ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর সত্যতার প্রমাণ

৩. ১। ধমীয় গ্রন্থাবলীতে বর্ণিত ভবিষ্যাদ্বাণীসমূহের পূর্ণতার সাক্ষ্য প্রমাণঃ

পবিত্র কুরআনে সূরা জুমুআতে তাঁর আবির্ভাব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর দ্বিতীয় আগমন বলে অভিহিত করা হয়েছে। সূরা সাফে তাঁকে ‘আহ্‌মদ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সূরা নূরে ‘ঈসা-সদৃশ’ খলীফা হিসাবে ইংগিত করা হয়েছে। সূরা কাহাফে তাঁকে ‘যুল কারনায়ন’ বলা হয়েছে। হাদীসের গ্রন্থাবলীতে তাঁকে কখনও ‘ইমাম মাহ্‌দী’, কখনও ‘ঈসা ইবনে মরিয়ম’, ‘ইবনে মরিয়াম’, ‘খলীফাতুল্লাহিল মাহ্‌দী’ বলা হয়েছে। হিন্দুদের শাস্ত্রাদিতে কলি যুগের জন্য প্রতিশ্রুত মহাপুরুষকে ‘কল্কি অবতার’ এবং বৌদ্ধ ধর্মে ‘মৈত্তেয়’ বলা হয়েছে। তিনি পার্শী ধর্মে ‘মসীদর বহরমী’, ‘সুসান’ এবং ‘পবিত্র আহ্‌মদ’ নামে তিনি পরিচিত, খৃষ্টানদের জন্য তিনি ‘মনুষ্য পুত্র ঈসা’ নামে এবং শিখ ধর্মে ‘রেশাদ’ ও ‘মাহ্‌দীমীর’ বলে অভিহিত। বস্তুতঃ সকল ধর্মের অনুসারীদের জন্য শেষ যুগে তিনি এক ও অভিন্ন ঐশী সংস্কারক হবেন। একই যুগে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি প্রত্যাদিষ্ট হওয়ার প্রশ্ন বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে অযৌক্তিক এবং হাস্যকর। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘মাহ্‌দী ঈসা ইবনে মরিয়ম ব্যতীত অপর কেহ নহেন’। (ইবনে মাজা)

পবিত্র কুরআনের কয়েকটি রেফারেন্স দৃষ্টান্ত হিসেবে নীচে উল্ল্যেখ করা হলোঃ (এ গুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ, হাদীসের উক্তি ইত্যাদি বিষয়ে জানার জন্য হযরত মির্যা সাহেব (আঃ)-এর লেখা ৮৮ খানা পুস্তক এবং আহ্‌মদীয়া সাহিত্য, পত্র-পত্রিকাদি দ্রষ্টব্য)।

