয়া যায়, তবে সেই মাছি হইতে সেই বস্তু ফেরৎ আনিবার শক্তিও তাহাদের হইবে না”। (২২:৭৪-৭৫)

তাহাদের উপাসকগণ বুদ্ধি ও শক্তিতে দুর্বল। খোদা তো তিনি , যিনি সকল শক্তিমান হইতেও অধিক শক্তিশালী এবং সকলের উপর প্রাধান্য বিস্তারকারী। কেহ তাঁহাকে ধরিতে বা বধ করিতে পারে না। যাহারা ভ্রমে নিপতিত, তাহারা খোদার মর্যাদা বুঝে না এবং জানে না যে, খোদা কেমন হওয়া উচিত। তারপর বলিয়াছেনঃ

“খোদা শান্তি দাতা, স্বীয় কামালাত ও তৌহীদের প্রমাণ প্রতিষ্ঠাকারী”।

ইহা এই কথার প্রতি ইঙ্গিত করিতেছে যে, প্রকৃত খোদার মান্যকারী ব্যক্তি কোন মজলিসে লজ্জিত হইতে পারে না এবং সে খোদার সম্মুখেও লজ্জিত হইবে না। কারণ তাহার কাছে শক্তিশালী যুক্তি থাকে। কিন্তু কৃত্রিম খোদায় বিশ্বাসী বড়ই বিপদে থাকে। সে যুক্তি দেয়ার পরির্বতে নিরর্থক আজেবাজে কথাকে গোপন তত্ত্ব আখ্যা দেয়, যাহাতে হাস্যাস্পদ হইতে না হয় এবং প্রমাণিত ভ্রান্তি সমূহকে ঢাকা দিতে চাহে। তিনি আরও বলিয়াছেনঃ

السَّلَامُ الْمُؤْمِنُ الْمُهَيْمِنُ الْعَزِيزُ الْجَبَّارُ الْمُتَكَبِّرُ

অর্থাৎ “তিনি সকলের রক্ষক, পরাক্রমশালী, নষ্ট হওয়া কাজকেও সুসম্পন্নকারী; তাঁহার সত্তা চূড়ান্তভাবে অভাবের অতীত” (৫৯:২৪)

Pages: 1 2 3 4 5