ক. বূ্রুজী’ আবির্ভাবঃ সূরা জুমুআঃ ৪ আয়াতে আধ্যাত্মিক অর্থে বুরুজীভাবে হযরত মুহাম্ম (সাঃ)-এর দ্বিতীয় আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বণী রয়েছে। এ সম্বন্ধে বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীস ‘লাও কানাল ঈমানু মোয়ালিৱকান ইনদা সুরাইয়া লানালাহু রেজালুন মিনহা-উলায়েঁ প্রণিধানযোগ্য।
খ. খেলাফতের প্রতিশ্রুতিঃ সূরা নূরঃ ৫৬ আয়াতে খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঐশী প্রতিশ্রুতি রয়েছে যা বিশেষভাবে ইসলামের আর্বিভাব-যুগে খোলাফায়ে রাশেদীনের মাধ্যমে এবং আখেরী যুগে ইমাম মাহ্‌দী ও মসীহ্‌ মাওউদ (আঃ)-এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। এ সম্বন্ধে মেশকাত ও অন্যান্য হাদীস দ্রষ্টব্য।
গ. আবির্ভাব কালঃ সূরা সিজদাঃ ৬ আয়াত অনুযায়ী ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর (সহী হাদীস অনুযায়ী প্রথম তিনশত বছর ইসলামের গৌরবময় যুগ) এক হাজার বছরে উহা আকাশে উঠে যাবে। অর্থাৎ ১০০০ + ৩০০ বছর = ১৩০০ বছর পর উপরের (ক) ক্রমিকে বর্ণিত সূরা জুমুআর ভবিষ্যদ্বাণী অনুয়ায়ী আকাশ হতে ধরাপৃষ্ঠে ঈমানকে আনয়নের জন্য প্রতিশ্রুত মহাপুরুষের আগমন অবধারিত। ফলতঃ চৌদ্দশত হিজরীর প্রারম্ভেই আহ্‌মদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা ঐশী নির্দেশে তাঁর দাবী পেশ করেছেন।
ঘ. বিশ্ব বিজয়ের প্রতিশ্রুতিঃ সূরা সাফঃ ১০, ফাতাহঃ ২৯-৩০, তাওবাঃ ৩৩ প্রভৃতি আয়াত এবং সংশ্লিষ্ট হাদীস ও বুযূর্গানে উম্মতের অভিমত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ‘প্রতিশ্রুত মসীহ্‌’ এবং প্রতীক্ষিত মাহ্‌দী’ (আঃ)-এর মাধ্যমে আখেরী যুগে ইসলাম প্রচার ব্যবস্থা সুসংগঠিত হবে এবং ঐশী সাহায্যের দ্বারা ইসলাম বিশ্ব-বিজয়ী হবে।
ঙ. ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)-এর বংশ, নাম, দৈহিক গঠন এবং আর্বিভাব স্থানঃ আনআমঃ ২১, সাফঃ ৭, জুমুয়াঃ ৪, ইয়াসিনঃ ২১-২৬ এবং সংশ্লিষ্ট হাদীসের ভবিষ্যদ্বাণী এবং বুযূর্গানে উম্মতের অভিমতের আলোকে বিষয়টির প্রকৃত তাৎপর্য পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, আহ্‌মদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতার মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ পূর্ণতা লাভ করেছে।
চ. চরম বিরোধিতা সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীসমূহঃ সূরা বাকারাঃ ২৯৫ ইয়াসিনঃ ৩১, বুরুজঃ ৮-১২, আনআমঃ ১১ এবং সংশ্লিষ্ট হাদীসের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযয়ী সমকালীন অহঙ্কারী-দাম্ভিক আলেমগণ আহ্‌মদীয়া জামাতের বির্বদ্ধে বিষোদগার করে চলেছে। এর দ্বারাও দাবীকারকের সত্যতাই প্রমাণিত হয়।

৩.২। অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থের ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের পূর্ণতার প্রমাণসমূহঃ

বিশ্বজনীন ধর্ম হিসাবে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা পৃথিবীর অন্যান্য ধর্ম এবং ধর্মীয় মহাপুরুষদিগকে সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছে (লাকাদ বায়াসনা ফিকুলিৱ উম্মতির রাসূল- ইউনুসঃ ৪৮)। অবশ্য একথা সত্য যে, বিভিন্ন কারণে অতীতের গ্রন্থাবলী সংরক্ষিত হয় নাই এবং তার ফলে অনেক ক্ষেত্রে এগুলো বিকৃতি এবং হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। এতদসত্বেও প্রাচীন ধর্ম গ্রন্থাবলীতে অল্প বিস্তর ভবিষ্যদ্বাণী দেখতে পাওয়া যায় যেগুলো দ্বারাও ‘আখেরী তথা কলি যুগ’ এবং সেই যুগের মহাপুরুষের বিভিন্ন লক্ষণ ও চিহ্নাবলীর উল্ল্যেখ দেখতে পাওয়া যায় যেগুলো বর্তমান কালে পূর্ণতা লাভ করেছে। সংক্ষেপে কয়েকটি ভবিষ্যদ্বাণীর বরাত উল্ল্যেখ করলাম।

ক. হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যদ্বাণীঃ ‘আহ্‌মদ’ নামক ঋষি তাঁর আত্মিক পিতার আদর্শ অনুযায়ী আসবেন (অথর্ব বেদ ২০ কান্ড, ১৯৫ সুক্ত)। আহ্‌মদের আবির্ভাব স্থলের নাম হবে কদন (অথর্ব বেদ, ৯৭ সুক্ত)। সেই সময়ে বিশেষ চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ হবে (মহাভারত বনপর্ব, ভাগবৎপুরাণ-৯৩ স্কন্ধ)। মহাভারতের ৯ম পর্ব ৯৯০-৯৯৯ অধ্যায়গুলোতে কলিযুগের বিভিন্ন চিহ্ন ও লক্ষণসমূহ বর্ণিত হয়েছে যেগুলো বর্তমান যুগে পূর্ণ হয়েছে। গীতার একাদশ অধ্যায় ‘শ্রীকৃষ্ণের বিশ্বরূপ’ সম্পর্কে যে সকল বিষয় বর্ণিত হয়েছে সেগুলো কলিযুগের মহাপুরুষ সম্পর্কে যথোপযুক্তভাবে প্রযোজ্য। বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থ ‘অনাগত ভবিষ্য’ অনুযায়ী শেষ যুগে ‘মৈত্তেয়’ আসার ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে। ‘জৈনষ্টাকাতনী’ নামক বৌদ্ধ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, শেষ যুগে আগমনকারী মহাপুরুষের নাম ‘এমদ’ হবে।
খ. পার্শী ধর্মের ভবিষ্যদ্বাণীঃ ‘পবিত্র আহ্‌মদ নিশ্চয় আগমন করবেন’ (যেন্দাবেস্তা, ৯ম খন্ড)। শেষ যুগে একজন ত্রাণকর্তার আবির্ভাব হবে (গাথা)। শাহ রহমতুল্লা (মসীহদর বহরমী বা সুসান নামে) এক পবিত্র পুরুষের আবির্ভাব হবে (সুস্তনাম সাসান পঞ্চমঃ ৩১-৩৩ শ্লোক)।
গ. ইহুদী ও খৃষ্টধর্মের ভবিষ্যদ্বাণীঃ মসীহ্‌ একজন রসূল হবেন এবং তাঁর রাজত্ব কাল হাজার বছর স্থায়ী হবে (তালমুদ)। ‘প্রতিশ্রুত মসীহ মারা যাবেন এবং তাঁর রাজত্ব পুত্র ও পৌত্রের উপর বর্তাবে’ (তালমুদ)। বিদ্যুত যেমন পূর্ব দিক পর্যন্ত প্রকাশ পায় তেমনি মনুষ্য-পুত্রের আগমন হবে (মথি ২৪:২৭)। মানুষের গায়ে ব্যাথাজনক দুষ্টক্ষতের সৃষ্টি হলো … সমুদ্রের জীবগণ মরলো … প্রচণ্ড ভূমিকম্প হলো … (প্রকাশিত বাক্য ১৬:২-২১)। উল্লেখ্য যে খৃষ্টধর্ম গ্রন্থের ২৯৬টি স্থানে শেষ যুগে মনুষ্যপুত্র মসীহ্‌ অর্থাৎ হযরত ইসা (আঃ)-এর আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে।
ঘ. শিখ-মতবাদের আলোকেঃ তিনি প্রকৃত সিদ্ধগুরুর শিষ্য হবেন (গুরুগ্রন্থ সাহেব, রাগ তালংগ, মোহাল্লা-১)। সেই মহাপুরুষ পাঞ্জাবের বাটালা অঞ্চলে জমিদার পরিবারে আবির্ভূত হবেন (ভাইবালা জনম শাখী) তিনি ‘রেশাদ’ নামে অভিহিত হবেন যার অর্থ ‘খোদার প্রিয়’ এবং ‘নৈকট্য প্রাপ্ত’ (ভাইবালা জনম শাখী)। চন্দ্র ও সূর্য তাঁর আগমন বার্তা ঘোষণা করবে (গুরু গ্রন্থ সাহেব, মোহাল্লা- ৭, ঝুলনা- ৪)। এক অবতার অর্থাৎ মাহ্‌দীমীর প্রেরিত হবেন। তিনি রাক্ষস বধ করবেন, সমগ্র বিশ্বে খ্যাতি লাভ করবেন… (গুরা গোবিন্দ সিং, ১০ম গ্রন্থ, চব্বিশ অবতার অধ্যায়)।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7